খুলনায় বিরল রোগ লেপটোস্পাইরোসিসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান

নিজস্ব প্রতিবেদক: খুলনায় লেপটোস্পাইরোসিস নামের বিরল রোগে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে । সম্প্রতি এই রোগে আক্রান্ত হন খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরিদ আহমেদ। কিন্তু সময় মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নেয়ায় তিনি এখন অনেকটা সুস্থ।

নিজ বাসায় চিকিৎসারত অবস্থায় অ্যাডভোকেট ফরিদ আহমেদ খুলনা গেজেটকে জানিয়েছেন, গত ৩০ ডিসেম্বর জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ধীরে ধীরে জ্বরের তীব্রতা বৃদ্ধি ও শরীরে অস্বাভাবিক নানা লক্ষণ দেখা দেয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে বেসরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হলে খুলনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট পার্থ ঘোষের পরামর্শে ওই হাসাপাতালে ভর্তি হন। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষায় তাঁর শরীরে লেপটোস্পাইরোসিস নামের বিরল এই রোগে সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টি চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন। পরে ওই ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়ে ১২ জানুয়ারিতে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়ে আবারও বাসায় অবস্থান করছেন অ্যাডভোকেট ফরিদ আহমেদ। তিনি এখন অনেকটা সুস্থ।

এ ব্যাপারে খুলনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিষেশজ্ঞ পার্থ ঘোষ মুঠোফোনে খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘ওই ব্যক্তির শরীরে লেপটোস্পাইরোসিস নামক ব্যাকটেরিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সেভাবেই তাকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়েছে। এ ব্যাকটেরিয়া থেকে মুক্ত পাওয়ার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ঔষুধ যথেষ্ট। এটি নিয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এ রোগে আক্রান্ত হলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলেই সুস্থ্ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।’

জানতে চাইলে খুলনা সিভিল সার্জন নিয়াজ মোহাম্মদ খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘কয়েকদিন হল খুলনাতে যোগদান করেছেন তিনি। তবে এই রোগে আক্রান্ত ওই ব্যক্তিকে তিনি হাসপাতালে দেখতে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শও দেন। তিনি আরও বলেন, সবেমাত্র যোগদান করার কারণে এর আগে আর কেউ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা-তাঁর জানা নেই।’

২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশে লেপটোস্পাইরোসিস রোগ সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইঁদুর এবং অন্যান্য কিছু গবাদি পশুর মূত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া এই রোগে বহু মানুষ আক্রান্ত হবার তথ্য মিলেছে।

তখন সারাদেশে চিকিৎসকদেরকে এই রোগটির অস্তিত্বের ব্যাপারে সচেতন করার কথা জানায় বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট বা আইইডিসিআর। যদিও এর আগে বাংলাদেশে এই রোগের খুব একটা প্রাদুর্ভাবের খবর ছিল না।

রোগটি নিয়ে আইইডিসিআরের তৎকালীন প্রধান ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘জ্বরের রোগী তো সবসময়ই থাকে। এ ধরনের রোগীদের বিষয়ে আমরা অন্য অনেক রোগের কথা ভাবি। কিন্তু লেপটোস্পাইরোসিসকেও এখন চিন্তায় আনতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “কোন এলাকায় জ্বরে আক্রান্ত রোগীর ১২ শতাংশ এ নতুন রোগে আক্রান্ত হওযার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সারাদেশে দশটি এলাকায় অন্তত সাত শতাংশ জ্বরে আক্রান্ত রোগীর এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে।’

মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘রোগটা মূলত ইঁদুরের রোগ। তবে গরু, ছাগল ও ভেড়ার মাধ্যমেও হতে পারে। মূলত: এসব প্রাণীর মূত্র থেকে এ রোগ ছড়ায়। এ রোগে মৃত্যুর হার ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। কারণ কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে আক্রান্ত হতে পারে।’

নরসিংদীসহ ঢাকার আশেপাশের এলাকায় গবেষণায় এ ধরনের রোগী পাওয়া যায় তখন। যদিও এ রোগের চিকিৎসা রয়েছে এবং যথাযথ ঔষধ সেবনে এ রোগ ভালো হয় বলে জানান ড. মাহমুদুর রহমান।

বিশেষজ্ঞদের মতে লেপটোস্পাইরোসিস হল এক প্রকার সংক্রমণ যা লেপটোস্পাইরা নামক একটি স্পাইরাল আকৃতির ব্যাকটেরিয়াম (স্পাইরোচেট)-এর দ্বারা হয়। এই সংক্রমণের ফলে বিভিন্ন প্রকৃতির বহু উপসর্গ দেখতে পাওয়া যায়, যা অন্যান্য সংক্রমণের উপসর্গগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্য বহন করে। সুতরাং এই রোগের নিশ্চিত নির্ণয়করণের জন্য মূত্র বা রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য জটিলতাগুলো হল কিডনির ক্ষতি, শ্বাসের সমস্যা, লিভার ফেলিওর এবং মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের রক্ষাকারী আবরণ মেনিনজেস-এর ফুলে যাওয়া)।

লেপটোম্পাইরোসিস রোগে সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখতে পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে ; জ্বর, গায়ে কাঁটা দেওয়া, মাথা যন্ত্রণা, বমি, জন্ডিস, রক্তবর্ণ চোখ, পেশীর ব্যথা, ফুসকুড়ি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া ও পেটখারাপ।

ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশের মধ্যে দুই দিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবধান থাকতে পারে, যে সময়ে প্রাথমিক উপসর্গ থাকে জ¦র। লেপটোস্পাইরোসিসের দু’টি লক্ষ্যণীয় পর্ব দেখা যায়। প্রথম পর্বে জ¦র, মাথা যন্ত্রণা, বমি ও পেশীর যন্ত্রণা থাকে। আর দ্বিতীয় পর্বে মেনিনজাইটিসের পাশাপাশি কিডনি বা লিভারের ক্ষতি, আইরিস-ফুলে যাওয়া বা প্রদাহ বা স্নায়ুরোগ। অন্তঃস্বত্তাদের জন্য লেপটোম্পাইরোসিস মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, এর ফলে গর্ভপাতেরও সম্ভাবনা থাকে।

এর প্রধান কারণ কি?
আক্রান্ত পশুর মূত্র থেকে এর সংক্রমণ ঘটে। কুকুর, গবাদি পশু, ঘোড়া, বেড়াল ও অন্যান্য গৃহপালিত পশুর মূত্রে এই রোগের ব্যাকটেরিয়াম পাওয়া যায়। এমনকি ইঁদুরদের মধ্যেও লেপটোস্পাইরা থাকে। এই মূত্রের সঙ্গে যেকোন প্রকার সরাসরি সংস্পর্শ বা তার দ্বারা দূষিত খাদ্য বা জলগ্রহণের মাধ্যমে এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে। চোখ বা নাক অথবা ত্বকের ক্ষতের মিউকোসাল স্তরের মধ্যে দিয়ে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। মানুষের পক্ষে এই রোগের বাহক হওয়া বিরল ঘটনা, সুতরাং মানুষ থেকে মানুষে এটি সংক্রমিত হয় না।

এটি কিভাবে নির্ণয় এবং চিকিৎসা করা হয়?
এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে দেহ তরল থেকে ব্যাক্টেরিয়া নিয়ে তার কালচারের মাধ্যমে এটি নির্ণয় করা যেতে পারে। প্রথমদিকে সাধারণত মস্তিষ্কসুষুম্না তরল বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (মস্তিস্ক ও সুষুম্নাকান্ডকে ঘিরে যে তরল থাকে) পরীক্ষা করা হয়ে থাকে, পরবর্তী পর্যায়ে রোগ-নির্ণয়ের জন্য ইউরিন কালচারের সাহায্য নেওয়া হয়। রক্ত ও ইমিউন সিস্টেমের কোষ ও এর জন্য পরীক্ষা করা যেতে পারে। পেনিসিলিন, ডক্সিসাইক্লিন, সট্রেপ্টোমাইসিন ও এরিথ্রোমাইসিন-এর মত কিছু এন্টিবায়োটিক এই রোগের বিরুদ্ধে কার্যকরী। শ্বাসের সমস্যার ক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বিশেষ সাহায্য করে। লিভার ও কিডনি ফেলিওর-এর ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিকের সাথে পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

প্রতিরোধ :
আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়া গৃহপালিত পশুকে পরিষ্কার করার সময় সুরক্ষাকারী পোশাক পরা, পশুর মূত্র দ্বারা দূষিত জল পান করা বা তাতে স্নান করা থেকে বিরত থাকলে এই সংক্রমণের সম্ভাবনা কমানো যায়।

আপনার মতামত জানানঃ