বাড়িঘর নদী ভাঙ্গনে হারিয়ে যাওয়ায় মাথা গোজার ঠাই হলো রাস্তা, বস্তি

প্রকাশঃ ২০২৬-১১-০১ - ০৭:৫৪

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার উপকূলীয় মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদী ভাঙ্গনে বাড়িঘর হারিয়ে কোনরকম মাথা গোজার ‌ঠাঁই পেয়েছে রাস্তায় ও ‌বস্থিতে ‌।জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা। নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে, কিন্তু জীবনযুদ্ধে উপকূলের নারীদের দুঃখ শেষ হয় না। নোনা পানির এলাকার মানুষ চিন্তিত তদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাদের পরিবর্তনের জীবনচিত্র
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির চেহারা বদলে যাচ্ছে বিশেষ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের। পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। প্রতিনিয়ত উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনজীবিকা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। টিকে থাকতে হচ্ছে সংগ্রাম করে। প্রকৃতির গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ায় জনজীবনে এসেছে পরিবর্তন। প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের। প্রাকৃতিক বৈরী প্রভাবের ফলে জীববৈচিত্র্যও ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে। সময়ের বিবর্তনে উপকূল অঞ্চলের জীবনধারায় এসেছে নানা পরিবর্তন। প্রতিটি মানুষের পেশা বদলে যাচ্ছে। বছরের পর বছর যারা মাছ বিক্রি করত তারা অন্যান্য পেশার দিকে ঝুঁকছে
কেউ কেউ শহরের দিকে পা বাড়াচ্ছে। কৃষক আর চাষাবাদের দিকে এগোয় না। চাষাবাদের মাধ্যমে দেনাপাওনা পরিশোধ করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। তারা পিতৃভূমি হারিয়ে ফেলছে। ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস পাচ্ছে। বিশুদ্ধ খাবার পানিরও সংকট দেখা দিচ্ছে। দেশের উপকূলের ১৯ জেলায় ৪ কোটির বেশি মানুষের বসবাস; যা দেশের আয়তনের শতকরা ৩২ ভাগ। উপকূল অঞ্চলের একটি সম্প্রদায় মুন্ডা। ধারণা করা হয়, জঙ্গল পরিষ্কারের জন্য ভারত থেকে ৩০০ বছর আগে এ ভূখণ্ডে আসে তারা। বর্তমানে এদের অবস্থান খুলনা বিভাগের বেশ কয়েকটি জায়গায়। তার মধ্যে খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার দেবহাটা ও তালা উপজেলা উল্লেখযোগ্য। পেশা হিসেবে এরা বেশিরভাগই দিনমজুরি করে। অনেকে আবার সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের ওপর নির্ভর বলতে মূলত মধু সংগ্রহ, মাছ শিকার এসব। তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের স্বাভাবিক জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।
প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করতে পারায় তৎকালীন শাসকরা সুন্দরবনের গাছ কেটে বসতি গড়তে মুন্ডাদের এ দেশে এনেছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। তারপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি তাদের। আজও সুন্দরবন ঘিরেই তাদের জীবনমরণ। তবে ভালো নেই তারা। সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি, ভেটখালী, তারানিপুর, সাপখালী, ধুমঘাট, মুন্সিগঞ্জ, কাশিপুর, কচুখালী এলাকায় বসবাস করে মুন্ডারা। জেলার দেবহাটা ও তালা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে মুন্ডাদের বসতি। সাতক্ষীরা উপকূলে মুন্ডা জনগোষ্ঠী রয়েছে আড়াই সহস্রাধিক। এ ছাড়া খুলনার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলায় তাদের বসতি রয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনেও এদের বসতির চিহ্ন মেলে। কম্পাট মুন্ডা, খাঙ্গার মুন্ডা, খাড়িয়া মুন্ডা, পাথর মুন্ডা, দেরগে মুন্ডা, সাঙ্কা মুন্ডা ও মাঙ্কী মুন্ডা- বাংলাদেশে এ সাত মুন্ডা গোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। সুন্দরবন এলাকার মুন্ডাদের জীবনজীবিকা বনের ওপরই নির্ভরশীল।
মুন্ডা পরিবারের ৯৫ শতাংশ ভূমিহীন। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অভাব পুঁজি করে সৃষ্টি হয়েছে এ সম্প্রদায়ের কষ্টের জীবন। জমিজমা যা ছিল তা-ও হারিয়েছে নানা কারণে। বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতে হয় অধিকাংশকে। আগে মুন্ডাদের প্রধান জীবিকা ছিল সুন্দরবনের গাছ কাটা। বিশেষ করে গোলপাতা ও গরান কাঠ কাটা ছিল তাদের অন্যতম কাজ। বর্তমানে অনেকে আদি পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত। বাঙালির মতো মুন্ডারা কৃষিকাজে নিয়োজিত হলেও অধিকাংশই ভূমিহীন। তাই এ অঞ্চলের মুন্ডারা দিনমজুরির ভিত্তিতে মাছ ধরে। অন্যের জমিতে বেতনভুক কাজ, নৌকা নির্মাণ, কাঠমিস্ত্রির কাজ করে। পরিবেশের বিপর্যয়ে প্রভাব পড়েছে মুন্ডা নারীদের জীবনেও। মুন্ডা নারীরাও আজ ঘরের বাইরে নানা কাজ করে। জাল বোনা, সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ- কাঁকড়া ধরা, মৌ সংগ্রহসহ সব ধরনের কাজে দেখা যায় মুন্ডা নারীদের। এ ছাড়া গৃহপালিত পশুর দেখভাল, কৃষি থেকে শুরু করে নানা কাজে অংশ নেয় তারা।
‘ইটভাটার কাজ কী আমরা জানতাম না, আইলার পর আমাদের চারপাশের অনেকেই এখন ইটভাটায় কাজ করি। কার ইচ্ছা করে বলুন নিজের বাড়ি ছেড়ে দূরে কাজ করতে যেতে। তাও আমাদের যেতে হয়, পেটের ক্ষুধা তো কারও কথা শোনে না। আগে কত ভালো সময় ছিল, আমরা চাষাবাদ করতাম। যদিও অন্যের জমিতে ফসল ফলাতাম তাও পরিবারের সঙ্গে থাকতে তো পারতাম। আমাদের সম্প্রদায়ের যারা এ অঞ্চলে থাকি, তাদের বেশিরভাগেরই সেই অর্থে চাষের জমি নেই। যতটুকু আছে, আমরা চেষ্টা করতাম ফসল ফলাতে। আমরা প্রতিদিন মজুরির ভিত্তিতে কাজ করি, সেটা হতে পারে কৃষিকাজ, মাছ চাষ কিংবা অন্য কোনো টুকিটাকি কাজ। আর সেজন্যই আমরা এ এলাকায় দিনমজুর হিসেবে পরিচিত।
এখনও কিন্তু আমরা দিনমজুরি করি, তবে আমাদের এখানে ফসল উৎপাদন কম কারণ কয়েক দিন পরপর ঘূর্ণিঝড়, বন্যার প্রকোপ ঘটে। আর এসব কিছু মানেই আপনারা জানেন আমাদের লোকালয়ে লবণপানির প্রবেশ। পুরো এলাকায় আপনি যেখানে যাবেন সেখানে অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য জমির ফসল হয় না, এ গল্প শুনবেন। আমাদের এ অঞ্চলের চারদিকে নদীতে যখন বন্যা হয়, পাড় ভেঙে গিয়ে লবণপানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। তবে অনেকে আবার চিংড়ি চাষের জন্য নিজেরাও নালা কেটে লবণপানি প্রবেশ করায়। এ সমস্যা না হয় আমরা কিছু একটা করে বন্ধ করতে পারি, কিন্তু দিনে দিনে নদীর পানির সঙ্গেও তো লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এ সমস্যা কী করে সমাধান করব, তা জানা নেই। আর সমস্যা তো একটা না, ওই আইলার পর থেকে নানান ধরনের রোগ আমাদের দেখা দিচ্ছে। চুলকানি থেকে শুরু করে পেটের রোগ, জ্বর কী নেই তার মধ্যে। আমাদের মেয়েরা আরও বেশি ধুঁকছে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যায়। এ অঞ্চলে শুধু আমরা মুন্ডারা না, সব মেয়ের বাচ্চা জন্মানোর সময় সিজার করতে হয়। যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও বিপদের মুখে। আর এসবের ফলস্বরূপ আমাদের ছেলেমেয়েরাও ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না, হয়তো তারাও ভবিষ্যতে আমাদের মতো দিনমজুর হবে।’ কথাগুলো বলছিলেন শরৎ মুন্ডা, যার বাস খুলনার কয়রা উপজেলার টোপখালী। পেশায় দিনমজুর।
পোড়াকাটলা এলাকার বাসিন্দা মিতা রানী (৪৫) বলেন, ‘আমার তলপেট খুব ব্যথা করে, কোমরের অংশ অবশ হয়ে যায়, মনে হয় পেটের ভেতর থেকে কিছু একটা ছিঁড়ে নিচে নেমে আসছে। তা ছাড়া প্রচণ্ড সাদা স্রাব হয় আর চুলকায়। ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। আর প্রসাব করতেও খুব কষ্ট হয়। গ্রামের ডাক্তাররা জরায়ু কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এ বয়সে অপারেশন করাতে স্বামী রাজি হননি। আপাতত চিকিৎসা নিচ্ছি। কিন্তু খুব বেশি হলে ১০-১৫ দিন ভালো থাকি।’
শেফালী বেগম (৩৮) বলেন, ‘আমার আমার বাড়ি সাতক্ষীরার দাতিনাখালী। ফলে জন্ম থেকেই নোনা পানির সঙ্গে বসবাস। তবে আগের তুলনায় যেন নোনাভাব বেড়েছে। আস্তে আস্তে নোনাভাব এত বাড়ে যে পুকুরের পানি মুখেই নিতে পারি না। অথচ তাতেই গোসলসহ সব কাজ করতে হয়। আমাদের চর্মরোগ ও জরায়ুতে সমস্যা হচ্ছে।’
ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেত পেলেই ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হয় উপকূলের মানুষকে
পরিবেশকর্মীদের একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, উপকূলীয় এলাকায় নোনা পানিতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে নারীরা। এতে তাদের জরায়ুতে নানা রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত এমনকি অপরিণত শিশু জন্মের হার বেড়েছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ, গোসল, কৃষি, গবাদি পশু পালন, চিংড়ির পোনা ধরাসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে নারীরা লিউকোরিয়াসহ সাধারণ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক নারীকে অল্প বয়সে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জরায়ু অপসারণ করতে হচ্ছে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের এ অংশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া এবং সে লবণাক্ত পানির অত্যধিক সংস্পর্শের ফলে এ সমস্যা বেড়েই চলেছে। শারীরিক নানা অসুস্থতার কারণে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। আবার কম বয়সে মুখে কালো ছোপ পড়া এবং শরীরের রঙ কালো হয়ে যাওয়ায় বাল্যবিবাহ বেড়েছে। মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বোঝামুক্ত হতে চান অভিভাবকরা, সাতক্ষীরার অনেক গ্রামেই অবিবাহিত কোনো কিশোরী নেই বললে চলে।
করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকার সময় বাড়ির কাজ আর খেলাধুলা করেই কাটছিল হাওয়ালভাঙ্গি আটুলিয়ার মনিরা খাতুনের (১৩)। হঠাৎ এক সন্ধ্যায় আত্মীয়ের বাড়িতে নেওয়া হয়। সে জানতে পারে একটু পরই তার বিয়ে। এ উপকূলে তার মতো বাল্যবিবাহের শিকার আছিয়া খাতুন (১৭), কারিশমা (১৬), সোনিয়া খাতুন (১৫), লাকি আক্তার (১৭) ও তানিয়া (১৬)।
বাল্যবিবাহের এ চিত্র বাংলাদেশের দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম খুলনায় খুবই সাধারণ। দারিদ্র্য এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাল্যবিবাহের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। করোনা মহামারির পর তা বহুগুণে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের অন্যতম সাতক্ষীরায় বাল্যবিয়ে প্রায় ঘরে ঘরে। তা ছাড়া লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পুরুষের বড় একটা অংশকে পরিবার ছেড়ে শহরে কাজ করতে যেতে হয়। যাদের সে সামর্থ্য নেই, তারা গ্রামে অলস সময় কাটায়।
২০১৪ সালে পরিচালিত বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে পানীয় জল ও সেচের ঘাটতি বাড়বে, যা প্রায় ২৯ লাখ দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা অ্যাডভান্সিং আর্থ অ্যান্ড স্পেস সায়েন্সের গত বছর প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অভিবাসী বা স্থানান্তরিত হবে। নিম্নভূমির দেশ হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ বিশেষভাবে সংবেদনশীল বলে জানানো হয় ওই প্রতিবেদনে।
সোহানুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলে লবণাক্ততা বেড়েছে। আর লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক নানা সমস্যা দেখা যায়। লবণের জন্য মেয়েদের মাসিক প্রক্রিয়ার ম্যানেজমেন্ট স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। লবণপানি ব্যবহারের ফলে মেয়েদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি আমাদের গবেষণার পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। শ্যামনগরের প্রতিটি গ্রামে জরায়ুসংক্রান্ত রোগে ভুগছে এমন নারীর সন্ধান পাওয়া যাবে।’
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নারীদের জরায়ুসংক্রান্ত অসুখের তীব্রতা নোনা পানি প্রবণ গ্রামগুলোয় বেশি। লবণপানির এ সমস্যা আসলে কতটা গভীর তা আরও স্পষ্ট করে বোঝা যায় ‘ডিস্ট্রিবিউশন অব গ্রাউন্ডি ওয়াটার স্যালানিটি অ্যান্ড ইটস সিজনাল ভ্যারিয়াবিলিটি ইন দ্য কোস্টাল অ্যাকুইফারস অব বেঙ্গল ডেল্টা’ শীর্ষক গবেষণায়। এতে বলা হয়, ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা উপকূলের আশপাশের বেশিরভাগ অঞ্চলে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। বেশিরভাগ উপকূলীয় অঞ্চলে মূল বা দ্বিতীয় জলবায়ুতে লবণাক্ততার পরিমাণ (ক্লোরাইড গণনা) শুকনো মৌসুমে ১০৩-১২,৪৩৩ এবং বর্ষাকালে ৩৪ থেকে ১১,৩৬৬ পর্যন্ত থাকে। বর্ষাকালে হয়তো দুয়েকটি সবজি লাগানো যায়। বাকি সময় তো এখানকার মাটিতে ঘাসও হয় না। তাহলে অত শাকসবজি কোথায় পাবে? ১২ মাস তরকারি কিনে খাওয়ার ক্ষমতা তো সবার থাকে না। অবশ্য নদীতে নামলে টুকটাক খাবার মাছ হয়। তবে সেই প্রবণতা কমে আসছে। কারণ নদীতে মাছের তুলনায় মাছ ধরার লোক বেশি এখন।
পরিবেশকর্মী কৌশিক কুমার দাস বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তাদের যে ক্ষতি হয়েছে তার টেকসই সমাধানের জন্য ত্রাণ সহযোগিতার চেয়ে দক্ষ মানুষ বেশি তৈরি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশেষ করে শিল্পপতিদের কাছে বিনীত অনুরোধ- তারা যেন সবকিছুতে ব্যবসায়িক চিন্তা না করে পরিবেশকেও ভালোবাসেন, যাতে আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ সুন্দর ও নির্মল রাখতে পারি। আমরা সবাই মিলে কাজ করে জলবায়ু সুবিচার নিশ্চিত করব।’সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ এলাকা উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে এরই মধ্যে সুন্দরবন পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বনের আশপাশের নদ-নদীতে বালি উত্তোলনে সরকারিভাবে কোনো অনুমোদন নেই। তবু পশ্চিম সুন্দরবনের কয়েকটি এলাকার নদ-নদীতে খননযন্ত্র দিয়ে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। সুন্দরবন ও নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে অব্যাহতভাবে বালি উত্তোলনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি বিলীন হচ্ছে উপকূলীয় নদীপাড়ের বনের অংশ ও লোকালয়। এতে সুন্দরবন এলাকা ও উপকূলীয় বাঁধ আরো ঝুঁকিতে পড়ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের প্রভাবে সৃষ্ট ভাঙন রোধে প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বিপুল অর্থ খরচ দেখিয়ে সংস্কার করা হচ্ছে নদীতীর রক্ষা বাঁধ, যা সংস্কারের অল্প দিনেই ফের ধসে পড়ছে। বছর না ঘুরতেই ওই স্থানে আবারো নেয়া হচ্ছে প্রকল্প। এরই মধ্যে পশ্চিম সুন্দরবন ঘেঁষা কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ নদ, শাকবাড়িয়া নদীসহ কয়েকটি এলাকার গাছপালা ভেঙে নদ-নদীতে পড়তে শুরু করেছে। কয়েকটি স্থানে ভাঙনের পরিধিও বেড়েছে।
এ ব্যাপারে পাউবো খুলনা-২-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বালি উত্তোলনের কারণে সেখানে বড় ধরনের গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। সেই গর্তে বেড়িবাঁধ ধসে ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলার এসিল্যান্ড ও জেলা প্রশাসনকে লিখিতভাবে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন, যার ৬৬ শতাংশ বাংলাদেশে; বাকিটা ভারতে। এ ম্যানগ্রোভ বনে জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বেশকিছু বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীও বাস করে। জলবায়ু সংকট প্রকট হয়ে ওঠার সঙ্গে বনাঞ্চলের ঝুঁকিও ক্রমে বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অল্প কয়েক ফুট ওপরে এ বনভূমি। প্রায়ই ঘূর্ণিঝড় এসে আঘাত হানছে সুন্দরবনে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া আর চরম আবহাওয়ার কারণে সর্বশেষ আবাসস্থলও হারাতে পারে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এতটাই সর্বব্যাপী যে প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের ওপর সেই চাপ অসহনীয় মাত্রায় পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘জীববৈচিত্র্যের অসামান্য সম্ভার সুন্দরবনের পরিবেশগত ও বাস্তুতান্ত্রিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৭ সালে একে “‍বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা” হিসেবে ঘোষণা করে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে “‍প্রাকৃতিক দেয়াল” হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবন। কিন্তু অপরিকল্পিত ও পরিবেশের তোয়াক্কা না করে যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে একে নানাভাবে সংকটে ফেলছি আমরা।’
খুলনা জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, রূপসা ব্রিজের দক্ষিণ থেকে দাকোপের চালনা এলাকার পূর্ব পাশ পর্যন্ত খুলনা জেলা প্রশাসনের আওতাধীন একমাত্র সরকারি বালুমহাল। এর বাইরে জেলার কোনো এলাকায় বালি উত্তোলনের অনুমতি নেই। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অনুযায়ী, সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারাজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা আবাসিক এলাকা থেকে সর্বনিম্ন এক কিলোমিটারের মধ্যে বালি তোলা যাবে না। এছাড়া বালি বা মাটি উত্তোলন কিংবা বিক্রির জন্য খননের ফলে কোনো নদীর তীর ভাঙনের কবলে পড়লেও বালি তোলা যাবে না। আইন অমান্যকারীর দুই বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ব্যাপারে পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, ‘সুন্দরবনের পাশের নদ-নদী থেকে বালি তোলা বনের জন্য হুমকি। এ বিষয়ে আগে কয়েকবার খননযন্ত্রের মালিকদের নিষেধ করা হয়েছে। তবে তারা প্রশাসন থেকে অনুমতি নিয়েছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।’
এ ব্যাপারে খুলনার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘কয়রা ও দাকোপ উপজেলার কোনো নদ-নদী থেকে বালি তোলার অনুমতি নেই। কারণ উপকূলীয় ওইসব এলাকা নদীভাঙন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
একই কথা বলে গেছেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী। তিনি বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ বেঁড়িবাধের কারণে নদ-নদী থেকে বালি উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষেধ। তার পরও যদি কেউ নদী থেকে বালি উত্তোলন করে তাহালে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, পশ্চিম সুন্দরবন এলাকার কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া, খোলপেটুয়া, সুতারখালী, শিবসা, ঢাকী, কাজীবাছা, পশুর, চুনকুড়ি ও ভদ্রা নদী থেকে খননযন্ত্র দিয়ে বালি উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিরা ওই বালি উপকূলের বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণকাজে ব্যবহার করছেন।
কয়রা উপজেলার বাসিন্দা ইউনুছ আলী বলেন, ‘পশ্চিম সুন্দরবনের নদ-নদী থেকে বালি তোলার পেছনে কয়েকটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে। দীর্ঘদিন স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে বালি উত্তোলন করছে তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ সংস্কারকাজের ঠিকাদাররাও এ চক্রের সঙ্গে চুক্তি করে বালি উত্তোলন করেন। রাতের বেলায় বেশি বালি তোলা হয়।’
কয়রা সদর ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার নদ-নদী থেকে বালি উত্তোলনের একটা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আমার ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি স্পটে বালি উত্তোলনের ফলে নদীভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে দুই-একজনকে জরিমানা করলেও বালি উত্তোলন বন্ধ হয়নি।
কয়রা উপজেলার বেড়িবাঁধের কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমিন অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিনিধি আমিনুর ইসলাম জানান, তাদের বস্তা ডাম্পিং, জিও ব্যাগ ভর্তি ও বেঁড়িবাধের কাজে বালির প্রয়োজন হয়। এজন্য তারা হারুন নামে একজনের কাছ থেকে ৬ টাকা ঘনফুট চুক্তিতে আট লাখ ঘনফুট বালি নিয়েছেন। তবে বালি কোথা থেকে আসছে তিনি এ বিষয়ে জানেন না।
স্থানীয়রা বলছেন, কপোতাক্ষ নদের পশ্চিম তীরে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পাতাখালী, জেলেখালী ও ঝাপা গ্রাম। নদের পূর্ব তীরে কয়রা উপজেলার হরিণখোলা, গোবরা, ঘাটাখালী গ্রাম। অবাধে বালি তোলায় এসব গ্রামের বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
নাগরিক সংগঠন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের দাকোপ উপজেলা সমন্বয়ক গোলাম মোস্তফা খান বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় পরিকল্পিত ও স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মিত না হওয়ায় প্রতি বছরই ভাঙন দেখা দেয়। অথচ এ এলাকার ভাঙনকবলিত এলাকার নদ-নদী থেকে খননযন্ত্র দিয়ে সারা বছরই বালি তুলছে কয়েকটি চক্র। এতে পরবর্তী সময়ে সেই স্থানে বাঁধ ধসে ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে।’প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবে বারবার এ অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস। একটানা বৃষ্টির ফলে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বেড়িবাঁধ ছাপিয়ে যাচ্ছে। এতে উপকূল রক্ষা বাঁধে দেখা দিচ্ছে ভাঙন। ফলে বছরের এ সময় এলেই সংশয় আর উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটছে উপকূলবর্তী মানুষের। উপকূলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে এ জনপদে। কিন্তু বারবার উপকূল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একটি সময় গিয়ে অনেকে স্থানত্যাগ করে অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছে। এতে দেখা দিচ্ছে পারিবারিক, সামাজিক সমস্যাসহ নানা সংকট। এ বছর বৃষ্টি মৌসুমে উপকূলে বড়সড় কোনো ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব না পড়লেও, সাম্প্রতিককালে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ও তালা উপজেলার শাহাজাতপুর গ্রামে কপোতাক্ষের বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে যেকোনো সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়ে বিস্তীর্ণ এসব এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এজন্য উপকূলীয় জনপদের মানুষ এখন দুশ্চিন্তার মধ্যে দিয়ে দিন পার করছে। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে উপকূলের মানুষ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। কিন্তু তাদের এ চিৎকার, আর্তনাদ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল পর্যন্ত পৌঁছেও পৌঁছাচ্ছে না। ফলে বারবার প্লাবিত হয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের অনান্য অঞ্চলের থেকে উপকূলীয় জনপদের মানুষ কয়েক বছর পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই তাদের দিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। উপকূলের এসব সংকট মোকাবিলায় উপকূলীয় বোর্ড গঠন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যায়।
বর্ষা মৌসুম এলেই এ অঞ্চলের মানুষের হাহাকার শুরু হয়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব একটু পড়তেই ঘরবাড়ি ছেড়ে তাদের আশ্রয় নিতে হয় সাইক্লোন সেন্টারে। সেখানেও খাবার কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের সংকট লেগেই থাকে। এদিকে সারা বছর নিরাপদ খাবার পানি থেকে বঞ্চিত হয় তারা। সাধারণত উপকূলবর্তী বেশিরভাগ মানুষ পুকুরের পানি খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বা নদীর লোনাপানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যখন পুকুর ডুবে যায় তখন তাদের খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। সরকার প্রতি বছর এ সংকট মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু তা কোনোভাবেই ফলপ্রসূ হচ্ছে না। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ভেস্তে যাচ্ছে। নানা সংকটের কথা বলে বছরের পর বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড দিন পার করে দেয়। ভাঙন দিয়ে পানি ঢোকার পর তারা জিও বস্তা আর কয় কোদাল মাটি দিয়ে বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে তোড়জোড় শুরু করে দেয়। কিন্তু বছর না পার হতেই সেই ভাঙা জায়গার আশপাশ দিয়ে আবার বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। এভাবে দায়সারা ফাটল সংস্কারের কাজ করে কোনোভাবেই উপকূলীয় জনপদ বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে উপকূলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে সরকারকে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রিমাল। প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশের উপকূলে ছোট-বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার ঘটনা ঘটে। রিমালের স্থায়িত্বের দিক থেকে অন্যান্য ঘূর্ণিঝড় থেকে বেশ আলাদা। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের ঘূর্ণিঝড় রিমাল বেশি সময় ধরে তাণ্ডব চালিয়েছে বাংলাদেশের উপকূলে। রিমাল তাণ্ডব চালিয়ে চলে যাওয়ার পরও এখনো রয়ে গেছে এর ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত।
রিমালের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উপকূল অঞ্চলের বেড়িবাঁধ। খুলনা, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, সাতক্ষীরাসহ দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর বেড়িবাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়ে কয়েক লাখ মানুষ। খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনায় বাঁধ ভাঙে বেশি। খুলনা বিভাগে ৬১ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বরগুনায় ১২ কিলোমিটার, পটুয়াখালীতে ৯ কিলোমিটার এবং ভোলায় ১৩ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ৫০ কিলোমিটার বাঁধের ক্ষতি হয়। এর আগেও সিডর, আইলা, আম্ফানসহ অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বেড়িবাঁধ ভেঙে যেতে দেখা গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাবে—এটিই হয়ে উঠেছে উপকূলের স্বাভাবিক ঘটনা। তবে টেকসই বেড়িবাঁধ তৈরি করা গেলে হয়তো কিছুদিন পরপর উপকূলের মানুষদের এমন পানিবন্দি হয়ে নানা ভোগান্তির শিকার হতে হতো না।খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট উপকূলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি চিংড়িচাষ। ওই জেলাগুলোর উপকূলীয় অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার একটি বৃহৎ অংশ প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে চিংড়ি চাষের ওপর নির্ভরশীল। যখন লোকালয়ে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ করে তখন এসব অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরগুলো পানিতে ভেসে যায়। ফলে বেশ মোটা অঙ্কের লোকসানে পড়তে হয় চিংড়ি চাষের সঙ্গে সম্পৃক্তদের। এ অঞ্চলের অর্থনীতি বেশ বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পূর্বেই দরজায় কড়া নাড়তে থাকে নতুন কোনো ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সময়ে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও এসব ঘের ব্যবসায়ীর জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না, যার ফলে এই ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হন এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
এ ছাড়া লোকালয়ে পানি ঢুকে ভেসে যায় মানুষের ঘরবাড়ি। ফলে মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ হয়ে পড়ে গৃহহীন। যদিও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন মাধ্যম থেকে ঘূর্ণিঝড় কবলিতদের সাহায্য করা হয়, তবু এই সাহায্য যথেষ্ট নয়।