মৃত্যু বাড়লেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ হয় না (ভিডিও)

এ পর্যন্ত মৃত্যু ৪
ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় ৯০ শতাংশ সরকারি ভবন

কামরুল হোসেন মনি : নূরানী সিনথিয়া আলম (৯)। মাদ্রাসার আরবী লাইনে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কার্নিস ধসে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুত্বর জখম হয়। মা মুন্নী আলমের হাত ও কাঁধ এর হাড় ভেঙে যায়। সিনথিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় মারা যায়। ৬ মে তার লাশ খুলনায় আনা হলে ভোরে বসুপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়। গত ৪ মে বিকেলে নগরীর শামসুর রহমান রোডে কেসিসির চিহ্নিত একটি পরিত্যক্ত বিল্ডিং এর কার্সিস ভেঙে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে এ পর্যন্ত মারা গেছে ৪ জন। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নড়েচড়ে বসেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো অপসারণের উদ্যোগ নিলেও কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। গত ৮ বছরেও চিহ্নিত ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
গতকাল নগরীর শামসুর রহমান রোডে সিনথিয়ার দুর্ঘটনাস্থলে গেলে দেখা যায়, ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ছাদের নিচে বিভিন্ন অংশও খুলে পড়ছে। এই বিল্ডিং এর দ্বিতীয় তলায় ‘যুবক জিম’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। পাশে রয়েছে ভাড়াটিয়া। নিচে রয়েছে প্রেস। পাশে আছে আরও ৩-৪টি ভাড়াটিয়া।
ওখানে বসবাসকারীরা জানান, এখানের সব ভাড়াটিয়ার ভাড়ার টাকাগুলো প্রতিমাসে ‘জিলেট সুজন’ নামে এক ব্যক্তি এসে নিয়ে যান। শুধু ওই বিল্ডিং নয়, এমন একাধিক বিল্ডিং নগরীর বড় বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায়। ভবনগুলো পরিত্যক্ত, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও এসব ভবনে বসবাস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, গোডাউন এবং পরিবারের বসবাসও। খুলনায় ভূমিকম্প এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ওই সব ভবন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
দুর্ঘটনায় নিহত সিনথিয়ার বাসা নগরীর রায়পাড়া মেইন রোড নবারুণ ক্লাবের পাশে। ওই বাসায় গেলে মা মুন্নী আলম মেয়ের শোকে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। ওই দিন ওই বিল্ডিং এর কার্নিস ধসে পড়ে তার হাত ও কাঁধের একটি হাড় ভেঙে গেছে। বাবা মোঃ নূর আলম শোকে মাতম করছেন।
আহত মুন্নী বলেন, ওই দিন শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে শিশুপুত্র মোঃ নূর নবী ও মেয়ে সিনথিয়াকে নিয়ে ওই বিল্ডিংয়ে তার নিকটতম আত্মীয় বাসায় যান। তিনি সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে ‘হুড়মুড়’ একটি শব্দ পেলেন। এরপর তিনি আর কিছু বলতে পারেন না। ওই সময় মেয়েটি চিৎকার দিলেও ওইটাই তার শেষ চিৎকার ছিল।
এর আগে ২০১৫ সালে জুন মাসে নগরীর ইকবালনগর স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আবিদা আরিফিন শাপলা বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় ভবন ধসে মারা যায়। এছাড়া ২০১০ সালে নগরীর বড়বাজার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে দুই ব্যবসায়ী নিহত হন।
খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ লিয়াকত আলী খান বলেন, ওই বিল্ডিংটি কেসিসির ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে এ বিষয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিং এর তালিকার মধ্যে অধিকাংশই সরকারি ভবন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অপসারণের জন্য চিঠি প্রদান ও ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিংগুলো চিহ্নিত করে সাইনবোর্ডও টাঙিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কেসিসির স্টেট অফিসার মোঃ নূরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ঝুঁকিপুর্ণ তালিকার মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন থেকে সরকারি ভবনগুলো বেশি। মামলা-মোকদ্দমা থাকার কারণে অনেক সময় ওই বিল্ডিং এর বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারছি না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় ঝুঁকিপূর্ণ বিল্ডিংগুলোর লিজ বাতিলের জন্য সুপারিশ করেছি। এছাড়া ভবনগুলো চিহ্নিত করার জন্য সাইনবোর্ড লাগানো হচ্ছে, রাতের অন্ধকারে ওই সব সাইনবোর্ড খুলে ফেলা হচ্ছে।
কেসিসির সম্পত্তি শাখার সূত্র মতে, ২০১০ সালে নগরীর বড়বাজার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ধসে দুই ব্যবসায়ী নিহত হওয়ার পর ওই বছরে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) পক্ষ থেকে ৯৪টি এবং কেসিসির পক্ষ থেকে ৫৯টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে চিহ্নিত ৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং বসবাসের অনুপযোগী ২৬টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে অপসারণের জন্য নোটিশ প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। এ তালিকায় ২০টি জেলাপ্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে, একটি সিটি কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রণে, একটি গণপূর্ত বিভাগের আর বাকি ৪টি ব্যক্তি মালিকানাধীনের রয়েছে। এছাড়া অপক্ষেকৃত কম ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার মধ্যে রয়েছে ১৭টি বাড়ি। এগুলোর নিচতলা রেখে বাকি অংশ ভেঙে পুনঃনির্মাণের জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়। এসব বাড়ি গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নিয়ন্ত্রণে। আর ৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ির সম্প্রসারিত অংশ ভেঙে প্রয়োজনীয় মেরামতের বিষয়ে বাড়ির মালিককে নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। এ সব বাড়ি ব্যক্তি মালিকানাধীন। ইতোমধ্যে একটি বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১৬ সালের ১৮ মার্চ তৎকালীন মেয়রের সভাপতিত্বে এক সভায় ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাভুক্ত যে সকল বাড়ি জেলা প্রশাসন ও গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক লীজ দেওয়া আছে স্ব স্ব কর্তৃপক্ষ ওই সকল বাড়ির লীজ বাতিল করবে এবং কেসিসি ভবনসমূহের হোল্ডিং বাতিল করবে মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া ওই সভায় ৭ দিনের মধ্যে ঝুঁকিপুর্ণ ভবন ত্যাগ করার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু ওই সব সিদ্ধান্তগুলো কাগজ-কলমে রয়ে গেছে। বাস্তবে রূপ নেয়নি কখনো।
জানা গেছে, পরিত্যক্ত ঘোষিত খুলনা জেলা কারাগার ভবন, টুটপাড়া আনসার ক্যাম্পের ভেতরে ভূতের বাড়ি, খুলনা জেনারেল হাসপাতালের পরিত্যক্ত ভবন, খুলনা প্রেস ক্লাবের বিপরীতে স্যার ইকবাল রোড, বসুপাড়া, হাজী মহসিন রোড, গগণ বাবু রোড, মুন্সীপাড়া, রায়পাড়া, দোলখোলা, বানিয়াখামার, টুটপাড়া, মুজগুন্নী, খালিশপুর, দৌলতপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দু’ শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। মহানগরী এলাকায় প্রাচীনকালের জরাজীর্ণ ভবনও রয়েছে। এসব ভবনের দুই ও তিনতলার দেওয়ালের মধ্যে বটগাছের চারাসহ বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ জন্ম নিয়েছে। বিগত সময়ে এ ভবনগুলো ভেঙে ফেলার জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও তা ভাঙা সম্ভব হয়নি।