খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলদারদের সাজানো মামলায় ট্রাস্টি সদস্য গ্রেফতার

প্রকাশঃ ২০২৬-০৪-০৮ - ০১:৪৫

বিশেষ প্রতিনিধি :

খুলনার প্রথম প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি পবিত্র কুমার সরকারকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। গত ৪ এপ্রিল রাত সাড়ে ১১টায় নগরীর হরিণটানা থানার রাজবাঁধের বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়। পরদিন ৫ এপ্রিল মহিলা দল নেত্রী ফাতেমা-তুজ-জোহরা লিন্ডার দোকান ভাংচুর মামলায় অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ নিয়ে খুলনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

পবিত্র কুমার সরকারের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, ভাংচুরের মতো কর্মকান্ডে তার জড়িত থাকার অভিযোগ অতি হাস্যকর। মূলত: গতবছর বিশ্ববিদ্যালয়টি অবৈধভাবে দখল হওয়ার পর পবিত্র সরকার দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালত পবিত্র সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এতে ক্ষিপ্ত হয়েই তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। অবৈধ এই দখলদাররা বৈধ ট্রাস্ট্রি সদস্য পদ পাবেনা জেনেও জনৈক খুলনা মহানগরীর বিএনপি নেতার সহযোগিতায় এ ধরনের ঘৃণিত কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, তার বাদি মহিলা দল নেত্রী ফাতেমা-তুজ-জোহরা লিন্ডা পবিত্র সরকারকে চিনেন না বলেও জানিয়েছেন।

সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৮ নভেম্বর খুলনার প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি। শুরুতে এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেসিসি’র সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তালুকদার আব্দুল খালেক আত্মগোপনে চলে যান। এরপর বাকী বোর্ড সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হন বিএনপি সমর্থিত ট্রাস্টি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সিরাজুল হক চৌধুরী।

সূত্রটি আরো জানায়, ২০২৫ সালের ২১ মে সিরাজুল হক চৌধুরীকে সরিয়ে তার অনুপস্থিতিতে প্রস্তাবিত বোর্ড সদস্য ডিশ ব্যবসায়ী মোঃ মিজানুর রহমান
নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষনা দেন । সৈয়দ হাফিজুর রহমানকে করা হয় সদস্য সচিব। তারা দু’জনের কেউই বৈধ ট্রাস্টি নন। মূলত: খুলনা মহানগর বিএনপির এক নেতার প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি দখল নেন তারা। এরপর ছাত্রদের দ্বারা মব তৈরি করে পবিত্র কুমার সরকারসহ প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিএনপির সমাবেশে হামলার মামলাও দেওয়া হয়। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেন তারা। এতেকরে, বিশ্ববিদ্যালয়টি স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচাীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এককথায় তারা জিম্মি দশায় আছেন। এই অবৈধ ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য মোঃ মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমান বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সম্প্রতি স্থায়ী ক্যাম্পাসে পাইলিং কাজ দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তারা। দখলদার এই ট্রাস্টি বোর্ড সদস্যদের বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের রিপোর্টে অবৈধ ঘোষণা করেছে।

ট্রাস্টি বোর্ড সদস্য পবিত্র কুমার সরকার মোঃ মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খুলনার সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। গত ১৩ জানুয়ারি খুলনার সদর সিনিয়র সহকারী জজ মোঃ রাশিদুল আলম মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দখলদার চেয়ারম্যান মোঃ মিজানুর রহমান ও সৈয়দ হাফিজুর রহমান কে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন আদালত। পরে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করেন দখলদাররা। আগামী ১৬ এপ্রিল আদালত তাদের আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেছে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ থাকলেও, আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা রীতিমত বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কিছু নিয়ন্ত্রন করছেন। তাদের এসকল কাজে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে নেতাদের সুপারিশে নিয়োগকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার (ভারপ্রাপ্ত ভিসি) কানাই লাল সরকার, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের দোসর বোর্ড অব ট্রাস্ট্রিজের লিয়াজো ডাইরেক্টর শেখ মাহরুফুর রহমান, সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের ঘনিষ্ঠ ভাজন ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস স্ট্যাডিজের ডিন ফারজানা আকতার।

এ বিষয়ে খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক তৈমুর ইসলাম বলেন, ‘তিনি আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। ভাংচুরের ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। এজন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

পবিত্র সরকারের স্ত্রী বিউটি মন্ডল বলেন, শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় আমাদের বাড়িতে ঢুকে আমার স্বামীকে ডিবির লোকেরা তুলে নিয়ে যায়। আমাদের সঙ্গে ডিবির লোকেরা খুবই খারাপ আচরণ করেছে। পরদিন জানতে পারি আমার স্বামীকে ভাংচুর মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘অজ্ঞাত মোবাইল নাম্বার থেকে ফোন করে আমাদেরকে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। এবং বলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মামলা তুলে নিলে আর কোনো ঝামেলা হবে না। ওই মামলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এখন কি করবো তা বুঝতে পারছি না। আমাদের দুটি সন্তান নিয়ে খুবই অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি’।

তিনি আরো বলেন, বিয়ের ১৫/১৬ বছরে আমার স্বামীকে কখনো আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডে অংশ নিতে দেখিনি। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কখনওই জড়িত ছিলেন না।

এ বিষয়ে ফাতেমা-তুজ-জোহরা লিন্ডা বলেন, পবিত্র কুমার সরকার নামের আমি কাউকে চিনি না। তাকে কেন এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে ডিবিই বলতে পারবে?

জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ দায়ের করা যে ভাংচুর মামলায় পবিত্র সরকারকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে তার বাদি মহিলা দল নেত্রী ফাতেমা-তুজ-জোহরা লিন্ডা। মামলার এজাহারভুক্ত ৭ আসামির সকলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। এর মধ্যে পবিত্র সরকারের নাম কোথাও নেই।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মিথ্যা হয়রানি মূলক মামলা বাণিজ্যের রেস এখনো বহাল আছে কিনা এটিও খতিয়ে দেখার বিষয় বলে অনেকে মনে করছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেখানে বলেছেন, অন্যায় ভাবে কোথাও কেউ দখলদারি করলে, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় তার বক্তব্য জানিয়েছেন এ সরকারের আমলে অন্যায় ভাবে কেউ মামলার শিকার হবে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সেখানে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতার ইন্ধনে বা সরাসরি সহযোগিতায় এহেন হীন কাজ কিভাবে পরিচালিত হতে পারে তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন?