লাশের স্তূপ রাখা করিডরে আগেরবার নামাজ পড়েছি

ইউনিক ডেস্ক : কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনি এ খবর। সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিলাম নিউজিল্যান্ডে। কথা বললাম তামিমের (ইকবাল) সঙ্গে। ওর কাছেই জানলাম ঘটনার বিস্তারিত। দুই-তিন মিনিটের পার্থক্যে বেঁচে গেছে দলের সবাই। তামিম বলছিল, এক-দুই মিনিটের মধ্যেই ওরা ঢুকত মসজিদে (আক্রান্ত ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদ)। যদি সত্যি ঢুকে পড়ত ওরা, কী পরিস্থিতি হতো, আমি ভাবতেই পারছি না! ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। যাঁরা মসজিদের ভেতর নিহত হয়েছেন, তাঁদের কথা ভেবে এত খারাপ লাগছে বলে বোঝাতে পারব না।

গুলি করার ধরনটা কী ভীতিকর! একটা লোক নির্বিকার ভঙ্গিতে গুলি করে যাচ্ছে নিরীহ মানুষকে-এই দৃশ্য সহ্য করা কঠিন! বেশ কজন বাঙালি নিহত হওয়ার খবর শুনলাম। আমরা কিন্তু গত ১৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, ক্রাইস্টচার্চে দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে এই মসজিদেই জুমার নামাজ পড়েছি।

মসজিদের পাশে বড় বড় কিছু গাছ আছে। এর পর বড় একটা মাঠ। এই মাঠ পেরিয়ে ম্যাচের ভেন্যু হ্যাগলি ওভাল। ওয়ানডের সময়ও আমাদের অনুশীলন শুরু হওয়ার কথা ছিল দুপুর ২টা। অনুশীলনের আগে আমরা ওই মসজিদে নামাজ পড়েছি। মসজিদের সামনে গাড়ি রেখে যে সরু গলিতে গুলি শুরু করেছে ওই লোকটা, মাসখানেক আগে ঠিক ওখানেই জুতা রেখে আমরা ভেতরে গিয়ে বসেছি। আমাদের দেশে মসজিদগুলোয় সামনেই অন্তত তিনটা দরজা থাকে। আর ওই মসজিদে একটা দরজা দিয়ে ঢুকতে হয়, ওটা দিয়েই বের হতে হয়। মানুষ যে নৃশংস এ ঘটনা থেকে পালিয়ে বাঁচবে সে উপায়ও নেই। লাশের স্তূপ রাখা যে করিডরে, ওখানেই আমরা আগেরবার নামাজ পড়েছি। ভেতরে নারী ও পুরুষের আলাদা আলাদা নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে সেখানে।

গত মাসে নামাজ পড়ে ওই মাঠ দিয়ে হেঁটে মূল মাঠে এসেছি। কাল তামিমদেরও বোধ হয় গাড়িতে করে মসজিদের সামনে নামিয়ে দিয়ে আসার কথা ছিল। পুরো বিষয়টা আমি যেন চোখ বুঁজে দেখতে পাচ্ছি। ওখানে যেহেতু আমি আগেও গেছি। এত মন খারাপের সংবাদের মধ্যে আল্লাহর রহমত, আমাদের দলের সবাই নিরাপদে ফিরে এসেছে। ওদের কোনো ক্ষতি হয়নি। এরপরও বলতে হবে, যে মানুষগুলো নিহত হয়েছে, তাদের জন্য খুব খারাপ লাগছে। তাদের পরিবারের কী অবস্থা, একবার চিন্তা করুন।

নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে যখন এ ঘটনা ঘটে গেছে, আমাদের প্রতিটি সফরে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতেই হবে। আমাদের দেশে যখন কোনো দল খেলতে আসে, তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হয়। যেটা সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধানেরা পেয়ে থাকেন। বিশ্ব মানের নিরাপত্তা দেওয়ার পরও আমাদের কত কথা শুনতে হয়। সাধারণ কোনো দর্শকের ঢিল পড়েছে টিম বাসে, সেটি নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে কী হইচই। এটা অনেক আগেই বলেছি, এ ধরনের ঘটনা বিশ্বব্যাপী ঘটছে। প্রতিটি দেশ যার যার জায়গা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এটাও সত্যি, নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে এমন ঘৃণ্য ঘটনা ঘটবে, এটা চিন্তার বাইরে। এ ঘটনার পর ভবিষ্যতে ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে সবাইকে। কারও আর নির্ভার থাকার সুযোগ নেই।

কোনো বিদেশি দল আমাদের এখানে এলে কী ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হয় সেটাও দেখতে পারে সবাই। আমাদের সরকার কিংবা ক্রিকেট বোর্ড যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে, সেটি শুধু বিশ্বমানের বললেও যেন কম বলা হয়। আমরা জাতিগতভাবেই খেলাধুলা পছন্দ করি। আর ক্রিকেট তো এখন অন্য একটা জায়গায় চলে গেছে। আশা করি, এ ঘটনার পর সব পর্যায়ে সচেতনতা, সতর্কতা বাড়বে। শুধু ক্রিকেটেই নয়, এ ধরনের ঘটনা ঘটা সবার জন্যই ধাক্কার। একজন মানুষ হিসেবে এটা মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন।

এ ট্রমা থেকে বের হতে আমাদের খেলোয়াড়দের একটু সময় লাগবে। ওদের মানসিক সমর্থন দিতে হবে। চোখের সামনে এত বড় ঘটনা। টিম বাসের ভেতর ওরা অনেকক্ষণ আটকে ছিল। আশা করি এ ধাক্কা তারা দ্রুত কাটিয়ে উঠবে। দলের সবার সঙ্গে কথা হয়েছে। সবাই নিরাপদে আছে। এখন দ্রুত দেশে ফিরে আসুক, সে অপেক্ষায়।

আপনার মতামত জানানঃ