খুমেক হাসপাতাল ওষুধ প্রতিনিধিদের দখলে! : বেপরোয়া সংঘবদ্ধ দালাল চক্র

কামরুল হোসেন মনি : খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল এখন ওষুধ প্রতিনিধিদের দখলে। তাদের কারণে রোগীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে। সেই সাথে রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংঘবদ্ধ দালাল চক্র।
মঙ্গলবার খুমেক হাসপাতালে সরেজমিনে বহিঃবিভাগ ও আন্তঃবিভাগে এ চিত্র দেখা যায়। সকাল সাড়ে ১১টায় হাসপাতালের সার্জারি (৯-১০) ওয়ার্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হন দুইজন। সাথে রয়েছে আহতদের অত্মীয়-স্বজনরা। ওই ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসকের রুমে দেখা গেছে মানুষের জটলা। কেউ ভিজিটিং কার্ড বের করছেন, কেউ বা তাদের কোম্পানির ওষুধের নাম বলছেন রোগীর প্রেসক্রিপশনে প্রেসক্রাইব করার জন্য। দরজার বাইরে রোগীর লোক দাঁড়িয়ে আছেন। ওষুধ প্রতিনিধিরা ভেতরে থাকার কারণে ডাক্তারের রুমে ঢুকতেই পারছেন না আগত রোগীর অভিভাবকরা। আবার বাইরে ওষুধ কোম্পানির ব্যাগ রেখে দুইজন অপেক্ষা করছেন। বহিঃবিভাগের সার্জারি, অর্থপেডিক্স, মেডিসিন, ইএনটি চিকিৎসকদের রুমের সামনে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। এদের মধ্যে কেউ রোগীর দীর্ঘ লাইন পাশ কাটিয়ে চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে পড়ছেন। রোগীরা বের হওয়ার সাথে সাথে ওষুধ প্রতিনিধিরা সংঘবদ্ধ হয়ে রোগীকে আটকিয়ে রাখে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে কী ওষুধ এর নাম লেখা হচ্ছে। মোবাইল বের করেই ছবি তুলছে। একজন তুলছেন আরেকজন তোলার জন্য আবারও রোগীর হাত থেকে প্রেসক্রিপশনটা কেড়ে নিচ্ছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে স্যাম্পল উপঢৌকন ও বিভিন্ন প্রকার উপহার সামগ্রী নিয়ে তাদেরকে যে কোনো সময় প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসকরা। বিভিন্ন নামী দামী ওষুধ কোম্পানির পাশাপাশি রয়েছে ফুড সাপ্লিমেন্ট নামক পট কোম্পানির প্রতিনিধিরাও। চিকিৎসকরা ওষুধের মান ও গুণ বিবেচনা না রেখে রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ওই সব কোম্পানির ওষুধের নাম লিখে থাকেন। কোন কোম্পানি কত বেশি সুবিধা দিয়ে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন করাতে পারে তা নিয়ে চলে রিপ্রেজেনটেটিভদের মধ্যে অঘোষিত প্রতিযোগিতা। রোগী চিকিৎসকের রুম থেকে বের হলে রিপ্রেজেনটেটিভরা সেই ব্যবস্থাপত্র যাচাই করে দেখে উপঢৌকন নেওয়া চিকিৎসকরা তাদের প্রতিষ্ঠানের ওষুধের নাম লিখছেন কি-না। হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে রয়েছে আরেক গ্রুপ ওষুধ প্রতিনিধি। ভেতর বাইরে সব জায়গায় হাসপাতাল দখলে রয়েছে রিপ্রেজেনটেটিভদের।
বটিয়াঘাটা থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী সাইফুলের বাবা হাফিজ উদ্দিন বলেন, বহিঃবিভাগের মেডিসিন ডাক্তারকে দেখিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথে ঘিরে ধরে রিপ্রেজেনটেটিভরা। ওখানে ছিলো এক গ্রুপ। এখন বাইরে রয়েছে রিপ্রেজেনটেটিভদের আরেক গ্রুপ। সেখানে তার হাত থেকে জোর করে প্রেসক্রিপশন নিয়ে যাচ্ছে তারা। পুরো হাসপাতালটাই মনে হচ্ছে এদেরই দখলে। অপরদিকে বহিঃবিভাগের মহিলা টিকিট রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা দালাল। ভেতের এক যুবতী মেয়ে লাইনে দাঁড়াতেই তার কাছে গিয়ে বলছেন এখানে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী। আমি ১শ টাকার মধ্যে আপনাকে ডাক্তারের চেম্বারে বসে রোগী দেখিয়ে দিতে পারবো। আমার সাথে আসেন। এখানে ডাক্তার তেমনভাবে রোগীকে দেখেন না। রোগীর সাথে দালালের এসব কথাকোপন এইভাবে চলতে দেখা যায়। খুমেক হাসপাতালে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগী আসলেই এভাবে রোগীরা দালালদের খপ্পড়ে পড়ে। অনেক দালাল টাকা নিয়ে লাপাত্তাও হয়ে যায়। কারো কারো বিরুদ্ধে কম খরচে টেস্টের কথা বলে রোগীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
খুমেক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ওষুধ প্রতিনিধিদের ভিজিটের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডাক্তারের চেম্বারে রোগী থাকলে কোনো ওষুধ প্রতিনিধির ওই সময় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারী করা আছে। এছাড়া দালালের খপ্পরে যাতে কোনো রোগী না পড়েন সেই জন্য আন্তঃবিভাগে ও বহিঃবিভাগে মাইকের মাধ্যমে রোগীকে সতর্কবার্তা জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওষুধ প্রতিনিধিরা নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে হাসপাতাল অভ্যন্তরে ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আপনার মতামত জানানঃ