প্রেম ও বিশ্বাসকে উপজীব্য করে মাজার সঙ্গীতই মাজার চত্বরের বিনোদন

নজরুল ইসলাম তোফা, কলামিস্টঃ বাংলাদেশে মাজার প্রেমী সাধারণ নারী এবং পুরুষদের সুরের জগতে প্রবেশ করার আগেই যেন ধ্যান মগ্ন হয়ে যান। পরে তারাই ইহজগতের ও পরজগতের অশেষ ফায়দা হাসিলের জন্য এক সুমহান লক্ষ্যে নিজস্ব আত্মায় যেন নিগূঢ় রহস্য খোঁজে। এই জগতের ধ্যানরত মানুষরাই শুধু আধ্যাতিক, তারা পীর আউলিয়ার বিশ্বাসেই অন্তরে ধ্বনিত করে অলিক এক মহা শক্তি। সেই শক্তিটাই হলো তাদের খোদা। অন্তরে বিরাজমান সেই খোদা বিশ্বাসে তারা সুর পিপাসু হয়ে মাজার প্রেমী অজস্র সাধারণ মানুষকে বেঁচে থাকে এক প্রয়াস সৃষ্টি করে এবং তাদের পেটের ক্ষুধা নিবারণ হোক বা না হোক মন ও শরীরকে সুস্থ, সতেজ রাখার জন্যই সঙ্গীতের প্রতি গুরত্বের সহিত নান্দনিক দৃষ্টি রাখে। বহু ধাঁচের গানের দেশ এই বাংলাদেশ। মাজার প্রেমী শত সহস্র বাউলের দেশ এই বাংলাদেশ। প্রাচীন ইতিহাস এবং ঐত্যিহ্যের এক সমৃদ্ধশালী বিশাল গানের ভান্ডারেই যেন রেকর্ড সৃষ্টিকারী সংস্কৃতির বিভিন্ন বিনোদনের আধ্যাতিকতার দেশ। এমন এই মাজার সংস্কৃতিতে আগরবাতি, মোমবাতি, জালিয়ে এবং নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণেই রং বেরংয়ের অনেক ধরনের বৈদ্যুতিক বাতির প্রয়োগ ঘটিয়ে তারা যেন আলোক উজ্জ্বল পরিবেশে ভক্ত এবং মুরীদের সারারাত্রি খুুব বিনোদন প্রদান করে থাকে। এই সমাবেশের মধ্যেই যেন তাদের খোদার প্রতি শত সহস্র হৃদয় নিংড়ানো প্রেম-ভালোবাসার গভীর এক রহস্য লুকিয়ে আছে। এমন এই ধ্যান মগ্ন হওয়া মানুষদের আনন্দ-উল্লাস, বিরহ এবং তাদের অন্তর শীতল করবার জন্যই যুগ যুগ ধরে আধ্যাত্মিকতার এমন এ লোকজ সঙ্গীতের আয়োজন হয়। তাই তো ওলী আওলিয়ার দেশ এই বাংলাদেশ।
প্রত্যন্ত গ্রামে ও শহরের মাজারে বাউলদের কাছে গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ অথবা রাত্রিবাস করেছে যারা। তারাই তো তাদের এমন অনভ্যস্ত জীবন এবং সেই জীবন যাপন করার কষ্টকর কাহিনী আবার তাদের জীবনযাত্রার অনেক স্বাদ নেয়ার ইতিহাসটাও যেন কপচাতে পারে। তেমনিই এক বাউল প্রেমী, সঙ্গীত পাগল মানুষ শফিকুল ইসলাম শফির সহিত দুদন্ড আলাপ আলোচনা হয় নজরুল ইসলাম তোফা’র।তিনি বলেন, মাজারে কতটা কি দেখেছি, আবার কি পেয়েছি তা হয়তো ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়,তবে সবাই তা বুঝবেনও না। তবে একটা কথা সঠিক যে, তাদের কাছে গিয়ে যা বুঝেছি তাহলো, তারা গভীর বিশ্বাস আর মনের প্রসারতা নিয়েই এই পথে থাকে।চরম দারিদ্র্যতা রয়েছে তাদের কিন্তু মন একে বারে খোলা আকাশের মতো। তারা তো সুরের জগতেই বিচরণ করে খোদার নিগূঢ় ভালোবাসা পায়। একটু যদি অতীতের দিকে দৃষ্টি দিই তাহলে বলা যায়, এই বাংলায় আবহমান কাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণী এবং ভিন্ন ভিন্ন ধর্মালম্বী মানুষদের বসবাস হলেও এখন অবশ্য মাজারে মুসলমানদের পরিমান খুব বেশী। কিন্তু এক সময় বৌদ্ধ ও হিন্দুদের আধিপত্য ছিল তাকেও অশিকার করার উপায় নেই। এইদেশে সেন বংশের পর থেকেই ইসলাম প্রচার ও প্রসার ঘটে। আর ঠিক তখনই অনেক পীর ওলি ও আউলিয়ার আবিভাব ঘটে থাকে। সুতরাং তাদের মৃত্যুর পরেই সমাধিস্হলে মাজার রূপ নেয়। সুতরাং এ মাজার গুলোতে ধিরে ধিরেই বিনোদন পূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এইদেশের ৬৪ জেলায় ছোট বড় অনেক মজার এবং তার বিনোদনের ইতিহাসও রয়েছে। এমন এই ইতিহাসকে খন্ড খন্ড করে আলোচনায় আনা না গেলেও সমষ্টি গত ভাবে মাজার সংস্কৃতির গানের বিভিন্ন শাখা প্রশাখা নিয়ে নজরুল ইসলাম তোফা, শ্রদ্ধেয় বাউল শিল্পী ও স্বরচিত সঙ্গীত রচয়িতা, গুনি শফিকুল ইসলাম শফিকের সঙ্গে মতবিনিময় করে।
এই দেশের সঙ্গীতের গৌরবময় ইতিহাস শিক্ষা এবং সংস্কৃতিকে নিয়ে গড়ে না উঠলে সম্ভব হতোনা এমন এই মাজার সংস্কৃতি। এই মাজার সংস্কৃতির সঙ্গীতই আজ গুরুত্ব পূর্ণ সঙ্গীত বিনোদনের অঙ্গ বলা যেতে পারে। এসঙ্গীত আবার যেন নানা উপাদানে মাজারে সমৃদ্ধ রয়েছে। এই সকল উপাদানে শ্রুতি, স্বর, রাগ, গ্রাম, অলঙ্কার, রস, বর্ণ, ভাব প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত না হলে মাজার বিনোদনের পূর্ণতা পেত না। সংগীতের এই সকল উপদানের মহিমা ও মাধুর্যকে ইতিহাসের নিরীখে আজো মানুষের কাছে মাজার বাউলগণেরা অক্লান্তভাবে সঙ্গীতের অনুশীলন করছে। অন্যদিকে মাজার ভক্ত অনেকেই সঙ্গীতের ইতিহাসের বিচিত্র উপাদান সংগ্রহে ব্যস্ত রয়েছে। এভাবেই রচিত হচ্ছে মাজার ভিক্তিক সঙ্গীত শাস্ত্রের নানা রূপ নানা দিক। আসলে বলা যায়, আদিম যুগ থেকে ক্রমবিবর্তনের মাঝ দিয়ে বর্তমান যুগ পর্যন্ত যে এক ধারাবাহিকতা সঙ্গীতের ভেতর পাওয়া যায় সেটাই হলো সঙ্গীতের ইতিহাস। তেমনিভাবে দিনে দিনেই এ দেশে এসেছে মাজার সংস্কৃতি। সুতরাং সাধারণত মানুষের মন, চিন্তা ও তাদের ভাবের রাজ্যে বিচরণের সংস্কৃতিই মাজার বিনোদন। তাই তো তাদের এই সঙ্গীতই শ্রেষ্ঠ বিদ্যা। সঙ্গীত মানুষকে জন্ম-মৃত্যুর পারে নিয়ে যায় এবং শাশ্বত শান্তি দান করে। মাজার চত্বর ঘিরেই বাউল, ফকিরি ও মুর্শিদী গানের মূূর্ছনায় আড়ম্বর পূর্ণ অনেক গানে মুখরিত থাকে। সঙ্গীতের সরগরম হওয়া অনেক মাজারেই তারা যেন বাউল, ফকিরি, মুর্শিদী ধারার আধ্যাতিক গান এবং সাধনা ভিক্তিক গান গায়। তাছাড়াও মাজারে বহু ধারার গানও হয়ে থাকে অঞ্চল ভেদে। যেমন, লালন গীতি, কবি গান, জারি গান, দোহার গান, যোগীর গান, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, হাপু গান, চর্যাগীতি, মাদার গান, মনসার গান, বারোসা গান, বারমাসি গান, বাইজী গান, ধূয়া গান, টপ্পা গান, কীর্তন, গজল, বিচ্ছেদী, ভজন, পপ, লোকগীতি, ব্লুজ ও নৌকা বাইচের গান সহ ইত্যাদি ধরনের বিনোদন পূর্ণ গান মাজার সংশ্লিষ্ট পরিবেশে মাজার ভক্ত এবং মাজার বিশ্বাসি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গেই যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের মাজার শব্দটি আরবি থেকে এসেছে। মাজারের শাব্দিক অর্থ সাক্ষাতের স্হান। সাধারণ ভাবে এদেশের মাজার বলতে ওলি-দরবেশ, সুফি-সাধক, পীর-ফকির-বাউলদের কবর স্হানকেই ধরা হয়। বলা যায়, সাধারণ কবর আর মাজারের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। মাজার মূলত জাক-জমক একটি বিনোদনপূর্ণ কবর স্হান। এমন এই স্হানেই সাধারণ মানুষের সৌজন্যে যুগ যুগ ধরে বিনোদনের পসরা সাজিয়ে ওরস উৎসব করে আসছে। উৎসবে সাধারণ মানুষ এবং বাউল শিল্পীদের আনাগোনার পরিমান সবচেয়ে বেশী। এই মাজারে যেসব শায়িত ব্যক্তি রয়েছে, তাদের অসংখ্য ভক্ত-মুরিদ বা খাদেম যারা থাকে, তারাই যেন আস্তে আস্তে বিনোদন পূর্ণ মাজার চত্বরে পরিনত করে থাকে। তারাই সাধারণ মানুষকে ভক্তি, শ্রদ্ধা,বিশ্বাস, আধ্যাতিকতা, সংস্কার, লোকাচার এবং ঝাড়ফুক সহ বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন করে থাকে। এমন মাজার প্রিয় ভক্ত কুল মানুষদের অন্তরে গভীর ভাবে আস্হা এবং তাদের নির্ভরশীলতা যেন স্হান পায় সেই লক্ষেই মাজারে বিনোদন আয়োজন করে মাজারকে পাকা পোক্ত করে।
আবার শুনা যায়, ব্রিটেনে অনেক জায়গায়তে নাকি ডিজিটাল মাজার নামে বিনোদন নির্ভর বহু মাজার রয়েছে। এই মাজার গুলো নির্ধারিত সময়েই নাকি চলে। রমজান মাস ছাড়া বছরের বাকি সময়ে এই ডিজিটাল বাক্সগুলোতেও নাচ হয়, আর তা লাখো-কোটি মানুষরা এই সব বিনোদন উপভোগ করে। এসব ডিজিটাল বা কমিউনিটি নাম ধারি বিনোদন পূর্ণ মাজার গুলোতে হাজার হাজার মানুষ ঢেলে দেয় অঢেল অর্থ, তারা গাঁটের পয়সা খরচ করে এমন মোকামের উদ্দ্যেশেই খরচ করে পরকালের মনস্কামনা পূর্ণ করে।
মহিলা বাউলরা মাজারে থেকেই গান গায় এবং বাউলানিদের জীবন যাপনও অনেক ক্ষেত্রে হয় নাকি রোমান্টিক। তারা আবার সাধনার মূল লক্ষে নাকি পৌঁছাতে পারে। আবার জানা যায় যে, বাউল সাধনায় মাজারের বাউলের সাধনসঙ্গিনী হয়ে তারা যেন ধ্যান জ্ঞানে মগ্ন থাকে। এসব মাজারের অনেক আখড়ায় গিজগিজ করে অগনিত মানুষ, তারা সে সব আখড়ায় প্রান খুলে গান গেয়ে এবং ভাববাদী কথা বলে অনেক শ্রোতার মনের মণিকোঠায় স্হান পায়। বাউলদের সঙ্গে বাউলানিরা লালনের অনেক ভাববাদী এবং বিচ্ছেদী গানের এক সমন্বয়ী গোষ্ঠী সৃষ্টি করে। একাধিক ব্যক্তির পরিশ্রমে এক একটি সঙ্গীতের জন্ম হয় মাজারে। প্রত্যেক গানই একজন সঙ্গীত স্রষ্টার কাছে নিজ সন্তান সমতুল্য। এখানে গীতিকবি, সুরকার এবং কণ্ঠশিল্পর ভূমিকা কারও চেয়ে কারও কম নয়। একটি গানের জন্ম সে তো পরিবেশ গত ভাবে অন্তর থেকেই। মাজারকেন্দ্রিক গানগুলো প্রায়ই ভক্তবৃন্দের নিজস্ব লেখা। বর্তমানে মাজার কেন্দ্রিক বহু গানই বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে অডিও এ্যালবাম এবং সিডি করে বের হচ্ছে। তার বিক্রিও যে কম হচ্ছে এমন বলা যাবে না। সুতরাং এই মাজারের সঙ্গীত বাংলার সঙ্গীত এবং সংস্কৃতির এক উল্লেখ যোগ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত। তাই মাজার মুলত অসাম্প্রদায়িক। এখানে সব ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী ও গোত্রের মানুষরা নিজস্ব ধর্ম বা বিনোদনের উদ্দ্যেশে যায়। ওলী বাবার কাছে কোনও বিভেদ নেই। তিনি নাকি সবার ডাকে সাড়া দেন। সেই ডাক যদি অন্তরের ডাক হয়ে থাকে।
ধর্মকে উপজীব্য করে তারা সাধারণ মানুষদের দীর্ঘ কালের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং তাদের বিনোদনের রীতিনীতির এরকম সংস্কৃতিক গুরুত্বকে বহন করে আসছে। অস্বীকার করবার উপায় নেই, এই মাজার সঙ্গীতের বিনোদন আজও কোটি কোটি মানুষদের অন্তরকে স্পর্শ করে এবং এই সংস্কৃতি শ্রোতাদের অন্তরে সারাজীবন অক্ষত থাকবে। সুতরাং তাদের সুখে দুঃখে, প্রেরণা, স্বপ্ন ও প্রেমে সঙ্গীতই সব সময় বন্ধুর মতো। তাদের ভাল লাগা এক একটি মাজার সঙ্গীত যেন সারা জীবন পথ চলার নিত্য সঙ্গী।

আপনার মতামত জানানঃ