মধুমতি-চিত্রা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-১৩ - ১৬:০৫

নড়াইল প্রতিনিধি : নড়াইলের মধুমতি ও চিত্রা নদীতে ব্যাপক আকারে ভাঙন দেখা দিয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীর ভাঙনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বসতবাড়ি, ফসলি জমি, হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এ কারণে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চিত্রা নদীপাড়ের বাসিন্দা অশোক কুমার বিশ্বাস জানান, নড়াইল সদর উপজেলার হবখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানা প্রাচীরে ভাঙনের কারণে ফাটল দেখা দিয়েছে। একই এলাকায় পাজারখালি মহাশ্মশানের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চিত্রা নদীর ভাঙনে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে হবখালী ইউনিয়নের সুব্দিডাঙ্গা, পাজারখারী, ভান্ডালীপাড়াসহ আশপাশের এলাকার চিত্র।

হবখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আনিসুর রহমান বলেন, হাজারো মানুষের চিকিৎসা সেবার অন্যতম ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি এখন নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষ কার্যকরী ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে।

পাজারখালি মহাশ্মশানের সাবেক সভাপতি সুনিল জানান, পাজারখালি মহাশ্মশানের মূল অবস্থানের বড় অংশ এই চিত্রা নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। নদীতে চলে গেছে শ্মশানে বসার স্থান ও মরদেহ দাহ করার জায়গা। পার্শ্ববর্তী তিন গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই শ্মশানে মরদেহের সৎকার করেন। শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শ্মশান নয়, আশপাশের বহু বসতবাড়িও এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে লোহাগড়া উপজেলার শালনগন, জয়পুর, লোহাগড়া, ইতনা, কোটাকেলসহ কয়েকটি ইউনিয়নে মধুমতি নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাটের মোকাম খ্যাত শালনগর ইউনিয়নের শিয়ারবর হাটের কাছাকাছি ভাঙন আসায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে শত শত পাট ব্যবসায়ীরা।

শিয়ারবর হাটের পাট ব্যবসায়ী হাসান আলী জানান, যুগ যুগ ধরে এ হাটে নদী পথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফরিয়া ব্যবসায়ীরা নৌকা, ট্রলার যোগে বিভিন্ন মোকাম ও মিলে পাট সরবারাহ করে থাকে। ভাঙন রোধ না করলে চরম ক্ষতির মুখে পড়বে এই পাটের মোকামটি।

ছাগলছিড়া গ্রামের নদী ভাঙন তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা নারী ইউপি সদস্য নাজমা বেগম বলেন, নদী ভাঙনের কারণে গত কয়েক বছরে আমি তিনবার আমার বসতবাড়ি সরিয়ে চরম বিপাকে পড়েছি। আমার মতো গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার এই পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছে।

আমডাঙ্গা গ্রামের কৃষক মন্ডল মোল্যা বলেন, আমার জীবদ্দশায় মধুমতি নদী ভাঙনের খেলায় হারিয়েছি আমার স্বজনদের বসতভিটা, মসজিদ, বাপ দাদার কবরস্থান, খেলার মাঠ, প্রাইমারি ও হাইস্কুল। এসব কথা মনে পড়লে আমি খেই হারিয়ে ফেলি।

কোটাকোল ইউপির ঘাঘা গ্রামের কামাল হোসেন জানান, মধুমতি ভাঙনে এলাকাবাসী হারিয়েছে শত শত একর ফসলি জমি, মাছের বাঁওড়, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিশাল জনপদ।

নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, বর্ষা মৌসুমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মহাশ্মশান ও বসতবাড়িসহ স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা বা প্রতিরক্ষামূলক কাজের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে জেলায় নদীভাঙন রোধে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জন্য একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ফিজিবিলিটি স্টাডির প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।