খুলনা সরকারি শিশু পরিবারে (বালক) অনিয়মের অভিযোগ : খাবার নিন্মমানের

খেলতে দেয় না, কাজ না করলে মারধর

কামরুল হোসেন মনি : পরিবারের অনটনের কারণে কিংবা অনাথ হওয়ায় যাদের আশ্রয় হয় সরকারি শিশু পরিবারে। সেখানে বর্তমানে ৮০ জন বালকের ভাগ্যে প্রতিদিনই জুটছে নিন্মমানের খাবার ও পরিমাণও কম। বাবুর্চির সাথে কাজে সহযোগিতা না করলে তাদের ওপর চলে নির্যাতন। কেউ অভিযোগ দিলেই কোনো কারণ ছাড়াই বের করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করেন। উপ-তত্ত্বাবধায়কের কাছে অভিযোগ দিলে উল্টো অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া হয়। খুলনা দৌলতপুর থানাধীন মহেশ্বরপাশা সরকারি শিশু পরিবার (বালক) এই চিত্র।
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ আয়নাল হক মঙ্গলবার সকালে এ প্রতিবেদককে বলেন, কোনো অনিয়ম হলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। খাবার সরবরাহ করা হয় ঠিকাদারের মাধ্যমে। তারা যদি কোনো অনিয়ম করে থাকেন তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে ৮০ জন বালক সেখানে রয়েছে। প্রতি মাসে জনপ্রতি বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৬শ টাকা।
খুলনা মহেশ্বরপাশায় সরকারি শিশু পরিবার (বালক) উপ-তত্ত্বাবধায়ক আফরোজা সুলতানা এ প্রতিবেদককে মুঠোফোনে বলেন, কোনো তথ্য নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আসেন।
গত ৩১ মে এই প্রতিবেদকের সাথে সরকারি শিশু পরিবার (বালক) কয়েকজন এতিম নিবাসীর কথা হয়। কথা বলার আগে তাদের নাম প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন। মামুন (ছদ্মনাম) ফুলবাড়িগেট সরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পড়াশুনা করেন। গাইড বই না থাকার কারণে পড়াশুনায় পিছিয়ে পড়ছেন। কর্তৃপক্ষকে বললে উল্টো ধমক দিয়ে বলেন বাজেট নেই। বছরের একবার মাত্র এক জোড়া স্যান্ডেল দেন। ছিঁড়ে গেলে খালি পায়ে হাঁটতে হয়। কাপড় চোপড়ও নি¤œমানের। প্রতিদিন সকালে খিচুড়ি। খাবারের তালিকায় ডিম থাকলেও কেউ পায় কেউ পায় না। মুরগি এক পিস (খুব ছোট) দেয়। ১০ বছর হয়েও গেলে অনেক বালককে এখনও ভর্তি করানো হয়নি। অনেকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমাদের জন্য কোনো ব্যক্তি ছাগল কিনে দান করলেও ওই দিন খাওয়ায় না। ওটা রেখে দিয়ে সরকারি বিশেষ দিনে ওটা খাওয়ানো হয়। কর্র্তৃপক্ষ নিজেই কিনেছেন সেই খরচটা দেখিয়ে দেন। সপ্তাহে তিন দিন মুরগি, ২ দিন মাছ ও ২ দিন ডিম (শুধু দুপুরে) দেন। প্রতিদিন সকালে শুধু খিচুড়ি খেতে দেয়।
বিকেলে খেলতে দেয় না, টিভিও দেখতে দেয় না। কোনো কিছু বললে আমাদেরকে মারধর করেন।
বাবুর্চি প্রভাতের সাথে রান্নার সময় কাজ না করলে আমাদেরকে মারধর করেন। অফিস সহকারী দিবাস ছেলেদেরকে মারধর করেন। এক ছেলেকে মাথায় বাড়ি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো।
তাদের এ সব অভিযোগগুলো সরকারি শিশু পরিবার (বালক) উপ-তত্ত্বাবধায়ক আফরোজা সুলতানাকে বলা হলেও উল্টো বলেন, আমাদের স্টাফদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিবে না, তাহলে বের করে দিবো। ঈদের কয়েকদিন আগে ১০-১২ জনের নাম কেটে দিয়েছে।
এ বিষয়ে গত ৩১ মে স্টাফ বিজন কৃষ্ণ শিকদার এই প্রতিবেদককে বলেন, এক বালকের জন্য প্রতি মাসে ২ হাজার ৫শ টাকা বরাদ্দ আছে। এর মধ্যে পোশাকের জন্য প্রতি মাসে ১৬৫ টাকা, খাওয়া বাবদ ২ হাজার টাকা, প্রসাধনী বাবদ ৭০ টাকা, লেখাপড়া বাবদ ২০০ টাকা ও চিকিৎসার জন্য ৬০ টাকা খরচ ধরা হয়। খাবার কম ও নিন্মমানের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঠিকাদার ওয়াহিদের মাধ্যমে খাবার এখানে দেওয়া হয়। মাংসের পরিমাণ কম বিষয়ে তিনি বলেন, গত বছর মাংসের পরিমাণ ছিলো ১১০ গ্রাম এবার ৮৫ গ্রাম করে দিচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে মাংসের পরিমাণ কম বলে তিনি দাবি করেন।
খাবার বাবদ এ শিশু পরিবারের বালকদের মাথাপিছু মাসিক বরাদ্দ ২ হাজার টাকা। কিন্তু তাদের যে মানের খাবার দেওয়া হয়, তাতে বড় জোর বরাদ্দের এক তৃতীয়াংশ টাকা খরচ হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ এতিমখানার একাধিক বালক এ প্রতিবেদককে জানায়, সকালে এক প্লেটের বেশি খিচুড়ি দেওয়া হয় না। অনেকের পেটও ভরে না।

আপনার মতামত জানানঃ