সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর ধরে চলছে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রকল্প। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি শোধন, রিভার্স অসমোসিস (RO) প্ল্যান্ট, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (PSF) ও সৌরবিদ্যুৎচালিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। তবে প্রকল্প বাড়লেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
বিশেষ করে শ্যামনগরের গাবুরা এবং কালিগঞ্জের কালিঞ্চি এলাকায় পরিস্থিতি এখনও নাজুক। লবণাক্ততা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে পানির উৎসগুলো ঝুঁকিতে রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি বলেছেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আজকের পদক্ষেপই আগামীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তিনি জানান, সরকার জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) ২০২৩-২০৫০ এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC 3.0) প্রণয়ন করেছে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-নিঃসরণ উন্নয়ন কৌশল এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন জোরদারেও কাজ চলছে।
কিন্তু নীতি ও প্রকল্পের এই উদ্যোগের সঙ্গে উপকূলের বাস্তবতার ব্যবধান এখনো বড়।
সাতক্ষীরায় সুপেয় পানি নিশ্চিতে চলছে Satkhira Resilient Water System Pilot Project। সেভ দ্য চিলড্রেন ও উত্তরণের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটির আওতায় RO প্ল্যান্ট স্থাপন এবং PSF পুনর্সংস্কার করা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, এর মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা পেয়েছেন। কমেছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। কমেছে পানি কেনার খরচও।
প্রকল্পটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কমিউনিটি ব্যবস্থাপনা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও নারী ওয়াটার ইউজার গ্রুপের মাধ্যমে ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে স্থানীয় নারীরাও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে যুক্ত হয়েছেন।
ব্র্যাকের Rain for Life প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি নিয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশ বন্ধু ফাউন্ডেশন ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সৌরবিদ্যুৎচালিত সুপেয় পানির প্ল্যান্ট পরিচালনা করছে। কেয়ার বাংলাদেশ ও ডিএসকে-এর নবাবল্লভ প্রকল্পেও উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষ সুপেয় পানির সুবিধা পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য।
তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও অপ্রতুল। শ্যামনগর ও আশাশুনির মতো সংকটপূর্ণ এলাকায় পানি সংগ্রহের বুথ বা কালেকশন পয়েন্টের সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় কম। অনেক এলাকায় বসানো PSF ও রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ট্যাংক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
গাবুরার চিত্র আরও কঠিন। নদীবেষ্টিত এই এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেশি। ফলে সাধারণ নলকূপ প্রায় অকার্যকর। পুরোনো অনেক PSF ও পানি শোধনাগারও এখন বন্ধ। শুষ্ক মৌসুমে পুকুর শুকিয়ে গেলে সচল প্ল্যান্টগুলোও পানি দিতে পারে না।
তবে নতুন উদ্যোগও আছে। গাবুরার সোরা গ্রামে রূপান্তর ও ওয়াটারএইড বাংলাদেশের অর্থায়নে ‘সুন্দরবন নারী দল সুপেয় পানি প্ল্যান্ট’ চালু হয়েছে। নারী নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। এরপরও অনেক পরিবারকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। কেউ কেউ চড়া দামে ফিল্টারের পানি কিনছেন।
কালিঞ্চিতেও একই চিত্র। DPHE ও বিভিন্ন এনজিওর সীমিতসংখ্যক RO এবং সৌরবিদ্যুৎচালিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় স্থানীয়দের। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যায়।
এই দুই এলাকায় WaterAid Bangladesh, Rupantar, BONDHU, Save the Children, Uttaran, Friendship, PROBAHO এবং UNDPসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। তাদের উদ্যোগে পানি সরবরাহ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজনের সুযোগ বাড়ছে।
তবু বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে। উচ্চ লবণাক্ততায় সাধারণ ফিল্টার দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। কোথাও পুকুর শুকিয়ে যাচ্ছে। কোথাও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে প্ল্যান্ট বন্ধ। আবার কোথাও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
তাই শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা। প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক পানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বড় পরিসরে লবণাক্ততা দূরীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকার NAP ২০২৩-২০৫০-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনার সফলতা যাচাইয়ের সময় মাঠে। সাতক্ষীরার উপকূলের মানুষের কাছে সেই সাফল্যের মাপকাঠি খুব সহজ—প্রকল্পের সংখ্যা নয়, প্রতিদিন ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছাচ্ছে কি না।
উপকূলের মানুষের কাছে এখন একটি কলসি সুপেয় পানিও উন্নয়নের বড় সূচক। তাই জলবায়ু অভিযোজনের অর্থ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়। সেই অবকাঠামো কতদিন সচল থাকে এবং কত মানুষ নিয়মিত নিরাপদ পানি পান—সেটিই হতে হবে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সারা বছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয় উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার মানুষকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা সুপেয় পানি সংকট। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের পর থেকে এ অঞ্চলে মিঠাপানির আধারগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
সংকট নিরসনে সরকার ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে রেইন ওয়াটার হারভেস্ট প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। শেষ হবে ২০২৪ সালের জুন নাগাদ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের এক লাখ মানুষ সুপেয় পানি পাবে বলে জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাস্তবায়িত প্রকল্পে উপকূলীয় ছয়টি উপজেলায় তিন হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ১৭ হাজার ট্যাংক স্থাপন করা হবে। যার একেকটি ট্যাংক স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০-৪২ হাজার টাকা। গত মে মাসে প্রকল্পের কার্যাদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করেছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরার মরিয়াম বিবি, আমেনা বেগমসহ কয়েকজন জানান, বর্ষা মৌসুমে দূরের পুকুর ও জলাশায় থেকে মিঠাপানি সংগ্রহ করতে হয়। আর বছরের বাকি সময় পানি কিনে খেতে হয় তাদের। রেইন ওয়াটার হারভেস্ট প্রকল্পের অধীনে তারা প্রত্যেকে একটি করে তিন হাজার লিটার ট্যাংক পেয়েছেন।
আশাশুনি উপজেলা সদর ইউনিয়নের রোজিনা খাতুন ও আছিয়া বিবিসহ অনেকেই জানান, তাদের গ্রামে সুপেয় পানির সংকট তীব্র। টিউবওয়েলের পানিতে অতিমাত্রায় লবণাক্ত, যা কোনোভাবেই ব্যবহার করা যায় না।
আশাশুনি উপজেলার দরগাহপুর গ্রামের মনোয়ারা খাতুন ও বড়দল গ্রামের হালিমা খাতুনসহ অনেক জানান, তাদের বাড়ির উঠানে ওই ট্যাংক স্থাপন করে দিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ছাদ বা টিনের চালে স্থাপন করা ট্যাংক থেকে পাইপের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার মোট জনসংখ্যার ৬৩ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি ব্যবহার করতে পারে। আর পানি সংকটে রয়েছে ৩৭ শতাংশ মানুষ, যার পরিমাণ প্রায় আট লাখ।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিএম মাকসুদুল আলম বলেন, গাবুরা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে সুপেয় পানি। চারদিকে নদনদী আর সুন্দরবনবেষ্টিত এ ইউনিয়নের অধিকাংশ মিঠা পানির আধারগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে সুপেয় পানির সংকট তীব্র। রেইন ওয়াটার হারভেস্ট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে তাদের এ সংকট কিছুটা কাটবে।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, উপকূলীয় মানুষের সুপেয় পানি সংকট নিরসন করতে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে রেইন ওয়াটার হারভেস্ট প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে প্রাথমিক অবস্থায় উপকূলীয় জনপদের অন্তত এক লাখ মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা মিটবে।
তিনি আরও বলেন, আগামী বর্ষা মৌসুমে এসব সুফলভোগী বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে পারবে। বৃষ্টির পানি শতভাগ নিরাপদ। তাছাড়া অনেকদিন ট্যাংকে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যায়।শ্যামনগরের এই সরকারি পুকুর থেকে পানি নিতে দেড়-দুই কিলোমিটার দূর থেকে নারীরা আসেন।
সাতক্ষীরার সুন্দরবনঘেঁষা উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর। চারদিকে থইথই করছে পানি। কিন্তু খাওয়ার পানির বড়ই অভাব। খাওয়ার পানি আনতে গিয়ে প্রতিদিন দুবারে ৪-৫ ঘণ্টা ব্যয় করতে হয় এ উপকূলের অধিকাংশ বাড়ির নারীদের। তীব্র গরম পড়ার আগেই শ্যামনগরে খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
শ্যামনগরের দাতিনাখালি গ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারী কুমিলা রানী মুন্ডা (৩৩)। খাওয়ার পানি আনতে গিয়ে তিনি হারিয়েছেন শিশুসন্তানকে। কুমিলা কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘কাঁখে কলসি আর ঘাড়ে বাচ্চা নিয়ে যাতি হয় জল আনতি। কষ্টের কুথা বুলে বুঝানো যাবে না। ২০২১ সালের এপ্রিলে বাড়িতে সাবাল (ছেলে) রাখে গেলাম খাবার জল আনতি কলবাড়িতে। পানি নে এসে দেখি, বাড়ির ডোবায় ভাসতে আমার আদরের পলাশ। তখন পলাশের বয়স হইলো দুই বছর। সেখান থেকে জল আনতে গেলি ছোট সাবালটা ঘাড়ে করে নে যাই।’
বৃষ্টির অভাব, বন্যায় এলাকায় লবণ পানি ঢুকে যাওয়া এবং পুকুর, জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় আরডব্লিউএইচ ও পিএসএফ ঠিকভাবে কাজ করছে না।
একই গ্রামের রেবেকা খাতুনও (৩৬) পানি আনতে গিয়ে তাঁর শিশুসন্তানকে হারিয়েছেন। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক বিকেলে তাঁর মেয়ে সালমাসহ (৬) কয়েক শিশুকে খেলতে দেখে তিনি পানি আনতে যান। বাড়িতে ফিরে দেখেন, বাড়ির পুকুরে তাঁর মেয়ে ডুবে মারা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও লবণাক্ততার সমস্যা দূর করতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো তদারকি না করায় খাওয়ার পানির সংকট বাড়ছে দিন দিন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল শ্যামনগর উপজেলার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এ এলাকায় ৪০ শতাংশ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছে। শ্যামনগর আতরজান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের পান করাসহ দৈনন্দিন কাজের জন্য নির্ভর করতে হয় পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষ, চিংড়িঘেরে উঁচু বাঁধ না দেওয়া, নদীপ্রবাহ আটকে দেওয়া, পুকুর ভরাট, খাল বেদখলের কারণে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষগুলো নিরাপদ পানির তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে দিনানিপাত করছে। সাধারণত শীতের মৌসুম থেকে বর্ষা আসার আগপর্যন্ত একটা লম্বা সময় এই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এ উপকূলবাসীর।
শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ১ হাজার ৯৪৯টি গভীর (২৫০ ফুটের ওপরে), ৪৯১টি অগভীর (২৫০ ফুটের নিচে), ৫০০টি এসএসটি (৫০ থেকে ১৫০ ফুট) ও ৪৪১টি ভিএসএসটি (৩০ থেকে ৫০ ফুট) নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি গভীর, ১২৯টি অগভীর, ১৬টি এসএসটি ও ৪৪টি ভিএসএসটি নলকূপ কয়েক বছর ধরে অকেজো পড়ে আছে। উপজেলার রমজাননগর এলাকার বাসিন্দা আমান উল্লাহ বলেন, খাওয়ার পানির জন্য তাঁকে প্রতি মাসে হাজার টাকার কাছাকাছি ব্যয় করতে হয়। রান্নাবান্নার পানি আনতে হয় অনেক দূর থেকে। বাড়িতে নলকূপ বসিয়েছেন; কিন্তু পানি ওঠে না।
গত বুধবার সকালে জয়াখালী মোড়সংলগ্ন আকিজ কোম্পানির তৈরি পানির ফিল্টার থেকে পানি নিতে এসেছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুর্শিদা। সে জানায়, তাদের বাড়ি সাপখালী। জয়াখালী থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। সকাল ৭টার দিকে এলাকার চাচিদের সঙ্গে এখানে পানি নিতে এসেছে সে। তার স্কুল ১০টা থেকে। এখান থেকে গিয়ে স্কুল ধরতে প্রতিদিন তার কষ্ট হয়। তার বাবা দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। প্রতিদিন পানির জন্য এই পথ পাড়ি দিয়ে তাকেই পানি আনতে হয়।
রমজাননগর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আল মামুন জানান, এ অবস্থা শুধু কৈখালী ইউনিয়নে নয়, পার্শ্ববর্তী রমজাননগর, মুন্সিগঞ্জ, ঈশ্বরীপুর, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, আঠুলিয়াসহ গোটা উপকূলে একই অবস্থা।
শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভূগর্ভে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপে পানি কম উঠছে। শুধু দুর্যোগকালে সরকারিভাবে দুর্গতদের মধ্যে খাওয়ার পানি বিতরণ করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, পানির সমস্যা দূরীকরণে শ্যামনগরে জনস্বাস্থ্য বিভাগের পিএসএফ, আরডব্লিউএইচ (রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং), গভীর ও অগভীর নলকূপ, আরও (রিভার্স অসমোসিস), পুকুর, দিঘি, মার (ম্যানেজড একুইফার রিচার্জ) মিলিয়ে প্রায় আট হাজার পানির উৎস রয়েছে। তবে বৃষ্টির অভাব, বন্যায় এলাকায় লবণ পানি ঢুকে যাওয়া এবং পুকুর, জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় আরডব্লিউএইচ ও পিএসএফ ঠিকভাবে কাজ করছে না।
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, কিছু এনজিও পানি সরবরাহের কাজ করলেও জনস্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় না করায় পানি সরবরাহের বিষয়ে কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই।সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় মানুষ এখনো পর্যন্ত খাবার পানিতে বৈষম্যর শিকার। কারণ শহরের চেয়ে গ্রামে এক লিটার পানির মূল্য ৪০ গুণ বেশি। তারপরেও কিনে খেয়ে জীবন বাঁচাতে হচ্ছে উপকূলীয় মানুষের। সে কারণে উপকূলের মানুষ খাবার পানিতে ও বৈষম্যর শিকার হচ্ছে।শ্যামনগরের গোলাখালী সুন্দরবনের কিনারার একটি গ্রাম। দেশ স্বাধীনের আগে এই গ্রামে পানির তেমন অভাব ছিল না। গ্রামের মানুষ পুকুর সংরক্ষণ করতেন এবং সেখান থেকে পানি খেতেন। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় আইলার পর পুকুর সব প্লাবিত হয়ে বিনষ্ট হয়। মো. নূরুজ্জামানের জন্ম সেই গ্রামে, যার পুরো পরিবার তীব্র পানি সংকটের মুখোমুখি আজ। বেসরকারি পর্যায়ে পানিসংকট সমাধানে তারা কাজ করেন, কিন্তু জানালেন উদ্যোগগুলো অপ্রতুল। পানি সমস্যার সমাধান রাষ্ট্রীয় নীতিতে রাজনৈতিকভাবে ঠিক করতে হবে। আশাশুনি ও তালা উপজেলায় কাজ করতে গিয়ে তিনি লবণপানির আগ্রাসনের কারণে গ্রামীণ স্থানান্তরের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ পানির অভাবে প্রতিদিন গ্রাম ছাড়ছে মানুষ। সাতক্ষীরার সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার পানিসংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লিখে চলেছেন। তিনি বলেন, উপকূলের মানুষ লবণপানি খাচ্ছে আর শহরের মানুষেরা সুপেয় পানির নামে বিষ খাচ্ছে। লবণপানির শোধনাগার তৈরি করে উপকূলের গ্রামে সুপেয় পানির সমাধান সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। পাশাপাশি এলাকার উন্মুক্ত সব জলাধার এবং সাতক্ষীরার ২৭টি নদী দখলমুক্ত করে পানিসংকট সমাধান করতে হবে।
উপকূলের পানি ও উন্নয়ন নিয়ে ক্রিটিক্যাল চিন্তাতাত্ত্বিক, সাংবাদিক ও গবেষক গৌরাঙ্গ নন্দী, যিনি নিজেও এক দীর্ঘ পানিসংকট অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছেন। লেখালেখি ও লড়াই জারি রেখেছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি প্রথম খুলনার দাকোপের একটি গ্রামে যান এবং দেখতে পান গ্রামের মানুষ বড় পুকুর থেকে পানি পান করত এবং বড় মাটির মটকায় পানি সংরক্ষণ করত। প্রায় ৪০ বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি জানান, বর্তমানে দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগর বা উপকূলের কোনো গ্রামেই এখন আর বড় পুকুর নেই। মানুষ মটকায় পানি জমিয়ে রাখে না। বর্তমানে সব মানুষকেই এখন পানি কিনে খেতে হয়। কারণ এই এলাকার মাটির তলার পানি ক্রমেই লবণাক্ত হয়ে উঠেছে। উপকূল অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই নোনা অঞ্চল। এখানে পানিসংকট সমাধানের জন্য বহু আগেই থেকেই গ্রামীণ মানুষ পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ করত। সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, এই নোনা অঞ্চলে এই পুকুরটির পানি মিষ্টি ছিল বলে এক সময় এই পুকুর ঘিরে মেলার প্রচলন ঘটে। উপকূলের নদীগুলোর সঙ্গে উজানের নদীপ্রবাহের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ কারণে উপকূলের নদীতে মিষ্টিপানির প্রবাহ আসার সুযোগ নষ্ট হয়েছে এবং একই সঙ্গে লবণাক্ততা বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নোনার পরিমাণ নদীতে বেশি থাকে, অন্য সময় কম থাকে। কিন্তু গ্রামের মাটি, কৃষিজমি, খাল ও গ্রামের ভেতর নোনার পরিমাণ বছরের সবসময় বেশি থাকে। এই অঞ্চলের নোনা ও স্বাদুপানির সংমিশ্রণের যে বৈশিষ্ট্য তার পরিবর্তন ঘটেছে। উপকূলীয় বাঁধ দিয়ে এই বৈশিষ্ট্য নষ্ট করা হয় এবং পরে আবার মাটির এই বাঁধ কেটে নদী-খাল থেকে নোনাপানি গ্রামের ভেতরে চিংড়ি চাষের জন্য ঢুকিয়ে গ্রামের ভেতর লবণাক্ততার তীব্রতা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে নদী-খাল দখল এবং অন্যান্য আরও সমস্যা আছে। গ্রামে গ্রামে পুকুর সংরক্ষণ করার ভেতর দিয়েই কেবল উপকূলের সুপেয় পানিসংকট সমাধান করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে কৃষি, চিংড়ি এবং বসতি সবকিছু জোনিংয়ের আওতায় আনাও জরুরি বলে মনে করেন।
শ্যামনগর পদ্মপুকুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি মেম্বার গাজী আশরাফ হোসেন জানান, তার চাচির তীব্র ডায়রিয়া হয়েছিল পুকুরের দূষিত লবণপানির কারণে। আগের দিনে গ্রামের মেয়েরা পুকুরের পানি এনে চুন মিশিয়ে ছেঁকে খেতেন কিন্তু বর্তমানে পানি এভাবে শোধন করা যাচ্ছে না। পানি উত্তোলন বা শোধনের কাজে সুলভ, স্বল্পমূল্যের এবং নিরাপদ নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি করেছেন এই সাবেক জনপ্রতিনিধি। উপকূলের পানিসংকট সমাধানে সরকার আন্তরিক কি নাÑ এই প্রশ্ন তুলেছেন উপকূলের সাংবাদিক এম কামরুজ্জামান। বিগত রেজিমের একটি কর্মসূচির অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ক্ষোভ নিয়ে তিনি জানান, অনেক প্রতিষ্ঠান উপকূলের পানিসংকটকে দেখিয়ে ফান্ড সংগ্রহ করে এবং জলবায়ু সম্মেলনে পানি-দুর্গত মানুষদের দেখিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে। কোনো ভিক্ষা নয়, ন্যায়বিচার সুরক্ষার দাবি জানান তিনি। সুন্দরবন লাগোয়া গ্রাম শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের দাঁতিনাখালী। গ্রামের বনজীবী নেতা শেফালী বিবি জানান, লবণপানির কারণে মেয়েদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছে এবং অনেক দূর থেকে সুপেয় পানি আনতে হয় বলে মেয়েরা নানা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। অসহনীয় পানি সংকটের কারণে গ্রামীণ পরিবারগুলো খুব অল্পবয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হয়। সরকার ও এনজিওরা বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে কাজ করে। কিন্তু কেন উপকূলের গ্রামে গ্রামে মানুষ বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে এসব কেউ খতিয়ে দেখছে না এবং মূল সমস্যার সমাধান করছে না বলে অভিযোগ করেন শেফালি বিবি। তিনি বলেন, পানিসংকট টিকিয়ে রেখে কোনোভাবেই বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যাবে না। কতটুকু পানির কষ্ট হলে মা-বাবারা নিজের বুকের ধনকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে তা সরকারকে ভাবতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
শ্যামনগরের যুব উন্নয়ন সংগঠক গাজী আল ইমরান জানান, উপকূলের বহু নদী-খাল-জলাশয় বেদখল করেছে বহু প্রভাবশালী মানুষ। এরা রাজনৈতিকভাবে এবং বাণিজ্যিকভাবে ক্ষমতার ভাগাভাগি করেছে। দখল ও দূষিত সব জলাশয় উন্মুক্ত করে সবার জন্য খুলে দিতে হবে। আদি যমুনা নদীর নাম পাল্টে নাম দেওয়া হয়েছিল যমুনা খাল। আইবুড়ি নদীর নাম বদলে আইবুড়ি খাল। যারা এসব করেছেন তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং দখলমুক্ত করতে হবে। সাতক্ষীরার সাংবাদিক আহসান হাবীব জানান, উপকূলের মাটি ও পানিতে লবণের পরিমাণ কত এটি সরকারিভাবে নিয়মিত ফোরকাস্ট করা হয় না। উপকূল অঞ্চলে লবণের পরিমাণ মাত্রা নিয়মিত জানানোর জন্য সরকারি দপ্তরকে কার্যকর করার প্রস্তাব জানান তিনি। সাংবাদিক ও গবেষক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন জানান, সাতক্ষীরার গ্রামে গ্রামে পানির যন্ত্রণা কত তীব্র হতে পারে, যখন আমরা দীর্ঘদিন দেখছি মানুষকে পানির জন্য মিছিল করতে হচ্ছে, সমাবেশ ও চিৎকার করতে হচ্ছে। পানিসম্পদ কিংবা জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেউ সুনির্দিষ্টভাবে উপকূলের পানিসংকট সমাধানে এখনো দৃশ্যমান তৎপরতা দেখায়নি। করপোরেট দৃষ্টিভঙ্গি বা পণ্যকরণের ধারণা থেকে নয়, পানিকে বিনা শর্তে বিনামূল্যে সব জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি তার।
শ্যামনগরের শিক্ষক ও গবেষক রণজিৎ বর্মণ দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, পানি, মৎস্য, ভূমি ও কৃষি বিভাগের ভেতর পাবলিক পানির উৎসগুলো সুরক্ষায় কোনো সমন্বয় নেই। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ছাড়া কোনোভাবেই উপকূলের মানুষের সত্যিকারের সমাধান সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। পানির কষ্ট দূর করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন সাতক্ষীরার সাংবাদিক আসাদুজ্জামান আসাদ। সাতক্ষীরার সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি জানান, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া কোনোভাবেই উপকূলের সুপেয় পানির সমাধান সম্ভব নয়। পানি নিয়ে রাজনীতিবিদরা কেবল ছিনিমিনি খেলবেন আর মানুষ দিনের পর দিন ভুক্তভোগী হতে থাকবে তা আর কত দিন? পানিকে পণ্যকরণের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
তালা উপজেলার পবিত্র মোহন দাস একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। মার্কিন দাতা সংস্থার অর্থায়নে তৈরি একটি পানি প্রকল্পের তিক্ত অভিজ্ঞতা সামনে এনে জানান, ২৪ লাখ টাকা খরচ করে করা সেই পানি প্রকল্প থেকে মানুষ ২৪ কলস পানিও সংগ্রহ করতে পারেনি এবং সেটি এখন বন্ধ আছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি বন্ধ না করতে পারলে কোনোভাবেই পানিসংকটের সমাধান হবে না বলে তিনি জানান। মানবাধিকারকর্মী হেনরি বিশ^াস পানিসংকট সমাধানে উপকূলের গ্রাম থেকে শহর সবার সুপারিশ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান।
সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ জানান, সাতক্ষীরার ২২ লাখ মানুষের ভেতর পানিসংকটের ধরন ও তীব্রতা ভিন্ন ভিন্ন রকমের। আর্সেনিক, আয়রন এবং লবণাক্ততা এই অঞ্চলের পানিসংকটের সঙ্গে জড়িত। সাতক্ষীরায় কতটুকু জমিতে কি পরিমাণে চিংড়ি উৎপাদতি হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান জনসম্মুখে প্রকাশ করার দাবি জানান তিনি। বিভিন্ন দপ্তরের পরিসংখ্যান এবং তথ্যগত ত্রুটি এবং গরমিল থাকার বিষয়টিকে তিনি সামগ্রিক পানিসংকট সমাধানে একটি বাধা হিসেবে দেখেন।
কৃষিপদকপ্রাপ্ত কৃষক মোজাম্মেল হোসেন উপকূলের পানিসংকটের সঙ্গে জড়িত সব কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহি ও বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলে জানান, পানিকে বাজারের বিক্রয়যোগ্য পণ্য করা হচ্ছে, এনজিওরা অনেকে পানি বিক্রি করছে, এটি বন্ধ হওয়া দরকার। রাজনীতিবিদ মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম ফারুক সাতক্ষীরার বেদখল হওয়া খালের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, খাল উন্মুক্ত না করলে শহরের জলাবদ্ধতা দূর হবে না। এ জন্য নাগরিক সমাজের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় হতে হবে। আইনজীবী শেখ আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, পানিসম্পদ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত সরকারি দপ্তরগুলোকে জানালেও তারা জনগণের সামনে আসতে চান না। উপকূলে পানিসংকট সমাধানসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে দ্রুত উপকূল বোর্ড গঠন করে কাজ করার প্রস্তাব করেছেন তিনি।
উপকূল দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ। ১৯টি জেলায় বিস্তৃত এই উপকূল দেশকে ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা করে। বিশে^র বৃহত্তম বাদাবন ও দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতও এখানে। লবণসহিষ্ণু দেশি ধানের জন্মভূমি এই অঞ্চল। নোনাখচি, খেজুরছড়ি, রায়েন্দা, তালমুগুর, দাদখানির মতো দেশি ধানের জাতগুলোই এই অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে উপযোগী ছিল। কিন্তু ষাটের দশকে প্রবর্তিত বৈশ্বিক সবুজ-বিপ্লব প্রকল্প সব দেশিজাত হটিয়ে দিয়েছে। জোয়ার-ভাটার গণিতকে অস্বীকার করে তৈরি উপকূল বাঁধ ও বাণিজ্যিক চিংড়ি, কাঁকড়া ঘের লবণাক্ততার তীব্রতা ও অঞ্চল ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে। এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুক্ত হয়েছে জলবায়ু সংকটের নানা অভিঘাত। নিউলিবারেল ব্যবস্থা আর কাঠামোগত বৈষম্য জিইয়ে রেখেই এই অঞ্চলে পানি সমস্যার নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যার কোনো সুরাহা নেই। পানিসংকটের প্রশ্নহীন ভার বহন করতে হচ্ছে মূলত গ্রামীণ নারী ও শিশুদের। প্রতিদিন মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে। পিপাসার্ত ও ক্ষুধার্ত জীবন ঘের ও লবণপানি বন্দি হয়ে মুক্তির উপায় খুঁজছে। বৈশি^ক জলবায়ু সম্মেলন, জলবায়ু তহবিল, ক্ষয়ক্ষতি ও কার্বন-বিবাদ কোনো কিছুই উপকূলের অন্যায় পানিসংকটের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করছে না। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মীর মুগ্ধের ‘পানি লাগবে পানি’ আমাদের সামনে পানির অনিবার্যতাকে হাজির করেছে। উপকূলের পানি-বৈষম্য নিরসনে সব শ্রেণি-বর্গ-পক্ষের সমন্বয়ে দরকার নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তি।প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে উপকূলীয় এলাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নিরাপদ খাওয়ার পানির সংকট আরও বেড়ে গেছে। চলতি মাসের শুরু থেকে এই সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য চলছে হাহাকার। নারী-পুরুষ ও শিশুরা পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সুপেয় পানি ।