খুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ বাস্তবায়ন কাগজ-কলমেই!

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণে জরিপ নেই

কামরুল হোসেন মনি : খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) পক্ষ থেকে ৯৪টি এবং কেসিসির পক্ষ থেকে ৫৯টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করা হয় ২০১০ সালে। এরপর গত ৯ বছরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা আরও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। কেসিসির পক্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে জরিপ না হওয়ায় ভবনের সঠিক তথ্য জানা নেই কর্তৃপক্ষের। তালিকাভুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণের সিদ্ধান্ত হলেও তা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৬ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন মেয়রের সভাপতিত্বে এক সভায় ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাভুক্ত যে সকল বাড়ি জেলা প্রশাসন ও গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক লীজ দেওয়া আছে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষ ওই সকল বাড়ির লীজ বাতিল করবে এবং কেসিসি ভবনসমূহের হোল্ডিং বাতিল করবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া ওই সভায় ৭ দিনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ত্যাগ করার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু ওই সব সিদ্ধান্তগুলো কাগজ-কলমে রয়ে গেছে। বাস্তবে রূপ নেয়নি কখনো। এর আগে ২০১০ সালে নগরীর বড় বাজার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে দুই ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার পর ওই বছরে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) পক্ষ থেকে ৯৪টি এবং কেসিসি’র পক্ষ থেকে ৫৯টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করা হয়। ১৪ জুন নগর ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা জমা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২৯ আগস্ট কেসিসির ২০তম সাধারণ সভায় ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা, ১৭টি ভবনের নিচতলা বাদে ওপরের অংশ ভেঙে ফেলা এবং ৫টি ভবনের সম্প্রসারিত অংশ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর মালিকদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয় কেসিসি। কেসিসির তালিকাভুক্ত অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি ভবনের অধিকাংশই নগরীর বড় বাজারে অবস্থিত। যে কোনো সময় এগুলো ভেঙে পড়ে মানুষের জীবনহানির কারণ হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো হচ্ছে- নগরীর ২১ নম্বর জিগজ্যাক রোড হেলাতলা মোড় (শ্যামল), ১০ নম্বর জিগজ্যাক রোড (সেলিনা হক), ১৩ নম্বর জিগজ্যাগ রোড (সত্য নারায়ণ মন্দির), ২৬ নম্বর ক্লে রোড (মুক্তিযোদ্ধা সমাজকল্যাণ সংস্থা), ১২ নম্বর ওয়েস্ট মেকট রোড, ১৬ নম্বর ওয়েস্ট মেকট রোড (রাস্তার দক্ষিণ পাশে), ওয়েস্ট মেকট রোড (নতুন-৪৯৭), ২১ নম্বর ওয়েস্ট মেকট রোড (আফতাব জমাদ্দার), হোটেল আফগানিয়া, ৪০ নম্বর কালিবাড়ি রোড (বলাকা ঘাট), ৩ নম্বর কালিবাড়ি রোড, ৪ নম্বর কালিবাড়ি রোড (ভৈরব স্ট্রান্ড রোড), ১৯, ২০ ও ৩০ নম্বর কালিবাড়ি রোড, ৬৭ নম্বর ভৈরব স্ট্রান্ড রোড, ৭০ নম্বর ভৈরব স্ট্রান্ড রোড, ৯ ও ১০ নম্বর তুলাপট্টি, পিসি রায় রোড (হাদিস পার্কের সামনে), ৫(ক) পুরাতন যশোর রোড, হাজী ইসমাইল লিংক রোড (সাদেক হোসেন), ১ নম্বর ধর্মসভা রোড, ৩৩ নম্বর পুরাতন স্যার ইকবাল রোড ও ১৬ রাম চন্দ্র দাস লেন।
২০০৪ সালে সিটি কর্পোরেশনের একটি শক্তিশালী কমিটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলার জন্য তৎকালীন মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের কাছে রিপোর্ট পেশ করেন। কিন্তু সে উদ্যোগ বেশিদূর এগোয়নি। খুলনায় এই পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে সিদ্ধান্ত একাধিকবার হলেও তা শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে অনেকে। ২০১০ সালে নগরীর বড় বাজার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে দুই ব্যবসায়ী নিহত হয়। এর আগে ২০০৮ সালে একটি ভবন ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০১৫ সালে জুন মাসে নগরীর ইকবালনগর স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আবিদা আরিফিন শাপলা বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় ভবন ধসে মারা যায়। ২০১৮ সালের মে মাসে সর্বশেষ নূরানী সিনথিয়া মাদ্রাসার আরবী লাইনে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কার্নিস ধসে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়। মা মুন্নী আলমের হাত ও কাঁধ এর হাড় ভেঙে যায়। সিনথিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
কেসিসি’র এস্টেট অফিসার মোঃ নূরুজ্জামান তালুকদার সোমবার বলেন, গত ২০১০ সালে নগরীতে ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়েছিলো। এ সব ভবনগুলো বসবাসের অনুপযোগী হিসেবে উল্লেখ করে সাইনবোর্ডও টাঙিয়ে দেওয়া হয়। অনেক ভবন মামলা মোক্কাদ্দমা থাকায় কিছু করা যাচ্ছে না। বতর্মানে নগরীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা আরও দীর্ঘ। মাঠ পর্যায়ে জরিপ না হওয়ায় এর সঠিক তথ্য জানা নেই। তবে আগের তালিকার চেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা আরও দীর্ঘ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আপনার মতামত জানানঃ