সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : প্রকৃতিজগতের সঙ্গে মানবসভ্যতার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতি ও প্রাণী জগত পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক সাম্রাজ্যের এবং মানবসভ্যতার ভারসাম্য সুরক্ষায় জগতের প্রতিটি প্রজাতি পৃথকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিটি জীবই কোনো না কোনোভাবে পরিবেশের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে। এক্ষেত্রে বনভূম
প্রকৃতিজগতের সঙ্গে মানবসভ্যতার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতি ও প্রাণী জগত পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক সাম্রাজ্যের এবং মানবসভ্যতার ভারসাম্য সুরক্ষায় জগতের প্রতিটি প্রজাতি পৃথকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিটি জীবই কোনো না কোনোভাবে পরিবেশের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে। এক্ষেত্রে বনভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মহান আল্লাহ কুদরতি হাতের ছোঁয়ায় আমাদের চারপাশে গড়ে উঠেছে সবুজ উদ্যানে তৈরি সৌম্য-শান্ত ও সজীব পরিবেশ। ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছগাছালি, রং-বেরঙের পাখিদের কলতান, নিরবধি বয়ে চলা ঝরনা-নদী এসবই বান্দার প্রতি আল্লাহর বিশেষ দান ও নেয়ামত। আমাদের বেঁচে থাকার মূল উপাদান গাছপালা ও সবুজ বনাঞ্চল। মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে প্রয়োজন নির্মল বায়ুর। আর তার পুরোটাই আসে গাছপালা ও বনাঞ্চল থেকে। প্রাণিকুলের এই অমোঘ প্রয়োজন পূরণার্থে মহান আল্লাহতায়ালা পৃথিবীজুড়ে প্রয়োজনেরও অধিক সৃষ্টি করেছেন নানা ধরনের বৃক্ষরাজি। প্রাণিকুলের বসবাসের জন্য রেখেছেন আলাদা বনভূমি। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে থাকি পরিমাণমতো, সেগুলোকে আমি জমিনে সংরক্ষণ করি এবং আমি তা অপসারণ করতে সক্ষম। সে পানি দিয়ে তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙুর বাগান সৃষ্টি করছি। তোমাদের জন্য এতে প্রচুর ফল আছে এবং তোমরা তা থেকে আহার করে থাকো।’
কোরআনে আরো বলা হয়েছে, আমি ভূমিকে বিস্তৃত করেছি এবং তাতে ফলিয়েছি সর্ব প্রকার নয়নাভিরাম উদ্ভিদ। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং এর দ্বারা বাগানে শস্য উৎপাদন করি। যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয়। আল্লাহ আরো উল্লেখ করেছেন, তার নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখবে অনুর্বর পড়ে আছে। আমি যখন বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন তা শস্য-শ্যামলতায় ভরে ওঠে ও স্ফীত হয়। নিশ্চয় যিনি একে জীবিত করেন, তিনি জীবিত করবেন মৃতদেরকেও।
উল্লেখিত আয়াতগুলোর দ্বারা মহাশক্তিশালী আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। এর সঙ্গে এটাও বোঝা যায়, মানুষের প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণ বৃক্ষরাজি তাদের কল্যাণার্থেই সৃষ্টি করেছেন। এ সম্পর্কে মহাবিজ্ঞানময় গ্রন্থ পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী স্থাপন করেছেন এবং প্রত্যেক ফলের মধ্যে দু দু প্রকার সৃষ্টি করে রেখেছেন। তিনি দিনকে রাতের দ্বারা আবৃত করেন। এতে তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা চিন্তা করে। জমিনে বিভিন্ন শস্যক্ষেত্র রয়েছে, যা একটি অপরটির সঙ্গে মিলিত আর কিছু মিলিত নয়।
অথচ এগুলোকে একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়। আর আমি স্বাদে একটিকে অপরটির চাইতে উৎকৃষ্টতর করে দিই। এগুলোর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করেন।’ হাদিসেও বৃক্ষরাজির উপকারিতা সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যেকোনো মুসলমান ফলবান গাছ লাগাবে, আর তা থেকে কেউ খেয়ে ফেলবে বা চুরি করবে অথবা বন্য জন্তু বা পাখি খাবে, তা হবে দানস্বরূপ। আর কেউ বলে কিছু নিয়ে খেলেও তা তার জন্যও দানস্বরূপ হবে।’
মানবকল্যাণের প্রয়োজনে বৃক্ষ ও বনাঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃক্ষরাজি। মানুষ ও পশুপাখির আহার্য উৎপাদন হয় গাছপালা থেকে। ফলদ গাছগুলো থেকে আমরা পুরো বছরই পাই নানা ধরনের সুমিষ্ট ফল। মানুষ ও পাখিরা সে ফল খেয়ে জীবন ধারণ করে। পশুপাখি ও কীটপতঙ্গের নিরাপদ বসবাসের জন্য চাই ঘন ও গভীর বনাঞ্চল। গাছপালা-তরুলতা পরিবেশকে সজীব ও সুন্দর রাখে। গাছপালা না থাকলে জমিন হয়ে পড়ে রুক্ষ। একসময় তা মরুভূমিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। বন গভীর হলে জীবজন্তু ও পাখিদের বসবাস বৃদ্ধি পায়। নির্ভয়ে তারা বিচরণ করতে পারে বনে। ঘর নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরিতে প্রয়োজন শক্ত ও মজবুত কাঠের। বিভিন্ন কাঠের গাছ আমাদের সে প্রয়োজন পূরণ করে। প্রতিদিনের জ্বালানির চাহিদা মেটাচ্ছে বনাঞ্চল। শিলকড়ই, মেহগনি, শাল এর মধ্যে প্রধান। প্রতিবছর সুন্দরবন থেকে আসে খাঁটি মধু। নিরাপদ বনভূমি না থাকলে খাঁটি মধুর কল্পনাও করা যেতো না।
জীবজন্তু এবং প্রাকৃতিক বিপর্যায় রোধে বৃক্ষ ও বনভূমির বিকল্প নেই। গাছপাল নিয়মিত কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে বিনিময়ে অক্সিজেন ত্যাগ করে প্রাণী জগতের প্রভূত উপকার করছে। একটি বৃক্ষ নিয়মিত প্রায় ১৩ কেজি কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখে। এর সঙ্গে বৃক্ষরাজি আমাদের জীবন ধারণের জন্য ৬ কেজি বিশুদ্ধ অক্সিজেন বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। বৃক্ষ আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারণ, গৃহস্থালি, আসবাবপত্র, যানবাহন, শিল্প-কারখানা, কৃষি যন্ত্রপাতি, ওষুধ, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক শোভাবর্ধন ইত্যাদির জোগান দিয়ে অনেক উপকার করছে। বনাঞ্চল ভূমি ক্ষয়রোধ, পরিবেশ রক্ষা, মাটির উর্বরতা ও শক্তি বৃদ্ধি, বৃক্ষ সমৃদ্ধ এলাকাতে বৃষ্টিপাত, বানভাসি, ঝড়-ঝঞ্জা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধসহ মানব সম্প্রদায়কে নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় হতে রক্ষা করে। সমগ্র বিশ্বের ভৌগোলিক আয়তনের এক-তৃতীয়াংশই বনাঞ্চল। বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বৃহদাকার জীবজন্তুর আবাসভূমি এ বনাঞ্চলসমূহ। মানব সমাজকে অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে নানাভাবে সহায়তা করা ছাড়াও তা পরিবেশকে রাখে দূষণমুক্ত। এর সঙ্গে জলবায়ুর উপাদান যেমন উষ্ণতা, বৃষ্টি বর্ষণ, আর্দ্রতা ইত্যাদির ওপর প্রভাব বিস্তার করে বৃক্ষরাজি আবহাওয়া ও জলবায়ুকে বহু পরিমাণে মানবসমাজের অনুকূল করে তোলে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কিছু স্বার্থান্বেষী ও লোভী মানুষের লালসার মুখে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বৃক্ষরাজি ও বনাঞ্চল। যে পরিমাণে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে, সে তুলনায় রোপণ হচ্ছে না। যার ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অনাবৃষ্টি ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব দুর্যোগে ক্ষয় হচ্ছে ভূমি। জাতিসংঘের প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন কারণে এক কোটি সত্তর লাখ হেক্টর বনাঞ্চল ভূপৃষ্ঠ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বনভূমি, পাহাড়, হ্রদ, নদী ইত্যাদি বনাঞ্চলের ধ্বংসযজ্ঞে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে মানবসমাজ। বর্তমানে বিশ্ব ভূখণ্ডের মাত্র ত্রিশ শতাংশে বনভূমি রয়েছে। বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটি হেক্টর বনভূমি ধ্বংস হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য কোনো দেশের মোট ভূমির ৩৩ শতাংশ বনভূমি থাকা উচিত। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে দেশের আয়তনের ২৪ শতাংশ বনভূমি ছিলো। ১৯৮০-৮১ খ্রিষ্টাব্দে তা কমে হয় ১৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং বর্তমানে মাত্র ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বনভূমি রয়েছে। এ আশঙ্কাজনক ঘাটতির কারণ হলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিবিধ প্রয়োজন মেটানো। এর মধ্যে কৃষিজমির সম্প্রসারণ, বসতবাড়ি স্থাপন, শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার, গৃহ নির্মাণসামগ্রী ও আসবাবপত্রের ব্যবহার, রাস্তা, বাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ, জ্বালানি হিসেবে ব্যাপক ব্যবহার, নগরায়ণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত কারণগুলোর মধ্যে জ্বালানি হিসেবে বনজসম্পদের ব্যবহার ৯৫ শতাংশ দায়ভার বহন করে। এ ছাড়া নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন-বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বৃক্ষের ব্যাপক ক্ষতি করে। অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ প্রয়োজনে বৃক্ষ সংকট এক প্রকট সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। যেকোনো দেশের ভৌগোলিক আয়তনের ৩৩ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা যদিও প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশে আছে মাত্র সাত-আট শতাংশ। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রায় ১ লাখ গাছ ধ্বংস হয় বলে এক সমীক্ষায় প্রকাশ পেয়েছে।
জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতিনিয়ত বৃক্ষ নিধনের প্রভাব পুরো পৃথিবীতে পড়ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুই মেরুর বরফ গলে যাচ্ছে। বৃষ্টিপাতর মাত্রা কমে যাচ্ছে। সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে একসময় উপকূলেরর অঞ্চলগুলো চলে যাবে সমুদ্রের গভীরে। এগুলো নিশ্চয় চিন্তার বিষয়। এভাবে প্রতিনিয়ত বৃক্ষ নিধন হলে দেশ একসময় মরুভূমিতে রূপান্তরিত হবে। বিলীন হয়ে পড়বে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা বনাঞ্চল ও তাতে বসবাসরত প্রাণিকুল। তাই আসুন, পরিবেশবান্ধবে আমরা প্রত্যয়ী হয়ে বৃক্ষ নিধন রোধ করি এবং বৃক্ষ রোপণে জনমত তৈরি করি।
বাংলাদেশের সংরক্ষিত বনভূমি যেভাবে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে, তা জাতির জন্য অশনিসংকেত। সংরক্ষিত বনভূমি সুরক্ষার দায়িত্বে সরকারি কর্ম কর্তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ! তাই এই বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি দেয়া আবশ্যক। হাজার কোটি নতুন চারা গাছ লাগিয়ে কোন সুফল পাওয়া যাবে না, যদি না সংরক্ষিত বনভূমিকে যথাযথভাবে সুরক্ষা করা না যায়। কারণ, চারাগাজ রোপণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য সুরক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাই মানবসভ্যতার স্বার্থে পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য সুরক্ষার জন্য সংরক্ষিত বনভূমির সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা আবশ্যক।মানুষসহ সমগ্র প্রাণীজগতের প্রতি প্রকৃতির অমূল্য অবদান অরণ্য। অরণ্যের ইংরেজি প্রতিশব্দ (ফরেস্ট)। শব্দটি মূল লাতিন ভাষার শব্দ ‘ফরেস’ থেকে এসেছে। এর অর্থ হচ্ছে ‘আউটসাইড’। এ ‘আউটসাইড’ শব্দটি গ্রামের সীমা নির্দেশ করে। যেখানে অনাবাদি জমি মনুষ্য বসতি অঞ্চলেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কাঠ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট এক অঞ্চল হিসেবেও এতে সংজ্ঞায়িত করা যায়। সমগ্র বিশ্বের ভৌগোলিক আয়তনের এক-তৃতীয়াংশই বনাঞ্চল। বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বৃহদাকার জীবজন্তুর আবাসভূমি এ বনাঞ্চলসমূহ। মানব সমাজকে অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হওয়ার ক্ষেত্রে নানাভাবে সহায়তা করা ছাড়াও তা পরিবেশ দূষণমুক্ত করে রাখে। উপরন্তু জলবায়ুর উপাদান যেমন উষ্ণতা, বর্ষণ, আর্দ্রতা ইত্যাদির ওপর প্রভাব বিস্তার করে অরণ্যগুলো আবহাওয়া তথা জলবায়ু বহু পরিমাণে মানব সমাজের অনুকূল করে তোলে। শুধু কি এটাই? অরণ্যরাজি পাহাড়ি অঞ্চলের পাদদেশে পানি প্রবাহের ধারাও নিরবচ্ছিন্নভাবে ধরে রাখে। বনাঞ্চলের উপকারিতার শেষ নেই। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের কথা, প্রকৃতি প্রদত্ত এ অমূল্য সম্পদের সংকোচন ঘটছে দ্রুতহারে আমাদের দেশে।
জাতিসংঘের প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে বিভিন্ন কারণে এক কোটি সত্তর লক্ষ হেক্টর বনাঞ্চল ভূপৃষ্ঠ থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। সবুজভূমি, মরুভূমি, পাহাড়, পুকুর, হ্রদ, নদী, সাগর ইত্যাদির মতো বনাঞ্চল ও বাস্তুতন্ত্রও ধ্বংসযজ্ঞে সক্রিয় তথা প্রধান ভূমিকা নিয়েছে মানব সমাজ। বর্তমানে বিশ্ব ভূখন্ডের মাত্র ত্রিশ শতাংশে বনভূমি রয়েছে। বিশ্বে প্রতি বছর ১ কোটি হেক্টর ক্রান্তীয় অরণ্যভূমি ধ্বংস হয়।
যে কোনো দেশের ভৌগোলিক আয়তনের শতকরা ৩৩ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন যদিও বাংলাদেশে আছে মাত্র ৭/৮ শতাংশ। এ পরিমাণ হ্রাস পাওয়াটা নিঃসন্দেহে চিন্তাজনক বিষয়। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় দেশে প্রায় ১ লক্ষ গাছ ধ্বংস হয় বলে এক সমীক্ষায় প্রকাশ। যখন-তখন বনাঞ্চল সংহার করার ফলে অন্যান্য কুফলের সঙ্গে মরুভূমির সম্প্রসারণ ঘটছে। ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সময়কালে বিশাল বনাঞ্চল কেবল মানুষের লোভে ধ্বংস হয়েছে। চাষাবাদ, শিল্পায়ন, নগরায়ণ এ তিন কারণই মুখ্যত বনভূমি ধ্বংসের জন্য দায়ী। আর এক্ষেত্রে কৃষির জন্য সর্বাধিক হারে বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। কৃষিকাজের সম্প্রসারণ বনভূমি ধ্বংসের জন্যও দায়ী।
দ্রুতহারে অরণ্যাঞ্চল কমে আসার কুফল মানব সমাজ ইতিমধ্যেই ভোগ করছে। আধুনিক মানব সভ্যতাকে গতি প্রদান করার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে বনভূমির। কিন্তু অরণ্যসমূহের প্রতি মানুষ যে অন্যায় আচরণ করছে তা একদিন মানব সভ্যতার প্রতি হুমকির সৃষ্টি করবে। বায়ুমন্ডলে অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য রক্ষায় বৃহৎ পরিমাণের সবুজ গাছ-গাছালি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ভূ-মন্ডলের উত্তাপ বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিন হাউস গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বায়ুমন্ডলে বেড়ে গেছে। দ্রুতহারে বনানী ধ্বংস হয়ে যাওয়া এর অন্যতম কারণ। ভূ-মন্ডলের উত্তাপ বেড়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং এর ফলে প্রকৃতির বিভিন্ন পরিবর্তন বিজ্ঞানীমহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
অরণ্য পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কম করে তা নয়, অন্যভাবেও সহায়তা করে। প্রকাশিত দুটি তথ্যেই এর প্রমাণ মেলে। ২.৫ একর বিশিষ্ট একটি বনাঞ্চল বায়ুমন্ডলের প্রায় ৪ টন পরিমাণের ধুলো শোষণ করতে পারে। এ ছাড়া একটি ঘন অরণ্যভূমি বছরে প্রতি একর জমিকে গ্রাস করতে পারে এমন ০.১৬ টন সালফার-ডাই-অক্সাইড অপসারণে সমর্থ হয়। আমরা সবাই জানি, সালফার-ডাই-অক্সাইড এক ধরনের দূষিত গ্যাস। শব্দদূষণ রোধের ক্ষেত্রেও অরণ্যের ভ‚মিকা রয়েছে। গাছ শব্দের তীব্রতা ১০ থেকে ১৫ ডেসিবল কমাতে পারে।
ভূমিস্খলন রোধ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, মরুভূমির বিস্তার রোধ, মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, জলবায়ুর উপাদান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জলবায়ু, আবহাওয়া, মানুষ তথা অন্যান্য প্রাণীক‚লের অনুক‚লে রাখা ইত্যাদি বহু সুফল ছাড়াও ঔষধিগুণ বিশিষ্ট প্রায় ১০,০০০ উদ্ভিদ অরণ্যে পাওয়া যায়। গাছপালা নিধনের ফলে আমরা যে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মারছি তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
অরণ্যঘেরা কোনও এলাকার বায়ু আর্দ্র অবস্থায় থাকে। অন্যদিকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ বায়ুপ্রবাহের উষ্ণতা স^াভাবিকভাবেই শীতল অবস্থায় থাকা বনভূমির বায়ুর সংস্পর্শে কমে এবং এর ফলে বৃষ্টি হয়। এ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ফলে স্থানীয়ভাবে বর্ষণের বিতরণেও অরণ্য প্রভাব ফেলে। বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে বৃষ্টির পরিমাণ কমে অনেক সময়ে খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মরুভূমির বালিকণা, ঘূর্ণিঝড় অনেক দূর টেনে নিয়ে গিয়ে মরুভ‚মির সম্প্রসারণ ঘটায়। গাছগাছালি থাকলে মরুভ‚মির বিস্তারে বাধা পায়, কারণ বালিকণা আটকে থাকে গাছের লতাপাতায়। তা ছাড়া, বায়ুর আর্দ্রতা বাড়িয়ে মরুভূমির শুষ্ক অবস্থা সৃষ্টি হতে দেয় না। ফলে মরুভ‚মি বিস্তার লাভ করতে পারে না। অরণ্যের এ প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের প্রতি দৃষ্টি রেখেই ভারতের একমাত্র মরুভ‚মি থর মরুভ‚মির লাগোয়া অঞ্চলে ৬৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৮ কিলোমিটার চওড়া অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ করে অরণ্যের সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা এক বিরাট সাফল্য।
বাতাস ও পানির আঘাতে ভ‚মির ক্ষতি হয়। অরণ্য কিন্তু এ ক্ষতি থেকে ভ‚মিকে রক্ষা করতে পারে। আমাদের দেশে বছরে হাজার হাজার একর জমি বাতাস ও পানি দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। অরণ্য ধ্বংস হওয়ার ফলেও ভ‚মির স্খলন দ্রুত ঘটছে। অন্যদিকে জুম চাষের জন্য দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে বনাঞ্চল অনেকটা কমেছে। এতে ভ‚মিক্ষয়ের পরিমাণ বেড়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জুম চাষ নামে পরিচিত স্থানান্তরিত কৃষি পদ্ধতি বিশ্বের বিভিন্ন ক্রান্তীয় অঞ্চলে বিভিন্ন নামে প্রচলিত। জুম চাষের জন্য দেশে বছরে হাজারো হেক্টর বনাঞ্চল ধ্বংস হয় বলে এক সমীক্ষায় প্রকাশ। ক্রান্তীয় অরণ্যাঞ্চল ধ্বংসের ফলে প্রতিদিন লুপ্ত হচ্ছে মানব সমাজের প্রয়োজনীয় ১০০ ধরনের মূল্যবান বনজ সম্পদ।
বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে বনজ জীবজন্তুর আবাসভ‚মির অভাব ঘটছে এবং অনেক বন্য জীবজন্তু খাদ্যাভাব বা অন্যান্য কারণে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া ছাড়াও জনবসতিগুলোতে তারা বেরিয়ে আসার ফলে অনেক মূল্যবান মানব জীবনেরও পরিসমাপ্তি ঘটছে। হাতি, বাঘের উপদ্রবের খবরও মাঝেমধ্যে সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে। অরণ্যভূমি ধ্বংসের অন্যতম কুফল এটা।
বনাঞ্চলের উপকারিতার প্রতি লক্ষ্য রেখে এর সংরক্ষণ তথা রক্ষণাবেক্ষণের ওপর বর্তমানে যথেষ্ট সরকারি, বেসরকারি এমনকি সামাজিক ও ব্যক্তি পর্যায়েও গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে। বনানীকরণ ও পুনর্বনানীকরণের ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। সামাজিক বনানীকরণ কর্মসূচি ক’বছর আগে শুরু করেছিল সরকার। অ্যাগ্রো ফরেস্ট্রি প্রোগ্রামে এক টুকরো জমিতে চাষাবাদ, গাছ লাগানো ইত্যাদি করা হয়। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে পতিত জমির সদ্ব্যবহার হয়। এর ফলে চাষিরা শস্য ছাড়াও পশুখাদ্য, জ্বালানি হিসেবে খড়ি, ফলমূল ও কাঠ পায়।
পর্যাপ্ত বনভূমি থাকার পরও প্রতিবেশী দেশ ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম তাদের নিজ নিজ দেশের বনাঞ্চলকে সম্প্রসারিত করার প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এ সকল দেশে সামাজিক বনানীকরণ বিভাগ অ্যাগ্রো ফরেস্ট্রি, কমিউনিটি ফরেস্ট্রি, কমার্শিয়াল ফরেস্ট্রি এবং আরবান ফরেস্ট্রিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। অরণ্য সমূহের ওপর মানব সমাজের বিভিন্ন কারণে প্রয়োগ করা চাপ কম করাটা সামাজিক বনানীকরণের মুখ্য উদ্দেশ্য। বনাঞ্চলগুলোর নিবাসী মূল্যবান বন্যপ্রাণীগুলোর সংরক্ষণের জন্যও প্রণয়ন করা হয়েছে নানা কর্মসূচি। ভারত সম্ভবত বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র যেখানে ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২ প্রণয়ন করা হয়। বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও কর্মসূচির মাধ্যমে সেখানে বন্যপ্রাণী রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রোজেক্ট টাইগারের জন্য কুড়িটি জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্য বাছাই করা হয়েছে। বন্য জন্তুগুলোর প্রাকৃতিক আবাসভ‚মি অরণ্যসমূহের সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বছরব্যাপী বন মহোৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে ভারতসহ অন্যান্য দেশে।
প্রাসঙ্গিকভাবে আমি এখানে ক’টি উদাহরণ উপস্থাপন করতে চাই, আশা করি পাঠকমহল অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন যে, সততা, একাগ্রতা, আন্তরিকতা থাকলে যে কোনো মহৎ কাজে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পাওয়া যায় এবং এতে সফলতা আসে- যেমন ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রংপুর জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ারের (বর্তমান সিলেটের জেলা প্রশাসক) নেতৃত্বে ‘সবুজ তারাগঞ্জ গড়ি’ কর্ম পরিকল্পনার আওতায় ১৩৫টি রাস্তায় সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে মাত্র ১ ঘণ্টা সময়ে আড়াই লাখ গাছের চারা রোপণ করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৪৫টি ওয়ার্ডের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি, ইমাম, সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার ৩৫ হাজার মানুষ ৪৬০ কিলোমিটার রাস্তার উভয় পাশে আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা, আমলকী, মেহগনি, বকুল, কৃষ্ণচূড়া, রাঁধাচ‚ড়াসহ ৪০ প্রজাতির ফল, ফুল, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে। চারা গাছ রোপণের এ মহৎ কাজে যারা অংশগ্রহণ করেন তাদের প্রত্যেকেই রোপিত গাছের চারা বাঁচিয়ে রাখার প্রতিশ্রæতি প্রদান করে উপস্থিত জন সমাবেশে।
জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ারের মহৎ এ উদ্যোগ সকল মহলে প্রশংসিত হয়। জেলার অনেকেই বৃক্ষ রোপণের মতো মহৎ কাজে আগ্রহী হয়ে গাছের চারা রোপণে এগিয়ে আসে এবং অনেক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকেই গাছের চারা রোপণ করে তা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করে। জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, বৃক্ষরোপণ করে রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে তা বাঁচিয়ে রাখা এবং বনাঞ্চল সৃষ্টি করা এক মহৎ কাজ। তিনি এও বলেন যে, সমাজের সকল স্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে কোনো মহৎ কাজে সফলতা আসেই। আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রয়াসে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তরিকতার সাথে যদি আমরা বৃক্ষরোপণ করে রক্ষণাবেক্ষণ করি তাহলে এদেশকে সবুজে সমৃদ্ধ করা কোনো কঠিন কাজ নয় এবং এটাই হবে সবচেয়ে মহৎ কাজ, যা প্রাণীক‚লের বেঁচে থাকার জন্য একান্তই প্রয়োজন।
আমাদের পার্শ্ববর্তী ছোট্ট পাহাড়ি দেশ ভুটানের দিকে তাকাই। এদেশের জনসংখ্যা মাত্র ৩ লাখের মতো। ভুটানের রাজা জিগমে খেসর পিয়াল ও রানী জেটসুন প্রেমার ঘরে জন্ম নিয়েছে প্রথম সন্তান। এ উপলক্ষে দেশের জনগণ এক ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিয়েছে। রাজপুত্রের জন্ম উপলক্ষে বিভিন্ন প্রজাতির বিশেষ করে ফলজ ১ লক্ষ আট হাজার গাছের চারা একদিনে রোপণ করেছে দেশের জনগণ দেশের বিভিন্ন স্থানে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাজা খেসর রানী প্রেমা তাদের প্রথম সন্তান জন্ম হওয়ার ঘোষণা দেন। প্রতিটি গাছে নবজাতকের জন্য এক একটি প্রার্থনা সেঁটে দেওয়া ছিল। দীর্ঘায়ু, সুন্দর সহানুভূতির প্রতীক গাছকে বৌদ্ধ ধর্মে পবিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। গাছের চারা রোপণের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ ৮ হাজার সংখ্যাটিই মানা হয়েছিল। কেননা বৌদ্ধরা ১০৮ সংখ্যাটি পবিত্র বলে মনে করে। ৮২ হাজার পরিবার ১টি করে গাছের চারা রোপণ করেছে। গাছের চারা রোপণ করে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে, রোপিত গাছের প্রতিটি চারা রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করে বড় করে তুলবে। এতে ছোট দেশ ভুটান আরও সমৃদ্ধশালী হবে। এর আগের বছর এক ঘণ্টায় ৫৯ হাজার ৬৭২টি গাছের চারা রোপণ করে বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল এ ভূটানিরাই। উল্লেখ্য, ভুটান ছোট দেশ হলেও ফলজ ও বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ। তাদের দেশের প্রতিটি মানুষই দেশপ্রেমিক, রাজাভক্ত এবং দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ল্যাবি এইচ এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. ডাব্লিউ জামান বাংলাদেশের বন ও পরিবেশ নিয়ে এক গবেষণা করে জানিয়েছেন, দেশের সড়ক, রেলপথ, নদী, খালের দুই পাশে চা বাগানের পরিত্যক্ত ভূমি এবং টিলা পাহাড়ে পরিকল্পিতভাবে ১২০ কোটি ফলদ বৃক্ষ লাগিয়ে ১০ বছরে মাত্র ফল ও পুষ্টি ঘাটতি পূরণ করা খুবই সহজ। এতে ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হবে এই সঙ্গে ৫০-৬০ লক্ষ টন ফল বিদেশে রপ্তানি করা যাবে। পশুপাখির আগমন বাড়বে, সুন্দর হবে পরিবেশ, অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, দেশ হবে সমৃদ্ধশালী। আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকরা এ ব্যাপারে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসলে এ কাজে সফলতা খুব কঠিন ব্যাপার নয়।
যে কোনো প্রকল্পের সফল রূপায়ণের জন্য জনগণের সহযোগিতা জরুরি। সে^চ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে জনগণের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। ব্যক্তিস^ার্থ পূরণের লক্ষ্যে বনধ্বংসে লিপ্ত দুর্নীতিগ্রস্ত লোকের বিরুদ্ধে জনসাধারণের প্রতিবাদী কণ্ঠ সোচ্চার হতে হবে। সরকারকেও এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। মনে রাখতে হবে, মূল্যবান একগুচ্ছ গাছ ধ্বংস করতে বেশি সময় লাগে না, কিন্তু সে গাছ গজিয়ে উঠতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট। বৃক্ষ রোপণে জাতীয় পুরস্কার (১ম স্বর্ণপদক) প্রাপ্ত।সামাজিক বানয়ন হলো স্থানীয় দরিদ্র জনগণকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত বনায়ন কার্যক্রম যার প্রত্যক্ষ সুফলভোগীও উপকারভোগী হয়ে থাকেন। বনায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, বনজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, লভ্যাংশ বন্টন ও পুনঃবনায়ন সব কাজেই তারা ওতোপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্থ গ্রামীণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করাই সামাজিক বনায়নের প্রধান লক্ষ্য। সামাজিক বনায়নের মূল উদ্দেশ্য হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের self dependent সহায়তা করা এবং তাদের খাদ্য, পশুখাদ্য, জ্বালানী, আসবাবপত্র ও মূলধনের চাহিদা পূরণ করা। নার্সারি সৃজন, প্রান্তিক ও পতিত ভূমিতে বৃক্ষরোপণ করে বনজ সম্পদ সৃষ্টি, মরুময়তারোধ, ক্ষয়িষ্ণু বনাঞ্চল রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং সর্বোপরি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দেশের সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০০৪ কে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ২০১১ সাল পর্যন্ত সংশোধনী আনা হয়। সংশোধিত বিধিমালায় সরকারী বন ভূমিতে বনায়নের জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সামাজিক বনায়ন মূলত পল্লীর জনগণ এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক, বাস্তুসংস্থানিক ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত বনায়ন। সামাজিক বনায়নের লক্ষ্য শুধু গাছ নয়, গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীও। এ ধরনের সহায়তার লক্ষ্য শুধু গাছ লাগানো ও সেসব গাছের যত্ন নেওয়ার জন্য নয়, বরং গাছ রোপণকারীরা যাতে লাগানো গাছের সুফল পাওয়ার আগ পর্যন্ত সসম্মানে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে তারও নিশ্চয়তা বিধান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রদত্ত সামাজিক বনায়নের সংজ্ঞা হচ্ছে, বনায়ন কার্যক্রমে জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্তকরণ।
শিল্পভিত্তিক বৃহদায়তন বনায়ন এবং শুধু কর্মসংস্থান ও মজুরিভিত্তিক উন্নয়ন সহায়ক অন্যান্য ধরনের বনায়ন সামাজিক বনায়ন নয়, বরং গোষ্ঠীভিত্তিক বনায়নে উৎসাহ ও সহায়তা প্রদানকল্পে বনশিল্প ও সরকারি প্রচেষ্টায় পরিচালিত কর্মকাণ্ড সামাজিক বনায়নের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়নের ইতিহাস প্রাতিষ্ঠানিক বন সম্প্রসারণ।