খুলনার কোচিং সেন্টারের সহস্রাধিক পরিচালক ও শিক্ষক বেকার

মুকুল রায় : করোনাকালীন লকডাউনে সীমিত আকারে সবকিছুই চলছে। তবে বন্ধ রয়েছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সকল কোচিং সেন্টার। টানা এক বছরের বেশি সময় কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ থাকায় পথে বসেছে কোচিং সেন্টারের পরিচালক ও শিক্ষকেরা। শিক্ষিত যেসব যুবক-যুবতী এখানে শিক্ষকতা করতেন তারাও বেকার হয়ে পড়েছেন। আর্থিকভাবে চরম দুর্দশায় অন্তত খুলনার সহস্রাধিক কোচিং সেন্টারের পরিচালক ও শিক্ষক।
কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে বিকল্প পন্থায়। কেউ পাড়ি জমিয়েছেন প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গ্রামে। যাদের কোনো বিকল্প নেই তারাই আছেন মহা সংকটে। করোনাকালের অন্ধকার কবে দূর হবে এই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তারা।
এক সময় মহানগরী খুলনার অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন নামে-বেনামে কোচিং সেন্টার বা ব্যাচ। কিন্তু অদৃশ্য শক্তি কোভিড-১৯ সেই চিরচেনা কোচিং বা ব্যাচ সাম্রাজ্যকে করেছে দিশেহারা। বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। যাদের এই প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত টিউশনির উপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে বাকি অর্থ গ্রামে বসবাসরত পরিবারের কাছে পাঠাত। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছে। একটা সময় নগরীর বিভিন্ন জায়গায় চোখে পড়ত বিভিন্ন স্যারের ব্যাচ বা কোচিং। কিন্তু করোনার কারণে সে চিরচেনা রূপ আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আর বিভিন্ন দেয়ালে দেখা মেলে না বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন স্যারের চমকদারি বিজ্ঞাপন আর সাফল্যগাঁথার কল্পকাহিনী। গতকাল সরজমিনে নগরীর ফুলবাড়িগেট, দৌলতপুর, বয়রা, খালিশপুর, সোনাডাঙ্গা, খুলনাসদরসহ বিভিন্ন জায়গায় স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের দেখা মিলেছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ডের দেখা মিলেছে নগরীর দৌলতপুর সরকারি বিএল কলেজের আশেপাশে, বয়রা সরকারি মহিলা কলেজের আশেপাশে, সিটি কলেজের আশেপাশে, দোলখোলা, আহসান আহমেদ রোড, পিটিআইয়ের আশে-পাশে, সামছুর রহমান রোড, বাবুখান রোড, ছোট মির্জাপুর, সাউথসেন্ট্রাল রোড ও হাজী মহসিন রোডে। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এপ্রিল থেকে এগুলো তালাবদ্ধ রয়েছে। সাইনবোর্ড হতে প্রাপ্ত নম্বরে যোগাযোগ করে জানা যায় তারা গ্রামে আছেন। প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রশ্ন করায় অধিকাংশই হতাশার কথা ব্যক্ত করে বলেন, জুন মাস থেকে কোচিং চালু করতে না পারলে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিয়ে হয়তো অন্য কোনো পেশায় যেতে হবে। অন্যথায় গ্রামেই থেকে যেতে হবে। যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান খোলা পাওয়া গিয়েছে তারা ঈদ পরবর্তীতে অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত করতে ব্যস্ত রয়েছেন। তারা বলেন, বুক ভরা আশা নিয়ে প্রতিষ্ঠান ধরে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম ঈদের পর প্রতিষ্ঠান চালু করতে পারব। কিন্তু লকডাউন আবার বর্ধিত করে ২৯ মে পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে সরকার নির্দেশনা দিয়েছে। এদিকে গত বছর বাড়ির মালিকরা কিছুটা বাড়িভাড়া মানবিক কারণে কম নিলেও এ বছর তারা নির্ধারিত ভাড়ার এক পয়সাও কম নিতে চাইছেন না। পক্ষান্তরে এ বছর অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সাড়াও গত বছরের তুলনায় নগণ্য। ফলে বিড়ম্বনার শেষ নেই। কোচিং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ জানান, কোচিং এর মতো একটি সম্মানজনক পেশায় নিজেদের জড়িয়ে বর্তমানে তারা দিশেহারা। এখানে অর্থ ও সম্মান পাওয়া যেত। বিধায় খ্যাতির বিড়ম্বনায় ছোটখাটো কোনো পেশায়ও নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে পারছেন না তারা। তবে আক্ষেপের সাথে একাধিক কোচিং পরিচালক বলেন, আমাদের নিয়ে কেউ ভাবেন, এমনটাও মনে হয় না। একটা সময় কোচিং বাণিজ্য নিয়ে পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হত। বর্তমানে আমাদের দুর্দশার বাস্তব চিত্র কারো চোখে পড়ে না। না পেয়েছি কোনো অনুদান, না দাঁড়াতে পেরেছি কোনো ত্রাণের লাইনে। কিন্তু আজ এক বছরের অধিক সময় কর্মহীন, অর্থহীন জীবনযাপন আমাদের কাছে বড়ই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত বছর কোচিং করে আয় করা অর্থ-সম্পদ কী করেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে কোচিং পরিচালকরা এই প্রতিবেদককে বলেন, যার যেভাবে আয় হত, তারা সেভাবে ব্যয়ও করতেন।
নগরীর হাজী মহসিন রোডের স্টার একাডেমিক কেয়ারের পরিচালক অসিত রায় বলেন, আমরা দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী। এদেশের নতুন প্রজন্মের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করি। আমাদের স্বীকৃতিও দরকার। সাথে সাথে টিকে থাকার জন্য কোভিড প্রটোকল মেনে তাদের প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ারও দাবি জানান তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যাচ ও কোচিং এর পরিচালক বলেন, আমরা না পারছি সইতে, না পারছি বলতে। আমাদের সঞ্চিত অর্থ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বর্তমানে তারা সম্পত্তি বিক্রি করে, কেউ সুদে টাকা নিয়ে, কেউবা ধার করে এবং কেউ কেউ আবার গহনা বিক্রি করেও টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিগত দিনে অর্জিত অর্থ-সম্পদ নিয়ে এখনো ভালো সময় পার করছেন।
এদিকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত খসড়া শিক্ষা আইন-২০২১ এ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত ফ্রি ল্যান্সারদের সব ধরনের কোচিং সেন্টারের বৈধতা দিয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে তা পরিচালনার জন্য সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। এমন সংবাদে কোচিং সংশ্লিষ্টরা আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় গত এপ্রিল মাস থেকে চলমান লকডাউনে মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত খসড়া আইনটি পাশ হওয়া সম্ভব হয় নি।
এ বিষয়ে কোচিংসেন্টার এসোসিয়েশনের (এসেব) খুলনার সভাপতি শ্যামল কুমার রায় বলেন, আমরা শিক্ষাআইন-২১ এর চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে আশাবাদী। আমাদের বহু প্রতীক্ষিত প্রত্যাশার প্রাপ্তি ঘটতে চলেছে। তিনি বলেন, আমরা যারা ফ্রি ল্যান্সার (কোচিং সংশ্লিষ্টরা) এবং এই পেশার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল আছি; আমাদের সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকার আমাদের টিকে থাকার কোনো একটি ব্যবস্থা করলে চির কৃতজ্ঞ থাকব। ইতোমধ্যে ৬০% ফ্রি ল্যান্সার (কোচিং সংশ্লিষ্টরা) প্রতিষ্ঠান ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। আর যারা এখনও টিকে আছেন; তারা চরম হতাশার মধ্যে আছেন। তিনি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে তাদের মানসিক বিকাশ সাধনের জন্য সম্ভব হলে সপ্তাহে অন্তত একদিন এক একটি ক্লাস চলমান রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে একাধিক অভিভাবকের সাথে কথা বললে তারা বলেন, এক বছরের বেশি সময় ঘরে বসে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা ভুলতে বসেছে। শুধু টিভি, মোবাইল গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং আচার-আচরণে ব্যাপক পরিবর্তনও এসেছে। কথায় কথায় তর্কে জড়িয়ে পড়ছে এবং মোবাইলে প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। অভিভাবকরাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বল্প পরিসরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
বুক ভরা আশা নিয়ে শিক্ষা সহায়ক এই প্রতিষ্ঠানগুলো (কোচিংসেন্টার) এখনো টিকে রয়েছে সোনালি দিনের প্রত্যাশায়। তারা আশা করেন প্রধানমন্ত্রী তাদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে নতুন কোনো ইতিবাচক দিকনির্দেশনা অবশ্যই প্রদান করবেন।

আপনার মতামত জানানঃ