শুধু আয় প্রাক্কলনেই কর ফাঁকির জরিমানা নয়, থাকতে হবে দালিলিক প্রমাণ: এনবিআর

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৩ - ২১:৪৫

শুধুমাত্র আয় প্রাক্কলন করলেই করদাতাদের ওপর কর ফাঁকির অভিযোগে জরিমানা আরোপ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আয়, সম্পদ, দায় কিংবা ব্যয় গোপন অথবা অসত্যভাবে আয় প্রদর্শনের মাধ্যমে কর ফাঁকি হয়েছে এমন গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ থাকতে হবে। সেই সঙ্গে জরিমানা আরোপের আগে সংশ্লিষ্ট করদাতার শুনানি গ্রহণ কিংবা শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেয়াও বাধ্যতামূলক করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিবের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আয়কর আইনের অংশ-১৯ এ উল্লিখিত সব ধরনের জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট করদাতা বা ব্যক্তির শুনানি গ্রহণ অথবা শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দেয়া বাধ্যতামূলক।

এ ক্ষেত্রে কোনো করদাতার আয়, সম্পদ, দায় বা ব্যয় গোপন অথবা অসত্য পরিমাণে প্রদর্শনের কারণে কর ফাঁকি সংঘটিত হলে আয়কর আইন, ২০২৩ এর ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, জরিমানা আরোপের আগে সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনারকে প্রথমে ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপের প্রযোজ্যতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে রায় বা করাদেশ দিতে হবে। যদি সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনার জরিমানা আরোপের প্রযোজ্যতা পান, তবে একই করাদেশে জরিমানা আরোপ করতে হবে। তবে যদি জরিমানার প্রযোজ্যতা না থাকে, সে ক্ষেত্রে কোনো জরিমানা আরোপ করা যাবে না।

এনবিআরের নির্দেশনায় চাকরি থেকে আয়, বাড়ি বা সম্পত্তি ভাড়া থেকে আয়, কৃষি আয়, ব্যবসা বা পেশা থেকে আয়, মূলধনী আয়, আর্থিক পরিসম্পদ থেকে আয় ও অন্যান্য উৎস থেকে আয়ের ক্ষেত্রে ২৭২ ধারা প্রয়োগের বিষয়টি পৃথকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উল্লিখিত কোনো খাতের আয় গোপন করা বা অসত্য পরিমাণে প্রদর্শনের মাধ্যমে কর ফাঁকি সংঘটিত হলে ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা যাবে। করদাতা যদি কোনো আয় গোপন বা অসত্যভাবে প্রদর্শন না করে কোনো করযোগ্য আয়কে করমুক্ত হিসেবে প্রদর্শন করেন, সংশ্লিষ্ট আইনগত বিধান পরিপালনে ব্যর্থ হন অথবা আইন অনুযায়ী কোনো করমুক্ত আয় করযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে শুধু এসব কারণে ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা যাবে না। পাশাপাশি নির্দেশনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, ভাড়া থেকে আয়, কৃষি আয়, ব্যবসা বা পেশা থেকে আয়, মূলধনী আয় ও আর্থিক পরিসম্পদ থেকে আয়ের ক্ষেত্রে কর ফাঁকির অভিযোগে জরিমানা আরোপের জন্য গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ থাকতে হবে।

এ ক্ষেত্রে শুধু কর কর্তৃপক্ষের আয় প্রাক্কলনের ভিত্তিতে জরিমানা আরোপ করা যাবে না। আর ভাড়া থেকে আয়ের ক্ষেত্রে কোনো সম্পত্তির যৌক্তিক ভাড়ামূল্য প্রাক্কলন করাও জরিমানা আরোপের একক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না। এ ছাড়া ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়ের’ ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এনবিআরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, আয়কর আইনের ৬৬ ধারায় উল্লিখিত অন্যান্য উৎস থেকে আয়ের কোনো খাত গোপন বা অসত্য পরিমাণে প্রদর্শনের মাধ্যমে কর ফাঁকি সংঘটিত হলে ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা যাবে। তবে গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ ছাড়া শুধু ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ প্রাক্কলন করে কোনো করদাতার বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা যাবে না।

এ ক্ষেত্রে আয়কর আইনের ৬৭ ধারা উপধারা (৩) ছাড়া অন্য কোনো উপধারা প্রয়োগের কারণে কোনো করদাতার ক্ষেত্রে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ উদ্ভূত হলে ওই আয়ের ওপর ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপের সুযোগ নেই। তবে ৬৭ ধারার উপধারা (৩) প্রয়োগের কারণে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ সৃষ্টি হলে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে ২৭২ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রেও শুধু আয় প্রাক্কলন যথেষ্ট হবে না। কর ফাঁকির অভিযোগে জরিমানা আরোপের জন্য গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য দালিলিক প্রমাণ থাকতে হবে বলে আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে এনবিআর।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নতুন এই নির্দেশনার ফলে কর ফাঁকির অভিযোগে জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে কর কর্মকর্তাদের দালিলিক প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে করদাতার বক্তব্য শোনার সুযোগ নিশ্চিতের মাধ্যমে কর প্রশাসনে জবাবদিহি ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।