এখনও কাঁদছেন মা চার বছরেও বিচার হলো না দিয়াজ হত্যার

চট্টগ্রাম ব্যুরো:কি কারণে মেধাবী ছাত্র দিয়াজকে খুন হতে হলো? কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাবেক ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরী চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য উন্মোচন না হওয়ায় জনমনে এমন প্রশ্ন আজও ঘুরপাক খাচ্ছে।

যদিও পরিবার এবং দিয়াজের অনুসারী ছাত্রলীগ কর্মীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্মাণকাজের দরপত্র নিয়ে সৃষ্ট কোন্দলের সূত্র ধরেই পরিকল্পিতভাবে দিয়াজকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের আজ ২০ নভেম্বর চার বছর পূর্ণ হলেও হত্যার আসল রহস্য উন্মোচন করতে পারেননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তরা।

এই হত্যার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে প্রতিবছরই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে, হয়নি শুধু মামলার অগ্রগতি। প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়ালেও অধরা রয়ে গেছে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আসামিরা।

এদিকে সন্তানহারা দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী সুষ্ঠু বিচারের আশায় এখনও ধুকে ধুকে কাঁদছেন। ছেলে হত্যার বিচারে চেয়ে বেশ কয়েকবার গায়ে কাফনের কাপড় জড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে অনশনেও বসেছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার দিয়াজের বড়বোন জুবাঈদা ছরওয়ার চৌধুরী নিপা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কোনো নতুন আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। দুজন আসামি জামিনে আছেন। বাকিরা পলাতক। আমরা সিআইডি অফিসে যাচ্ছি। কিছুদিন আগে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। ওনাকে নতুন করে সব ডকুমেন্ট ও স্বাক্ষী দেখাতে হচ্ছে, বুঝাতে হচ্ছে’।
মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও তাদের গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ। চার বছরের মধ্যে প্রতিবছর নতুন একজন সিআইডি কর্মকর্তা আসে, আবার বদলি হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচারের আশায় এখনও ধুকে ধুকে কাঁদছেন আমার মা।’

দিয়াজ হত্যার তদন্তকারী কর্মকর্তা চট্টগ্রাম ও জেলার সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার অবদুস সালাম মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তদন্ত চলছে। আমি সবেমাত্র এ মামলার তদন্তের দায়িত্বে এসেছি। কিছুদিন আগে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি। সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাদিপক্ষ যেসব তথ্য দিয়েছে তা আমরা সংগ্রহ করছি। নিরপেক্ষ জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে’।

আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আসামি দুজনকে ধরার পর রিমান্ডেও আনা হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা জামিনে বেরিয়ে গেছে। যারা পলাতক আছে তাদের বিরুদ্ধে হাটহাজারী থানায় ওয়ারেন্ট আছে।’

দিয়াজ ইরফানের অনুসারী ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মো. মামুন বলেন, ‘চার বছরেও দিয়াজ হত্যা মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। কি কারণে এতো সময় লাগছে আমারা তা বুঝতে পারছি না। খুব শিগগিরই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, এটাই আমাদের একমাত্র দাবি’।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন উত্তর ক্যাম্পাসে নিজ বাসা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক দিয়াজের লাশ। ঘটনার পর দিন প্রথম দফা ময়নাতদন্ত করা হয়। তিন দিন পর (২৩ নভেম্বর) ‘আত্মহত্যা’ উল্লেখ করে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন দেয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ।

 তবে দিয়াজের পরিবার এ ঘটনাটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যা’ বলে দাবি করে আসছিল। দিয়াজের লাশ উদ্ধারের চার দিন পর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেন। এসময় তিনি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। পরে ২৪ নভেম্বর দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী বাদি হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন এক সহকারী প্রক্টর, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং সংগঠনটির ১০ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। দিয়াজের মায়ের আপত্তির ফলে আদালত সিআইডিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়। এরপর দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা। তদন্তের স্বার্থে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল মাহমুদের নেতৃত্বে একটি টিম দিয়াজের বাসা পরিদর্শন করেন। পরে ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই দেওয়া দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দিয়াজের শরীরে হত্যার আলমত রয়েছে বলা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশের পর দিয়াজের মায়ের করা এজাহার হত্যা মামলা হিসেবে নিতে হাটহাজারী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন আদালত।

আপনার মতামত জানানঃ