আবু নাসের হাসপাতালে সিরিয়ালে রোগীর মরণদশা : ফের সক্রিয় ওষুধ প্রতিনিধি ও দালাল চক্র

বাথরুমের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ রোগীরা

কামরুল হোসেন মনি : আলমগীর ও পুতুল দাস দু’জনই কার্ডিওলোজি চিকিৎসককে দেখানোর জন্য শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে আসেন। হাসপাতালের আউটডোর থেকে তারা টিকিট কেটে চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে বসে থাকা এক ব্যক্তির কাছে টিকিটটি জমা দিতে গেলেই এক কথায় উত্তর প্রেসার মেপে আসেন। দুইজনই প্রেসার মেপে পুনরায় আসলে বলে আজ হবে না। এতেই ওই দুইজন রোগী উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। শুরু হয় দুইজনের মধ্যে তর্র্ক। চিল্লাপাল্লা শুনে ডিউটিরত পুলিশ এসে উপস্থিত। রোগীদের অভিযোগ টাকার বিনিময়ে অন্য রোগীদের সিরিয়াল দিয়ে, এখন বলছে ৪০ জন রোগীর সিরিয়াল হয়ে গেছে আগামীকাল আসতে হবে।
সোমবার নগরীর গোয়ালখালীতে অবস্থিত শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে আউটডোরের ১১২নং রুমে চিকিৎসার নিতে আসা দুর্ভোগে পড়া রোগীদের চিত্র এ প্রতিবেদকের নজরে আসে। শুধু কার্ডিওলোজি বিভাগের নয়, নিউরোলজি বিভাগেরও একই অবস্থা। তখন ৯টা বেজে ১৫ মিনিট ঘড়ির কাঁটায়। চিকিৎসকরা কখন আসবেন এমন প্রশ্ন করা হলে শানু নামে এক মহিলা বলে ওঠেন ১১টার পর আসবে। এটি কি প্রতিদিনের নিয়ম এমন প্রশ্নে বলেন, স্যাররা (ডাক্তাররা) ওই সময়ই আসেন। আবার আড়াইটার আগেই চলে যান। সাড়ে ১০টা পর্যন্তও চিকিৎসকের খোঁজ মেলেনি। ১০ টা ৫৮ মিনিটে চেম্বারে ঢোকেন চিকিৎসক। রোগীদের অভিযোগ, ভোর ৫টার পর থেকে এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, আগে সিরিয়াল নেওয়ার জন্য। একজনকে টিকিট কাটাতে পাঠানো হয়, আরেকজন এখানে দাঁড়িয়ে থাকি। আর ডাক্তার আসেন ১১টার পর। আবার বলেন, ৪০ জনের বেশি সিরিয়াল নেওয়া হবে না।
নিউরোলজি বিভাগের ডাক্তারের চেম্বারের দীর্ঘ লাইন পড়ে আছে। অনেকেই এসে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মেঝেতেও বসে পড়ছেন। কেউ একবার উঠছেন আর বসছেন। চিকিৎসকের নেই কোনো খোঁজ। ওই দিন নিউঃ সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মোঃ রুহুল কুদ্দুস দেশের বাইরে অবস্থান করায় তার পরিবর্তে দেখছেন সহকারী অধ্যাপক ডাঃ আব্দুস সালাম। সেখানেও একই অবস্থা। আলট্রাসনোগ্রাফি বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীদর দীর্ঘ লাইন। সকাল ৯টার পর থেকে রোগীরা চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপসন অনুযায়ী আলট্রাসোনো করাতে আসেন। একটু পর পর রোগীরা জানতে চাচ্ছেন, কখন ডাক্তার আসবেন? ১১টার পর। এতক্ষণ পর আসবে! এত সময় থাকলে তো কাপড় নষ্ট হয়ে যাবে, প্রস্রাবের বেগ বেশি আসছে। এক রোগী অপেক্ষা করতে করতে সামনে মেঝেতে অসুস্থ হয়ে শুয়ে পড়েছেন। কথা হয় রোগী তানিয়া সুলতানা ওরফে রেনুর বাবা আঃ মান্নানের সাথে। তিনি বলেন, দৌলতপুর দেয়ানা থেকে ওই হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাফি করাতে আসেন। ঘন্টা দুই ডাক্তারের অপেক্ষায় থাকার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই আলট্রাসনোগ্রাফি রুমে চিকিৎসক আসেন ১১টার পর।
আউটডোরের বাথরুমে গিয়ে দেখা যায়, ময়লা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। নেই বাথরুমের লাইট। আগত রোগীর স্বজনরা জানান, রাতের বেলায় বাথরুমে লাইট না থাকায় বিপদে পড়তে হয় রোগীদের নিয়ে। কার্ডিওলোজি বিভাগের ইনডোরের বাথরুমের অবস্থাও একই রকম। বেলা একটার পর পরই গিয়ে দেখা গেছে, ডাক্তারের চেম্বারে রোগীর বদলে ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিড়। এর মধ্যে কয়েকজন চিকিৎসক চেম্বার ত্যাগ করেন। এর আগে ওই সব ওষুধ প্রতিনিধিরা ডাক্তারের দেওয়া রোগীদের ওষুধের ব্যবস্থাপত্র মোবাইলফোনে ছবি তোলার জন্য রীতিমত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন।
এমআরআইওতে আছে অনিয়মের অভিযোগ। এমআইআরও কোনো রোগী করাতে আসলে তাকে রিপোর্ট ও সিরিয়াল মিলে এক মাস অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় সিরিয়ালের তোয়াক্কা না করে হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারীর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে এমআরআইএর সিরিয়াল পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের। স্ট্রোক করা এক রোগীর স্বজনরা জানান, কোনো হাসপাতালে এমআরআইয়ের জন্য সিরিয়াল নিয়ে যদি এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হয়, তবে আর ওই পরীক্ষার দরকার আছে কি? ততদিন রোগী বাঁচবে কি মরবে কিংবা অন্য কী অবস্থা হবে, সেই দায় কে নেবে!’
শহীদ আবু নাসের হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ বিধান চন্দ্র গোস্বামী সার্বিক বিষয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, রোজার মধ্যে তাদের চিকিৎসার সিডিউল পরিবর্তন হয়নি। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। তিনি বলেন, আউটডোরে কোনো মেডিকেল অফিসার নিয়োগ না থাকায়, কনসালট্যান্ট ডাক্তাররা ইনডোরের রোগী দেখে তারপর আউটডোরে যাচ্ছেন। অন্যসব সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে মেডিকেল অফিসার থাকলেও এই হাসপাতালে নেই। দালালদের বিরুদ্ধে তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে দালালদের আটক করছেন। আমরাও তাদেরকে সহযোগিতা করছি।

আপনার মতামত জানানঃ