গণতন্ত্র পেয়েছি, তা রক্ষা করাই বড় দায়িত্ব : রাষ্ট্রপতি

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-১৫ - ১৯:৫৫

নিউজ ডেস্ক : মঙ্গলবার বিকেলে সিলেট নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা ও সুধী সমাবেশে রাষ্ট্রপতি বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং তা রক্ষা করাই দেশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেছেন, “গণতন্ত্রের জন্য দেশের মানুষ বারবার সংগ্রাম করেছে। কিন্তু, বিভিন্ন সময়ে সেই পথে বাধা এসেছে। এবার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই অবহেলায় হারানো যাবে না।” মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগর ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা ও সুধী সমাবেশে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, “গত ১৫-১৬ বছর দেশের ইতিহাসে একটি জটিল সময় গেছে। ওই সময়ে গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। সেই ত্যাগের বিনিময়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ এসেছে।”

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা, রক্তপাত ও আমাদের সন্তানদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা একটি ফ্যাসিস্ট সরকারকে সরিয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছি। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি সুযোগ আমরা পেয়েছি।”

তিনি বলেন, “নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। এখন সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব হচ্ছে— ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে আবার জাগিয়ে তোলা এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা।” রাষ্ট্রপতি বলেন, “গণতন্ত্র পেয়েছি। গণতন্ত্রকে রক্ষা করাটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় কাজ, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”

তিনি বলেন, “শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হয়। সংসদকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, সেটিই স্বাভাবিক। তবে, সেই মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।”

মির্জা ফখরুল বলেন, “সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে— গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা; সংসদকে কার্যকর করা, সংসদ যেন ঠিকমতো কাজ করে, সেই চেষ্টা করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে যে দ্বিমত রয়েছে, তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা।”

আগামী দিনের রাজনৈতিক দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, অতীতে তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন। এখন দেশের পুনর্গঠন এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য নতুন লড়াই শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, “আমাদের সামনের লড়াই হচ্ছে— দেশকে পুনর্গঠন করা, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যিকার অর্থে একটি বাসযোগ্য আবাস নির্মাণ করা।”

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, দেশে সরকার ও বিরোধী দল থাকবে। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোতে সবাইকে একমত হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, “আসুন, আমাদের যে সাধারণ বিষয়গুলো আছে, সেই বিষয়গুলোতে আমরা একমত হই। একমত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।” বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “দেশে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। এই সম্প্রীতি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সৌন্দর্য। দেশের অগ্রযাত্রায় এই সম্প্রীতি ও ঐক্য ধরে রাখতে হবে।”

সিলেটের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, তিনি বহুবার সিলেটে এসেছেন। অতীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে সিলেটে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। গণতন্ত্রের আন্দোলনেও সিলেটের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

সিলেটের মানুষের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একদিকে যেমন অতিথিপরায়ণতা ও শান্তিপ্রিয়তা রয়েছে, অন্যদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ঐতিহ্যও রয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য সিলেটের মানুষ অতীতেও অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।”

সিলেটের গুণী ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, সুফি সাধক শাহ আবদুল করিম, হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো বহু কৃতী মানুষের জন্ম ও কর্মের সঙ্গে সিলেটের সম্পর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধেও সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।”

সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, “এ অঞ্চলের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা কাজ করছেন। ইতোমধ্যে বেশকিছু বড় প্রকল্প সামনে এসেছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে।”

রাষ্ট্রপতি বলেন, “নিজেদের অধিকার ও উন্নয়নের জন্য নিজেদেরও উদ্যোগী হতে হবে। কেউ এসে সবকিছু করে দিয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা না করে নিজেদের সামর্থ্য ও ঐক্যকে কাজে লাগাতে হবে।“ তিনি বলেন, “আমরা যদি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে না পারি, আমরা যদি নিজেদের দাবি নিজেরা আদায় করে নিতে না পারি, কেউ এসে আমাদের জন্য করে দিয়ে যাবে না।”

সিলেটের মানুষের সঙ্গে ভবিষ্যতেও থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, “সিলেটের মানুষের সঙ্গে আমি সবসময় ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। ইনশাআল্লাহ, সিলেটের মানুষ বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেবে।” অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউছ, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, পেশাজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।