মানুষের অদ্ভুত জীবন; জন্ম এবং মৃত্যু: দুই

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-১৩ - ১০:০৯

সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: জন্ম যেমন মানুষের পছন্দে হয় না মৃত্যুর সময়ও তেমন মানুষ পছন্দে বেছে নিতে পারে না। কেউ বৃদ্ধ হয়ে কেউ অল্প বয়সে। কেউ স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ অসুখে ভোগে যে কোন বয়সে মানুষের মৃত্যু হয়। কে কখন যাবে এর কোন নিয়ম নেই অদ্ভুত জীবন চলার পথে।
জন্ম নিলে মানুষ জীবনের শেষ পর্যন্ত পথ চলতেই চায়, এটাই স্বাভাবিক। যে ভাবে, যে অবস্থায়ই তার জন্ম হোক না কেন। যেমনই তার জীবন যাপনের অবস্থা হোক। মোটামুটি বেশির ভাগ মানুষের জীবন স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রক্রিয়ায়ই অবসান হয়। কিছু মানুষকে অন্য মানুষ অস্বাভাবিক ভাবে হত্যা করে। আমরা অদৃশ্যের কাছে নতুজানু হয়ে বলি এভাবেই তার মৃত্যু নির্ধারিত ছিল।
এছাড়া কিছু মানুষ ব্যাতিক্রম। তাদের কাছে জীবনটা বয়ে বেড়াতে ভালোলাগে না। তারা এই জীবনের চলার পরিসমাপ্তি নিজেরাই করে ফেলতে চায়। অভিমানে, রাগে, ভালো না লাগা থেকে বা কঠিন অবস্থার সাথে যুদ্ধ না করতে পেরে। বিষন্নতায় ভোগে অথবা কোনই কারণ ছাড়া এ জীবনে বেঁচে থাকার কোন মানে খুঁজে না পেয়ে। জীবন বয়ে নেওয়ার কোন অর্থ থাকে না আর জীবন শেষ হয়েই যাবে একদিন। আর ক’দিন বেঁচে থেকে কি লাভ; শেষ করে দেই এ জীবন। এমন ভাবনায় গলায় দড়ি দিয়ে বা মাথায় গুলি করে বা ছাদ থেকে লাফ দিয়ে, হাতের রগ কেটে, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে, রেললাইনে শুয়ে পরে বা ঘুমের ওষুধ খেয়ে কতরকম ভাবে মানুষ নিজের জীবনটাকে শেষ করে ফেলে। জীবন চলার পথের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে লাভ নেই একে শেষ করে দেওয়া দরকার।
বেশির ভাগ সময়, হতাসায় নিমজ্জিত মানুষই এই আত্মহত্যার কাজ করে। বিষন্ন হয়ে যাওয়া এই মানুষ বেঁচে থাকার কোন কারণ খুঁজে পায় না। প্রতিটি হতাস মানুষের আত্মহত্যার কারণও হয় ভিন্ন।
যদি ঠিক তাতক্ষনিক নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার ভাবনার মূহুর্তে, সেই মানুষটাকে সেই অবস্থা থেকে বের করে নিয়ে আসা যায়। তবে আবার তারা বেশ ভালোই বাকি জীবন কাটায়। কিন্তু সমস্যা হলো তাদের সেই একা ভাবার মূহুর্তে, ভয়ের বা বিষন্নতা বা রাগের মুহূর্তে, অনেক সময় তাদের সঠিক গাইডেন্স দেওয়ার কেউ থাকে না পাশে। অনেকে তাতক্ষনিক ভাবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে। কেউ কিছুদিন ধরে গভীর ভাবে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে থাকে, জীবনের কোন কুল কিনার না পেয়ে আত্মহত্যাই শেষ গতি ধরে নেয়।
তবে অনেকের মধ্যে থাকে আত্মহত্যার প্রবণতা। মানসিক ভাবে দূর্বল এই মানুষগুলো যখন তখন নিজেকে শেষ করে দেয়ার কথা ভাবে। এক সময় শেষ করেও ফেলে সুযোগ পেলেই। এদের পাহাড়া দিয়ে রেখেও অনেক সময় শেষ রক্ষা হয় না। এক ধরনের ভয়। মৃত্যুর আকর্ষণ, এদের রক্তে খেলা করে। পরিচিত কয়েকজন কিশোর, তরুণের হঠাৎ আত্মহত্যার খবরে হতবাক হয়েছিলাম, খবর জানার সাথে সাথে। সব কিছু সাজানো সুন্দর অথচ মরিবার সাধ হলো তাদের। আবার বয়স্ক কিছু মানুষের আত্মহত্যার খবর জেনেছি, পরিচিত মানুষের মধ্যেও। যারা বেশ চলতে পারত কোন ঝামেলা ছাড়া অথচ বেছে নেয় আত্মহত্যা। মনে হয় এরা তাতক্ষনিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় কোন ঘটনায়।
জীবনানন্দ দাশ এবং পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মহত্যা আমাকে মাঝে মধ্যে বেশ ভাবায়। জীবনানন্দ দাশের হয়তো হতাসা ছিল। তিনি যে আজ এত জনপ্রিয় কবি, তাঁর সময়ে তাকে ডুবে থাকতে হয়েছে অভাবে অনটনে। পরিচয়হীন হয়ে, হয়তাে হতাসায় নিমজ্জিত কবি অন্য মনস্ক পরে যান ট্রামের তলে অথবা নিজেই ইচ্ছা করে।
কিন্তু পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় তিনি তো প্রচণ্ড রকম জনপ্রিয় গীতিকার সুরকার ছিলেন তিনি কেন হঠাৎ মাঝ গাঙ্গে ঝাঁপ দিলেন। কি এমন ভাবনা ছিল তখন তার মনে। মনে হয় এই মানুষগুলো খুব বেশি আবেগ তাড়িত, ইমোশনাল হয়। জীবনের প্রতি আর কোন আগ্রহ না রেখে শেষ করে ফেলা নিজেকে খুব সহজ বিষয় না।
নাহ মানুষের মন এক মরিচীকা। কে কখন কি ভাবে যত নিষেধ বাঁধা থাকুক মানুষ আপন গতিতেই পথ চলবে। হোক সে পথ চলা নিজেকে শেষ করে দেয়া বা হতাসার পাহাড়ে ডুবে থেকেও তার ভিতর থেকে বের হয়ে আকাশে উড়া। মানুষ সবই পারে। শুধু সব কিছু নির্ভর করে সেই মানুষের ইচ্ছা শক্তির উপর প্রচণ্ড ভাবে।
উন্নত দেশ গুলোতে অনেক সংস্থা এবং রাষ্ট্রিয় ভাবে হতাসা গ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করার জন্য সুযোগ সুবিধা আছে। মানুষ যখন বিষন্ন চাইলেই সাহায্য নিতে পারে সে সব হেল্প অফিস থেকে।
বড় শহরের মাঝ দিয়ে নদী বয়ে গেছে। রাস্তার পুলের উপর উঠে মানুষ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্মা করত। পুলের দুইপাশের রেলিং দুই মানুষ সমান উঁচু করা হলো যেন মানুষ সেখান থেকে লাফিয়ে নদীতে পরতে না পারে।
ঠিক সেই জায়গায় টেলিফোন নাম্বার বড় বড় করে লেখা আছে। তুমি হতাস, আত্মহত্যার কথা ভাবছো আমাদের একটা ফোন দাও আগে। কারণটা অন্তত জানিয়ে যাও। আমাদের একটা ফোন করো। পাশে ফোনবুথও আছে পয়সা ছাড়া ইমার্জেন্সি ফোন করা যায় সেখান থেকে, আমাকে সাহায্য করো। হেল্পলাইনগুলোতে মানুষ বসে আছে কথা বলে, আশা জাগানোর জন্য। যে কথাগুলো বলার কোন লোক নাই, সে কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনবে এমন মানুষ অপেক্ষা করে আছে ফোন পাওয়ার জন্য। অথবা স্বশরীরে সামনাসামনি বসেও কথা বলা যায় নিজের জীবনের হতাসা বিষয়ে। অথচ অনেকে জেনেও সে সুযোগ না নিয়ে মৃত্যু পছন্দ করে।
গত দুবছরে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। কারণগুলো অনেক। অর্থনৈকিত সমস্যা ছাড়াও হঠাৎ করে ঘরে থেকে মানুষের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ বেড়ে যায়। এক ঘরে থাকা মানুষ এক সাথে বেশি সময় থাকতে গিয়ে ভালোবাসা না করে ঝগড়া করেছে বেশি। অনেক গুলো নতুন শেলটার খুলতে হয়েছে অত্যাচারিতদের রাখার জন্য এই করোনাকালের মহামারির সময়ে।
কথা বলে মানুষ যারা মরতে চায় তাদের সে অবস্থা থেকে বের করে আনা যায় মনস্তত্ত্ববিদরা এমনই বলেন। কিন্তু সে সুযোগটা সে উপায় সবাই পায় না বা অনেকে জেনে শুনেও সাহায্য সংস্থায় যায় না তারা মৃত্যুর পথেই হাঁটে। যখন একজন তার মন একটি নিদৃষ্ট বিষয়ে স্থির করে ফেলে তখন সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা খুব সহজ কাজ নয়। যেমন প্রেমে পরে নিজের বাড়ি ঘর চির চেনা পরিবার ছেড়ে অন্যজনের হাত ধরে চলে যায় প্রেমিক প্রেমিকা। কখনও তা ভালো হয় কখনও চুড়ান্ত খারাপ।
বিশ্বে প্রতিবছর যে পরিমাণ মানুষ আত্মহত্যা করে সংখ্যাটা এক সাথে জানলে চমকে উঠতে হয়।
“বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ সমীক্ষা অনুমান করে যে প্রতি বছর প্রায় ৮০০০০০ মানুষ আত্মহত্যার কারণে মারা যায়। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন ব্যক্তি আত্মহত্যা করছে।”
শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর খুব বেশি শোনা যাচ্ছিল করোনার আগে। পড়াশোনার এত চাপ এবং ভালো রেজাল্ট করতে না পারার আশাংকা। একাডেমিকভাবে সফল হওয়ার জন্য উচ্চ স্তরের চাপ অনুভব করে। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে একসময় আত্মহত্যা করে ফেলছে ছাত্ররা। সিস্টেম আমাদের মেরে ফেলছে প্রেসার দিয়ে। চাকরি ক্ষেত্রে হতাসা, পরিবারের চাহিদা পুরণ করতে না পারা এমন বিষয়গুলাও আত্মহত্যার জন্য দায়ী।
জাপানে এক সময় বয়স্কদের পাহাড়ের এক স্থানে রেখে আসা হতো সেটা এক ধরনের মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়া। ষাট বছর হয়ে গেছে এখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। বর্তমানে মানুষের আয়ু অনেক বেড়ে গেছে। কেউ একশর বেশি বয়স হয়েও মহা আনন্দে জীবন কাটাচ্ছে । আবার কারো জন্য জীবন বোঝা হয়ে যায় কম বয়সে।
বর্তমান সময়ে যৌথ পারিবারিক সিস্টেম ভেঙ্গে পরছে । প্রবীনরা যে জীবনে অভ্যস্থ ছিলেন সন্তান ভরনপোষন করবে সেট হচ্ছে না। নিজেকে নিজে চালিয়ে নেয়ার অবস্থা এবং সঙ্গতি থাকেনা। হতাসা গ্রস্ত অনেকেই জীবন অবসান করে আত্মহত্যার মাধ্যমে। সত্তর বছর বয়সি মানুষ সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যার হার বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। এই উচ্চ আত্মহত্যার হারের একটি কারণ বয়স্কদের মধ্যে আত্মহত্যা। ঐতিহ্যগতভাবে, শিশুদের তাদের বৃদ্ধ পিতামাতার যত্ন নেওয়ার আশা করা হয় যেহেতু এই সিস্টেমটি বেশিরভাগই একবিংশ শতাব্দীতে অদৃশ্য হয়ে গেছে, অনেক বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্করা আত্মহত্যা করে পরিবারকে মুক্তি দেয়। পরিবারের জন্য নিজে একটি আর্থিক বোঝা হয়ে থাকতে চায় না। বয়স্কদের পাশাপাশি, ছাত্রদের আত্মহত্যার হারও বেশি,পারিবারিক অশান্তি, যুগলের মনোমালিন্য ব্রেক আপের পাশাপাশি আংশিক কারণ শিক্ষা । যখন তারা শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না, তখন তারা মনে করে তারা তাদের পরিবারকে অসম্মান করেছে।
অ্যালকোহল ব্যবহার, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ এবং দুর্বল সামাজিক সম্পর্ক শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় আত্মহত্যা করার বর্তমান সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতিগুলির মধ্যে একটি হল কার্বন মনোক্সাইডের মাধ্যমে বিষক্রিয়া। আগে ছিল নদীতে ঝাঁপ দেয়া।
আমাদের দেশে কিছুদিন আগে বয়স্কলোকের ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করা সামাজিক জীবনযাপনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সাউথ এশিয়ার দেশের মতনই কঠিন বাস্তবতার প্রভাব পরছে। যা কেউ কেউ মেনে নিতে পারছে না। সহ্য করতে পারে না।
বয়স্ক কেন্দ্রে থাকা একটি অসম্মানজনক ভাবনা আমাদের দেশে। তেমন ভালো বয়স্ককেন্দ্রও নাই দেশে, যেখানে মানুষ একই সময় বযসীরা এক সাথে আনন্দে কাটাতে পারেন।
পরিবর্তন মেনে নেয়ার মানসিকতা খুব জরুরী। আজ যারা সন্তানের উপর নির্ভর করে থাকতে চান তারাই কিন্তু নিজের প্রয়োজনে পিতামাতা থেকে দূরে চলে এসেছেন। অথচ নিজের বেলায় মানতে কষ্ট হয় একা থাকা। ইউরোপ আমেরিকায় বয়স্ককেন্দ্রে বয়স হয়ে গেলে চলে যাওয়াটা অনেকেটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বয়স্ককেন্দে না গেলে নিজের বাড়িতেও নিজের মতন একা থাকতে অনেকে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। যখন বাস্তবতা সন্তানকে কাছে না পাওয়ার। তখন তারা নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেন। এরজন্য মানসিক প্রস্তুতি থাকে আগে থেকেই। তাই সমস্যা হয় না বাস্তবতা মেনে নিতে।
মৃত্যু নিয়েও অনেক বিধি নিষেধ নিয়ম আচার আছে। আত্মহত্যা করে মারা যাওয়া মানুষ, অনেক সময় শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান পান না ঠিক মতন। আবার নানা পেশার মানুষও নিগৃহিত হন, মৃত্যুর পর শেষ কৃত্যর আনুষ্ঠানিকতায়। সবটাই নির্ভর করে মানুষটির জীবন সময়ের অবস্থা এবং যে স্থানে আছেন সে এলাকার মানুষের মনোভাবের উপর। সার্বজনিন কোন সাধারন নিয়ম নাই একজন মানুষকে সমাধী বা দাহ্য করে ফেলার।
এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কত আরোও একটি পোষ্ট করব।মাঝে প্রশ্ন জাগে মনে কে আমি? হে স্বামী,কোথা হতে আমি এসেছি.কোথায় আমি যাবো? কোথা হতে এসেছি-এর উত্তর মেলে। মা বাবার অনন্ত ভালবাসার অনন্ত পিপাসায় আমার রূপের এ আদল মেলেছে। চোখের কান্না মুখের হাসি ফুটেছে। পৃথিবীর বিশালতায় অশেষ সৌন্দর্য্য দেখেছি। মা বাবার আদরের জোৎস্নায় বড় হয়েছি। জীবনে অঢেল অঢেল ভালবাসা পেয়েছি। তাদের দেয়া অনেক নামও মিলেছে। অনন্ত কান্নার সাগরে ভেসেছি। আমি কে চিনেছি। তোমরা কে জেনেছি। আমার মনু রূপ আমার কাছে উদঘাটিত হয়েছে। সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়েছি। মায়ের থেকে দূরত্ব অনুভব করেছি,মায়ের কান্না শুনেছি,নিজেও সরবে কিংবা নীরবে কেঁদেছি। এই দূরালয়ে এসে মা ও দেশকে নুতন করে বুঝেছি। উপলব্ধি করেছি অনেক সত্য, দেখেছি অনেক মিথ্যা। উদঘাটিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যার মিশ্র খেলা, মেলা বয়ে দিয়েছে বেলা। মানুষের মমতা, সরলতা,মনের বিশালতা আমায় যেমন টেনেছে তেমনি তাদের কদর্য রূপ আমায় তাদের হতে দূরে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বাস শব্দটির উপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখা দেয়। কিন্ত আবার নিজে নিজে সামলে উঠেছি এই ভেবে বিশ্বাস শব্দটি যদি হারিয়ে ফেলি আমার পথ চলা হবে বিঘ্নিত। কিছুটা বিশ্বাস নিয়ে এখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। বেড়েছে ধৈর্য্য বেড়েছে সহ্য। আগে যেমন কিছু ভাল না লাগলে প্রকাশ পেতো আমার কন্ঠে আমার সুদৃঢ় কঠোর ভঙ্গিমায়। এখন তাতে অনেকাংশে বিলুপ্তি ঘটেছে। এখন কিছু ভাল না লাগলে মনে মনেই প্রতিবাদিত হই। এই ভেবে ভাল লাগে এখনও আমি তেমন ভন্ড হয়ে উঠিনি। আমার জীবন এক মহাভারত। আমার মনে হয় মহাভারতকেও তা ছাড়িয়ে গেছে। মনে হয় প্রত্যেকেরই মহাভারত পড়া উচিত। মহা ভারত মানুষের মনে নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দেয়।

চিন্তা ও অচিন্তনীয় ঘুম এই দুইকে পাশাপাশি নিয়েই আমি চলি। যতদিন আমি জেগে থাকবো আমার জন্ম পুনঃপুনঃ হতে থাকবে। আমি নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হবো, দৃষ্টি প্রসারিত হবে, স্বপ্নালোক বিস্তারিত হবে কথা পরিমিত হবে। ভালবাসা সুনিপুনতায় রূপ নেবে। শিশুলোক হচ্ছে আমার স্বপ্নপুরী আর শিশুরা হচ্ছে আমার প্রিয় বন্ধু। ওদের ঘিরেই আমার নতুন নতুন জন্ম। ওরা আমার মধ্যে নতুন নতুন ভাষার জন্ম দেয়। সৃষ্টি করে অনন্ত ভাল লাগা। ওদের হাসি-কান্না-নড়াচড়া-তাকানো ইত্যাদি ইত্যাদি আমার মধ্যে ছন্দ সৃষ্টি করে। জাগে এক আবেগময় ভাবনা। ওদের অভিব্যক্তি নিয়ে ওদেরকে ঘিরেই আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অভিব্যক্তি। অনেক দিন আমার মধ্যে স্বপ্নের ঘাটতি ছিল। ওরা যেন কোথায় লুকিয়ে ছিল। ঠিক যেমনি করে মুক্তা লুকিয়ে থাকে ঝিনুকের মধ্যে।

আমাদের বিভিন্ন চলমানতার প্রতিরূপই হচ্ছে অভিব্যক্তি। অভিব্যক্তি ছাড়া জীবন গৌন। প্রকৃতি অভিব্যক্তি ছাড়া মৌন। আমার এগিয়ে যাওয়া সে এক অনিন্দ্য ছন্দ ওদেরকে ঘিরেই। আমার কান্না হাসি আনন্দ দুঃখ হাঁটা চলা ভালবাসা অনন্ত আশা বৈচিত্র তামাশা সবই বিভিন্ন বিভিন্ন মাত্রায় ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে এগিয়ে যায় আমার বিশ্ব ব্রহ্মান্ড। এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের খন্ড খন্ড দৃশ্য আমাদের বলা চলা লেখা দেখা শেখা এ এক অনন্ত দিক দর্শন। এই অনন্ত দিক দর্শন থেকেই আমার অভিব্যক্তি,আমার নতুন করে বেঁচে ওঠা আমার নতুন করে স্বপ্ন দেখা।

প্রত্যেক মানুষেরই স্বপ্নকে নিয়ে হাঁটা উচিত। স্বপ্নই মানুষকে সামনে এগুতে সাহায্য করে। স্বপ্নহীন মানুষ স্হবিরতায় রূপ নেয়। আমার মনে হয় সেই স্হবিরতার আরেক নাম মৃত্যু। মৃত্যু ছেলে বেলা হতে আমায় ভাবিয়েছে, আমার ডাইরীর পাতায় মৃত্যুর অবয়ব মেলে। চাক্ষুষ মৃত্যু দেখি আমার বয়স যখন পাঁচ কি ছয়। সেদিন ছিল ১৪ই আগষ্ট ১৯৬৯ কি ১৯৭০। স্কুলে গিয়েছি। যখন আমরা সারি সারি দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত পাক সার জামিন গাইছিলাম তখন আমার বাবার খালাতো ভাই আমাদের বুলু কাকা এসে হাজির। তিনি আমাদের ঝিকাতলায় অবস্হিত ১০৬/১ ধূপছায়ায়, দাদার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। শুনতে পেলাম দাদির, বাবার, বড় ফুফুর চিৎকার কান্না। সাথে বড় কাকা,সেজো কাকা, ছোট কাকা, ছোট ফুফু,মা,বড় কাকির নীরব কান্না। আমার দাদা পাড়ি দিয়েছেন মৃত্যুলোকে। খুব সকালে বাবা নাইট ডিউটি সেরে দাদাকে দেখে গিয়েছিলেন। তখনও ভাবতে পারেন নি এই তার জীবিত বাবাকে শেষ দেখা। দাদার মৃত্যু আমায় প্রথম মৃত্যুর ছায়া দেখায়,ভাবায়। তবে খুব ছোট ছিলাম বলে হয়তো খুব গভীর ভাবনায় ভরেনি আমার মন। কিন্ত দাদার বাড়িতে গেলে দাদার খালি ঘর বিছানা দেখলে আমার মনে প্রশ্ন বোধক চিহ্ন দেখা দিতো এবং তখন থেকেই আমার মন মৃত্যু জিজ্ঞাসায় উৎসারিত হয়। এর পর হারুন মামা আমার বড় কাকির ছোট ভাই যিনি আমায় বড় ভালবাসতেন, সাইকেল চড়িয়ে এখানে সেখানে নিয়ে বেড়াতেন তার আত্নহত্যা আমাকে প্রচন্ড শোকে বিমূঢ় করে দেয়। তার আত্মহত্যার পিছনের নিগুঢ় কারণ নাইবা উল্লেখ করলাম,তবে এইটুকু লিখি ভালবাসা ও অভিমান,এই দুই-ই এর পিছনে কাজ করেছিল। তার মৃত্যু বিশ্লেষণ আমার ডায়েরীর পাতা ভরিয়ে দিয়েছিল। তবে যে মৃত্যু আমার মনের ভিতরকে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেটা হচ্ছে ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্টে আমাদের জাতীয় পিতা ও তার পরিবারের নির্মম নৃশংস হত্যাকান্ড। এই মৃত্যুতে মন কিছুতে সায় দেয় না। আমার মনও পাথর নিথর হয়েছে। ৩৪ বছর এই হত্যা কান্ডের বিচার হয়নি।কিন্ত আমার মন শুধু আমার মনকে কেন পুরো জাতির মনকে আশ্বস্ত করেছে ২০০৯ এর ১৯ শে নভেম্বরের বিচারের রায়। যারা এ হত্যা কান্ডের সাথে জড়িত ছিল তাদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। এ আমাদের এক পরম প্রাপ্তি। নতুন জন্ম।

আমার বন্ধু কাশফিয়ার বাবার আকস্মিক মৃত্যুও আমার মনকে প্রচন্ড ধাক্কা দিয়েছিল। মনে আছে অঝরে কেদেঁছিলাম সেদিন। মনে মনে প্রার্থনা করেছিলাম,”হে ঈশ্বর আমাদের পরিবারের সবাই যেন এক সাথে মারা যাই তাহলে কেউ কারোর জন্যে কষ্ট পাবোনা” । ১৯৮৪ সালে আমার বন্ধু ঝুমকি রোজার ঈদের রাতের আগে রাঙ্গাঁমাটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুলোকে পতিত হয়। ও বন্ধুদের সাথে আনন্দবিহারে গিয়েছিল। কিন্ত বিনিময়ে মৃত্যু ওকে নিয়ে গিয়ে আত্নীয় বন্ধুদের শোকে বিহ্ববলিত করে। আনন্দ পরিণত হয় শোকে। ১৯৮৯ এর ১লা আগষ্ট দাদি ক্যান্সারে মারা যান। এই মৃত্যু আমি কিছুটা স্বাভাবিক ভাবে গ্রহন করি। ১৯৯১ সালে আমাদের আরেক বন্ধু এ্যাপি ঘুমের ঔষধ খেয়ে চিরন্তন ঘুমিয়ে পড়ে। টিএসসিতে ওর সাথে আমার শেষ দেখা। আমি আর অপরাহ্ণ বসে গল্প করছিলাম। ও দেখা হতেই বললো,“ ডিসেম্বরে বিয়ে, আসিস”। সাথে ছিল ওর হবু বর। প্রশ্ন জাগে ওতো ওর পছন্দের পাত্রকেই বিয়ে করেছিল তবে কেন এই ভাবে মৃত্যুকে কাছে টানা। পাত্রটিকে কম বেশী সবাই জানেন চেনেন। নামটি নাই বা উল্লেখ করলাম। ১৯৯৪ সালে ৪ঠা জুলাই,আমি তখন ডেট্রয়টে ছোট কাকার বাড়িতে, পেলাম বড় কাকার মৃত্যু সংবাদ। বাংলাদেশে থাকাকালীনই দেখে এসেছিলাম তার অসুস্হ্যতা। তাই দাদির মৃত্যুর মতই এই মৃত্যুও স্বাভাবিক ঠেকলো। ১৯৯৫ সালে ৩০শে আগষ্ট । এই দিনটিকে আমি কোনদিন ভুলতে পারবো না। দিনটি ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় আমার বাবার অকাল মৃত্যু। আমার জন্মদিন ২৮শে আগষ্টের দুইদিন পরেই এই ঘটনা ঘটেছিল। আমি জন্ম দিনের বিকেল বেলায় তাঁর জন্যে কেক ও অন্যান্য খাবার বানিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। বাবা খুব খুশী হয়েছিলেন। ২৯শে আগষ্ট বাবা অপরাহ্ণ’র হাতে আমার জন্মদিনের কার্ড পাঠিয়ছিল।তাঁর ইচ্ছে ছিল আমায় একটি ঘড়ি উপহার দেবার। কিন্ত সেই আশা পূর্ণ হয়নি। ২৯শে আগষ্টেই হয়েছিল তাঁর সাথে আমার শেষ কথা। ৩০শে আগষ্ট দুপুর তিনটায় আমার ছোট ভাই সমরুর ফোন। তখন ওর সাথে আমার মান অভিমান চলছিল। আমার এই ভাইটি বড় অভিমানী। ও অভিমান ঝেড়ে মুছে বললো “আব্বু অফিসে নেই। আমি হাসপাতালে গিয়েছিলাম।আব্বু বলেছিল আমি আসার পর আব্বুর একটি জরুরী কাজ আছে সেখানে যাবে।কিন্ত আমি অফিসে ফিরে দেখি আব্বু নেই। আমি যখন ফিরছিলাম তখন বাস থেকে দেখলাম আব্বুর মতো একজনকে কেসট্যানো মেট্রোর সামনে অক্সিজেন দেয়া হচ্ছে। তোমরা কি একটু ৯১১ এ ফোন করে দেখবে?” সাথে সাথে আমি ৯১১এ ফোন করলাম। ওরা বললো-না ওরা এমন কোন ব্যাক্তির খোঁজ এখন পর্যন্ত পায়নি। সন্ধ্যে ছয় কি সাতটায় আবার ওর ফোন। আমাদের ট্যাক্সি নিয়ে অফিসে চলে যেতে বললো। ওখানে পৌঁছাতেই ও ড্রাইভারকে জ্যাঁ-তালো হাসপাতালে যেতে বললো। দেখি ও ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি তখন পর্যন্ত জানিনা আমার জন্যে কি দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে। হাসপাতালে যেতেই আমাদের একটি রুমে নেয়া হলো। দেখলাম সাদা চাদরে ঢাকা একটি মানুষের শরীর। তৎক্ষনাৎ বুঝে ফেললাম আমার বাবা আর নেই। চাদর সরিয়ে বাবার মুখ দেখলাম।মনে হলো নির্বিগ্নে ঘুমাচ্ছে আমার বাবা। কপালে হাত রাখলাম। ঠান্ডা নিথর শরীর। এই পৃথিবীতে যে মানুষটি আমায় সবচেয়ে বেশী ভালবাসতো, ভালবাসার উষ্ণতায় ভরিয়ে রাখতো, যার কাছে আমার সমস্ত আবদার পেখম মেলতো সেই মানুষটি আমার চাক্ষুষ জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। সে এখন আমার স্বপ্নলোকের বাসিন্দা। বাবার বলা-“ডোন্ট কুইট”-এই বাক্যকে সাথে করে আমি হাঁটছি। ভবিষৎও হাঁটবো।

শুভ জন্মদিন মা (আজ ২১শে নভেম্বর)। কেমন আছো তুমি তোমার স্বর্গ লোকে স্বপ্নলোকে।তুমি সারা জীবন ঈশ্বরকে ডেকেছ ,সারাদিন সারাজীবন বাইবেল বুকে নিয়ে হেঁটে গেছো।তুমি আমাদের বাইবেল পড়িয়ে শুনাতে। বাইবেল পড়তে পড়তে তোমার দুচোবেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তো বাইবেল পড়া শেষে সব সময় পৃথিবীর সব মানুষের জন্যে প্রাথনা করতে তুমি।এমন কি শত্রু রা ও তোমার প্রাথনা থেকে বাদ পড়িনি ।বলতে -পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয়। বাবার সাথ নিশ্চয় তোমার দেখা হয়েছে ,তোমার আজকের এই দিনে বাবা তোমাকে কি উপহার দিলো? হাত তুলবো? জানি। কিশি।

তোমার চন্দ্রমুখী কপালে মমতাময় কিশি। নিথর নিঃশব্দ আলিঙ্গন সকল উপহার। তুমি তো আমার অর্ন্তলোকের অন্তমনি। বুকের মাঝে স্বর্ণখনি। তুমি আমার অশ্রুকনা,বুকের মাঝে স্বপ্নবোনা। তুমি আমায় দিয়েছ কথা অনন্ত ভাষা শিক্ষা। দিক্ষা। মা আমি তোমার অর্ন্তজলী যাত্রায় সঙ্গী হইনি। ধূপের গন্ধে সুগন্ধী করিনি তোমায় আমি। শ্বেত পাথরে বাঁধাইনি তোমার সুষমামন্ডিত শরীর। সুরমা দিয়ে দেইনি চোখে। পায়ে মাখিয়ে দেইনি আলতা। যদিও আমি ছিলাম না তোমার পাশে,শুনেছি লোকমুখেঅনন্ত শান্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো তোমার চোখে মুখে। তোমার ও বাবার মৃত্যুতে আমার নতুন করে মৃত্যুর সাথে পরিচয় ঘটলো। আমি প্রচন্ড একলা হয়ে গেলাম। নিঃশ্ব হয়ে গেলাম। প্রতিক্ষণ তোমার ও বাবার কথা মনে হয়। তোমাদের স্বপ্ন দেখি। নজরুলের কবিতা মনে হয়-“ যেদিন আমি হারিয়ে যাবো বুঝবে সেদিন বুঝবে, অস্তপারের সন্ধ্যা তারায় আমার খবর পুছবে,বুঝবে সেদিন বুঝবে”।

মানুষ মারা গেলে নাকি আকাশের তারা হয়ে যায়। আমিও আকাশের তারা দেখে মা বাবাকে খুঁজি। এরপর আমি অনেক মৃত্যু দেখি। অনেক প্রিয় মুখ খসে পড়েছে জীবন থেকে। মৃত্যুর অসংখ্যতায় এর স্বাভাবিকতা খুঁজে পাই এখন। জীবনের সবকিছুর মধ্যে মৃত্যুই সত্যি। এর থাবা সবাইকে স্পর্শ করবেই। জন্ম যেমন দেয় আনন্দ , মুত্যু তেমন দেয় কষ্ট, কান্না।একাকিত্ব। এক বুক দীর্ঘঃশ্বাস। মৃত্যু মানুষকে ভুবন লোকে অদেখা করে দেয়।
মানুষের জন্ম সবচেয়ে আনন্দদায়ক ঘটনাগুলোর একটা। কোনো পরিবারে একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা হলে সেই পরিবারের সবাই খুশি হয়: একজন নতুন মানুষ আসছে! তার জন্য কাঁথা সেলাই করা হয়, খেলনা কেনা হয়; তাকে নিয়ে সবাই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তার মা তো গর্ভকালীন পুরোটা সময়ই তাকে নিয়ে স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকেন।
কিন্তু সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, যদি দেখা যায় নতুন মানুষটি স্বাভাবিক স্বাস্থ্য নিয়ে পৃথিবীতে আসেনি। তার ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম; পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলে সে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারছে না; সে এতই দুর্বল যে মায়ের স্তন পান করার শক্তিটুকুও তার নেই। তার নতুন চোখ দুটি ঝকঝকে উজ্জ্বল প্রাণবন্ত নয়, বরং হলদে কুয়াশায় নিষ্প্রভ।
দুঃস্বপ্ন গভীর ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়, যখন নতুন মানুষটি পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলার পর ২৮ দিন পেরোনোর আগেই ফিরে চলে যায়।
হ্যাঁ, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার পরিবারে এমন ট্র্যাজেডি নেমে আসে। জন্মের ২৮ দিনের মধ্যেই তারা নতুন মানুষটিকে হারায়। কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক আয়ু মাত্র ২৮ দিন নয়। খোদ বাংলাদেশেই মানুষের গড় আয়ু এখন ৭২ বছর। সুতরাং বছরে প্রায় ৫০ হাজার নবজাতকের মৃত্যু অবশ্যই মর্মান্তিক অকালমৃত্যু; জন্মমৃত্যু নিয়ে প্রকৃতির রহস্যময় লীলা নয়। এদের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী আমরাই: আমাদের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা, খাদ্য–পুষ্টি বণ্টনব্যবস্থার অমানবিক বৈষম্য, অজ্ঞতা–অশিক্ষা–কুসংস্কারে আচ্ছন্ন জন্ম–রীতিনীতি (বার্থ রিচুয়াল), জনস্বাস্থ্য ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবার নিম্নমান, সর্বোপরি আমাদের সরকারগুলোর দায়িত্ববোধের অভাব এবং তার পরিণতিস্বরূপ প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও অনৈতিকতার চর্চা।
গত তিন দশকে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে, প্রসূতি মায়েদের মৃত্যুহার কমেছে, শিশুদের মৃত্যুর হার কমেছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি–পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির ফলে খর্বাকৃতি ও কৃষকায় শিশু জন্মের হার কমেছে। এসব উন্নতির তথ্য ও সূচকগুলো অবশ্যই সুখকর, কিন্তু সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট নয়। বরং কিছু তথ্য এখনো বেশ বেদনাদায়ক। যেমন শিশুমৃত্যুর তথ্য: এখনো বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ শিশু মারা যাচ্ছে পাঁচ বছর বয়সে পৌঁছার আগেই। প্রতি ঘণ্টায় ১১ জন। ২০১৭ সালের এক সমীক্ষার ভিত্তিতে এই হিসাব দিয়েছে ইউনিসেফ। একটা ইতিবাচক তথ্য হলো, গত ২৭ বছরে বাংলাদেশে পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইউনিসেফ বলছে, ১৯৯০ সালে এই বয়সী ৫ লাখ ৩২ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর ২০১৭ সালে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ শিশুর। শিশুমৃত্যু ঠেকানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই অগ্রগতির প্রধান কারণ দারিদ্র্য হ্রাস; নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর আয় কিছুটা বাড়ার ফলে তাদের খাদ্যাভাব ও অপুষ্টি কিছুটা কমেছে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নারীর স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে, তাঁদের পুষ্টির অভাব ঘটলে গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে না, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হতে পারে: ফলে জন্মের সময় এবং তার পরের ২৮ দিন পর্যন্ত জীবাণু সংক্রমণে ও অন্যান্য জটিলতায় তার মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। উল্লেখ্য, ২৮ দিন পর্যন্ত বয়সী শিশুদের ‘নবজাতক’ ধরা হয়; জন্মের পাঁচ বছরের মধ্যেই যে শিশুরা মারা যায়, তাদের অর্ধেকই নবজাতক। অর্থাৎ, এ দেশ প্রতি ঘণ্টায় যে ১১ শিশুর মৃত্যু ঘটছে তাদের মধ্যে প্রায় ৬ জনই নবজাতক।
নবজাতকের মৃত্যুহার কমানো বাংলাদেশের জন্য এখনো খুব বড় একটা চ্যালেঞ্জ।