বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের করণীয়

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-১৮ - ১০:২৯

সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি বাংলাদেশ। সবুজ বন, নদী, নালা ও জলপ্রপাত এদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আরো মনোরম করেছে। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রয়েছে। এরই মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নানা কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো আক্রান্ত হয়েছে জনজীবনে নেমে এসেছে নানা বিপর্যয়। বিশ্বে মানুষের যত রকম ঝুঁকি রয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণতা তার মধ্যে অন্যতম।
বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য মূলত কার্বন ডাই অক্সাইড কে দায়ী করা হয়। কিন্তু এর সাথে মিথেন, নাইট্রস অক্সাইড, ক্লোরফ্লরো ইত্যাদি গ্যাস বিশেষ ভূমিকা রাখে। গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবী ক্রমাগত উষ্ণ হচ্ছে। মানব সভ্যতার অগ্রগতি, প্রযুক্তি ও শিল্প উন্নয়নে নির্মাণকারী কারখানা, শিল্প কারখানা থেকে বায়ু মন্ডলে সি,এফ সি গ্যাস যুক্ত হচ্ছে।
মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডের ফলে বায়ু মন্ডলে এসব গ্যাস যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতায় ভূমিকা রাখছে।
১৯১৭ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে গ্রীন হাউজে ৭০ ভাগ গ্যাস বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলত এ কারনে পৃথিবী উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে। যার পরিণতি হচ্ছে ভয়াবহ। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নতুন একটি পরিবেশগত সমস্যায় পতিত হয়েছে বাংলাদেশ।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম অগ্রগণ্য। বিশ্বের বড় বড় জিসিএমগুলো আগামী শতকে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সমুদ্র সমতলের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর কোন কোন স্থানগুলো সমুদ্রতলে বিলীন হয়ে যাবে তার একটা ধারণা দিচ্ছে যার মধ্যে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ৫৭টি নদী প্রবাহ ছাড়াও দেশটির দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান। দক্ষিণের উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে তলিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের উপকূলে প্রতিবছর ১৪ মিলিমিটার করে সমুদ্রের পানি বাড়ছে। গত ২০ বছরে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৮ সেন্টিমিটার। ১৯৯০-২০০৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের সমুদ্র উপকূলের পানি মেপে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। গবেষকদের ধারণা-২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পানির উচ্চতা আরো বেড়ে যাবে এবং বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। বিশ্বে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ ৪৫ জনের মধ্যে ১ জন জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। ফলশ্রুতিতে সেখানে প্রতি ৭ জনে ১ জন উদ্বাস্তু হবে। উদ্বেগজনক তথ্য এই যে, ১৭ ভাগ এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এরই মধ্যে কুতুবদিয়া এলাকার ২০ হাজার মানুষ মূল ভূখণ্ড ত্যাগ করে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, প্রতিদিনই মানুষ নদীভাঙন তথা জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ শিকার হয়ে ঢাকায় এসে বস্তি গড়ছে। ক্ষুদ্র আয়তনের বাংলাদেশে এমনিতে বিপুল জনসংখ্যার চাপ রয়েছে। জলবায়ু শরণার্থীর সমস্যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে একথা নিশ্চিত করে বলা যায়। ঢাকার মানুষ এখন ১ কোটি ৩০ লাখ। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে এখানে বাস করেন ২৭ হাজার ৭০০ মানুষ।
২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। মানুষ তার অগ্রযাত্রায় পরিবেশ থেকে নানা উপকরণ গ্রহণ করছে প্রতিনিয়ত। পরিবেশের অনেক উপাদানই আছে যার পরিমাণ সীমিত। মানুষের অনবরত ব্যবহারের ফলে প্রকৃতির অনেক উপাদানই আজ প্রায় নিঃশেষ হওয়ার পথে যার প্রভাব পড়েছে পরিবেশের উপর। ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে বিশ্বব্যাপী। আর এতে করে পরিবেশ হয়ে উঠছে মানুষের জন্য বসবাসের অনুপযোগী। পরিবেশের নানা উপাদানকে মানুষ তার প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে যথেচ্ছ ব্যবহার করার ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী সার্বিক পরিবেশের বিপর্যয়কেই অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব পরিবেশ যে সকল হুমকির সম্মুখিন তা হলঃ গ্রীন হাউস ইফেক্ট, ওজোনস্তর ক্ষয়, মরুকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি , জৈব বৈচিত্র ধ্বংস নদ-নদীর প্রবাহ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যয় দুই বা একদিন বা দুই এক বছরে সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ বছরের পর বছর মানুষ পরিবেশকে তার প্রয়োজনে ব্যবহার করতে গিয়েই পরিবেশকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে। যার বেশির ভাগ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মত পৃথিবীর উন্নয়নশীল দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর উপর। পৃথিবীব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়ের এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে আগামী শতাব্দীতে পৃথিবী মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে।
মারাকেশ ঘোষণা : মারাক্কেশে ১৯০টি দেশের জলবায়ু সমঝোতাকারী প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বনেতারা গত বছরের সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির সময়কাল ঠিক করেছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, রাষ্ট্রগুলো ওই চুক্তি অনুমোদন করতে বছর তিনেক সময় নেবে। তবে গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেই ৪০টি দেশ প্যারিস চুক্তি অনুমোদন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে আদৌ স্বাক্ষর করবে কি না, তা নিয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যেমন চীন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) রাষ্ট্রগুলোর সংশয় ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হওয়ার আগেই নির্বাহী আদেশে ওই চুক্তি অনুমোদন দেন।
১৯৯৭ সালে প্রথম জলবায়ু চুক্তি কিয়োটো প্রটোকলে স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র তা অনুমোদন করেনি। তাই প্যারিস চুক্তির শর্তের মধ্যে ছিল, কোনো দেশ চুক্তি অনুমোদনের চার বছরের মধ্যে তা বাতিল করতে পারবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদনের পর বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন ও ভারত তা অনুমোদন করে। মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের উদ্যোগেই মারাকেশ ঘোষণা। এক পৃষ্ঠার এই ঘোষণায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে রাষ্ট্রগুলো।
সে জন্য প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে একমত হয়েছে ১৯৩টি রাষ্ট্র। ১৮ নভেম্বর ছিল মারাকেশ সম্মেলনের সমাপনী দিন। সম্মেলনের আয়োজক সংস্থা জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) ওয়েবসাইটে ওই ঘোষণা প্রকাশ করে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণকে ওই ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্ব পেয়েছে স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন। মারাকেশ ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সবুজ জলবায়ু তহবিলে রাষ্ট্রগুলোকে ২০২০ সালের মধ্যে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার আহ্বান। একই সঙ্গে এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের তাপমাত্রা যাতে আরো ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে, সে জন্য রাষ্ট্রগুলোকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়েছে ঘোষণায়।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তি : পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং এর মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সারা বিশ্বে বহুল আলোচিত বিষয়। একে পৃথিবীর নিরাপত্তার প্রতি গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নামে দেশে দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের অপরিমিত ও যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারী গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনও বেড়ে গেছে। এ দুটো কারণে আজকের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইউএনএফসিসিসির আওতায় ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ২১তম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন হয়। সম্মেলনে কনভেনশনের সব সদস্য দেশ ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি জলবায়ু চুক্তি করে, যা পরিচিত ঐতিহাসিক প্যারিস চুক্তি নামে।
প্যারিস চুক্তির দুর্বল দিক : প্যারিস চুক্তির প্রধান দুর্বলতা হলো, বিশ্বেও সব সদস্য দেশকে—বিশেষ কওে শীর্ষ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে এই চুক্তির বাধ্যবাধকতায় আনার জন্য ছাড় দেওয়া হয়েছে। দেশগুলোর মধ্যমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস, আর্থিকসহ অন্যান্য সহায়তা ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা এসব দেশ নিজেরাই নির্ধারিত করবে, যা পাঁচ বছর পর পর কনভেনশন সচিবালয়ে দাখিল করবে।
প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন হবে কবে : প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরের পর যাতে প্রক্রিয়াগত কারণে তা বাস্তবায়নে দেরি না হয়, সে জন্য ১১০টি দেশ তাতে দ্রুত স্বাক্ষর করে। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নবিষয়ক সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির সভা শুরুও হয়েছিল এবারের সম্মেলনে। যদিও কিছুক্ষণ পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বলা হয়েছে, আগামী বছর আলোচনা হবে। পরে বলা হয়েছে, আগামী দুই বছর প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের নীতি ও কাঠামো তৈরিতেই ব্যয় হবে। ধরে নেওয়া যায়, ২০২০ সালের আগে প্যারিস চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে না। আগামী দুই বছর ১১টি বিষয়ের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করে রাষ্ট্রগুলো যেসব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছবে, সে বিষয়গুলো ধরেই চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। এবারের সম্মেলনে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো হতাশ। এ পরিস্থিতিতেই মারাকেশ ঘোষণা। এর মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের অঙ্গীকার : বাংলাদেশ প্যারিসে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে অঙ্গীকারনামা (এনডিসি) জমা দিয়েছে, তাতে বলেছে, তারা নিজস্ব অর্থায়নে ৫ শতাংশ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলে আরো ১০ শতাংশ অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ কমাবে। মূলত জ্বালানি, পরিবহন ও শিল্প খাত থেকে ওই কার্বন নিঃসরণ কমানোর কথা বলেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে সারা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুর্নিঝড়, বন্যা, খরা, ভুমি কম্পন, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড় ধস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, পানির স্থর নিচে নেমে যাওয়া, অসময়ে অধিক বৃষ্টি ও অধিক খরাসহ বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে হিমালয়ের বরফ, উত্তর মেরু ও অ্যান্টাকটিকার বরফ গলতে শুরু করেছে। সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। গত ১০০ বছরে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ১৫ সেঃ মিঃ থেকে ২৫ সেঃ মিঃ। বছরে বৃদ্ধির হার ১.৫ সেঃ মিঃ থেকে ২.৫ সেঃ মিঃ। যা গত ৩০০ বছরের ১০ গুন। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা তাপমাত্রা এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী শতকে সমুদ্রের উচ্চতা বছরে বৃদ্ধি পাবে ৩০ সেঃ মিঃ থেকে ৪০ সেঃ মিঃ। এর ফলে পৃথিবীর অনেক নিম্ন অঞ্চল তলিয়ে যাবে। সূত্র মতে বৈশ্বিক উষ্ণতার ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতি বছর ৫ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করবে। পৃথিবীর ১০ ভাগ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে। বছরে প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ু মন্ডলের পুঞ্জিভূত গ্রীন হাউস গ্যাস উৎসারণে বিশ্ব উষ্ণায়নে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায় ক্রমাগত ঝুঁকি বাড়ছে। সাগরে প্রতিনিয়ত নিম্নচাপ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, কৃষিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পানি, প্রাণিসম্পদ ও নগর উন্নয়ন হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হচ্ছে এবং ভূমি, বনাঞ্চল, শিল্পবাসস্থান পশু সমস্যা প্রকট হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। উপকূলবাসীকে প্রকৃতির ঢাল হিসাবে ঘূর্ণিঝড় সিডরসহ বিভিন্ন দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে সুন্দরবন হয়েছে নিজে লন্ডভন্ড। বাংলাদেশে সংঘটিত বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ১৯৭০, ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৭, ২০০৯ সালে বন্যা ও ঝড়ে দেশের বহুলোকের মৃত্যু হয়েছে। সূত্র মতে, তাপ মাত্রা ০.৫ থেকে ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বৃদ্ধি এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন পানিতে তলিয়ে যাবে। প্রতি বছর সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা ৩ মিলিমিটার করে বাড়ছে। আইপিসিসির ৪র্থ সমীক্ষায় বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা বেড়েছে মে মাসে ১ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং নভেম্বর মাসে ০.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস। গড় বৃষ্টিপাত ও মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছে আগামী ৫০ বছরে বিশ্বের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী থেকে ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ ১ মিটার বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাবে। উপকূলীয় ১৩ জেলার ৬৩ উপজেলার ৫৬ লাখ ৩৭ হাজার ৮ শত ৭৬ একর জমি তলিয়ে যাবে। যা দেশের মোট জমির ১৫.৮ ভাগ। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে আংশিক তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এতে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস্তু হারা হবে। মানুষের জীবন ও জীবিকায় নেমে আসবে বিপর্যয়। বিপন্ন হবে উপকূলীয় অঞ্চল।
মানবসভ্যতার উন্নয়ন কাযক্রমে মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ডে আমাদের কৃষি, বনজ, পানি, মৎস্য সম্পদগুলো ও জীববৈচিত্র্য ঝুঁকিতে পড়েছে। আরো অনিশ্চয়তায় পড়বে যদি দ্রুত জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে। তাই আর চুপ করে বসে থাকলে হবে না। সবাইকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে। বিশ্ব উষ্ণায়নে যে সমস্ত গ্যাস দায়ী আমাদের অসেচতন কর্মকাণ্ডে সে সমস্ত গ্যাস সম্মেলিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিহার করতে হবে। উন্নত বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে গ্রীন হাউস গ্যাস উৎসারণ করে বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
বিশ্ব বাসিকে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য আবহাওয়া, জলবায়ু ও বিশুদ্ধ বায়ু নিশ্চিত করতে হবে। তাই দায়ী উন্নত দেশগুলোকে এর সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।
উন্নত বিশ্ব যাতে বিশ্বায়ন রোধে গ্রীন হাউস গ্যাস কমিয়ে আনতে বাধ্য হয় তার জন্য ব্যাপক বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ও অভিঘাত মোকাবিলায় ভুক্তভোগী উন্নয়শীল দেশগুলোকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদানে উন্নত দেশগুলোকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগী হতে হবে।বৈশ্বিক উন্নয়নের এই যুগে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর বিরূপ প্রভাব বিশ্বব্যাপী একটি বড়ো উদ্বেগের বিষয়। ২০১৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উষ্ণতা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকায় প্রাক্-শিল্প সময়ে প্রায় ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওপরে উঠে যায়। অন্যদিকে, বৈশ্বিক স্তরে সাগর-বরফ হ্রাস পায় ৪.১৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার; যা এযাবত্কালের রেকর্ডে থাকা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। একদিকে উষ্ণতা বৃদ্ধি অন্যদিকে হিমায়িত সমুদ্রাঞ্চল হ্রাস জলবায়ুর ওপর সৃষ্টি করছে মারাত্মক চাপ। ভূমিকম্প, সুনামি, উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় এবং বন্যা সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ বার্ষিক গড়পড়তা শত শত বিলিয়ন ডলার। কেবল দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্যই দরকার হবে বার্ষিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো, যার যোগান কোনো সহজ কাজ নয়। এ কারণেই জলবায়ুর পরিবর্তন রোধ ও ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য বিশ্বব্যাপী ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডা ২০৩০’ এ গৃহীত হয়েছে এসডিজি-১৩। যার উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি কর্মব্যবস্থা গ্রহণ করা।
এসডিজি-১৩ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব উপশমনের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর প্যারিস চুক্তিতে প্রাপ্ত উদ্যোমকে সুসংহত করার কথা বলা হয়েছে। জলবায়ুসংক্রান্ত বিপদ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ দমনে দৃঢ়তা তৈরিকল্পে শক্তিশালী প্রচেষ্টারও প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ উপশমে সাহায্য করার জন্য ২০২০ নাগাদ প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার আহরণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ফাণ্ডের মাধ্যমে জলবায়ু সম্পর্কিত দুর্যোগ উপশমে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্য করা হবে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কৌশল বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছে। ২০১৪-১৫ সালে অধিকাংশ দেশের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী মূল ঝুঁকি উপাদান উপশমে বড়ো ভূমিকা রেখেছে পরিবেশ প্রভাব পর্যালোচনা, সংরক্ষিত এলাকা নিয়ে আইন, জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প, কর্মসূচি এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকিপ্রবণ একটি দেশ। এই দেশ সাধারণত যে সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয় তার মধ্যে আছে নদীভাঙন, সাইক্লোন, খরা, টর্নেডো, শৈত্যপ্রবাহ ইত্যাদি। এ সকল দুর্যোগ জলবায়ুজনিত ঘটনাগুলোর পুনঃপুন সংঘটন ও প্রবলতা ব্যাপক বৃদ্ধি করতে পারে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরাট প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। চরমমাত্রার তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তীব্রতর বন্যা, খরা এবং বঙ্গোপসাগরে বিরাজমান উত্তাল আবহাওয়া এখন প্রায়ই নিয়মিত ঘটনা। বড়ো ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিও রয়েছে বাংলাদেশের। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হবার ফলে মানুষের জীবন ও জীবিকায় ঝুঁকি ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রভাব মোকাবিলায় সরকার গৃহীত কর্মসূচির একটি হলো ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল এবং কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসপি)’। এর আওতায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রধান জাতীয় পরিকল্পনা যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। বিসিসিএসপি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটা সার্বিক নির্মাণ কাঠামো প্রস্তুত করে এবং উন্নয়ন অর্জনে সরকারি প্রতিশ্রুত পথ সম্পর্কে ধারণা দেয়। বিসিসিএসপি হলো এমন একটা কৌশল যা পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লক্ষ্য একই রেখায় আনার একটা সূত্র হিসেবে কাজ করে। এর মধ্যে মোট ৪৪টি কর্মসূচি এবং ১৪৫টি পদক্ষেপ ছয়টি বিষয়বস্তুগত জায়গায় স্থান দেওয়া হয়েছে। বিষয়বস্তুগত দিকগুলো হলো: (১) খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য; (২) বিস্তৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা; (৩) অবকাঠামো; (৪) গবেষণা ও জ্ঞান ব্যবস্থাপনা; (৫) উপশমন ও কার্বনের নিম্ন নিঃসারণ এবং (৬) সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধি। নরওয়ের সরকারের সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশে ২০১৫ সালে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার (এনএপি) একটা রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে। এনএপি প্রক্রিয়া সম্পন্নকল্পে যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি, একটি কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিসহ এনএপি সূত্রবদ্ধকরণের নিমিত্ত একটা প্রধান দল গঠন করা।
জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলা করে এসডিজি ১৩ অর্জনে সরকারের অন্যতম আরেকটি কর্মসূচি হলো ‘জলবায়ুর পরিবর্তন এবং লিঙ্গভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (সিসিজিএপি) ২০১৩।’ এর অন্তর্নিহিত নীতি হচ্ছে রূপান্তরযোগ্য লিঙ্গভিত্তিক হস্তক্ষেপ। সিসিজিএপি তৈরি করতে গিয়ে একটা অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল দেশের ভেতর সভা এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে মতবিনিময়। এগুলোতে অংশ নেয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/সরকারি বিভাগের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন। তাছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রকাশনা, ওয়েবসাইট, সমীক্ষা এবং মুখোমুখি সাক্ষাত্কার এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমান সরকারই প্রথম দেশে Climate Change Trust Act 2010 প্রণয়ন করে এবং আইনে পরিণত করে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব উপশমন করা।
এসডিজি ১৩র লক্ষ্যসমূহ অর্জনে শেখ হাসিনা সরকারের আরেকটি কর্মসূচি হলো: Intended Nationally Determined Contributions (আইএনডিসি)। আইএনডিসির মূল কাজ অভিযোজন ও উপশমন কৌশল সাজিয়ে জলবায়ু অভিজাতসহনীয় করে তোলা। বাংলাদেশের উপশমন কৌশল বিদ্যুত্, পরিবহন ও শিল্পখাত কেন্দ্রিক। ‘যেমন আছে তেমন অবস্থায় ২০৩০ নাগাদ এই খাতগুলো থেকে নির্গত জিএইচজি (GHG) মোট নির্গমনের ৬৯ শতাংশ হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। কেবলমাত্র অভ্যন্তরীণ উত্স ব্যবহার করে ২০৩০ নাগাদ এই খাত থেকে জিএইচজি নির্গমন মাত্রা ৫ শতাংশ হ্রাস করার জন্য বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর যদি উন্নত দেশ থেকে যথাযথ পরিমাণে  যথাসময়ে সহযোগিতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে হ্রাসের লক্ষ্য ১৫ শতাংশ। এছাড়া এরই মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় ‘নির্মল বায়ু আইন, ২০১৯’ একটি আইনের খসড়া করেছে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ নিম্নোক্ত দুটো প্রকল্পের জন্য Green Climate Fund (জিসিএফ) থেকে অর্থায়ন পেয়েছে। একটি হলো ‘বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন রান্না কর্মসূচি’। এর উদ্দেশ হলো উন্নত চুলা অভিযোজনে টেকসই বাজার সৃষ্টিতে প্রতিকূলতা দূরীকরণ। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ পল্লি অঞ্চলে বাস করে যেখানে রান্না-বান্না করা হয়ে থাকে প্রধানত প্রথাগত জ্বালানি (যেমন :কাঠ, খড়, পাটকাঠি) ব্যবহার করে। রান্নার জন্য কাঠ পোড়ালে কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। নির্গত হয় মিথাইল ও ব্ল্যাক কার্বন। এই প্রক্রিয়ার ক্ষতিকর প্রভাব হিসেবে বনায়ন ব্যাহত হয় ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এসব কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রাণহানিসহ প্রায় ৫৬ হাজার দুর্ঘটনা ঘটে। বর্তমানে দেশের মাত্র তিন-চার শতাংশ খানা উন্নীত চুলা ব্যবহার করে। উন্নীত চুলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা শুধু পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য নয়; এতে করে বিদ্যমান সাপ্লাই চেইন যেমন বিস্তৃত হবে তেমনি বৃদ্ধি পাবে চাহিদাও।
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে অর্থায়ন পাওয়া দ্বিতীয় প্রকল্প হলো ‘জলবায়ু-প্রসূত লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলের বিশেষত নারীদের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি’। উপকূলীয় এলাকার জনগণ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন—সাইক্লোন, উত্তাল সমুদ্র এবং সমুদ্র স্তর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকে। ইদানীং এগুলো আরো প্রবলতর হচ্ছে। এই সমস্ত দুর্ঘটনার সূত্রে উপকূলীয় মিঠাপানিতে প্রচুর পরিমাণে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যদি অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা যায়, তা হলে মিঠাপানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব হ্রাস পাবে এবং একই সঙ্গে উপকূলীয় জনপদে যারা ঝুঁকিতে আছেন তাদের ক্ষেত্রে দুর্লভ সুপেয় পানির প্রাপ্তি ঘটবে। এরই মধ্যে জলবায়ু সহনশীল পানি সরবরাহ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা কম্যুনিটি ভিত্তিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রকল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; যার মধ্যে জিসিএফ মঞ্জুরির পরিমাণ ২৪ মিলিয়ন ডলার।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ শিল্পোন্নত দেশ থেকে অভিযোজন সম্পর্কিত অর্থায়ন প্রত্যাশা করছে। কারণ এ দেশে অভিঘাত সহনশীল কাঠামো নির্মাণ করতে হলে ভবিষ্যতে প্রচুর অর্থায়নের প্রয়োজন পড়বে। শিল্পোন্নত দেশগুলো এ ক্ষেত্রে হতে পারে বাংলাদেশের অংশীদার ও প্রয়োজনীয় অর্থের উত্স। কিছুদিন আগে স্থাপিত Green Climate Fund প্রয়োজনীয় সহায়তা দিলে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং জলবায়ু সংক্রান্ত নীতিগুলোকে মূলস্রোতে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে।
বর্তমানে জলবায়ুগত বিভিন্ন বিপর্যয় ও দুর্যোগের কারণে প্রতি ১ লাখে মৃত ও নিখোঁজ মানুষসহ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার ৮৮১ জন। এই সংখ্যা কমিয়ে ২০২০ ও ২০৩০ সালের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৬ হাজার ৫০০ ও ১ হাজার ৫০০ জন। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এযাবত্কালের গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তেমন কঠিন কিছু নয়। এ লক্ষ্য অর্জনে বেশি সহায়ক হবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস কৌশল (২০১৬-২০২০); যা সেন্ডাই নির্মাণকাঠামো ধরে তৈরি করা হয়েছে। বিগত আট বছরে বিসিসিটিএফ এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজনে বাংলাদেশ প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা খরচ করেছে। এরই মধ্যে বিসিসিএসএপি সংশোধন ও এনএপির প্রস্তুতিপর্ব বিবেচনাধীন আছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নও আসছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জিসিএফ তহবিল থেকে দুটো প্রকল্পের জন্য মঞ্জুরি পেয়েছে। মোট কথা, জলবায়ুজনিত সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন বেশ ভালোভাবে প্রস্তুত আছে সে কথা নিঃসন্দেহে বলাবিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশেও অস্থায়ী কিংবা স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের এই বিপর্যয়কে বাংলাদেশ সরকারের বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশনপ্ল্যান-এ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।