মাগুরখালীর ঐতিহ্যবাহী যজ্ঞভূমিতে মানুষের ঢল

মাগুরখালী থেকে ফিরে : ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, তালা সীমান্তবর্তী এলাকা চারিদিকে নদী বেষ্টিত মাগুরখালীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠা, সাদা সোনা উৎপাদন, সবুজ কৃষি বিপ্লবে, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌছানের ফলে এখানকার মানুষের জীবণ যাত্রার মানোন্নয়ন ও আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ১৬ প্রহর ব্যাপী শ্র্রীশ্রী তারকব্রক্ষ মহানাম যজ্ঞানুষ্ঠানের ৭ম বর্ষে এবারে আয়োজনে অখন্ড ভারতের সতীর খন্ডিত দেহ একান্নাংশের পূণ্যভূমি মৃৎ শিল্পী কর্তক ভাস্কর্য় প্রদর্শন অর্ন্তভুক্ত করায় মাগুরখালীতে মানুষের ঢল নেমেছে। দেশ মাতৃকা, বিশ্ব শান্তি ও সকল জীবের মঙ্গল কামনায় মাগুরখালী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন কে.এম ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ২৪ প্রহর ব্যাপী শ্র্রীশ্রী তারকব্রক্ষ মহানামযজ্ঞ অনুষ্ঠান গত ২৩ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার শুভ অধিবাস দিয়ে শুরু ও ২৭ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার কুঞ্জভঙ্গ, নগর কীর্তন, ভোগ আরতি ও মহা প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ২৬ফেব্রুয়ারী যজ্ঞভুমির প্রধান পৃষ্ঠপোষক মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রানালয়ের মাননীয় মন্ত্রী শ্রী নারায়ন চন্দ্র চন্দ উপস্থিত ছিলেন। তিনি ঘুরে ঘুরে সতীপীঠ দেখেন ও আগত সুধী, স্থানীয় ভক্তবৃন্দের সাথে মত বিনিময় করেন। যঞ্জানুষ্ঠানের আয়োজক ও ব্যবস্থাপনা প্রধান স্থাণীয় চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ সানা সকল অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। এ সময় যঞ্জ কমিটির সম্পাদক প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র মন্ডল, ইউনিয়ন আ’লীগের সম্পাদক অধ্যাপক সরোজ কান্তি রায়, অবঃ প্রধান শিক্ষক কুমুদ রঞ্জন মল্লিক, অবঃ শিক্ষক কুঞ্জ বিহারী মন্ডল, কপিলমুনি ইউপি চেয়ারম্যান কওসার আলী জোয়ার্দার, অধ্যক্ষ হরেকৃষ্ণ দাশ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাধন কুমার ভদ্র, রথীন্দ্র নাধ দত্ত, রামপ্রসাদ পাল, সাংবাদিক শেখ আব্দুস সালাম, সাংবাদিক এস.এম আব্দুর রহমান, নিতীশ কুমার মন্ডল (লিটন), বিভূতী তরফদার, ুযুবলীগ নেতা প্রনব কান্তি মন্ডল, আশুতোষ সানা, চিত্ত রঞ্জন সানা, ব্যবসায়ী তাপস কুমার রায়সহ এলাকার গন্যমান্য ও সুধী মন্ডলী।
গতবছরে ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে চুকনগর, কপিলমুনি মুক্তিযুদ্ধের উপর ঘটনাবলী নিয়ে মৃৎ শিল্পীদের নির্মিত ভাষ্কর্য প্রদশিত হয়। এবারে সনাতন ধর্মীয় দেবী দূর্গার ৫১ টি সতী পীঠ উপস্থাপন করা হয়। সতীপীঠ হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে ভারত উপমহাদেশে দেবতা শিবের স্ত্রী সতীর বিভিন্ন দেহাংশ ছড়িয়ে থাকা পবিত্র স্থানসমূহ। বাংলা ভাষায় একে সাধারণত বলা হয় পীঠস্থান বা ‘মহাপীঠ’। ‘পীঠ’ শব্দের অর্থ ‘বেদি’ বা ‘আসন’ যেখানে বিষ্ণুচক্রে খন্ডে খন্ডে কর্তিত হওয়ার পর দেবী সতীর (দেবী দুর্গার আরেক নাম) দেহখন্ড পৃথিবীতে পতিত হয়েছিল। প্রচলিত অভিমত অনুসারে মোট একান্নটি শাক্তপীঠ রয়েছে। এই পীঠগুলির যথার্থ অবস্থান নিয়ে তেমন মতৈক্য নেই। মহাপীঠ নিরূপণ নামে একটি জনপ্রিয় প্রাচীন পান্ডুলিপিতে (১৬৯১-১৭২০) এসব পীঠের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই গ্রন্থে বৃহৎ বঙ্গের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা এবং এর পরিপার্শ্বের এলাকাগুলিতে অবস্থিত মোট ২৩টি পীঠ শনাক্তীকৃত। এগুলির মধ্যে ১৪টি পশ্চিমবঙ্গে এবং ৭টি বাংলাদেশে। পৌরাণিক উপাখ্যান মতে, সতীপীঠের উদ্ভব প্রসঙ্গ মহাভারত-এর ‘দক্ষযজ্ঞ’ নামে একটি পুরাণ কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে। একদিন প্রজাপতি দক্ষ পবিত্র অগ্নির যজ্ঞ করছিলেন। ওই যজ্ঞে তিনি সকল দেবতাকে আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু তার কন্যা সতীর স্বামী শিবকে বাদ দেন। এই ঘটনায় অপমান বোধ করে প্রতিবাদ জানাতে বিক্ষুব্ধ দেবী সতী যজ্ঞবেদিতে এসে আগুনে আত্মাহুতি দেন। প্রিয়তমা ভার্যার মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকার্ত দেবতা শিব দক্ষযজ্ঞে এসে সতীর মৃতদেহ কাঁধে তুলে নেন এবং শোকোন্মত্ত হয়ে পদাঘাতে মেদিনী প্রকম্পিত করে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকেন। ধরিত্রী এই কম্পনে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত হতে থাকে। শেষপর্যন্ত উন্মত্ত শিবকে থামানোর জন্য দেবতারা বিষ্ণুকে অনুরোধ জানালেন। বিষ্ণু তাঁর অস্ত্রচক্র শিবের প্রতি নিক্ষেপ করেন এবং তা শিবের কাঁধে অবস্থিত সতীর মৃতদেহকে খন্ড খন্ড করে কেটে ফেলে। এই কর্তিত দেহখন্ড গুলিই পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। পৃথিবীর যে স্থানে সতীর দেহখন্ড পড়েছে সেখানেই ভক্তরা দেবীর পূজার জন্য মন্দির নির্মাণ করে বেদি স্থাপন করেছে। সময়ের বিবর্তনে, স্থানীয় লোকদের প্রচেষ্টায় এই স্থানগুলি মাতৃকা পূজার নিমিত্তে তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকটি পীঠ সতী সম্পর্কিত পুরাণ কাহিনীর জন্মবৃত্তান্তসহ পৃথক পৃথক পীঠস্থান হিসেবে নাম পরিগ্রহ করেছে। সেগুলি দেবী ও তাঁর স্বামী দেবতার (শিব) নানা নামও গ্রহণ করেছে। দেবী সতী মূল মাতৃকাদেবী বা শক্তিদেবী দুর্গার অন্যান্য লৌকিক নামরূপের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছেন। আবার নানা অবতার মূর্তিতে দুর্গার নামও বিভিন্ন হয়েছে। প্রত্যেকটি পীঠ কেন এক এক দেবীর নামে পরিচিত এবং কেন সেগুলি দেহবিচ্ছিন্ন সতীর নানা নামে পুনর্জন্ম গ্রহণের কাহিনীতে রূপান্তরিত হলো তার কারণ এই লোকায়ত দেবীরূপ ও তার অবতারতত্ত্ব। ৫১ টি সতীপীঠ যথাক্রমে ঃ
১.হিংলাজ, ২.করবীপুর, ৩.জ্বালামুখী, ৪.সুগন্ধা, ৫.ভৈরব পাহাড়, ৬.অট্টহাস, ৭.প্রভাস, ৮.ইয়ানাস্থানা, ৯.গোদাবরী, ১০.গন্ধকী, ১১. সূচিদেশ, ১২.ভবানীপুর, ১৩.শ্রী পর্বত, ১৪.কর্ণাট, ১৫.বৃন্দাবন, ১৬.কিরীটেশ্বরী, ১৭.শ্রীহট্ট, ১৮.নলহাটি, ১৯.কাশ্মীর, ২০.রতœাবলী, ২১.মিথিলা, ২২.সীতাকুন্ডু, ২৩.মানবক্ষেত্র, ২৪.উজ্জয়িনী, ২৫.পুষ্কর, ২৬.প্রয়াগ, ২৭.বহুলা, ২৮.জলন্ধর, ২৯.রামগিরি, ৩০.বৈদ্যনাথ, ৩১.উৎকল, ৩২.বোলপুর, ৩৩.কালমাধব, ৩৪.শোণ, ৩৫.কামাখ্যা, ৩৬.নেপাল, ৩৭.শ্রীহট্ট, ৩৮.পাটনা, ৩৯.ত্রিপুরা, ৪০.ক্ষীরগ্রাম, ৪১.কালীঘাট, ৪২.কুরুক্ষেত্র, ৪৩.বক্রেশ্বর, ৪৪.যশোরেশ্বরী, ৪৫.নন্দীপুর, ৪৬.বারাণসী, ৪৭.কন্যাকুমারী, ৪৮.জাফনা, ৪৯.বৈরাট, ৫০.বিভাস, ৫১.ত্রিসোতা। মাগুরখালীর যজ্ঞ ভূমিতে (মঞ্চ) তিন পাশে ৫১টি পীঠস্থান -এর (যেখানে পদাচারণ ঘটেছে এমন মন্দির ও দেব দেবীর আবক্ষসহ) সংক্ষিপ্ত বিবরণ সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কথা, উপকথা অনুসারে যুগে যুগে পল্লবিত হয়েছে বিশ্বাস এবং সেই সনাতনী বিশ্বাসেই স্থাণীয়দের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী জেলা-উপজেলাসহ বহু দুর দুরান্ত থেকেও নারী-পূরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এসে ভিড় করছে। এক সময়ের ডুমুরিয়ার অবহেলিত জনপদ বলে খ্যাত মাগুরখালী আজ লোকে লোকারন্ন। যজ্ঞ ভুমির বৈশিষ্ঠ হলো অজানাকে জানা, নতুন প্রজন্মকে কিছু জানান দেয়া। ফলে সব শ্রেণীর উৎসুক মানুষের এ জমায়েতকে ঘিরে বসেছে ক্ষণিকের মিলন মেলা। সার্কাস, সামাজিক যাত্রা পালা, কনসার্ট, যাদু, নাগর দোলা, ফার্ণিচারসহ রকমারী দোকানের পশরা সাজিয়ে বসেছেু বিল এলাকা জুড়ে। রঙীন আলোর ঝলকানীতে মুখরিত যঞ্জ ভূমি। চারিদিকে সাজ সাজ রব। আগামী ৭মার্চ মেলা শেষ হবে।

আপনার মতামত জানানঃ