পাইকগাছা প্রতিনিধি : নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চরম অনুপস্থিতি, অনিয়ন্ত্রিত প্রাইভেট-কোচিং নির্ভরতা নাকি স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসনের ঘুমন্ত তদারকি—ঠিক কোন বিষফোড়ে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল উপকূলীয় পাইকগাছার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মেরুদণ্ড? ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণ করতেই সামনে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো শিক্ষাবিপর্যয়ের চিত্র। উপজেলার সিংহভাগ বিদ্যাপীঠে যখন অকৃতকার্যের ভয়াবহ মহোৎসব চলছে, ঠিক তখন এই সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ের মধ্যেও পড়াশোনার গুণগত মান ধরে রেখে পাসের হারের দিক থেকে উপজেলার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজ। আর ঠিক তার বিপরীতে, শতবর্ষের গৌরবময় ইতিহাসকে ধুলায় মিশিয়ে কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরে নেমে এসেছে শতভাগ ফেলের নজিরবিহীন ও চরম লজ্জাজনক পতন।
মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীকে নিয়েও শতভাগ অকৃতকার্য—কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দিরের এমন ফলাফল শিক্ষার মান ও পাঠদান পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যেখানে অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বাড়তি যত্ন ও নিবিড় তত্ত্বাবধানে পাঠদানের সুযোগ থাকার কথা, সেখানে তিনজনের একজনকেও পাস করাতে না পারার কারণ কী? নিয়মিত ক্লাস, পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল? এ ব্যর্থতার দায় কে নেবে? বিষয়টি খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
প্রকাশিত ফলাফলের খতিয়ান পরীক্ষা করলে দেখা যায়, পাইকগাছা উপজেলার এইচএসসি ফলাফলে শীর্ষ ও তলানির মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক দুর্ভেদ্য ও অস্বাভাবিক ব্যবধান। ঐতিহ্যবাহী ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজ থেকে এ বছর ১২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৪ জন পাস করে উপজেলার সর্বোচ্চ ৫৭.৩৬ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে; যার মধ্যে ৬ জন শিক্ষার্থী পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত জিপিএ-৫ (এ+)। অন্যদিকে চরম বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে লক্ষীখোলা কলেজিয়েট স্কুল ১৪৭ জনের মধ্যে ৭৯ জন পাস করিয়ে (৫৩.৭৪%) নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে উপজেলার সর্বোচ্চ ৮টি জিপিএ-৫।
তবে এই আলোটুকু বাদ দিলে বাকিসবটাই ঘোর অন্ধকার। শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩ জন শিক্ষার্থীর একজনও পাসের মুখ দেখতে পায়নি। ৩ জনে শূন্য—শতভাগ অকৃতকার্যের এমন লজ্জাজনক রেকর্ড গোটা পাইকগাছাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
উপজেলার প্রধান ও প্রাচীন কেন্দ্রগুলোতে অবস্থিত কলেজগুলোর পারফরম্যান্স দেখে চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হয়েছে শিক্ষক থেকে শুরু করে অভিভাবক মহলের। উপজেলার এই সেরা প্রতিষ্ঠান পাইকগাছা সরকারি কলেজে ৩০৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেল করেছে রেকর্ড ২২০ জন! পাসের হার নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮.৮০ শতাংশে, এ প্লাস এসেছে মাত্র ২টি। অন্যদিকে কপিলমুনি কলেজে ৩৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য ২০২ জন (পাসের হার ৪১.২৮%, এ প্লাস ৬)। রাড়ুলী আরকেবিকে হরিশ্চন্দ্র কলেজিয়েট স্কুলে ৪৩৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে রেকর্ড ৩০৭ জন ফেল করে পাসের মুখ দেখেছে মাত্র ১২৮ জন (পাসের হার ২৯.৪৩%, এ প্লাস ৩)। এছাড়া হরিঢালী কপিলমুনি মহিলা কলেজে ৬৭ জনের মধ্যে পাস করেছে মাত্র ২৪ জন (৩৫.৮২%, এ প্লাস ২)।
সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন, সরকারিকরণ ও লক্ষ লক্ষ টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরও সরকারি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানে যদি ৭০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করে, তবে অভিভাবকরা কোথায় আস্থা রাখবেন?
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, উপকূলীয় ও দুর্গম ইউনিয়নগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। এসব এলাকার কলেজগুলোতে ফেলের হার গড়ে ৮০ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সোলাদানার সরদার আবু হোসেন কলেজে ৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৯ জনই ফেল! পাসের হার তলানিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৩৩ শতাংশে। গড়ইখালী শহীদ আয়ুব ও মূসা ডিগ্রি কলেজে ২৬৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৩২ জন ফেল (পাসের হার ১২.৭৮%)। চাঁদখালী কলেজে ৫৯ জনের মধ্যে ৫১ জন ফেল (পাসের হার ১৩.৫৬%)। দেলুটির কালিনগর কলেজে ৭৪ জনের মধ্যে ৬০ জন অকৃতকার্য (পাসের হার ১৮.৯২%)।
পাইকগাছার এই অভূতপূর্ব ফল বিপর্যয়ের নেপথ্য কারণ খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এই দুর্যোগ কেবল শিক্ষার্থীদের অলসতা বা প্রশ্নের কাঠিন্যের ফল নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বহীনতারই এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। উপজেলার অধিকাংশ কলেজে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা সময়মতো শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হন না, ফলে শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যবই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা সংকুচিত হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোচিং-নির্ভর নোট বা সাজেশন পড়ে যে প্রকৃত ব্যাসিক জ্ঞান তৈরি হয় না—এইচএসসির ফলাফলে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। পাশাপাশি উপজেলা ও জেলা শিক্ষা প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি ও তদারকিমূলক পরিদর্শনের অভাবকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষানুরাগীরা। যেসব প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য বা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে অতীতে কোনো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়নি।