অটোমেটিক ক্লিন হবে ড্রেন : শহর রাখবে পরিচ্ছন্ন

মো. শহীদুল হাসান :
বিংশ শতাব্দীর নগরায়ণের এই সময়ে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা প্রধান কাজ। একদিকে কোটি মানুষের শহরে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট দফতরকে হিমশিম খেতে হয়, অন্যদিকে বাসিন্দাদের অসচেতনতা আর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অক্ষমতায় বন্ধ হয়ে যায় ড্রেন। এতে স্থবির হয়ে পড়ে পয়ো:নিষ্কাশন প্রণালী। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে। ব্যাহত হয় নগরায়নের সুবিধা এবং জীবন জীবিকা। অপরদিকে ড্রেনের পানি ও বর্জ্য মাটির উপরিভাগে উঠে এলে নানা ধরনের রোগজীবাণুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু, চিকুঙ্গগুনিয়ার মতো ভয়ংকর রোগের তালিকা হয় দীর্ঘ। ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড তো আছেই। এ ছাড়া পানি ও মাটিদূষণে ভারসাম্য হারায় পরিবেশ। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হয় ব্যাহত।
এসব অবস্থা থেকে বাঁচতে ‘অটো ড্রেন ক্লিনার’ উদ্ভাবন করেছেন খুলনার ম্যানগ্রোভ ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ ছাত্র ওবায়েদুল ইসলাম। তার বাড়ি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নের মধ্যম পাংশা গ্রামে। দীর্ঘ একবছর চেষ্টা করে ‘অটো ড্রেন ক্লিনার’ সিস্টেমের মডেল প্রকল্প সম্পন্ন করেছেন। এটি ব্যবহারে অত্যাধিক জনবল ছাড়াই নগরীর ড্রেনগুলো অটোমেটিক পরিষ্কার করা সম্ভব হবে। ফলে নগর হয়ে উঠবে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য হিসেবে।
তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রেন পরিষ্কার হয়ে যাবে। একই সঙ্গে ড্রেনের ময়লা ও পানি আলাদা হয়ে পানি চলে যাবে নদী বা খালে। ওদিকে মানবসৃষ্ট আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে জমা হবে। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, অটো ড্রেন ক্লিনার পদ্ধতিতে শহরের ড্রেন পরিষ্কার করতে একজন জনবলেরও দরকার হবে না। আর পুরো প্রকল্পটি চলবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে।

জানতে চাইলে ওবায়েদুল ইসলাম বলেন, অটো ড্রেন ক্লিনার হচ্ছে একটি শহর পরিচ্ছন্ন রাখার মডেল প্রযুক্তি। এটি বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়িত হলে নগর কর্তৃপক্ষ পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের ব্যয় কমবে। লোকবলের দরকার হবে না। সেই শ্রমশক্তি অন্যত্র ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি সময়মতো প্রতিদিন ড্রেন পরিষ্কার হয়ে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।

অটো ড্রেন ক্লিনার কী এবং এর কাজের পরিধি কত, এমন প্রশ্নে ওবায়দুল বলেন, অটো ড্রেন ক্লিনার হচ্ছে সেন্সর-নির্ভর এবং মাইক্রো প্রসেসর নিয়ন্ত্রিত একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতির সেন্সরের কাজ ড্রেনে ময়লা-আবর্জনার স্তর শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই স্তর ভেঙে দিয়ে প্রেসার পাম্পের মাধ্যমে পানির গতি বাড়িয়ে নির্ধারিত দূরত্বে ময়লা-আবর্জনা পৌঁছে দেওয়া। সর্বশেষ সেন্সরটি থাকবে ড্রেনের ‘বহির্গমন’ পয়েন্টে। সেখানে ড্রেনের পানি নদী/খালে নির্গমন না হয়ে যদি উল্টো প্রবেশ করে, তাহলে বহির্গমন পয়েন্টের সেন্সর সক্রিয় হয়ে নদী বা খালের পানির স্তর ড্রেনের পানির স্তরের নিচে না নেমে আসা অবধি পুরো প্রক্রিয়াটি নিস্ক্রিয় করে রাখবে।
তরুন এই উদ্ভাবক উদাহরণ টেনে বলেন, শহরের ময়লা-আবর্জনা ড্রেনের নির্ধারিত পয়েন্ট থেকে ফেলা হলে ড্রেনের পানির স্বাভাবিক গতির সঙ্গে মিশে একটি নির্ধারিত দূরত্বে গিয়ে জমাট বাঁধতে থাকবে। ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা যদি প্রথম স্তর পর্যন্ত জমাট বাঁধে, তাহলে সেন্সরের সিগন্যালের মাধ্যমে প্রথম প্রেসার পাম্পটি চালু হয়ে ময়লা-আবর্জনার জমাট বাঁধা অংশের ওপর প্রবল গতিতে পানি ছুড়ে তা ভেঙে দেবে। ড্রেনের স্বাভাবিক পানি ও প্রেসার পাম্পের ছোড়া পানি মিলে ময়লা-আবর্জনা নির্গমন মুখের দিকে স্রোতে ভেসে যাবে।
পানিপ্রবাহের গতি কমে গিয়ে যেখানে দ্বিতীয় স্তর গড়ে তুলবে, সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বিতীয় সেন্সরের সিগন্যালে প্রেসার পাম্প চালু হয়ে পানিপ্রবাহ বাড়িয়ে দেবে। এভাবে ড্রেনের বহির্গমন পয়েন্ট পর্যন্ত ময়লা-আবর্জনা পানিপ্রবাহের মাধ্যমে পৌঁছে দেবে সেন্সর ও প্রেসার পাম্প। বহির্গমনে বিশেষ পদ্ধতিতে ‘ছাঁকনি’ স্থাপন করা থাকবে। যাতে ময়লা-আবর্জনা আটকে থাকবে আর পানি নদী-খালে পতিত হবে, বলে তিনি জানান। তবে আটকে থাকা আর্বজনা নির্দিষ্ট সময় পরপর জনবল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
প্রেসার পাম্প ও সেন্সর চালু রাখতে কি পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরো প্রযুক্তি সৌরবিদুৎ ব্যবহার করে চালু রাখা যাবে এবং সেজন্য এখানে সৌর প্যানেল স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া প্রেসার পাম্পের জন্য নদী/খালের তলদেশ থেকে পাইপের মাধ্যমে সমান গভীরতার কূপে পানি নিয়ে পানি সরবারহ করতে হবে। এবং যতগুলো পয়েন্টে অটো ড্রেন ক্লিনার বসাানো হবে প্রতিটির ক্ষেত্রে পাইপের মাধ্যমে প্রেসার পাম্পের জন্য পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
তিনি আরো জানান, গত একবছর ধরে যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করে এই অটো ড্রেন ক্লিনার সিস্টেম উদ্ভাবন করেছেন তার জন্য ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে ড্রেনের আয়োতন ও উচ্চতা ভেদে প্রতিটি সেটের জন্য অর্থ ব্যয় কম বা বেশি হতে পারে। এক্ষেত্রে বৃহদায়াতনে কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে এটি উৎপাদন করা গেলে সামগ্রিকভাবে প্রতিটি সেটের উৎপাদন ব্যয় সহনীয় মাত্রায় বা সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তার মতে, একটি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না হলে সেই শহরটি দিনে দিনে বসবাসের উপযোগিতা হারায়। বিশ্বায়নের যুগে মানুষের ব্যস্ততা ও কাজের পরিধি বেড়েছে। এই সময়ে শ্রমিক দিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করা আধুনিক কোনো প্রক্রিয়া নয়। বরং তা শহরের আয়ুষ্কাল কমিয়ে দিচ্ছে।
কীভাবে ও কেন অটো ড্রেন ক্লিনার প্রযুক্তির চিন্তার শুরু, জানতে চাইলে ওবায়েদুল ইসলাম বলেন, লেখাপড়ার সুবাদে আমি খুলনা শহরে দীর্ঘদিন রয়েছি। এখানে দেখেছি নগর কর্তৃপক্ষ শ্রমিক দিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করায়। শ্রমিকরা ড্রেনের ময়লা তুলে হাসপাতাল, স্কুল-কলেজের সামনে সুবিধামতো স্থানে সড়কের ওপরেই রাখেন। এতে রাস্তা নোংরা থাকে কয়েকদিন। এতে প্রচুর রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ে শহরে। এসব নোংরা-আবর্জনায় যেসব মাছি বসে, সেগুলো উড়ে গিয়ে যে কারও প্লেটে বসে রোগের সংক্রমণ ঘটাতে পারে। নগর কর্তৃপক্ষ ভালো কাজ করলেও সেকেলে পদ্ধতিতে নগর পরিষ্কার করায় নগরবাসীর উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়।

বছরখানেক আগে একদিন দেখি ড্রেনের ময়লা পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তুলে শহরের রাস্তায় উন্মুক্ত স্থানে রাখছেন। সেই পথ দিয়ে রিকশায় করে এক যাত্রী যাচ্ছিলেন। তিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পড়ে গেলেন ময়লার মধ্যে। তখন থেকে চিন্তা এলো ড্রেন ব্যবস্থা কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায়।
ওবায়েদুল বলেন, করোনা আমার জন্য একধরনের ভালো সময়, কারণ এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। একাডেমিক লেখাপড়ার চাপ ছিল না। দিনে দিনে অটো ড্রেন ক্লিনার নিয়ে চিন্তার ও কাজের ফুরসত পেয়েছি।
এসবের পৃষ্ঠপোষকতা কীভাবে হলো, বললেন মামার সহযোগিতার কথা, আমার বাবার পরিচয় নেই এবং নিজের কোনো বাড়ি নেই। থাকি মামার বাড়িতে। আমার লেখাপড়া সবকিছুর ভরণপোষণ দিয়েছেন মামা। তিনি এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আমাকে সাহস ও অর্থ দিয়েছেন।

এক বছর ধরে পর্যায়ক্রমে অটো ড্রেন ক্লিনার প্রযুক্তি উন্নতির জন্য কাজ করছি। এতে এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে আমার। আমি বরিশালের বাবুগঞ্জ পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কারিগরি বিভাগের জেনারেল মেকানিকস ট্রেড থেকে এসএসসি ভোকেশনাল এবং খুলনার ম্যানগ্রোভ ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডিপ্লোমা ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছি।
ওবায়দুল ইসলাম জানান, সরকারের পৃষ্ঠপোশকতা পেলে ভবিষ্যতে এ প্রকল্পটি বৃহদায়কারে করে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। যার মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ সিটি কর্পোরেশনগুলোর ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন সম্ভব হবে। এছাড়া সারা দেশের শহরগুলোর ও নগরায়নের ফলে গড়ে উঠা এলাকাগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা যাবে। একই সাথে তিনি এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিত্তশালী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার প্রত্যাশা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>