শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল অঘোষিত নিয়ম রোগীর সিরিয়াল  জমা নেওয়ার মধ্যে ১০ জন স্টাফদের রোগী!

# হাসপাতাল ঘিরে একাধিক দালাল চক্র সক্রিয় : শেল্টার দিচ্ছে চিকিৎসকরা
# নিয়ম মানছে না ওষুধ প্রতিনিধিরা : চেম্বারে খাবার সরবরাহ দিচ্ছে

কামরুল হোসেন মনি :  শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে আউটডোরে ৩০ জনের বেশি রোগীর সিরিয়াল নেওয়া হয় না। এর মধ্যে হাসপাতালের স্টাফদের রোগী ১০ জন। অঘোষিতভাবে আউটডোরে রোগীর দেখার নিয়ম চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল চক্র। এর পেছনে কলকাঠি নাড়ান হাসপাতালের চিকিৎসকরা। ফলে বতর্মান সরকার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য নানা ধরনের পদক্ষেপ নিলেও এর সুফল পাচ্ছে না চিকিৎসা নিতে আসা হতদরিদ্র পরিবারগুলো। গত কয়েকদিনে হাসপাতালে সরেজমিনে বিভিন্ন ভুক্তভোগী রোগীর সাথে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়। যাবতীয় সব তথ্য এই প্রতিবেদকের সংগ্রহে রয়েছে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের পরিচালক ও কার্ডিওলজী বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ বিধান চন্দ্র গোস্বামী সোমবার এ প্রতিবেদককে বলেন, হাসপাতালের সকল চিকিৎসকের সাথে মিটিংয়ে রোগী দেখার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মিটিংয়ে সকল চিকিৎসককে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে রোগীর টিকিট কাটা থাকলে সেই রোগীকে দেখতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত রোগী থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত রোগী দেখে চেম্বার ত্যাগ করার নির্দেশনা রয়েছে। ওষুধ প্রতিনিধিদের নির্ধারিত ভিজিট করার দিন ও বার উল্লেখ করে নির্দেশনা দেওয়া আছে। তারা যদি নিয়ম ভঙ্গ করে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোমবার (১২ নভেম্বর) সকাল সাড়ে দশটায় শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে আউটডোরে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্ব স্ব চেম্বারে রোগীদের দীর্ঘ লাইন। ১১৪নং রুমে রোগীদের চেঁচামেচি শুনতে পেয়ে এগিয়ে দেখি – দূর থেকে বৃদ্ধা রেবাকা (৫০) আসেন ডাক্তার দেখাতে। ওই রুমে রোগীর সিরিয়াল নেওয়া শেষ। রোগীকে আগামীকাল (মঙ্গলবার) আসতে বলেন। কারণ হিসেবে সিরিয়াল দেখভাল করার ওই লোকটি বলেন, ৩০ জন রোগীর সিরিয়াল নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতালের স্টাফদের জন্য রয়েছে ১০ জন রোগীর সিরিয়াল। ডাক্তার এর বেশি রোগী দেখবেন না। বৃদ্ধা রোগী অনেক অনুরোধ করেও ওই লোকটির মন গলাতে পারেননি। ১১৪ নম্বরে চেম্বারে সোমবার রোগী দেখেন সহকারী অধ্যাপক (ইউরোলজী) ডাঃ মোঃ নাজমুল হক। সোমবার আউটডোরে ১১২ নম্বরে রুমে দেখছিলেন সহকারী অধ্যাপক (কার্ডিওলজী) ডাঃ মোঃ মিজানুর রহমান। ওই চেম্বারে রোগীর সিরিয়াল নেওয়া শেষ। এই প্রতিবেদক জানতে চাইলেন কতজন পর্যন্ত সিরিয়াল নেওয়ার পর আর নেওয়া হচ্ছে না। ৩০ জন রোগীর সিরিয়াল নেওয়া হচ্ছে। ডাক্তার এর বেশি রোগী দেখবেন না। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা ডাক্তার দেখানোর জন্য টিকিট কাটলেও এই অঘোষিত নিয়মের কারণে বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে। সকাল সাড়ে ১০টার পরেও চেম্বারে ওই ডাক্তারকে বসতে দেখা যায়নি। তিনি ১১টার পর চেম্বারে এসে বসেন।
ডাঃ মোঃ আছাদুজ্জামান (আবাসিক মেডিকেল অফিসার) তিনি ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন বিশেষজ্ঞ। ওই চেম্বারের সিরিয়াল মেন্টইন করছেন আছমা বেগম নামে এক মহিলা। তিনি বলেন, ৪০ জনের বেশি রোগীর সিরিয়াল নেয়া হচ্ছে না। এই প্রতিবেদককে ওই ডাক্তার ভিজিটিং কার্ড বের করে দিয়ে বলেন তিনি এই সব রোগী দেখেন। ওই ডাক্তারের ভিজিটিং কার্ডে উল্লেখ রয়েছে ‘সন্ধানী ক্লিনিক এন্ড ডায়াগণস্টিক কমপ্লেক্স। কমার্স কলেজের সম্মুখে তার চেম্বার। রোগীদেরকে ওই আসমা এই কার্ডটি ধরিয়ে দিচ্ছেন। ১২১ নম্বর রুমের নিউরোলজি ডাঃ এস এম নাহিদ কামাল তার রুমের থেকে সালমা নামের একজন রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায় ডাক্তার নিজেই পকেট থেকে কার্ড বের করে ডায়গনিষ্টিক সেন্টারে যেয়ে দ্রুত রিাপোর্ট আনতে তাকে নিদের্শ দেন।
ডাঃ মোঃ আছাদুজ্জামান (আবাসিক মেডিকেল অফিসার) তিনি ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন বিশেষজ্ঞ। ওই চেম্বারের সিরিয়াল মেনটেইন করছেন আছমা বেগম নামে এক মহিলা। তিনি বলেন, ৪০ জনের বেশি রোগীর সিরিয়াল নেওয়া হচ্ছে না।
১২১ নম্বর রুমের নিউরোলজী ডাঃ এস এম নাহিদ কামাল এর রুম থেকে বের হওয়া সালমা নামের একজন রোগীর সাথে কথা বলে জানা যায় ডাক্তার নিজেই পকেট থেকে কার্ড বের করে ডায়গনস্টিক সেন্টারে যেয়ে দ্রুত রিপোর্ট আনতে তাকে নির্দেশ দেন।
মঙ্গলবার আউটডোরে বসেন সহকারী অধ্যাপক (নেফ্রোলজী) ডাঃ মোঃ ইনামুল কবির। তিনি খুলনা শহরের প্রায় ৬ থেকে ৭টি প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখেন। তিনি সরকারি হাসপাতালে ৩০ জনের বেশি রোগী দেখেন না। যারা ওই হাসপাতালে এসে ডাক্তারকে না দেখিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। দালালদের মাধ্যমে ওই সব রোগীদের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে জানিয়ে দেন বিকেল ৪টায় গাজী মেডিকেলে গেলে ৮০০ টাকা ভিজিট নিয়ে ভলোভাবে দেখবেন তাছাড়া স্যারকে সিটি মেডিকেল হাসপাতাল, আকিজ আদ-দ্বিন হাসপাতাল, ইসলামিয়া ক্লিনিকে নিয়মিত পাবেন। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ওষুধ কোম্পানির এক প্রতিনিধি ব্যাগভর্তি খাবার ও পানি নিয়ে আসেন আউটডোরে। একজন ব্যাগ থেকে খাবার প্যাকেট বের করছেন আর স্ব স্ব চেম্বারে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। চিকিৎকদের সাথে ওষুধ প্রতিনিধিদের গভীর সখ্য থাকা ও আর্থিক সুবিধা থাকায় ওই সব কোম্পানির ওষুধ রোগীদের প্রেসক্রিপশনে উল্লেখ করেন। এর বিনিময়ে চিকিৎসকরা প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের অর্থ পেয়ে থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট এক ওষুধ প্রতিনিধির কাছ থেকে এ তথ্য জানা যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওষুধ প্রতিনিধিদেরকে প্রতি চার মাস পর পর সাপ্তাহিক দিন পরিবর্তন করে নোটিশ জারী করেন। নোটিশে উল্লেখ রয়েছে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শনিবার ও মঙ্গলবার, মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত রোববার ও বুধবার এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার ওষুধ প্রতিনিধিরা বেলা ১টা থেকে ২টার পূর্বে কোনো অবস্থাতেই হাসপাতালের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন না এবং বহিঃবিভাগে রোগী থাকা অবস্থায় কোনো চিকিৎসক রুমে প্রবেশ করতে পারবেন না। কিন্তু কর্তৃপক্ষের এই নিয়ম মানছেন না ওষুধ প্রতিনিধিরা।
এদিকে হাসপাতালে ঘিরে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মাঝেমধ্যে র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থা অভিযান চালিয়ে কতিপয় দালালকে আটক করেন। অভিযানের পর কিছুদিন নীরব থাকলেও পুনরায় তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত ১৭ অক্টোবর এই হাসপাতাল থেকে দুই দালাল এর মধ্যে রোগী ভাগিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র শেখ ডায়গনস্টিক সেন্টারের এর দালাল আব্দুল করিম অপর দালাল জোসনা বেগমকে পিটিয়ে আহত করে। এ ঘটনায় জোসনা বেগম ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শেখ শহিদুল ইসলামসহ দালাল আব্দুল করিমের নামে থানায় মামলা দায়ের করেন।
ওই হাসপাতালের দালাল ও একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল ঘিরে মহিলাসহ প্রায় ১৫/২০ জন দালাল সক্রিয়। এর মধ্যে শহীদ, বিপুল, রাজ ও সুমনসহ মহিলারাও রয়েছেন। ওই সব দালালরা অধিকাংশ গোয়ালখালী এলাকার বাসিন্দা।
ওই দালাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই হাসপাতালে ডাক্তাররা যখন আউটডোরে আসেন, তখন স্ব স্ব চেম্বারের ডাক্তারের অ্যাসিস্ট্যান্টরা রোগীরা আসলে তাদের রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ডাক্তারদের মনোনীত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণ করেন না। আনীত রিপোর্ট ঠিক নয় বলে জানিয়ে দেন। ওই হাসপাতাল ঘিরে রয়েছে শেখ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কমফোর্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও অ্যাংকর ডায়াগনিস্টক সেন্টার। এর মধ্যে মাগুরা এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম শেখ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক, অ্যাংকর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক আলমগীর এবং কমফোর্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মুন্না। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ডাক্তাররা টেস্টের প্রকারভেদ অনুযায়ী ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকেন। এছাড়া সন্ধানী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সব ডাক্তার টেস্টের ওপর ৫০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকেন বলে জনশ্রুতি আছে।
ওই সূত্র জানান, ওই তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শহীদ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিৎসকরা পালা বদল করে একেক সময় একেক ডাক্তার বসেন। কেউ সকাল ৯টায়, কেউ দুপুর ১২টায় আবার কেউ বা বেলা ১টা বা বিকেলে বসে থাকেন। ওই সব ডাক্তারের তাদের নির্দিষ্ট কোড রয়েছে। ওই দালাল জানায়, ওই হাসপাতালে ডাঃ আবু বক্কর সিদ্দিকী, ডাঃ মুকুল, ডাঃ মুক্তি ও অর্থপেডিক্সের ডাক্তারসহ আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, ওই হাসপাতালে কোনো রোগী চিকিৎসা নেওয়ার জন্য সিরিয়াল নিতে গেলেও তাতেও রয়েছে কারসাজি। হাসপাতালের আউটডোরে স্ব স্ব চেম্বারের চিকিৎসকদের অ্যাসিস্ট্যান্টরা রোগীদের সিরিয়াল নিয়েও বাণিজ্য করেন। ১০০ টাকা হাতে গুঁজে দিলেই সিরিয়াল পেয়ে যান, নয়তো বা হয় না। এভাবে দিনের পর দিন চলে আসছে দুর্নীতি। আর পর্দার আড়ালে কলকাঠি নাড়ান ওই হাসপাতালেরই চিকিৎসকরা বলে ওই দালাল উল্লেখ করেছেন। আর হাসপাতালের সিটি স্ক্যান ও এক্সরে মেশিন নষ্ট হয়ে গেলে চিকিৎসকদের বাণিজ্য আরও বেড়ে যায়। তখন কতিপয় অসাধু চিকিৎসক রোগীদের রোগ নির্ণয়ের নামে তাদের মনোনীত ডায়াগনস্টিক সেন্টাগুলোতে টেস্ট করিয়ে আনতে বলেন। আর এই টেস্টের থেকে তারা একটি মোটা অঙ্কের কমিশন পেয়ে থাকেন।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জানুয়ারি খুলনা কেএমপির ডিবির একটি টিম ওই হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা ডায়গনস্টিক সেন্টারের দালালকে গ্রেফতার করেছেন। এর মধ্যে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল হালিম শেখ, শেখ বিপুল ও জুলফিকার আলী রয়েছেন। এর পর থেকে ওই হাসপাতালের দুর্নীতি ও চিকিৎসকদের রোগীদের রোগ নির্ণয়ের নামে নানা তথ্য বেরিয়ে আসতে থাকে।

আপনার মতামত জানানঃ