মরার উপর খাড়ার ঘা, উপকূলে তীব্র শীতের মধ্যে মারাত্মক খাবার পানি সংকট

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২০ - ০৭:২৯

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ‌ : মরার উপর খাড়ার ঘা ‌। সাতক্ষীরার উপকূলে বর্তমান বইছে শীতের মারাত্মক তীব্র, তার মধ্য দেখা দিয়েছে খাবার পানির ব্যাপক সংকট। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় এত শীতের মধ্যেও এক কলস খাবার পানির জন্য নারী ও শিশুরা ছুটে বেড়াচ্ছে মাইলকে মাইল। পুকুরে যে সমস্ত বিএসএফ ছিল সেগুলো অধিকাংশই নষ্ট। এছাড়া সরকারিভাবে যে সমস্ত প্লাস্টক ড্রাম বিতরণ করা হয়েছিল দীর্ঘদিন বর্ষা না হওয়ায় সেগুলোও খালি হয়ে গেছে। সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলায় রয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন পাঁচটি পানির প্লান সেখান থেকে ৩০ পয়সা লিটারে প্রতিদিন পানি কিনতে হয় কিন্তু সাপ্লাই এর অধিক চাহিদা থাকায় সেখান থেকেও খাবার পানি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। সে কারণে উপজেলায় মারাত্মক খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। উপকূলীয় ‌অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল শুরুর আগেই সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। দিন দিন এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। উপকূলীয় নারীদের দীর্ঘ পথ হেঁটে গিয়ে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিহীনতার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আস্তে আস্তে নেমে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকার বেশিরভাগ অগভীর ও গভীর নলকূপে পানি পাওয়া যাচ্ছে খুবই কম। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক পানির আধারগুলোর অধিকাংশ শুকিয়ে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে।
স্থানীয়রা জানান, সুপেয় পানির সংকট রয়েছে শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের কম-বেশি প্রয় সব গ্রামেই। এক কলসি পানি সংগ্রহের জন্য নারীদের লম্বা পথ হাঁটতে হয়। ঘরের বিভিন্ন কাজ শেষ করে তারা ছোটেন পানি সংগ্রহের জন্য। উপকূলের অসংখ্য মানুষ সুপেয় পানির জন্য যেন যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। কোনো পরিবার পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) থেকে আবার কোনো পরিবার বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করছে নিজস্ব রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্লান্ট থেকে। যারা এসব উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারছেন না তাদের কম লবণযুক্ত পানি বা মানসম্মত না এমন পিএসএফ থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
উপকূলের শ্যামনগরে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানান বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম প্লান্ট বা পানির ট্যাংক বিতরণ করা হচ্ছে সরকারিভাবে। কিন্তু সাড়ে ৩ হাজার লিটারের এসব পানির ট্যাংকের পানি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আর পন্ড স্যান্ড ফিল্টার বা পুকুর ফিল্টার মূলত পুকুরের পানির ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে অনেক পুকুরেই পানি থাকে না। এ জন্য পিএসএফ অনেক সময়েই বন্ধ থাকে।
তারা ‌শ্যামনগরে চার লাখের বেশি মানুষের বসবাস। এখানে সুপেয় পানির সংকট সমাধানে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১২টি ইউপিতে সরকারিভাবে স্থাপনকৃত পিএসএফের সংখ্যা ২৫০ ও বেসরকারিভাবে ৫০০টির মতো। সরকারিভাবে স্থাপনকৃত গভীর নলকূপ আছে সাড়ে ৪ হাজার ও বেসরকারিভাবে আছে ২ হাজার। অগভীর নলকূপের সংখ্যা ৫০টির মতো। রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্লান্ট পরিবার পিছু সরকারিভাবে রয়েছে ৭ হাজার এবং বেসরকারিভাবে রয়েছে আড়াই হাজারের মতো। কমিউনিটি নলকূপ সরকারিভাবে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি ও বেসরকারিভাবে ২৫টি। রিভার্স অসমোসিস প্লান্ট সরকারিভাবে রয়েছে ৫টি ও বেসরকারিভাবে ১০০টির মতো।
শ্যামনগরের হাটছোলা গ্রামের গৃহবধূ অর্পণা রানী ও কুলসুম বেগম বলেন, সকালে ঘরের সব কাজ শেষ করে বিকালে সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্য ফ্রি করে রাখতে হয়। এরপর পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ হেঁটে পিএসএফে যেতে হয়। সেখানে আবার দীর্ঘ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ভেটখালী গ্রামের বাসিন্দা রানী গাইন বলেন, সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্য বাড়ি থেকে লম্বা পথ হেঁটে এসে আমাদের পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পানখালী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মনজিলা বেগম ও আসমা বেগম বলেন, সরকারিভাবে তৈরি আশ্রয়ণ প্রকল্পে বাস করি। এখানে সুপেয় পানির সমস্যা রয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা সদরের বাসিন্দা গৃহিণী শর্মিষ্ঠা রানী বলেন, বছরের প্রায় ১২ মাসই সুপেয় পানি ও রান্নার পানি কিনে খেতে হয়। মুন্সিগঞ্জ জেলেখালী গ্রামের বাসিন্দা রঞ্জন পরামান্য, ধানখালী গ্রামের বাসিন্দা খোকন বৈদ্য ও আটুলিয়ার বাসিন্দা বিশাখা রানী বলেন, সুপেয় পানির সংকট শুষ্ক মৌসুমে প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে পানির ড্রাম কিনতে হয়। এক ড্রাম পানির মূল্য ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ড্রামে পানি থাকে ৩০ থেকে ৪০ লিটারের মতো।
দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার নজরুল গাজী ও রমজাননগরের ফজলু বলেন, শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এর প্রভাবে সুপেয় পানির উৎস অনেকাংশে নষ্ট হয়। এ ছাড়া উপজেলায় লবণাক্ততার প্রকোপও বেশি। উপজেলায় শুষ্ক মৌসুমে শুধু খাওয়ার পানির নয়, ব্যবহারের পানিরও সংকট দেখা দেয়। বিভিন্ন ইউনিয়নে চারদিকে শুধু পানি আর পানি থাকলেও সেগুলো লবণ পানি, ব্যবহারযোগ্য পানি নয়। লবণ পানির চিংড়ি ঘেরের কারণে পার্শ্ববতী মিঠা পানির পুকুর বা জলাশয়ের পানিও লবণাক্ত হয়ে যায়। এর ফলে সেই পানিও পানযোগ্য বা ব্যবহারযোগ্য থাকে না। এ ছাড়া গ্রীষ্মের শুরুতেই বৃষ্টিহীনতার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আস্তে আস্তে নেমে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকার বেশিরভাগ গভীর ও অগভীর নলকূপে পানি কম ওঠে। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে শেষ ভরসা পুকুরের পানি। কিন্তু সেই পানিও নিরাপদ নয়। সুপেয় পানির অভাবে অনেক পরিবারের সদস্যই চর্মরোগ, আমাশয়, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার নারী সংগঠন নকশীকাঁথার পরিচালক চন্দ্রিকা ব্যানার্জি জানান, তিনি নিজেও সুপেয় পানি কিনে থাকেন। গরমের সময়ে গোসলের পানিও কিনতে হয়। উপজেলার অনেক এলাকায় নারীরা কোলের শিশু নিয়েও পানি সংগ্রহ করেন পিএসএফ থেকে।
বেসরকারি একটি সংগঠন পানি সংকট সমাধানে তাদের উপকারভোগীদের এটিএম কার্ড করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে এক কলসি করে পানি সংগ্রহ করতে পারেন তাদের ভ্রাম্যমাণ পানি বিতরণের ট্যাংক গাড়ি থেকে। কিন্তু এটি হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি গ্রামে প্রতিদিন পানি সরবরাহ করে।উপকূলে মানুষের দৈনিক খাবার জন্য যে পরিমাণ পানি প্রয়োজন তা নেই। খাওয়ার পানির চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন বৃহৎ আকারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা। কিন্তু সেটাও নেই উপকূল অঞ্চলে। তাই খাওয়ার পানির অভাবে দিন কাটাচ্ছে উপকূলের কোটি মানুষ। মিঠা পানির অভাবে গৃহপালিত পশু লালন-পালনও ছেড়ে দিচ্ছেন উপকূলবাসী। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে সরকারি পর্যায়ে বৃহৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি তাদের।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলায় গিয়ে দেখা যায় বিভিন্ন ইউনিয়নে খাওয়ার পানির তীব্র সংকট। এই এলাকায় এক সময় চিংড়ি চাষের জন্য লবণাক্ত পানি আনা হয় সমুদ্র থেকে। সেই পানিই এখন এলাকার মানুষের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আর খাওয়ার পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু পুকুর আছে যেখানে মিঠা পানি রয়েছে। সেখান থেকে মানুষ গিয়ে পানি কিনে আনে, তাও চড়া মূল্যে।
শ্যামনগর উপজেলায় ইউনিয়ন আছে ১২টি। এই ইউনিয়নগুলোতে সরকারি হিসেব মতে ৩ লাখ ১৮ হাজার ২৫৪ জন বসবাস করেন (২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী)। এই এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৭৫টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৮ হাজার ৫৭০ জন। প্রাইমারি স্কুল রয়েছে ১৮৯টি ও মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে ৪৩টি। মাদ্রাসা আছে ৩৬ ও কলেজ ৭টি।
পানির সংকট নিরসনে নিজস্ব ব্যবস্থায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করছেন স্থানীয়রা। এর সঙ্গে বিভিন্ন সাহায্য সংস্থাও সহযোগিতা করছেন স্থানীয়দের। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে সুপেয় পানি খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে বিভিন্ন এনজিও। তাদের সহযোগিতায় বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ব্যক্তি পর্যায়ে ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেলেও সরকারি পর্যায়ে তেমন হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জের ত্রিপানি বিদ্যাপীঠে যায়যায়দিনের পক্ষ থেকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় স্কুলটিতে ১০ হাজার লিটারের দুটি ট্যাঙ্ক বসানো হয়েছে। এই ট্যাঙ্কগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু এই পানি সংরক্ষণ করার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় খাওয়ার উপযোগী করা হয়। এমন ৪২টি স্কুলে সাহায্য সংস্থা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
স্কুলটির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়ন্ত মন্ডল বলেন, ‘একটা সময় আমাদের পানি বাসা থেকে নিয়ে আসতে হতো। কারণ আমাদের এই চারপাশে কোনো সুপেয় পানি নেই। এমনকি আমাদের স্কুলের আশপাশে ওয়াশরুমে যাওয়ার পর লবণ পানি ব্যবহার করতে হতো। কিন্তু এই পানির ব্যবস্থা হওয়ার পর আমাদের আর সমস্যা হয় না। স্কুল খোলা থাকাকালীন আমরা এই পানি ব্যবহার করি।’
এ সময় কথা হয় অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহুয়া আক্তার, ইসরাত জাহান ও নওমি লিয়ার সঙ্গে। এই তিন শিক্ষার্থী তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, এতদূর থেকে খাবার পানি ও বিভিন্ন ব্যবহারের পানি নিয়ে আসাটা অনেক কষ্টসাধ্য ছিল। বয়সন্ধিকালে বেশিরভাগ ছাত্রীরাই স্কুলে আসা বন্ধ করে দিতেন। কিন্তু বৃষ্টির পানির এই ব্যবস্থা হওয়ার পর সমস্যার সমাধান হয়েছে। এখন আর শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসা বন্ধ করেন না।
ত্রিপানি বিদ্যাপীঠের প্রধনা শিক্ষক আবুল কালাম মলিস্নক যায়যায়দিনকে বলেন, এই এলাকার প্রধান সমস্যা সুপেয় পানি ও ব্যবহার্য পানি। পানি সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে ভূগছে উপকূলের মানুষ। স্কুল-কলেজ তথা এই এলাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পানির জন্য। শিক্ষার্থী আসাও কমে যাচ্ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তবে বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা ও সরকারের ছোট ছোট উদ্যোগে এই সমস্যা কাটিয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, ‘ওয়াটার এইড আমাদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখানে একটি ভালোমানের টয়লেট তৈরি করে দিয়েছে তারা। আর খাবার পানির জন্য একটি আলাদা স্থান তৈরি করে দিয়েছে। এখন আর বাচ্চাদের কোনো সমস্যা হয় না। এখন স্কুল বন্ধ তাই আমাদের ধরে রাখা পানি ব্যবহার হচ্ছে কম। স্কুল খুলে গেলে যে পানি আমরা ধরে রাখব তাতে প্রতিষ্ঠানের সবার হয়ে আরও উদ্বৃত্ত থাকবে।’
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী সাত নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর মোহম্মদ ফজলুল হক বলেন, ‘এলাকায় পানির খুবই অভাব চলছে। এলাকার মানুষের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ওয়াটার এইড বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিছু মানুষ উপকার পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানো সবার জন্য পানির ব্যবস্থা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বার বার উপজেলায় বলছি। আকাশের পানি ধরে আমরা খাচ্ছি। পানি ধরে রাখা তারপর সেটাকে খাওয়ার উপযোগী করা খুব কঠিন নয়। কিন্তু সবার জন্য একই স্থানে এমন বড় কাজ করা সম্ভব না। তাই সরকারকেই বড় একটি প্রকল্প নিতে হবে। প্রয়োজনে আমি নিজের জমি সরকারকে দিয়ে দিব। তবুও আমাদের মিঠা পানির সমস্যা মিটুক।’
এদিকে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করে ওয়াটার এইড। এই সংস্থাটি শ্যামনগর এলাকায় স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা তৈরি করে দিয়েছে। তাদের মূল উদ্দেশ সাধারণ মানুষ যাতে স্বাস্থ্যসম্মত পানি ব্যবহার করতে পারে ও পান করতে পারে তা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের সঙ্গে মিলে তারা উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের সেবায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা তৈরি করে দিচ্ছে।
ওয়াটার এইডের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসিয়াল ইঞ্জিনিয়ার রেবিন চাকমা যায়যায়দিনকে বলেন, উপকূলবাসীর জীবনমান উন্নয়নে সবার আগে চিন্তা করতে হবে সরকারকেই। আর তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া পানি। ব্যবহার্য ও সুপেয় পানি যতক্ষণ নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন সম্ভব না। ওয়াটার এইড বাসায় বাসায় বা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে সচেতন করছে কিন্তু এত বড় জনগোষ্ঠীকে মিঠা পানির আওতায় আনতে পারবে একমাত্র সরকার।
তিনি আরও বলেন, ‘উপকূলবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য সেন্ট্রাল পানি সরবরাহ ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা থাকবে। সেখান থেকে পানি সরবরাহ করা হবে। এটি করতে দুটি বিষয় সামনে আসবে, অর্থায়ন ও জমি অধিগ্রহণ। দুটি বিষয় চাইলেই সরকার সমাধান করতে পারে। সরকার যদি চায় তাহলে এটা সম্ভব। কারণ তাদের লোকবল আছে। তবে বড় সমস্যা সদিচ্ছা। যদি সদিচ্ছা না থাকে তাহেল মানুষকে সুপেয় পানি দেওয়া সম্ভব না। উপকূলীয় মানুষকে যদি আমরা পানির আওতায় আনতে চাই তাহলে অবশ্যই সেন্ট্রাল পানি সরবরাহ ব্যবস্থা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াটার এইড এডভোকেসি করছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা কাজ করছি ও সফলতা পেয়েছি। ব্যক্তি পর্যায়ে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং হচ্ছে। কিন্তু এত বড় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বড় আকারে কাজ করা দরকার। আরও বড় প্রকল্প নেওয়া দরকার। যা সরকার চাইলে যেকোনো সময় হতে পারে।’
রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের বিষয়ে যায়যায়দিনের সঙ্গে কথা বলেন খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুলস্নাহ। তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং খুবই জরুরি। এই অঞ্চলগুলোতে গভীর নলকূপ করে খাওয়ার যোগ পানি পাওয়া যায় না। তাই বৃষ্টির পানিই একমাত্র উৎস। তবে এটি করতে বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে। কত মানুষ ঐ এলাকায় বসবাস করে? কতটুকু পানি লাগবে প্রতি বছর? কত প্রতিষ্ঠান আছে? কতটুকু জায়গা লাগবে? কীভাবে পানি সরবরাহ হবে? ইত্যাদি।
তিনি আরও বলেন, এখানে দুটি প্রক্রিয়ায় হতে পারে। একটি ইউনিয়ন ভিত্তিতে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং অপরটি সেন্ট্রাল রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং। প্রথমটি করতে খরচ কম হবে। কিন্তু সমস্যাও আছে। বড় ধরনের ঝড় আসলে এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর সেন্ট্রাল রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং করতে বড় প্রকল্প নিতে হবে। বিশাল স্থান নিয়ে এটি হবে। এটা বড় দুর্যোগ আসলেও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটা মাথায় রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
খুলনা ওয়াসার এমডি বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজ হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পানি সরবরাহ করা। এত বড় প্রকল্প তাদের দ্বারা সম্ভব কি না তা আগে দেখতে হবে। চাইলো লোকবল বৃদ্ধি করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। বড় প্রকল্প নিলে খরচ বেশি হবে তবে দীর্ঘদিন মানুষ এই প্রকল্পের সুফল ভোগ করবে।
সাতক্ষীরা জেলার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরীফুল ইসলাম বলেন, এই অঞ্চলে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের জন্য কোনো ধরনের সেন্ট্রাল প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এখানে মহলস্না বা পাড়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তর কিছু কিছু কাজ করেছে। এসব কাজ খুবই ছোট। ক্লাস্টার বেইজ এসব কাজ হয়েছে। কিন্তু পানি সংকট কাটাতে হবে অবশ্যই সমন্বিত মেগা প্রকল্প নিতে হবে। যা এখনো কেউ নেয়নি।
তিনি আরও বলেন, কোনো কাজই উপকূলের মানুষের জন্য হচ্ছে না। তাদের নিয়ে কোনো চিন্তাও নেই। সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে এভাবে লবণ পানি বাড়তে থাকলে। উপজেলায় মানুষ বসবাস করা কঠিন হয়ে যাবে একসময়। মিঠা পানির দ্রম্নত ব্যবস্থা করতে না পারলে এক সময় পরিত্যক্ত জমিতে পরণিত হবে উপকূলীয় অঞ্চল।
সাতক্ষীরা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহম্মদ আব্দুল বাছেক যায়যায়দিনকে বলেন, পানির সংকট সবচেয়ে বেশি হয় সাতক্ষীরার বেশ কয়েকটি উপজেলায়। এই এলাকায় পানির সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সরকারের একেক দপ্তর একেক প্রকল্প করলে সমস্যা সমাধান সম্ভব না। পানির সমস্যা সমাধানে ওয়াটার এইড ও বিভিন্ন এনজিওসহ সরকারের সব দপ্তরকে একত্রিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি পাড়া বা মহলস্নার জন্য পানি সমস্যা সমাধান করলে হবে না। একটি সেন্ট্রাল পানি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। বিশেষ করে মিঠা পানি সমস্যা সমাধান প্রয়োজন। তাই মেগা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।
সিটি করপোরেশনগুলোর বাইরে মানুষের কাছে পানি পৌঁছে দেওয়ার কাজটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের। এই দপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পরিকল্পনা তুষার মোহন সাধু খাঁ। উপকূল অঞ্চলে মিঠা পানির জন্য কোনো ধরনের সেন্ট্রাল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে কি না প্রশ্ন করা হলে উত্তর না দিয়ে ফোন রেখে দেন। বলেন, একটি মিটিংয়ে আছি। যদিও তিনি পরিকল্পনা বিভাগের দায়িত্বে আছেন। তিনি এটিও স্বীকার করেন উপকূলের জনগোষ্ঠী মিঠা পানির সংকটে আছে।সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সুপেয় পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই সংকট ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। প্রায় সব এলাকায় পানি না পেয়ে মানুষ এখন গভীর নলকূপ ব্যবহার করে আর্সেনিক ও ক্ষতিকর নানা উপাদান মিশ্রিত সোনালি রঙের পানি পান করছে। অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহার ক্রমশ ছড়াচ্ছে রোগবালাই। পানি ছাড়া যেখানে জীবন অচল, সেখানে রোগবালাই থেকে বাঁচার জন্য নিম্মআয়ের মানুষকেও বাধ্য হয়ে পানি কিনে পান করতে হচ্ছে। এতে দিন দিন বাড়ছে পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ।
সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সাতক্ষীরা সদরসহ উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সুপেয় পানির সংকট। ফলে জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনে পানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, নদীর নাব্য হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, মাটি-পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধিসহ মানুষ সৃষ্ট কারণে এ সংকট দেখা দিয়েছে। যা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই সংকট উত্তরণে বাধা হিসেবে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, দুর্বল নীতি বাস্তবায়ন এবং মনিটরিং, অপ্রতুল বরাদ্দ, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি এবং জনঅংশগ্রহণের অভাব। অবিলম্বে এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে জনগণের জন্য সুপেয় পানি পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
আরো দেখা গেছে, বেড়িবাঁধ দুর্বল হওয়ার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে লবণপানি ঢুকে চাষযোগ্য জমি ও সুপেয় পানির আধারগুলো নষ্ট হচ্ছে। চারদিকে শুধু লবণপানি, কিন্তু খাবারের পানি নেই। খাবার পানি সংগ্রহ করার জন্য একজন নারীকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। তাও আবার অপরিশোধিত পুকুরের পানি। গভীর নলকূপগুলো পড়ে আছে নষ্ট হয়ে। যেগুলো সচল সেগুলোর পানিও পানের উপযুক্ত নয়। সুপেয় বা ব্যবহারের উপযুক্ত পানি মানুষের অধিকার। কিন্তু সুপেয় পানির অভাবে মানুষ পুকুর ও গভীর নলকূপের অপরিশোধিত দূষিত পানি পান করে নানাবিধ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। পানি সংগ্রহ করতে তাদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়।
সাতক্ষীরার বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন করলেও পানির অধিকার নিশ্চিত হয়নি। উপকূলে এই সংকট সমাধানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা যথেষ্ট নয়। সাতক্ষীরার যুব, নারী, পুরুষসহ পানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলেন, সুপেয় পানি সর্বজনীন, ন্যায্য ও টেকসই প্রবেশ নিশ্চিত করতে সরকারি বরাদ্দ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বন্ধ করা, এলাকাভিত্তিক বড় বড় পুকুর-খাল-জলাশয় খনন করে তাতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা এবং খাসজমিতে মিঠা পানির আধার তৈরি করার দাবি জানাচ্ছি সরকারের কাছে।
সাতক্ষীরা জেলা জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের সভাপতি ও শিক্ষাবিদ আব্দুল হামিদ বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে সাগরের তলদেশ ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সাগরের লবণাক্ত পানি উপকূলীয় এলাকার জনগোষ্ঠীর পানির অধিকার ক্ষুণ্ন করছে এবং মানুষের জীবন ও জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সুপেয় পানির সংকটের কারণে উপকূলের মানুষ নানা সমস্যায় পড়ছেন। কৃষি উৎপাদন, গবাদিপশু পালন, খাবার পানি, রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে অনেকেই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। নারীদের ক্ষেত্রে খিঁচুনি, জরায়ুর সমস্যাসহ গর্ভবতী নারীদের বিবিধ ঝুঁকি বাড়ছে। দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত শ্রমঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে, আবার নিপীড়নের শিকারও হচ্ছেন অনেকেই।
তিনি আরো বলেন, দেশের ৯৮-৯৯ শতাংশ মানুষ সাধারণভাবে পানির সুবিধা পেলেও গুণগত মানসম্পন্ন নিরাপদ পানি এখনো সবার জন্য নিশ্চিত করা যায়নি। পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে- এটা একটা বড় সমস্যা। পানি শোধনাগার যা আছে, তাও যথেষ্ট নয়। তবে আশার কথা হলো, সরকার এসডিজি লক্ষ্য পূরণের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা বাড়াতে প্রতি অর্থবছরে বাজেট অনেক বাড়ানো হচ্ছে। এসব খবর আমাদের আশাবাদী করে তোলে। বাস্তবিক অর্থেই পানিসংকট এখন সবার জন্য লাল সংকেত। এই কথাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে সরকারকে।
সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও ফোরামের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এরই মধ্যে সাতক্ষীরায় বিশুদ্ধ খাবার পানির দুষ্প্রাপ্যতা তৈরি হয়েছে। পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় খাবার পানির সংকটে ভুগছে এখানের বাসিন্দারা। গ্রামের সবচেয়ে দরিদ্র লোকটাকেও টাকা দিয়ে লিটার দরে পানি কিনে খেতে হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নেমে যাচ্ছে। দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ নিরাপদ ও সুপেয় পানির আওতার বাইরে।
এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার দেশের অনেক এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি থাকা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হচ্ছে। সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলসহ জেলার সর্বত্রই।
তিনি আরো বলেন, প্রাকৃতিক জলাধারের ওপর অত্যাচার তথা দখল, ভরাট ও গতিপথ পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে পানিচক্রের ভারসাম্য ও ন্যায্যতা নষ্ট হয়। পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাই নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে জলাধার রক্ষার পাশাপাশি পরিত্যক্ত পুকুর খনন বা পুনঃখনন করতে হবে। পুকুরভিত্তিক পানি শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে। প্রতি বছর পানিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ও দূষিত পানি পানের কারণে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পাশাপাশি পানিতে আর্সেনিক একটি বড় সমস্যা। আবার শহরে পাইপলাইনের মাধ্যমে যে পানি সরবরাহ করা হয় সেখানে ৮০ শতাংশই ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া যুক্ত। পুকুরের পানিতেও এ ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কিছু অঞ্চলের টিউবওয়েলের পানিতে ক্ষতিকর অণুজীবের অস্তিত্ব মিলেছে। মাটির নিচে ক্রমেই কমছে সুপেয় পানির আবাস। একমাত্র ভরসা এখন পুকুর। সেখান থেকে প্রতিদিন এমন লাইন ধরে খাবার পানি সংগ্রহ করেন এলাকাবাসী। এসব সংকট সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরুর আহ্বান সংশ্লিষ্টদের।
সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর মাধ্যমে আমাদের উপকূলীয় তিনটি উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালিগঞ্জে নিরাপদ পানি সরবরাহের জন্য ৫০ কোটি টাকার একটা প্রকল্প সরকার গ্রহণ করেছে। আমি আশাকরি এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করতে পারব।
বড় বড় পুকুর-খাল-জলাশয় খনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা এবং খাসজমিতে মিঠা পানির আধার তৈরি সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে জেলা পরিষদ কিছু কাজ করেছে। আমরাও বড় বড় পুকুর-খাল-জলাশয় ডোবা পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যে এ সংকট কেটে যাবে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সুপেয় পানির আধার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুপেয় পানির আধার এখন ধুঁকছে। লবণাক্ততার প্রভাব পড়েছে পুরো উপকূলজুড়ে। সুপেয় পানির সংকটে ভুগছে উপকূলের শিশুসহ সব বয়সের মানুষ। লবণাক্ততা ফসল উত্পাদনেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। পানির প্রবাহজনিত ভারসাম্যতার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের দিকে চলে আসে। ফলে জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানি বৃদ্ধির কারণে লোনাপানি স্থলভাগে প্রবেশ করে। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে লবণাক্ততাও বাড়বে। সন্দেহ নেই, কম বৃষ্টির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব আরো বেশি মাত্রায় প্রভাব ফেলবে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা জেলায় লবণাক্ততার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এক এলাকার লবণাক্ততা আশপাশের অন্য এলাকায় মাটির ওপরও প্রভাব বিস্তার করছে।এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেসরকারিভাবে স্থাপনকৃত রিভার্স অসমোসিস প্লান্টগুলো মনিটরিং করা প্রয়োজন। এসব প্লান্টে ব্যবহৃত কার্বন ফিল্টার ছয় মাস পরপর পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আর মেমব্রেনগুলো দুই বছর পর পরিবর্তন করা দরকার। বেসরকারিভাবে নির্মিত প্লান্টগুলো নিয়ম মেনে চলে কি না সেই তথ্য তার কাছে নেই বলেও জানান তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিসেস আফরোজা আক্তার এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে জলোচ্ছ্বাস ও বেড়িবাঁধ ওভারফ্লো হয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে লোকালয়ে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সময়মতো টিউবওয়েলে পানি পাওয়া যায় না। এরকম একটা সংকট আমাদের এখানে রয়েছে। এটা কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকার যথেষ্ট আন্তরিক এবং ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে।তিনি বলেন, আমাদের রেইন ওয়াটার হারভেস্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পট এবং তিন চার হাজার লিটার পানির পাত্র, বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।