সুন্দরবন সুরক্ষার জন্য পৃথক নীতিমালা ঘোষণা করতে হবে

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৩ - ১০:৪৩

সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: সুন্দরবন সুরক্ষার জন্য পৃথক নীতিমালা ঘোষণা করতে হবে। পাশাপাশি  জাতীয় বাজেটে সুন্দরবনের জন্য বাজেট রাখতে হবে। কোনভাবেই যেন বন সংলগ্ন এলাকায় ভারী শিল্প গড়ে তুলতে যাবেনা। বন্য প্রাণীর প্রজননের সময় চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। এ নিয়ে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন।
সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল, তাই এর সুরক্ষা মানেই উপকূলীয় মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করা। সুন্দরবন যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল সংলগ্ন মানুষকে প্রলয়ংকরী ঝড় বা সুপার সাইক্লোনের ছোবল থেকে জীবন রক্ষা করে চলেছে। বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের বৃহত্তম আধার এই ম্যানগ্রোভ বনটি বাংলাদেশের অক্সিজেন ভান্ডার বা ফুসফুস হিসেবে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অপরিসীম ভূমিকা পালন করছে।
লাখ লাখ মানুষ সুন্দরবনের মাছ, মধু, গোলপাতা প্রভৃতি আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সুন্দরবনের নদী-খাল বাংলাদেশের মাছের চাহিদার একটা বিরাট অংশ জোগান দিচ্ছে। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সরকারও এ বন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে।
বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঝড়-ঘূর্ণিঝড়, ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে সুন্দরবন এবং এর জীববৈচিত্র্যকে আমাদের বাঁচাতে হবে। এরজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগের নাগরিকদের সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। এভাবে বললেন জনউদ্যোগ,খুলনার আলোচনা সভায় নাগরিক নেতৃবৃন্দ।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় জনউদ্যোগ,খুলনার আহবানে খুলনা সিভিল সোসাইটির কার্যালয়ে সুন্দরবন সুরক্ষা, বাস্তবতা এবং করনীয় শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনউদ্যোগ, খুলনার আহবায়ক শিক্ষক নেতা মানস রায়। ধারণাপত্র পাঠ করেন সাংবাদিক মহেন্দ্রনাথ সেন।
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সুজনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের এ্যাড: কুদরত-ই-খুদা, খুলনা সিভিল সোসাইটির আহবায়ক এস এম শাহনাওয়াজ আলী, বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সমন্বয়কারী এ্যাড: মোমিনুল ইসলাম, অধ্যাপক দেবদাস মন্ডল, পরিবেশ কর্মী আব্দুল্লাহ-আব্রাহাম, মফিদুল ইসলাম, আমরা বৃহত্তর খুলনাবাসীর সরদার আবু তাহের, সুরখালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম সিপার, দক্ষিণ অঞ্চল উন্নয়ন পরিষদের মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন হাওলাদার, সিনিয়র সাংবাদিক রকিব উদ্দীন পান্নু, সিভিল সোসাইটির মো: হুমায়ুন কবীর, নারীনেত্রী নূরুন নাহার হীরা, গীতা মন্ডল, ছাত্রনেতা জয় বৈদ্য, অর্পন সাধু স্বপ্ন, উৎস দেবনাথ, কৃষেন্দু মন্ডল প্রমুখ।
সভায় বক্তরা বলেন, অবৈধ কাঠ কাটা, বন্যপ্রাণী শিকার ও বনভূমি দখল কঠোরভাবে বন্ধ করা এবং আইন অমান্যকারীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কো-র সুপারিশ অনুযায়ী সুন্দরবন ও এর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ‘কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা’ বাস্তবায়ন করার বিকল্প নেই।
বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জন্য টেকসই বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা জীবিকার জন্য বনের ক্ষতি না করে। এছাড়া সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।
বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে। ম্যানগ্রোভ বনায়ন ও দ্রুত বর্ধনশীল দেশীয় প্রজাতির গাছের মাধ্যমে বনের ঘনত্ব বৃদ্ধি করার বিকল্প নেই।দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবন। কমছে আয়তন। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক হুমকি আর মানবসৃষ্ট হুমকি মোকাবিলা করছে এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এভাবে চলতে থাকলে একসময় এই বন তার অস্তিত্ব হারাবে। তাই এখনই সুন্দরবনের সুরক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরাকারবারী, বনদস্যু, পশুশিকারী, অসাধু মৎস্য শিকারী, মাছের পোনা ধ্বংসকারী চক্র এবং এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে বনজ সম্পদ লুণ্ঠনের অসৎ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। অগ্নিকা-, কাঠ পাচারকারীদের দৌরাত্মে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। সিডর ও আইলার মতো ভয়ানক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত, ক্লিংকার-তেল-সার-কয়লাবাহী জাহাজডুবি, দেশি-বিদেশি চক্রান্ত সুন্দরবনকে ভয়ানক হুমকির মুখে ফেলেছে।

সুন্দরবন স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরদার শফিকুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে যেসব বন্যপাণী-বৃক্ষরাজি আছে, এরা যেকোনো পরিস্থিতিতে সহনশীল বলেই দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। সুন্দরবনকে যেমন প্রাকৃতিক হুমকির মোকাবিলা করেত হয়, তেমনি মানবসৃষ্ট হুমকিও মোকাবিলা করতে হয়।

তিনি আরো বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে সুন্দরী গাছ টপ ডাইং রোগে মারা যাচ্ছে। আবার চোরাশিকারী, পাচারকারী ও বন্যদস্যু নির্বিচারে পশু শিকার করছে। বাঘের সংখ্যা কমে ১০৬টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে যদি কমে যায়, তাহলে বাঘ নিয়ে আর আমাদের গর্ব করার কিছুই থাকবে না। তাই সুন্দরবন রক্ষায় এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আমাদের মায়ের মতো সুরক্ষা করছে। দক্ষিণ বাংলার বিপুল জনগোষ্ঠির অর্থনৈতিক কর্মকা- এবং মৎস সম্পদ আহরণের উৎস হিসেবে যুগ যুগ ধরে পাশে আছে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে সুন্দরবন ব্যাপক কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে। তাই সুন্দরবনের সুরক্ষার বিকল্প নেই।

সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সাতটি সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলো হচ্ছে- অবিলম্বে সুন্দরবন সুরক্ষায় পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে। সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। সুন্দরবনের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদুৎকেন্দ্র, জাহাজভাঙা শিল্পসহ কোনো লাল শ্রেণির শিল্প স্থাপন করা যাবে না। শেলা নদী ও সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে সব ধরনের নৌযান চলাচল স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে ঘষিয়াখালী-মংলা চ্যানেল সম্পূর্ণরূপে চালু করতে হবে। চ্যানেলের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রভাবশালীদের দখলে থাকা খালগুলোর অবৈধ বাঁধ অপসারণ করতে হবে। ক্লিংকার, তেল, সার ও কয়লাবাহী জাহাজডুবির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা ও ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। নৌপথে টহল জোরদার, অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করে সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধে বিশেষ অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করতে হবে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সুন্দরবন অঞ্চলের নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য যুগোপযোগী বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ অঞ্চলের যুবকদের বনরক্ষী পদে চাকরিতে নিয়োগ দিতে হবে।

২০০১ সাল থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। যদিও এ আয়োজন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ।

জানা যায়, ১৯১১ সালে সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে তা আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার এবং বাকিটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত। বাংলাদেশের মোট আয়তনের ৪.২ শতাংশ এবং মোট বনাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ সুন্দরবন।

আন্তর্জাতিক গুরুত্ব¡ বিবেচনায় সুন্দরবনের অংশ বিশেষকে ১৯৯২ সালের ২১ মে ‘রামসার এলাকা’ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে ইউনেসকো সুন্দরবনকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ হল সুন্দরী। এ ছাড়া আছে- গেওয়া, বাইন, কেওড়া, গরান, সিউরা, ওড়া, কাকড়া, ধুন্দল, আমুর, পশুর, গোলপাতা প্রভৃতি। মধু এ বনে প্রকৃতির দান। ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্য তৈরির ভেষজ উপাদান ও সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা হয়। দেশের প্রয়োজনীয় মাছের প্রায় ৫ শতাংশ জোগান দেয় সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদী। এখানকার উল্লেখযোগ্য মাছের মধ্যে রয়েছে- রূপচাঁদা, লইট্যা, ছুরি, মেদ, ইলিশ, পোয়া, কাইন, পাঙ্গাস, ফ্যাসা, ট্যাংরা, ভেটকি, আইড়, ভোল। প্রতিবছর প্রায় ১৫/২০ হাজার টন মাছ আহরিত হয় সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা থেকে। প্রায় ৩৬ হাজার টন চিংড়ি ও কাকড়া, ৭৫০ টন ইলিশ এবং কয়েক কোটি চিংড়ির পোনা আহরিত হয় সুন্দরবন সংলগ্ন নদী থেকে। সুন্দরবনে পশু-পাখির মধ্যে আছে- বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মায়াবী চিত্রা হরিণ, শুকর, বানর, সাপ, গুঁইসাপ, কুমির, বনবিড়াল, ভোদরসহ নানা প্রজাতির  প্রাণী।

ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, উজানে নদ-নদীর পানির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় সুন্দরবন অঞ্চলের নদ-নদীতে লবনাক্ততা বাড়ছে। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ তৈরির পর ওপর থেকে নেমে আসা মিষ্টি পানি প্রবাহ কমে যায়। ফলে বর্তমানে পদ্মার শাখা নদী অধিকাংশ ভরাট হয়ে গেছে। লবন-মিষ্টি পানির সংমিশ্রণের সংকটে সুন্দরবনের প্রকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে সুন্দরবন। সম্প্রতি বনের প্রতিও মানুষ আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন আর মানুষের আগ্রাসনে সুন্দরবন যখন হুমকির সম্মুখীন, ঠিক সে সময় বাগেরহাটের রামপালে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ উদ্যোগে একটি ও ওরিয়ন গ্রুপ একটি কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। যা দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়লাপোড়া সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন প্রভৃতি সুন্দরবনের জীবম-ল ও বায়ুম-লকে দূষিত করবে। সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন যৌগসমূহ থেকে সৃষ্ট গ্রিন হাউস গ্যাস বনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এসিড বৃষ্টি ঘটাবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সুন্দরবন অঞ্চলের নদ-নদীর পানি, বায়ু দূষিত হবে এবং হুমকির মুখে পড়বে মানুষের জীবন-জীবিকা।

রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে ড. ফরিদুল ইসলাম বলেন, এ প্রকল্পে ভারত তার নিজস্ব আইন ভঙ্গ করে কাজ করছে। ভারতের আইন অনুযায়ী, বনের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরণের শিল্প প্রতিষ্ঠান করা যাবে না। অথচ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে এবং সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার ‘বাপার জোন’ থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে।মিত্র অচিহ্নিত রেখে সুন্দরবন রক্ষার আংশিক কর্ম পরিকল্পনা, রাজনৈতিক আন্দোলন না করে শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতিরে আংশিক কর্ম তৎপরতা কোনই কাজে আসবে না। কেন? বটম লাইন গুলো উল্লেখ করাই এই আলোচনায় ঢুকার প্রয়াস।
সুন্দরবনের শত্রূঃ
১। স্যালাইন পেনিট্রেশনঃ
১ক। ফারাক্কা বাঁধঃ ১৯৭৪-৭৫ এ পরীক্ষা মূলক এবং স্থায়ীভাবে চালু থেকেই শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানির হঠাত এবং একচেটিয়া প্রত্যাহারের কারনে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বড় আকারে সাগরের লোনা পানির আগ্রাসন শুরু হয়, এতে করে প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনে সাধু এবং লবনাক্ত পানির আসা যাওয়ার মিথস্ক্রিয়া নস্ট হতে শুরু করে। একদিকে নদীর স্বাদু পানির উচ্চতা এবং চাপ হ্রাস পায় অন্যদিকে লোনা পানি স্থল ভাগের অভ্যন্তরে বহু দূর পর্যন্ত প্রবেশ করে (স্যালাইন পেনিট্রেশন)।

১খ। ভারতীয় বাঁধ এবং পানি প্রত্যাহার ব্যবস্থাপনাঃ
সময়ের সাথে গঙ্গা সহ অন্য ৫৩ টি অভিন্ন এবং আন্তর্জাতিক নদী শাখা নদী এবং কানেক্টেড খাল গুলোতে ভারত বাঁধ এবং পানি প্রত্যাহার ব্যবস্থাপনা এগিয়ে নেয়ার সাথে সাথে স্যালাইন পেনিট্রেশন শুধু বেড়েছেই।

১গ। গঙ্গা- কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পঃ
কৃষির জন্য অত্যন্ত ভালো পদক্ষেপ হলেও শুকনা মৌসুমে গঙ্গার অবশিষ্ট সামান্য পানির উল্লেখযোগ্য আবারো সেচ প্রকল্পে পুনসঞ্চালন শুর হলে স্যালাইন পেনিট্রেশন আরো বাড়তে শুরু করে।

২। স্বাদু পানির প্রবাহে ভয়াবহ দূষণ এবং ভারী ধাতুর বিপর্যয়কর উপস্থিতিঃ
ভয়ঙ্কর ভারী ধাতুর সাধু পানি ম্যানগ্রোভে কি কি সমস্যা তৈরি করছে তা গবেষণার দাবি রাখে
মাত্রাতিকরিক্ত স্যালাইন পেনিট্রেশনের কারনে সুন্দরবনের উদ্ভিদ এবং প্রাণীকুল এমনিতেই দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমে হাফিয়ে উঠে এবং বর্ষায় নদীর সাধু পানির উচ্চতা বাড়লে কিছুটা দম নেয়! তার উপর পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নদ-নদীর জলজ এবং বনের উদ্ভিজ্জ বাস্তুসংস্থানের ওপর মারাত্মক প্রভাবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারত এবং বাংলাদেশের শিল্প, শহুরে এবং হিউম্যান ওয়েস্ট এর কারনে সৃষ্ট ভয়ঙ্কর পানি দূষণে নদীতে শত গুণ বেশি ভারি ধাতুর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। সুন্দরবনে ব্যাপক হারে গাছ গাছালি বিভিন্ন রোগ আক্রান্ত (আগা মরা সহ) যা এর সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে পায়রা নদীতে ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসা রয়েছে যথাক্রমে ৪৫, ১২, দশমিক ৭২ ও ২৫ মিলিগ্রাম। করতোয়ায় ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সিসার মাত্রা যথাক্রমে ১০৯, ২৫, ১ দশমিক ২ ও ৫৮ মিলিগ্রাম। পদ্মা নদীতে ক্রোমিয়াম রয়েছে ৯৭ ও সিসা ১৭ মিলিগ্রাম।

উল্লেখ্য পরিবেশ অধিদপ্তর সুপেয় পানিতে আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম ও সিসার মানমাত্রা নির্ধারণ করেছে দশমিক শূন্য ৫ মিলিগ্রাম। আর ক্যাডমিয়ামের গ্রহণযোগ্য মানমাত্রা নির্ধারণ করেছে দশমিক শূন্য শূন্য ৫ মিলিগ্রাম। অথচ এর বহুগুণ বেশি (১০০ গুণের বেশি) রয়েছে বাংলাদেশের সুপেয় পানির সবচেয়ে বড় উত্স নদীগুলোয়। আর শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে পরিশোধনের পর নির্গত তরলের ক্ষেত্রে আর্সেনিকের মাত্রা দশমিক শূন্য ৫, ক্রোমিয়াম ১, ক্যাডমিয়াম দশমিক ৫ ও সিসার মানমাত্রা ১ মিলিগ্রািম নির্ধারণ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এছাড়া সেচভূমির জন্য সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা দশমিক ১, ক্রোমিয়ামের ১, ক্যাডমিয়ামের দশমিক ৫ ও আর্সেনিকের দশমিক ২ মিলিগ্রাম। কিন্তু অধিকাংশ নদ-নদীর পানিতেই এসব ধাতুর উপস্থিতি নির্ধারিত মাত্রার অনেক বেশি ।
সামনের দিনে আরো ভয়ঙ্কর দূষণের মুখে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ গাছ গুলো কি কি রোগে আক্রান্ত হবে তা গবেষণার দাবি রাখে। যতই গাছ মরছে, ততই বাড়ছে লূটেরাদের ফরেস্ট পেনিট্রেশন!

৩। পাঁচ তারা লূটেরা চক্রঃ *ঢাকার মাফিয়া-*স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতি বাজ, *দুর্নিতিবাজ প্রশাসন- *বনজীবিদের লোভী অংশ এবং *সুন্দরবনের স্থানীয় দস্যু চক্র গুলোঃ বাঘ সুন্দরবনের খাদ্য শৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করায় এই পাঁচ শ্রেণীর লূটেরা সবসময়ই বাঘ মেরে সুন্দরবনে মানব পেনিট্রেশন সহজ করতে চেয়েছে। এতে করে বাঘের চামড়া পাচারকারী সময়ে সময়ে বাঘ মেরেছে, হরিণ শিকারি যখন তখন নিরীহ হরিণ মেরে মিট এবং লেদার পাচার করেছে, লোভী মৌয়ালরা (বংশ পরম্পরায় নয়) বেশি মৌচাক কেটেছে (নৌকার দাগ দেয়া অংশের পানিতে ডুবার মত দুর্ণিতি সহায়ক ব্যবস্থার সুবাদে), জেলে বেশি মাছ এবং রেণু আহরণ করেছে, কাঠুরে বেশি কাঠ কেটেছে এবং দস্যুরা পাচার করেছে। বনবিভাগের লোকেরা প্রতিটি ক্ষেত্রে বখরা পেয়েছে, খুলনা বরিশাল বিভাগের/ সিটির নেতারা সরাসরি এই লূটেরা ব্যবসা গুলো ওউন করেছে।

বাঘ হত্যার পিছনের রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা
এই পাঁচ তারা চক্রের উচ্চ ধাপে যেহেতু মেয়র সহ বৃহত্তর খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের রাজনৈতিক দলের নেতারা রয়েছে, তাই তাদের আইডেন্টিফাইড না রেখে সুন্দরবন রক্ষার কোন প্রচেস্টা কাজে আসবে না। চোর তারাই, তারাই বনে আগুন দিয়ে পরিষ্কার করে ধানের জমি এবং আবাসন ব্যবসা চালাচ্ছে।

এই দুর্বিনীত মাফিয়া দস্যূ চক্র চিহ্নিত না করে, শাস্তি না দিয়ে, রাজনৈতিক এবং আইনগত দিক থেকে প্রতিহত না করে কিংবা একই রাজনৈতিক বলয়ে তাদের উপস্থিতির কারনে রাজনৈতিক আন্দোলনে না গিয়ে রাজধানী কেন্দ্রিক সামাজিকপদক্ষেপে সুন্দরবন টিকানো যাবে না।

চিংড়ীর রেণু সংগ্রহ সুন্দরবনের জলজ পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি করছে!

৪। চিংড়ীর রেণুঃ সুন্দরবন উপকূলীয় নদ-নদীতে বাগদা চিংড়ির পোনা ও গলদার রেণু আহরণের জন্য অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ নেট জাল। ক্ষুদ্র ফাঁসযুক্ত এ জাল দিয়ে একটি বাগদা বা গলদা চিংড়ির পোনা ও রেণু সংগ্রহ করতে অন্তত ৪৬২ প্রজাতির মাছের ডিম, পোনা ও প্লাংকটন নষ্ট হয়। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মত্স্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য। বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, খুলনার কয়রা ও পাইকগাছাসহ আশপাশে একটি বাগদা পোনা আহরণে ১১৯টি চিংড়ি প্রজাতির পোনা, ৩১২টি জুপ্লাংকটন প্রজাতি ও ৩১টি সাদা মাছ প্রজাতির পোনা নষ্ট হয়। এছাড়া সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায় একটি পোনা ধরতে গিয়ে ৪৬টি চিংড়ি প্রজাতি, ৩৫টি জুপ্লাংকটন প্রজাতি ও ১১টি সাদা মাছ প্রজাতির পোনা ধ্বংস হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য ও মত্স্যসম্পদ দুটিই ধ্বংস হচ্ছে। রেণু সংগ্রহে বিষাক্ত ক্যামিক্যাল ব্যবহারের নজিরও রয়েছে। রেণু আহরণ সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ মাত্রাতিরিক্ত করেছে এবং প্রাণী চক্রকে সংকটাপন্ন করেছে।

চাষ না করে ওয়াইল্ড সোর্স থেকে মধু আহরণ, চাষ না করে মৎস্য আহরণ বা নিধন, পাখি শিকার, সুন্দরবন সহ অন্যান্য প্রাকৃতিক বন থেকে মধু, মোম, চিংড়ী পোনা, বাঘ এবং হরিনের চামড়া, মিট সহ অনেক অনেক উদ্ভিদ্য এবং প্রাণীজ সম্পদ আহরণের ন্যাচারাল এবং প্রাচীন ব্যাপারগুলো আমাদের ওয়াল্ড লাইফ, জৈব বৈচিত্র, মৎস্য প্রজনন এবং পরাগায়নের মত মৌলিক ব্যাপার গুলোকে বিষিয়ে তুলছে।গত ২-৩ দশকে বিশেষ জাল এবং বিষাক্ত ক্যামিক্যাল দিয়ে চিংড়ির রেণু সংগ্রহ করার প্রাণঘাতী পদ্ধতি সুন্দরবনের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে।

অত্যন্ত ভয়ের কথা হোল, উল্লেখিত পাঁচ চক্রের যার পর নাই অবারিত সম্পদ লুণ্ঠন এবং রেণু সংগ্রহ অব্যহত থাকলে আশে পাশের এলাকায় কোন ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র না থাকলেও শুধু রাজনৈতিক দুর্বিত্তায়িত প্রাণীজ-জলজ-বনজ সম্পদ আহরণ ভিত্তিক অগ্রসরমান ফরেস্ট পেনিট্রেশন এবং এতদসম্পর্কিত অনাচারে এমনিতেই ২০-৩০ বছরের মধ্যে সুন্দরবন হারিয়ে সাধারণ উদ্যান যাবে।

বন্দরঃ
সুন্দরবন ঘিরে ১৫০ শিল্প প্রকল্প
সুন্দরবন ধংস প্রচেষ্টায় নতুন প্রাণ দিয়েছে মংলা বন্দরের এলপিজি ভিত্তিক রি-মেইক (সরকার রান্নার গ্যাস সরবারহ থেকে সরে এসে বেসরকারি এলপিজির বাজার উন্মুক্ত করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে)। এতদিন বিপিসি এবং ৬টা বেসরকারি কোম্পানি সীমিত আকারে তাদের মংলা এবং চট্রগ্রাম ভিত্তিক নিজস্ব ছোট ছোট এলপিজি টার্মিনালের মধ্যমে আমদানি করছে তবে দেশি কোম্পানি গুলো মংলা ভিত্তিক এল পি জি হাব তৈরির মহা পরিকল্পনায় আছে, বিদেশী LPG giant LAUGFS(Srilanka) এবং TOTAL GAZ (France) ও এই পরিকল্পনায় রয়েছে। এখানে বটম লাইন হচ্ছে মংলায় স্থাপনা যত বাড়বে, সুন্দরবনে পেনিট্রেশন তত বাড়বে এবং নৌ চলাচলের কারনে প্রানীকূলের নাইট লাইফ ততই বিপর্যস্ত হবে। উল্লেখ্য মংলা কোনভাবেই একটি সমদ্রু বন্দর হবার যোগ্যতা রাখে না। অন্যদিকে মূল নৌ রুট গুলো একের পর এক সিল্টেড আপ হয়ে যাবার কারনে এবং বালু তোলা ভিত্তিক অপরিকল্পিত ড্রেজিং এর কারনে নতুন নতুন নৌ রুট তৈরি হচ্ছে, অর্থাৎ অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ রুটে পণ্য পরিবহন হচ্ছে এতে সুন্দরবনের স্বাভাবিকতা নস্ট হচ্ছে।

কয়লার মাস ট্রান্সপোর্টেশনের জন্য পায়রায় নতুন বন্দর পরিকল্পনা সুন্দরবনের জন্য নতুন আঘাত। উপরোল্লিখিত রাজনৈতিক নেতৃত্বে পাঁচ চক্রের লোকেরাই ভূমি দস্যু হিসেবে নতুন করে আবির্ভুত হয়েছে। রামপালে ভয়ংকর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমি অধিগ্রহণ এদের হাতেই। দেখা যাচ্ছে সুন্দরবন ঘিরে ১৫০ শিল্প প্রকল্প! বন এবং পরিবেশ মন্ত্রীকে এই ব্যাপারে সহনীয়ই মনে হচ্ছে কেননা সুন্দরবনের পাশের এলাকার লোক হয়ে দুর্বিত্ত অংশের নেতৃত্বে তিনিও অগ্রসর একজন।

অর্থাৎ আবাসন এবং কৃষি চাপের পাশাপাশি সুন্দরবনকে এখন ২টি বৃহৎ বন্দরের অনুকূলে গড়ে উঠা শিল্পের চাপও নিতে হবে।
উল্লেখ্য গলাচিপা নদীর (কুয়াকাটা) পশ্চিমের এলাকাকে সুন্দরবনের প্রাণ বৈচিত্র এবং পাথরঘাটার প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন খেত্রের রক্ষা কবচ বিবেচনা করে এই এলাকাকে বিদ্যুৎ এবং বন্দর অবকাঠামো , বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান সম্পর্কিত সম্ভাব্য ক্রস ড্যাম সহ সকল ম্যান মেইড স্থাপনা কিংবা নদী শাসনের বাইরে রাখার দাবি জোরালো করা দরকার। তাই প্রস্তাবিত পায়রা বন্দরকে পায়রার মোহনা থেকে সরিয়ে গলাচিপার মোহনায় স্থানান্তর এর দাবি জানাই। এতে শিল্পের পেনিট্রেশন অবকাঠামো গত ভাবে অনুন্নত বরিশাল-পটুয়াখালি-গলাচিপা-ভোলায় অবারিত হবে।

৬। ভারতীয় কয়লার সম্ভাব্য বাজার এবং কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রঃ ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে সুন্দরবনের সমূহ ক্ষতি (শব্দ পানি বায়ু co2 so2) সহ যাবতীয় দূষণ, ভারী ধাতু/হাই পারটিক্যাল নিঃসরণ, পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ঢেউ, মাস কোল ট্রান্সপোর্টেশন, প্রাণীকুলের নাইট লাইফ ক্ষতিগ্রস্ত করা, বনে ব্যাপক হিউম্যান পেনিট্রেশন ইত্যাদি) করবে তা নিয়ে বাংলাদেশের তরুণ গবেষক এবং এক্সপার্ট গণ সবাই একমত। বাংলাদেশে অন্য কোন বিষয়ে এত উচ্চ মান গবেষণা এবং ইন্টেলেকচুয়াল মুভ চোখে পড়ে না। সময় সাক্ষী থাকবে যে, বর্তমান সরকার তার নিজ দেশের নাগরিকের এই সব ইন্টেলেকচুয়াল ইফর্টকে অসম্মান করে একটি অস্পষ্ট আর্থিক চুক্তি এবং লোকদেখানো ভূয়া ইটিপীর মাধ্যমে সুন্দরবনেরই একটি সাবেক অংশে প্রাণ এবং পরিবেশের শত্রু কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ এই কেন্দ্র দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের আরো পূর্বে সরানোর স্কোপ আছে।
তবে যেহেতু কয়লার মাস ট্রান্সপোর্টেশনের জন্য সুন্দরবনের একেবারে নিকটস্থ পায়রায় একটি বন্দরই পরিকল্পনা করা হয়েছে, বুঝা যাচ্ছে রামপাল একটি সাক্সেস পাইলট হয়ে উঠলে এখানে আরো বেশি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে।

উল্লেখ্য বাংলাদেশ পাওয়ার সিস্টেম মাষ্টার প্ল্যান ২০১০ এবং ২০১৬ তে যেসব বিকল্প জ্বলানি ভিত্তিক বিদ্যুতের কথা বলা হয়েছে (এল এন জি, নিউক্লিয়ার, উইন্ড, সোলার) তা দুর্বল এবং অগণতান্ত্রিক সরকার কাঠামো, দুর্বল আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অতি দুর্নিতির কারনে সময়মত প্রস্তুত হবে না, তাই কয়লার উপর একচেটিয়া চাপ আসবে। আর ভয় এটাই যে নিজের ৬৫০০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুতের জন্য ভারতের নিজেরই যেখানে মান্সম্পন্ন কয়লা নেই (মাত্র ৪ টা ভারতীয় খনিতে আমাদের বড় পুকুরিয়ার মানের কয়লা আছে), ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূল হয়ে উঠতে পারে, নিন্ম মানের ভারতীয় কয়লার এক বিশাল বাজার। এটাই হবে সুন্দরবন ধংসের শেষ পেরেক।

সংক্ষেপে প্রাকৃতিক এবং জলবায়ু জনিত বিপর্যয়ের বাইরে সুন্দরবন ২ ধরনের মহা নির্যাতন ভোগ করছে। একটি রাজনৈতিক ভাবে মটিভেটেড শিল্প এবং লুন্ঠন চক্র, অপরটি ভয়ংকর সব পদ্ধতিতে বনজীবিদের অবারিত সম্পদ আহরণ।

অবারিত প্রাকৃতিক উৎস থেকে অনিয়ন্ত্রিত কৃষি ও মৎস্য সম্পদ আহরণ গ্রামীণ কর্মসংস্থানেরআদিম উপায় হলেও জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত হিউম্যান ইন্টারভেনশন এর কারনে প্রাণ এবং পরিবেশ এর চরম বিপর্জয়ের ঝুকির উপর দাঁড়িয়ে আমাদের আজ কর্মসংস্থানের সেসব মধ্যমকে পুনরায় ভাবনায় আনতে হবে।
বন বাঁচাতে সবার আগে বনজীবিদের বাঁচাতে হবে।পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ন দেশে কৃষি পন্য উৎপাদন পুরোপুরি প্রকৃতির উপর ছেড়ে না দিয়ে, পরিবেশ বান্ধব বাণিজ্যিক চাষাবাদ ভিত্তিক করে তুলে প্রাকৃতিক কৃষি ও মৎস্য সম্পদের উৎসগুলোকে রক্ষায় মনোযোগী হতে হবে।
বনজীবিদের বিকল্প কর্মসংস্থান বন বাঁচানোর ১ম পর্যায়।

খ। রাজনৈতিক মাফিয়াদের সনাক্ত করণ, আইনগত ভাবে প্রতিহত করন, এদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনে যাওয়া।তবে বনজীবিদের অর্থনৈতিক ভাবে প্রচণ্ড অভাবী কিংবা প্রান্তিক সমাজে রেখে এই পর্যায় ফলদায়ক হবে না।

গ। ৩য় পর্যায় হোল সকল নৌরুট সরানো, হিউম্যান পেনিট্রেশন (সম্পদ আহরণ হোক কিংবা পর্যটন) রোধ। অতিমাত্রার নিয়ন্ত্রিত পর্যটন বাস্তবায়নের ব্যাপারটা একেবারেই অনালোচিত। আমরা বাঘের আলোকচিত্র চাই না। বাঘের আন ডিস্টারবড, নিরাপদ এবং স্বাভাবিক স্থল এবং জলজ বিচরণ চাই, হরিণের বিস্তারে বনের গাছ সংরক্ষণের নিশ্চয়তা চাই।

ঘ। ৪র্থ পর্যায় হোল প্রাণঘাতি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা পোর্ট সরানো এবং মংলা বন্দরের প্রধান রুটকে চলাচলের উপযোগী করে সুন্দরবনের ভিতরের জালিকার নদীর অন্য সকল রুটের বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ করা । অন্যথায় এক থেকে দুই দশকের ব্যবধানে সুন্দরবনের আশেপাশের এলাকায় বায়ু, শব্দ এবং পানি দূষণে, পানি এবং বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ম্যানগ্রোভ এবং প্রাণী সুরক্ষার লেয়ার গুলো নষ্ট হয়ে পড়বে। বাঘ এই লেয়ারের উচ্চ স্তরে অবস্থান করছে। বাঘ শেষ হলে সুন্দরবন এর সম্পদ লূটে পুটে খাওয়া সহজ হবে।