পাইকগাছা (খুলনা)প্রতিনিধি : বর্ষার চিরচেনা রূপের আড়ালে খুলনার পাইকগাছায় এখন নিঃশব্দে থাবা বসাচ্ছে ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক রোগ। গত এক মাসের বেশি সময় ধরে উপজেলাজুড়ে এই দুই রোগের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্যকে নতুন এক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। গত ১ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর—এই ৩৩ দিনের ব্যবধানে কেবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেই সেবা নিয়েছেন ৮৩ জন রোগী। এর মধ্যে ডেঙ্গুর বিস্তার যেমন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, তেমনি হামের উপস্থিতি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে অভিভাবকদের।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই ৩৩ দিনে উপজেলায় হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ জন। এর মধ্যে প্রত্যেককেই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। পরিস্থিতি কিছুটা জটিল হওয়ায় তাদের মধ্য থেকে দু’জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেলে রেফার্ড করতে হয়েছে চিকিৎসকদের।
অন্যদিকে, একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৬৫ জন রোগী চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ১৬ জন বহির্বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও, ৪৯ জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হাসপাতালের বিছানায় ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করছেন ১৬ জন রোগী। অবস্থার অবনতি হওয়ায় এ পর্যন্ত ৫ জন ডেঙ্গু রোগীকে খুলনা বা অন্য উন্নত কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সাধারণত গতানুগতিক ধারার সংবাদের বাইরে গিয়ে এই পরিস্থিতির নেপথ্য কারণ ও জনসচেতনতার দিকটি তুলে ধরতে গিয়ে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু রোধের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে বাসাবাড়ির আশপাশ, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা জমে থাকা পরিষ্কার পানি নিয়মিত অপসারণের কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দিনের বেলায় মশারি টানানো কিংবা বডি রিপেলেন্ট ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন তারা। জ্বর, তীব্র মাথা বা চোখের পেছনে ব্যথা কিংবা জয়েন্টে ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, হামের সংক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় বিধায় আক্রান্ত রোগীকে শুরুতেই আলাদা বা আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বর, সর্দি, কাশি ও গায়ে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ এক পেশাদার ও সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “হাম কিংবা ডেঙ্গু—কোনটিই আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নয়, তবে এটি অবহেলারও অবকাশ রাখে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে এবং পানি জমতে দেওয়া যাবে না। শিশুদের টিকাদান শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ফার্মেসি থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”
কেবল সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের একক প্রচেষ্টায় এই স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন প্রতিটি পরিবারের সম্মিলিত উদ্যোগ। বিশেষ করে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার করার মাধ্যমে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে এই প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
৩৩ দিনের এই ৮৩ জনের পরিসংখ্যান কোনো বিচ্ছিন্ন সংখ্যা নয়; বরং এটি আগামী দিনের বড় কোনো বিপদের পূর্বাভাস। সময়মতো সচেতনতার বর্ম গায়ে জড়াতে না পারলে পাইকগাছার জনস্বাস্থ্য এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে—এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা।