‘বিপিএল বন্ধ হচ্ছে না, বলতে পারেন সংস্কার হচ্ছে’

প্রকাশঃ ২০২৬-০৮-২৯ - ১৯:২৮

ক্রীড়া প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ নাকি বাংলাদেশ বিতর্ক লিগ সেটা নিয়ে প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরস হয়ে থাকে। কারও কাছে এটা ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট বিপিএল আবার কেউ ২০ ওভারের টুর্নামেন্টকে মনে করেন বিপিএল কাপ হিসেবে। দুনিয়ার বাকি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো যখন সামনের দিকে হাঁটছে বিপিএল ঠিক উল্টো পথে। উন্নতির বদলে বছরান্তর কেবল অবনতি হচ্ছে।

বিপিএলের প্রতি মৌসুমের আগে যেমন খুশি তেমন সাজোর মতো বিসিবির কর্তারাও যেমন খুশি তেমন আশা কথা শোনান। মুখের কথা যেন মুখেই থেকে যায়। মাঠের ক্রিকেট কিংবা আয়োজনে একটু বদল নেই। প্রতি বছর ঘুরেফিরে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক সমস্যা, স্পটফিক্সিংয়ের সন্দেহ কিংবা আয়োজনের অব্যবস্থাপনা—কিছুই বাদ পড়ে না। বিপিএলের সঙ্গে এসব যেন অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে।

গত দুই মৌসুমে ফারুক আহমেদ ও আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড পরিবর্তনের কথা শুনিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে পরিস্থিতির একটু উন্নতি হয়নি। বরং দুই মৌসুমে প্রায় ৪০ কোটি টাকা লোকসানের পর আগামী মৌসুমে বিপিএলই আয়োজন করছে না তামিম ইকবালের বোর্ড। দেশের একমাত্র ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ যে ২০২৭ সালে হচ্ছে না সেটা নিশ্চিত করেছেন বিসিবি সভাপতি নিজেই। পাশাপাশি আবারও নতুন বিপিএল আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছেন।

তামিম যেন পুরনোদের কথাগুলো নতুন করে বলার চেষ্টা করেছেন। যদিও কিছুটা ভিন্নতা রেখেছেন। আগের বোর্ডের কর্তারা দুই-তিন মাসের সময় নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বিপিএল আয়োজন করতেন। তামিম অবশ্য সেই পথে হাঁটছেন না। বরং বিপিএলকে বিশ্ব মানের একটা মডেলে দাঁড়াতে প্রয়োজনে ১২ থেকে ১৮ মাসও সময় নিচ্ছেন। অর্থাৎ ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে যদি বিপিএল আয়োজন করা হয় তাহলে এখনো ১৬ মাস বাকি।

আগামী এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো গুছিয়ে নিতে চান বিসিবি সভাপতি। ফ্র্যাঞ্চাইজিরা যাতে নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারেন কিংবা একটা সমস্যা হলে সেটা সামলানোর জন্য যাতে সময় থাকে সেসব মাথায় রাখছেন তিনি। যার অংশ হিসেবে ২৯ আগষ্ট মিরপুরে রংপুর রাইডার্স, রাজশাহী ওয়ারিয়র্স ও ঢাকা ক্যাপিটালসের মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। বিপিএল নিয়ে তিনি কী ধরনের স্বপ্ন দেখেন সেসব তাদের সামনে তুলেছে ধরেছেন।

তামিমের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে রাজশাহীর কর্ণধার মোখছেদুল কামাল বাবু বলেন, ‘বিপিএল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আগামীতে বিপিএল যেন আরও ভালোভাবে, পেশাদারিত্বের সঙ্গে দাঁড়াতে পারে এবং বিশ্বের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো যেভাবে তাদের জায়গা নিতে পেরেছে বিপিএলও যেন সেই জায়গা নিতে পারে সেটা নিয়ে মূলত আলোচনা হয়েছে।’

‘আলোচনায় আমরা যেটা পেয়েছি বা বুঝেছি এ বছর বিপিএলের অনেকগুলো সংস্কার কার্যক্রম শুরু হবে এবং সেই সংস্কারের পরেই বিপিএলটা শুরু হবে। সেই কাজটি করতে গিয়ে যদি এ বছর বিপিএল করা সম্ভব না হয় তাহলে পরের বছর বিপিএল হবে। বিপিএল কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না, বলতে পারেন সংস্কার হচ্ছে।’

হযবরল বিপিএলকে একটু গুছিয়ে আনতে লম্বা সময়ের জন্য পরিকল্পনার বিকল্প নেই বিসিবি। পিএসএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বিক্রি হয়ে থাকে ১০ বছরের জন্য। গত মৌসুমের আগে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে আবারও ১০ বছরের চুক্তি নবায়ন করেছে পিসিবি। আইপিএলেও চুক্তিগুলো প্রায় একই রকম। যেখানে হুট করেই একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি চলে যাওয়ার আশঙ্কা। পাশাপাশি বিসিসিআইয়ের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বড় অঙ্কের লাভ করতে পারেন।

ক্রিকেট বোর্ডও টুর্নামেন্টের রাজস্ব থেকে লভ্যাংশ ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে শেয়ার করেন। বিসিবিও কিছুদিন আগে এমন আলোচনা হয়েছে। ফারুকের বোর্ডের সময় ফ্র্যাঞ্চাইজিরা কিছু টাকাও পেয়েছিলেন। গত বিপিএলের সময় পাঁচ বছরের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রি করা হলেও সেটা ফলপ্রসূ হয়নি। বরং নানান বিতর্কে বিপিএল নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা হয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের পাশাপাশি তামিমের চাওয়া লম্বা সময়ের জন্য একটা রোডম্যাপ তৈরি করা।

বিপিএলে কী ধরনের সংস্কার করা হবে সেসব জানাতে গিয়ে মোখছেদুল কামাল বলেন, ‘আমরা যদি এটাকে একসঙ্গে বলি তাহলে একটা স্থায়ী মডেল দাঁড় করানো। বিপিএল যেন তার হাইপের জায়গায় থাকে আর সেখান থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজিরা যেন কিছু অর্জন করতে পারে, খেলোয়াড়রাও যেন কিছু অর্জন করতে পারে এবং একটা লম্বা সময়ের রোডম্যাপ। আমরা বারবার এটা দেখেছি হুট করেই বিপিএলের তারিখ (চূড়ান্ত) হয়ে যায় তখন খুবই তড়িঘড়ি করে আমাদের প্রত্যেককে কাজ করতে হয়।’

‘সেটা আমাদের জন্য খুব একটা ভালো ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে না। এজন্য আমরাও বলেছি, উনারাও চিন্তা করছেন যে আগামী ৫ বছর বা একটা লম্বা সময়ের জন্য বিপিএলের একটা রোডম্যাপ তৈরি করা এবং সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী বিপিএল পরিচালিত করা। আমরা মনে করি সেটা যদি হয় তাহলে অবশ্যই পরের বিপিএল দারুণ একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারবে।’

মুশফিকুর রহিম একবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের রুটিরুজির বড় একটা অংশ আসে বিপিএল থেকে। এমনকি এও বলেছিলেন, বিপিএল না হলে তাদের সংসার চলবে না। ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর বিপিএল আয়োজন করতে চাননি ফারুক। তবে তামিমসহ ক্রিকেটাররা গিয়ে অনুরোধ করে বিপিএল চলমান রাখেন।

এবার তিনিই যখন দায়িত্বে তখন বিপিএল করছেন না। তামিমের কথায় ফ্র্যাঞ্চাইজিরা কতটা আশ্বস্ত হয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে রাজশাহীর কর্ণধার বলেন, ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে আমরা সবসময় চাই বিসিবি, ক্রিকেট, ফ্র্যাঞ্চাইজি, ক্রিকেটার— সবাই যেন একটা উইন-উইন পরিস্থিতিতে থাকে। আমরা নিশ্চয়ই চাই বিপিএল একটা ভালো জায়গায় যাক।’

বিপিএল না হওয়ায় হতাশ কিনা প্রশ্নে মোখছেদুল কামাল বলেন, ‘আসলে হতাশ বলতে একটা লিগের ধারাবাহিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটা লিগের যখন ধারাবাহিকতা থাকে না তখন… আসলে বিপিএল মানে তো কয়েকটা দিনের ম্যাচ বা ওই সময়টুকু না। এর বাইরেও প্রত্যেকটা ফ্র্যাঞ্চাইজি অনেক কাজ করে থাকে— দল গোছানো থেকে শুরু করে, স্পন্সরশিপ। আমরা প্রত্যেকটা দল সারা বছরই এগুলো নিয়ে কাজ করি। সেই জায়গা থেকে ধারাবাহিকতা ব্রেক হওয়াটা ব্যত্যয় ঘটায়। কিন্তু আমরা এটাও বলতে চাই যে ভালো জন্য সেই ব্যত্যয়টা আমরা গ্রহণ করেছি।’