উপকূলের কৃষিজমিতে লবণাক্ততায় বছরে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৭ - ০১:২০

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : মাটিতে এখন শুধু ফসলের বীজ নয়, লবণের সঙ্গেও কৃষকের লড়াই। বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯ জেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ভাবে এই লবণাক্ততার কারণে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ১৮টি উপকূলীয় জেলার প্রায় ৬৮ শতাংশ আবাদযোগ্য জমি এখন কোনো না কোনো মাত্রায় লবণাক্ততার প্রভাবে রয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে। একসময় যে জমিতে ধান, ডাল, সরিষা ও নানা ধরনের সবজি উৎপাদন হতো, তার বড় একটি অংশ এখন লবণাক্ততার কারণে কম ফলন দিচ্ছে, আবার কোথাও শুষ্ক মৌসুমে জমি পড়ে থাকছে। ২০০৯ সালের লবণাক্ত মাটির বিভিন্ন মাত্রা ১৯ জেলার ৪৯টি উপজেলায় নথিভুক্ত হয়েছিল। প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ততার কবলে পড়েছে; যার আয়তন প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার, প্রায় মুন্সীগঞ্জ জেলার সমান। সরকারিভাবে উপকূলীয় অঞ্চল সাধারণভাবে ১৯টি জেলা ও ১৪৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এসআরডিআই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে গবেষণাগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে কৃষক, জেলে, কৃষিশ্রমিক ও গ্রামীণ পরিবার বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ-এর সরাসরি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক এসআরডিআই মানচিত্রে নতুন করে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি ও মুকসুদপুর এবং যশোর সদর উপজেলাকে লবণাক্ততার মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ লবণাক্ততা শুধু উপকূলের একেবারে শেষ প্রান্তে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কিছু এলাকায় তা ভেতরের দিকেও এগোচ্ছে।
সাম্প্রতিক সরকারি গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৮টি উপকূলীয় জেলার ১৭.০৩ লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১১.৫৬ লাখ হেক্টর বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততায় আক্রান্ত বা অবক্ষয়গ্রস্ত হয়েছে। ২০০৯ সালে এই পরিমাণ ছিল ১০.৫৬ লাখ হেক্টর। অর্থাৎ ১৫ বছরে আরও প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ততার কবলে পড়েছে; যার আয়তন প্রায় এক হাজার বর্গকিলোমিটার, প্রায় মুন্সীগঞ্জ জেলার সমান। আরও দীর্ঘ সময়ের হিসাবে ১৯৭৩ সালে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮.৩৩ লাখ হেক্টর। ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০.৫৬ লাখ হেক্টরে। অর্থাৎ কয়েক দশকে লবণাক্ততার বিস্তার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
সাম্প্রতিক মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এসআরডিআই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১৮টি উপকূলীয় জেলার প্রায় ৬৮ শতাংশ আবাদযোগ্য জমি এখন কোনো না কোনো মাত্রায় লবণাক্ততার প্রভাবে রয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি; লবণাক্ত জমি মানেই পুরোপুরি অনাবাদি জমি নয়। লবণাক্ততার মাত্রা ভেদে কোথাও ফলন কমে, কোথাও বছরে একটি ফসল হয়, আবার কোথাও শুষ্ক মৌসুমে চাষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল দেশের মোট ভূখ-ের প্রায় ৩২% এবং এখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮% বসবাস করে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উপকূলীয় বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমি লবণাক্ততার কারণে শুষ্ক মৌসুমে অনাবাদি থাকার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
লবণাক্ততার অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি সাম্প্রতিক গবেষণাভিত্তিক হিসাবও সামনে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৫ সালের একটি ৎবসড়ঃব-ংবহংরহম বা দূরসংবেদন হলো; মাটিতে সরাসরি না গিয়ে স্যাটেলাইট, বিমান বা ড্রোনের মাধ্যমে দূর থেকে পৃথিবীর মাটি, পানি, কৃষিজমি, বন, লবণাক্ততা ইত্যাদির তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা। প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণা অনুযায়ী একটি আনুমানিক অর্থনৈতিক হিসাব হলো; বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণাটি কৃষি, পরিবেশ, পানি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর লবণাক্ততার প্রভাব বিবেচনা করেছে।
বিশ্বব্যাংক-ভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাটির লবণাক্ততা বাড়লে উচ্চফলনশীল ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। ৪ ডিএস/এম-এর বেশি লবণাক্ততার এলাকায় এইচওয়াইভি ধানের ফলন ১৫.৬ শতাংশ কম হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
কেন বাড়ছে লবণাক্ততা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে একটি মাত্র কারণ নির্দিষ্ট নেই। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদী-খালের নাব্যতা কমে যাওয়া এবং পোল্ডার ও জলনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমস্যার সঙ্গে লবণাক্ততার সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের কর্মকা-ও সমস্যাকে বাড়িয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ধানক্ষেতকে লবণ পানিনির্ভর চিংড়ি ঘেরে রূপান্তর করা হয়েছে। পোল্ডারের ভেতরে লবণ
মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। কৃষিজমিতে উৎপাদন কমে গেলে শুধু কৃষকের আয় কমে না। কৃষিশ্রমিকের কাজও কমে যায়। জমিতে ধান না হলে ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন, বাজারজাতকরণ সব ক্ষেত্রেই কাজ কমে। অর্থাৎ গ্রামের জমিতে কাজ না থাকলে মানুষ বিকল্প আয়ের সন্ধানে উপজেলা ও জেলা শহর, খুলনা, বরিশাল কিংবা ঢাকামুখী হতে পারে।
জাতীয় বাজেটে ক্ষতি কতটা : পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪১,২০৮.৯৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জলবায়ু বাজেট প্রায় ৫১,৭৪৬ কোটি টাকা, যার ৭৫ শতাংশের বেশি অভিযোজনমূলক কাজে রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ লবণাক্ততার বার্ষিক গবেষণাভিত্তিক ক্ষতির অঙ্ক কয়েক হাজার কোটি টাকা হলেও তা জাতীয় বাজেটের একটি পৃথক ক্ষতি হিসেবে হিসাব করা হয় না। এই জায়গায় সরকারের জন্য জেলা ও খাতভিত্তিক লবণাক্ততা-ক্ষতি হিসাব তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
জলবায়ু তহবিল কত পেয়েছে উপকূল : উপকূলীয় লবণাক্ততার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলো গ্রীণ ক্রাইমেট ফান্ড-এর অর্থায়নে ইউএনডিপি-এর জিসিএ প্রজেক্ট। প্রকল্পটির মোট মূল্য প্রায় ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং এটি লবণাক্ততায় আক্রান্ত উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর পানি ও জীবিকা সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি খুলনা ও সাতক্ষীরার পাঁচটি উপজেলায় কাজ করেছে এবং প্রায় ৬৭ হাজার পরিবারকে লক্ষ্য করেছে। এটি অবশ্য বাংলাদেশের সব উপকূলীয় লবণাক্ততা মোকাবিলায় পাওয়া মোট জলবায়ু অর্থ নয়। বরং নির্দিষ্ট একটি প্রকল্পের অর্থায়ন।
লবণসহিষ্ণু ফসল এখন সময়ের দাবি: এই পরিস্থিতিতে শুধু বাঁধ, স্লুইসগেট ও পানি ব্যবস্থাপনা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন লবণসহিষ্ণু ও স্বল্পমেয়াদি ফসলের বিস্তার। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে লবণসহিষ্ণু ধানের জাতসহ বিভিন্ন অভিযোজন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। বিআরআরআই ও বিএআরআই লবণসহিষ্ণু ও বিকল্প ফসল সম্প্রসারণে কাজ করছে। সাম্প্রতিক মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এসআরডিআই গবেষণায় লবণসহিষ্ণু জাতের পাশাপাশি আউশ-আমনের জন্য জলমগ্নতা সহনশীল জাত, ফসল বৈচিত্র্য এবং পরিকল্পিত কৃষি-মৎস্য সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। উপকূলের জন্য শুধু নতুন জাত আবিষ্কার করলেই হবে না। সেই জাত কৃষকের কাছে সাশ্রয়ী দামে পৌঁছাতে হবে, বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং বাজার তৈরি করতে হবে বলেও বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এসআরডিআই-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমীর মো. জাহিদ বলেছেন, উপকূলে লবণাক্ততার এলাকা ও তীব্রতা দুটিই বাড়ছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বড় চাপ তৈরি হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের প্রায় ১.০৫ মিলিয়ন (১০ লাখ ৫০ হাজার) হেক্টর কৃষিজমি লবণাক্ততার শিকার।
অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও সেচের মিষ্টি পানির তীব্র সংকটের কারণে প্রতি বছর আমন ধান কাটার পর (ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত) বিশাল এলাকার জমি অনাবাদি ও পতিত পড়ে থাকে। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এ সাত্তার ম-লের মতে, শুধু গবেষণায় বিনিয়োগ করলেই হবে না; গবেষণার ফল মাঠে নিয়ে গিয়ে কৃষকের ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে। বিআরআরআই-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদুর রহমানও কৃষি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। বিএআরআই-এর বিজ্ঞানী শিমুল ম-ল লবণাক্ততার কারণে ডাল ও সরিষার অঙ্কুরোদগমের সমস্যা এবং চাষ কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ২০২৬ সালের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা ৩০ বছরের ২৩১টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখিয়েছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় লবণাক্ততা শুধু কৃষি নয়; জীবিকা, স্বাস্থ্য, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, লবণাক্ততার সমস্যা ধীরে আসে, কিন্তু এর ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী। আজ যে জমিতে ফলন অর্ধেক হয়েছে, কাল সেটি হয়তো এক ফসলের জমিতে পরিণত হবে; পরশু হয়তো শুষ্ক মৌসুমে পুরোপুরি পতিত থাকবে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার প্রশ্নে তাই উপকূলকে শুধু দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও জীবিকা অঞ্চল। প্রয়োজন; লবণসহিষ্ণু নতুন ফসল, কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনা, পোল্ডার ও স্লুইসগেট সংস্কার, নদী-খাল পুনঃখনন, চিংড়ি চাষের সুশৃঙ্খল ভূমি ব্যবহার, কৃষকের জন্য অভিযোজন সহায়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে লবণাক্ততার কারণে জমি, ফসল, আয় ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত ক্ষতির একটি নিয়মিত জাতীয় হিসাব।
পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, উপকূলের জমিতে লবণ বাড়ার অর্থ শুধু একটি জমির উৎপাদন কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ—একটি পরিবারের আয় কমা, একজন কৃষিশ্রমিকের কাজ হারানো, একটি গ্রামের বাজার ছোট হয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যনিরাপত্তার ওপর জাতীয় চাপ তৈরি হওয়া। তিনি বলেন, লবণাক্ততার বিরুদ্ধে লড়াই তাই শুধু পরিবেশ রক্ষার লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াই। লবণাক্ততার বিস্তার থামানো না গেলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের খাদ্যভা-ারের অস্তিত্ব হুমকির মুখেই থাকবে। দীর্ঘমেয়াদী সমাধান, প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগই কেবল উপকূলের এই মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের উপকূলের প্রায় দুই লাখ কৃষক বাস্তুচ্যুত হবেন। জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূল অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে ধান চাষের অনুপযোগী হলে কৃষক এলাকা ছাড়বেন। নতুন একটি গবেষণার অনুমিত হিসাবে এ আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটি ও অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে এ গবেষণা করেছেন। গবেষণা প্রবন্ধটি গত ২৩ অক্টোবর নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ সাময়িকীতে ‘কোস্টাল ক্লাইমেট চেঞ্জ, সয়েল স্যালাইনিটি অ্যান্ড হিউম্যান মাইগ্রেশন ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে ছাপা হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, ঘন ঘন নোনা পানির প্লাবন ইতিমধ্যে বহু কৃষককে ধান চাষ ছাড়তে বাধ্য করেছে। কৃষক এখন ধানের জমিতে চিংড়ি বা অন্য সামুদ্রিক মাছের চাষ করছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন অধ্যাপক আইনুন নিশাত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলের নদী-খালে লবণপানি যে বাড়ছে, তার প্রমাণ আছে। তবে মনে রাখতে হবে, উপকূলে বেড়িবাঁধও আছে। বাঁধের কারণে নোনা পানি ফসলের জমিতে প্রবেশে বাধা পায়। মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে ধানের উৎপাদন কমছে, এমন উপাত্ত নেই। অন্য বিষয়টি হচ্ছে, মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার মতো জায়গা দেশে নেই। এ দেশের মানুষের নোনা পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বসবাস করার অভিজ্ঞতা আছে।
ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটির কৃষি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক জোসি চেন ও অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ভ্যালেরি মুলার উপকূলের জেলাগুলোর ১৪৭টি উপজেলার মানুষের অভিবাসনের আর্থসামাজিক উপাত্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০০৩ ও ২০১১ সালের স্যাম্পেল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন (এসভিআরএস) থেকে। তাঁরা কৃষি উৎপাদনের উপাত্ত নিয়েছেন বিবিএসের ২০০৫ ও ২০১০ সালের আয় ও ব্যয় খানা জরিপ থেকে। প্লাবনবিষয়ক উপাত্তের সূত্র যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যারোনেটিকস্ অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নাসা) উপগ্রহের তথ্য। মূলত এই তিন ধরনের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে (মডেলিংয়ের মাধ্যমে) তাঁরা বাংলাদেশের উপকূলে নোনা পানির প্লাবন, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও মানুষের অভিবাসন নিয়ে এই পূর্বাভাস দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁরা আগের কিছু গবেষণার তথ্যও বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহার করেছেন। গবেষকেরা বলছেন, তাঁরা অভিবাসনের ক্ষেত্রে লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রভাব দেখতে চেয়েছেন। প্লাবনের প্রভাব এই হিসাবের মধ্যে নেই।
গবেষকদের অনুমিত হিসাব বলছে, মাঝারি ধরনের লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে একটি খামারের কৃষি আয় বছরে ২১ শতাংশ কমে যাবে। আগামী ১২০ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের উপকূলে বসবাসকারী ১৩০ কোটি মানুষের বসতি সমুদ্রের পানিতে ডুবে যাবে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজমির ৪০ শতাংশ মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়বে। ইতিমধ্যে উপকূলের মানুষ ঘন ঘন প্লাবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করছে।
জোসি চেন যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমকে বলেছেন, অনেক কৃষক ইতিমধ্যে ধান চাষের জমি চিংড়ি বা সামুদ্রিক মাছ চাষের খামারে রূপান্তর করেছেন। চিংড়ি বা ওই সব সামুদ্রিক মাছ আধো নোনা পানিতে (ব্রাকিস ওয়াটার) ভালো উৎপাদন করা যায়।
গবেষণায় অভিবাসন বিষয়ে দৃষ্টি কাড়ার মতো তথ্য দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, জলবায়ুর প্রভাবজনিত কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ২৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। কিন্তু মানুষের বিদেশ যাওয়া ৬৬ শতাংশ কমে যাবে। বিদেশ যাওয়া কমে যাওয়ার একটি কারণ হবে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। চিংড়ি ও মাছ চাষ অনেক মানুষকে কাজ দেবে। গবেষণায় একটি চিত্রে দেখানো হয়েছে, লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের অভিবাসন হবে নিজের জেলায়। অন্য চিত্রে দেখানো হয়েছে, ৬০ হাজার মানুষের অভিবাসন হবে অন্য জেলায়। সে ক্ষেত্রে অভিবাসী মানুষ ঢাকাকে আশ্রয়স্থল হিসেবে বেশি প্রাধান্য দেবে। সেই তুলনায় উত্তরের জেলাগুলোতে অভিবাসন কম হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় ১৮ জেলার ৯৩টি উপজেলা বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। উন্মুক্ত জলাধার হ্রাস পাওয়ায় তাপপ্রবাহ বাড়ছে। এর প্রভাবে মানুষসহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবধরনের প্রাণীরা। খুলনায় ১৩ হাজারের বেশি মুরগি মারা গেছে। তাপের কারণে ঘেরে চিংড়ি মরছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, স্বাস্থ্য ও পানি খাত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ ও পরিকল্পনা জরুরি।
সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থায়ন ও সমন্বিত উদ্যোগ কৌশল শীর্ষক আলোচনা সভায় এ তথ্য জানা গেছে। সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনরা অংশ নেন।
সভায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে ‍খুব বেশি দায়ী না হলেও বাংলাদেশ অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় দিন বাস্তুহীন, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি ফসল, মৎস্য উৎপাদন কমছে। লবণাক্ততা বাড়ছে। খেটে খাওয়া মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশু স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।
সভায় আরও বলা হয়, যে কোনও নীতিগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিমত গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগী ও সংকটাপন্ন মানুষ কীভাবে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠবে বা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পেতে পারে তার সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। পরিবেশগত বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণ কমানো, বৃক্ষরাজি গড়ে তোলা, নদী-খাল, হাওড়, বাওড়গুলোর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিশেষ অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা যথা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দেশী ও আন্তর্জাতিক আইন-নীতিমালাগুলোর সমন্বয় করতে হবে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সচেতনভাবে এসব কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে।
অ্যাওসেড’র উদ্যোগে কেয়ার বাংলাদেশের সহযোগিতায় ৩০ এপ্রিল বিকাল ৫টায় হোটেল ওয়েস্টার্ন ইন খুলনায় মাল্টি-অ্যাক্টর পার্টনারশিপ’স (এমএপি’স) অন ক্লাইমেট অ্যান্ড ডিজাস্টার রিস্ক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইন্সুরেন্স (সিডিআরএফআই) প্রকল্পের  আওতায় সিডিআরএফআই প্রচারের জন্য মাল্টি অ্যাক্টর প্ল্যাটফরম এর খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক। সভায় সভাপতিত্ব করেন অ্যাওসেড’র নির্বাহী পরিচালক শামীম আরফীন। সভায় মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান।
আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বিদ্যুৎ কুমার সাহা, কুয়েট ইউআরপি বিভাগের প্রধান ড. তুষার কান্তি রায়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী  মো. সবিবুর রহমান. খুলনা ওয়াসার প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জি এম মোস্তাফিজুর রহমান, মৎস্য দফতরের কর্মকর্তা রাজ কুমার বিশ্বাস, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন, পানি অধিকার কমিটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির ববি, পরিবেশ দফতরের সহকারী পরিচালক মো. ইমদাদুল হক, প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ডেপুটি চিফ ড. মো. নজরুল ইসলাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি আসিফ আহমেদ, বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের মো. জুবায়ের হোসেন প্রমুখ।
আলোচনা সভা শেষে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়রকে প্রধান করে একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করা হয়। সভায় অংশ নিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সেটা আমরাও জানি, বিশ্ব নেতৃত্বও জানে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বাঁচা ও সুরক্ষা নিয়ে ভাবছি, পরিকল্পনা নিচ্ছি ও কাজ করছি। ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা ৫৪টি নদীর ফয়সালা না হলে এর প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। পানিপ্রবাহ না থাকায় নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা কাজ করে এক ফসলির জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন করছি। কিন্তু পানি সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। কারণ উজানের পানি নাই। সাগরের পানির ওপর ভরসা করায় লবণের মাত্রা বাড়ছে।’
সুন্দরবন সুরক্ষায় ঘষিয়াখালী খাল খনন করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যার সুফল এখন আমরা পাচ্ছি পুনঃখননের মাধ্যমে। ৫৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৩টি খাল খনন করা হয়। কিন্তু সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। নিয়মিত খনন করতে হয়। উজানের পানি প্রবাহ আনতে ৫৪ নদীর সমাধান দরকার।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি আছে কৃষি ও পানির ওপর। ফ্রেশ পানি হ্রাস পাওয়ায় মাছ চাষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক। ফলে মাছের স্বাভাবিক উৎপাদনও বাঁধাগ্রস্ত। বৃষ্টি কমছে। তাপমাত্রায় পরিবর্তন হয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টি নিয়েও শঙ্কা বাড়ছে। লবণাক্ততা বাড়ছে। নওয়াপাড়া পর্যন্ত মিষ্টি পানি পাওয়া যেতো। এখন সেখানে লবণ পানি পৌঁছে গেছে। খাদ্য উৎপাদনের ওপরও প্রভাব দৃশ্যমান। যা উদ্বেগের বিষয়। মানব স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য মিটিগেশন ও অ্যাডাপটেশনের ওপর জোর দিতে হবে। সোসিও ইকোনমিক পলিসির ওপর পরিবর্তনের ওপর ফোকাস করে অ্যাডজাস্টের দিকে নজর দিতে হবে। ঝুঁকিগুলো শনাক্ত ও হ্রাস করার ওপর জোর দিতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার বিদ্যুৎ কুমার সাহা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কোন ফান্ড নেই। নিজস্ব উদ্যোগে পানি ব্যবস্থাপনায় কাজ করছি। আগে তদারকি করতেন খালাসী। তাই সমস্যা হলে দ্রুত কবর আসতো। এখন ব্যবস্থাপনা কমিটির করতে হয়। কিন্তু নজরদারি দুর্বল হওয়ায় খবর পেতে পেতে বাঁধ ক্ষতি হয়ে যায়। সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়।’
পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি মানুষ থেকে আসে মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ। এটাই আমাদের উদ্বেগের জায়গা। বায়ুমণ্ডলে কম কার্বন নিঃসরণ করতে হবে। পলিথিন উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ বেশি। আমাদের পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, দেশে ১০০ টন পলিথিন ব্যবহার হয়। যার ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়। আর বাকী ৫০ শতাংশ বাইরে থেকে আসে। এ ব্যবহার বন্ধ করতে অভিযান, জেল জরিমানা করা হচ্ছে। পৃথিবী তার কক্ষপথ পরিবর্তন করলে জলবায়ু পরিবর্তন হবে। দশমিক ৭ শতাংশ কার্বনডাই অক্সাইড মনুষ্য সৃষ্ট কারণে হয়। যা বন্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর তার সাধ্যমতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। খুলনা অঞ্চলে তিনটি মনিটরিং কেন্দ্রে বায়ু দূষণ রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’
আলোচনা সভায় বক্তারা
প্রাণী সম্পদ বিভাগের উপ প্রধান কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তাপপ্রবাহে ব্যাপক ক্ষতি। ১৩ হাজারের ওপরে মুরগি মারা গেছে। প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। হিটের সময় ছায়া স্থানে রাখা ও তিনটার আগে মুরগীকে খাবার না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
কুয়েট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ড. তুষার কান্তি রায় বলেন, ‘ময়ূর নদী ও ২২ খাল বেদখল। ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খনন কাজ চলছে। ওয়াকওয়ে করা, গাছ লাগানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্জ্য ও পলি অপসারণ করে খাল উদ্ধার করা প্রয়োজন। এখন কেবল শহরেই নয়। গ্রামেও বাড়ি করতে হলে প্ল্যান নিতে হচ্ছে। এগুলো কিন্তু পরিকল্পিত কাজেরই নিদর্শন। জলবায়ু পরিবর্তন, শহরায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আসিফ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিবর্তনে হেলদি সিটির কাজ শুরু হয়েছে। এখন ক্লিন সিটির পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর খুলনার পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান। সেচ পানির সমস্যা, তেরখাদা, ডুমুরিয়ায় জলাবদ্ধতা, কৃষি শ্রমিক স্বল্পতা, বেড়িবাঁধ সমস্যা রয়েছে। নদী ও খাল খনন করাসহ স্লুইস গেট সংস্কার করা প্রয়োজন। খাল ইজারা মৎস্য চাষীদের দেওয়ায় কৃষকরা পানি পায় না। কিন্তু সরকার নামমাত্র রাজস্ব নেয়। একই রাজস্বে প্রকৃত কৃষক পেলে ফসল উৎপাদন বাড়বে। খালেও পানি প্রবাহ গতিশীল থাকবে। জলাধার থাকতে হবে। জলাধার নেই বলেই হিট ওয়েভও বাড়ছে।’
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়নের জিএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকৃতিকে বাঁধাগ্রস্ত করলে প্রকৃতি সেভাবেই ফিড ব্যাক দেবে। ১৯৭৩ সালে জরিপে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততা পাওয়া যায়। ২০০০ সালের জরিপে লবণাক্ততার মাত্রা ১ লাখ ২০ হাজার ৭৫০ হেক্টর। ২০০৯ সালের জরিপে লবণাক্ততা ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬০ হেক্টর। ২০২১ সালের জরিপের ফলাফল আগামী নভেম্বরে প্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ জমি লবণাক্ত হয়। ২০০০ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লবণাক্ত হয় ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি। উপকূলীয় ১৮ জেলার ৯৩টি উপজেলা লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়।’
তিনি বলেন, মার্চ মাসে ৯ দশমিক ৭৭ ডেসিবল ছিল লবণাক্ততা, যা এপ্রিল মাসে ২৩ দশমিক ৭৭ ডেসিবলে উন্নীত হয়। বৃষ্টি কমলে বেড়ে যায়। আগে আমন চাষের পর জমি পতিত থাকতো। এখন ভুট্টা, সূর্যমুখীসহ লবণসহিষ্ণু ধান চাষ হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে উপকূলীয় ১৮ জেলার ৯৩টি উপজেলা বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততার কবলে পড়েছে। দিন দিন উন্মুক্ত জলাধার কমে যাওয়ার কারণে তাপপ্রবাহ বাড়ছে। আর এর প্রভাবে মানুষসহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণীকূল। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, স্বাস্থ্য ও পানি খাত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ ও পরিকল্পনা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশ খুব বেশি দায়ী না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় দিন দিন বাস্তুহীন ও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি ফসল, মৎস্য উৎপাদন কমছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। যে কোনো ধরনের নীতিমালা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিমতকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় আনতে হবে। ভুক্তভোগী ও সংকটাপন্ন মানুষ কীভাবে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে উঠবে বা কীভাবে ক্ষতিপূরণ পেতে পারে সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। সুস্থ্য জীবনযাপনের জন্য পরিবেশগত বায়ু, পানি ও শব্দ দূষণ কমানো, বৃক্ষরাজি গড়ে তোলা, নদী-খাল, হাওর, বাঁওড়গুলোর পানিপ্রবাহ নিশ্চিত, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিশেষ করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ এবং ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা যথা সম্ভব।