বহুমাত্রিক ‌শোষণের শিকার দুবলার চরের প্রান্তিক জেলেরা

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২২ - ০৭:৪০

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত দুবলার চরে চলেনা সরকারের শাসন। সাগর, বন সবখানেই যেন সাহেবদের (মহাজন) সরকার। তাদের নিয়ন্ত্রনে চলছে চরের অন্তত ৪০ হাজার জেলের জীবন- জীবিকা। তাই হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরও ভাগ্যের বদল হচ্ছেনা দুবলার চরের জেলেদের। গত (বৃহস্পতিবার) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই চরে সচল একটি মাত্র মুঠোফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক। তবে যেদিন বেশি মাছ ধরা পড়ে সেদিনই বন্ধ ডাঙ্গার সাথে যোগাযোগ। আর এই সুযোগে পানির মাছ পানির দামে কিনে নেয় সাহেরদের লোকজন। জেলেরা সুবিশাল এই জেলে পল্লীতে একসময় ছিলেন দস্যুদের টার্গেট। তবে র‌্যাবের তৎপরতায় সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হলেও সংকট পিছু ছাড়েনি তাদের।
এদিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, বছরে সাত মাস দুবলার চর থাকে ফাঁকা। থাকেনা মানুষের তেমন পদচারণা। বাকি পাঁচ মাস লোকে লোকারণ্য, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রান্তিক জেলেরা গড়ে তোলেন বসতি। সাগর ও নদী থেকে ধরে আনা মাছ এখানে শুকানো হয় রোদে। সরকার প্রতি বছর এই শঁটকি পল্লী থেকে ছয় থেকে সাত কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে। একদিকে সিন্ডিকেট, অন্যদিকে সাহেবরা খায় লাভের অংশ। আরেকদিকে সরকার নেয় রাজস্ব। কিন্তু জেলেদের নিয়ে ভাবেনা কেউ। জেলেরা অভিযোগ করেন, সুন্দরবন জলদস্যু মুক্ত হয়েছে। নেই মুক্তিপনের আতংক। তারপরও দুবলার চরে হাসি নেই জেলেদের মুখে। এর কারণ দুবলার চরে কারা মাছ ধরবেন, বিক্রি করবেন কোন ব্যবসায়ীর কাছে বা চিংড়ি, লইট্যা, ছুরি মাছের দাম কত হবে-সবই ঠিক করেন প্রভাবশালী কথিত সাহেবরা। এমন কয়েকজন ব্যক্তি নিয়ন্ত্রন করেন এই চর। জেলেদের কাছে তাদের নাম ‘সাহেব’। এই সাহেবরাই জিম্মি করে রেখেছেন ৯৮৫ জেলে-মহাজনসহ প্রায় ৪০ হাজার মৎস্যজীবিকে। এ বিষয়ে দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা জেলে নজরুল ফকির বলেন, ‘ক্ষমতা সব সাহেবদের। কামাল সাহেব, টোকেন সাহেব, কামরুল সাহেবসহ অনেক সাহেব আছে এখানে। এই সাহেবদের কাছ থেকে দাদন (অগ্রিম টাকা নেওয়া) নিতে হবে। এক লাখ টাকা নিলে পাঁচ লাখ টাকার মাছ বুঝে নিবেন তারা। মহাজন বা সাহেবদের কারবার হওয়ায় কোন মাছ বাইরে বিক্রি করা যায়না। জলদস্যু না থাকলেও এই সাহেবদের অত্যাচারে জেলেরা বন্দি আছে। এখান থেকে আমরা মুক্তি চাই’।
আরেক জেলে সেলিম মাঝি বলেন, ‘এই চরের রাঘববোয়ালদের হাত থেকে সরকার আমাদের উদ্ধার করুক। যাদের লাইসেন্সসে এখানে মাছ ধরা হয় সেই সাহেবদের অর্ধেকের বেশি মাছ বুঝিয়ে দিতে হবে। কথা বলার কোন অধিকার নাই। এভাবে দিতে দিতে জেলেদের ছেঁড়া জাল আর ভাঙ্গা ট্রলার নিয়ে বাড়ী ফিরে যেতে হয়। ৫০ হাজার টাকা ঋন নিয়ে দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা জাহাঙ্গীর হোসেন নামে এক জেলে বলেন, ‘রাত জেগে রোদে পুড়ে সাগরে মাছ ধরতে হয়, অনেক কষ্ট। এরপর সাহেবদের কাছে সেই মাছ বিক্রি না করলে গালাগাল করে নির্যাতন করে’।
এদিকে শীত মৌসুমে দুবলার চরে জেলে ও অন্যান্য কর্মি মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার লোক বাস করেন। কিন্তু সেখানে নেই কোন মেডিকেল ক্যাম্প, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থাও। এ বিষয়ে জেলে নাহিদুল ইসলাম মৃধা বলেন, এখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, চরের কুয়া থেকে পানি উঠিয়ে সে পানি খেতে হয়। এতে পেটে অনেক সমস্যা হয়। এছাড়া এখানে হাসপাতালের কোন ব্যবস্থা নেই, সে কারণে তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে পর্যাপ্ত চিকিৎসারও কোন ব্যবস্থা নেই। ইয়াছিন শেখ নামে আরেক জেলে বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গেলে অনেক সময় ‘পানিসাপ’ নামে এক ধরণের বিষক্ত সাপেড় কামড় খেতে হয়। এজন্য এখানে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা রাখা হলে তাদের জীবনের ঝুঁকি কমে যেতো। এছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে দুবলার চর থেকে তাদেরকে নদী পথে বাগেরহাট বা খুলনায় হাসপাতালে নিতে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা সময় লাগে। এজন্য জরুরিভাবে একটি সরকারি হাসপাতালের দাবি করেন তারা।   জানা যায়, সুন্দরবনে দুবলার চরে শুঁটকির ব্যবসায় এক সময়ে পুরোটাই নিয়ন্ত্রন করতেন প্রয়াত (অবঃ) মেজর জিয়া উদ্দিন। এখন সে নিয়ন্ত্রন হাত ঘুরে তার ভাই এবং দুবলার কথিত কামাল (কামাল্লা )সাহেবের কাছে। জেলেদের ওপর নির্যাতন আর শোষনের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। বলেন-‘জেলেদের এই অভিযোগ কতটুকু সত্য তা আমার জানা নেই, এখানে দুবলা ফিশারম্যান গ্রপের একটি সমিতি আছে। জেলেরা চাইলে সমিতিতে অভিযোগ দিতে পারেন। এরপর এর সুষ্ঠু সমাধান করা যেতে পারে’।
কিন্তু দুবলা ফিশারম্যান গ্রপ সমিতির খোদ কামাল উদ্দিন আহম্মেদই কয়েকযুগ ধরে সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে রাখায় কোন জেলেরা অভিযোগ দিতে সাহস পায়না বলে জানা গেছে। মাছ শিকার আর শুঁটকির মৌসুমে কথিত সাহেবদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়ে জেলেরা লিখিত অভিযোগ দিলে দুবলার চরকে সাহেবমুক্ত করা হবে জানিয়ে পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মোঃ নুরুল করিম এই প্রতিবাদককে ‌বলেন, দুবলার চরে সুপেয় পানির দীর্ঘ দিনের সমস্যা ছিল। কিন্তু এবার জেলেদের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর স্বাস্থ্য সেবার জন্য গত সোমবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। এসময় দুবলার চরে অন্তত একজন চিকিৎসক এবং পর্যপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা করতে সিভিল সার্জনকে অনুরোধ করা হয়েছে। সিভিল সার্জন তাকে আশ^স্থ করেছেন।সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত দুবলার চরে সরকারের শাসন যেন অচল! সাগর, বন সবখানেই মহাজনদের জয়-জয়কার। তাদের নিয়ন্ত্রণেই চলে চরের অন্তত ৪০ হাজার জেলের জীবন-জীবিকা। তাই হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ভাগ্যের বদল হচ্ছে না দুবলার চরের জেলেদর।
তাদের অভিযোগ, সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়নি এ বছর মৌসুম শোরুর সাথে সাথে কয়েক দফা জেলে অপহরণ হয়েছে মুক্তিপণের দাবিতারপরও দুবলার চরে হাসি নেই জেলেদের মুখে। এর কারণ দুবলার চরে কারা মাছ ধরবেন, কোন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করবেন এমনকি চিংড়ি, লইট্যা বা ছুরি মাছের দাম কত হবে-সবই ঠিক করেন প্রভাবশালী মহাজনরা। এমন কয়েকজন ব্যক্তি মিলে নিয়ন্ত্রণ করেন পুরো দুবলার চর। জেলেদের কাছে তারা পরিচিত সাহেব হিসেবে। এ সাহেবরাই জিম্মি করে রেখেছেন প্রায় ৪০ হাজার মৎস্যজীবীকে।
মাছ শিকার আর শুঁটকির মৌসুমে কথিত সাহেবদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়ে জেলেরা লিখিত অভিযোগ দিলে দুবলার চরকে সাহেবমুক্ত করা হবে জানিয়ে পশ্চিম ‌সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন দীর্ঘদিন সুপেয় পানির সমস্যা ছিল। কিন্তু এবার জেলেদের জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবার জন্য সম্প্রতি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় দুবলার চরে অন্তত একজন চিকিৎসক এবং পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা করতে সিভিল সার্জনকে অনুরোধ করা হয়েছে। সিভিল সার্জন বিষয়টি নিশ্চিত করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে জেলেদের ওপর নির্যাতন আর শোষণের বিষয়টি বেমালুম অস্বীকার করেছেন দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপ সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন আহম্মেদ। তার কথায়, জেলেদের এসব অভিযোগ কতটুকু সত্য তা আমার জানা নেই। এখানে দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের একটি সমিতি আছে। জেলেরা চাইলে সমিতিতে অভিযোগ দিতে পারেন। এরপর এর সুষ্ঠু সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপ সমিতির সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি কয়েকযুগ ধরে সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে রাখায় কোনো জেলে অভিযোগ দিতে সাহস পায় না।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, দুবলার চরে সচল একটি মাত্র মুঠোফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক। তবে যেদিন বেশি মাছ ধরা পড়ে সেদিন বন্ধ থাকে ডাঙার সঙ্গে সব রকম যোগাযোগ। আর এ সুযোগে পানির মাছ পানির দামে কিনে নেয় মহাজনরা। সুবিশাল এ জেলেপল্লী একসময় ছিল দস্যুদের টার্গেটে। তবে এখন দস্যুর ভয় কিছুটা কমেছে। র‌্যাবের তৎপরতায় সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হলেও সংকট পুরোপুরি পিছু ছাড়েনি এ চরের বাসিন্দাদের।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বছরে সাত মাস দুবলার চর থাকে ফাঁকা। থাকে না মানুষের তেমন কোনো পদচারণা। বাকি পাঁচ মাস লোকে লোকারণ্য, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রান্তিক জেলেরা গড়ে তোলেন বসতি। সাগর ও নদী থেকে ধরে আনা মাছ এখানে শুকানো হয় রোদে। সরকার প্রতি বছর এ শুঁটকিপল্লী থেকে ছয় থেকে সাত কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে। একদিকে সিন্ডিকেট, অন্যদিকে মহাজনরা খায় লাভের অংশ। আর সরকার নেয় রাজস্ব। কিন্তু জেলেদের নিয়ে ভাবে না কেউ।
দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা জেলে নজরুল ফকির বলেন, ক্ষমতা সব সাহেবদের। কামাল সাহেব, টোকেন সাহেব, কামরুল সাহেবসহ অনেক সাহেব আছে এখানে। এ সাহেবদের কাছ থেকে দাদন (অগ্রিম টাকা নেওয়া) নিতে হবে। এক লাখ টাকা নিলে পাঁচ লাখ টাকার মাছ বুঝে নেবেন তারা। মহাজন বা সাহেবদের কারবার হওয়ায় কোনো মাছ বাইরে বিক্রি করা যায় না। জলদস্যু  থাকলেও এ সাহেবদের অত্যাচারে জেলেরা বন্দি আছে। এখান থেকে আমরা মুক্তি চাই। আরেক জেলে সেলিম মাঝি বলেন, এ চরের রাঘববোয়ালদের হাত থেকে সরকার আমাদের উদ্ধার করুক। যাদের লাইসেন্সে এখানে মাছ ধরা হয় সেই সাহেবদের অর্ধেকের বেশি মাছ বুঝিয়ে দিতে হবে। কথা বলার কোনো অধিকার নেই। এভাবে দিতে দিতে জেলেদের ছেঁড়া জাল আর ভাঙা ট্রলার নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়।
৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা জাহাঙ্গীর হোসেন নামে এক জেলে বলেন, দিনে রোদে পুড়ে আবার রাত জেগে সাগরে মাছ ধরতে হয়। অনেক কষ্ট। এরপর সাহেবদের কাছে সেই মাছ বিক্রি না করলে গালাগাল করে, নির্যাতন করে।
এদিকে শীত মৌসুমে দুবলার চরে জেলে ও অন্যান্য কর্মী মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার লোক বসবাস করেন। কিন্তু সেখানে নেই কোনো মেডিকেল ক্যাম্প, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থাও। এ বিষয়ে জেলে নাহিদুল ইসলাম মৃধা বলেন, এখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। চরের কুয়া থেকে পানি উঠিয়ে সেই পানি খেতে হয়।সুন্দরবনের দক্ষিণে অবস্থিত দুবলার চরে চলে ‘সাহেবদের’ শাসন। সাগর, বন সবখানেই তাদের আধিপত্য। তাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে চরের অন্তত ২০ হাজার জেলের জীবন ও জীবিকা। ফলে চরে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ভাগ্যের বদল হয় না বলে অভিযোগ সেখানকার জেলেদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবন এলাকার জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেনেনÑ এমন ব্যবসায়ীদের একটি সমিতি রয়েছে। দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপ নামের সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সমিতির সঙ্গে যুক্ত অন্যরা সাধারণ জেলেদের কাছে ‘সাহেব’ নামে পরিচিত। এই সাহেবরাই সেখানকার জেলে ও মাছ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। একসময় দুবলার চরে শুঁটকির ব্যবসা পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করতেন প্রয়াত মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন। তার মৃত্যুর পর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যায় তার ভাই কামাল উদ্দিন আহম্মেদের হাতে। কয়েক যুগ ধরে সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে ধরে আছেন তিনি।
জেলেদের অভিযোগ, সুন্দরবন জলদস্যু অত্যাচার। মুক্তিপণের আতঙ্ক থাকে সারাক্ষণ। সে কারণে ‌দুবলার চরে হাসি নেই তাদের মুখে। এর কারণ, দুবলার চরে কারা মাছ ধরবেন, কোন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করবেন, কোন মাছের দাম কত হবেÑ সবই ঠিক করেন প্রভাবশালী ‘সাহেবরা’। তারাই জিম্মি করে রেখেছেন ৯৮৫ জেলে-মহাজনসহ প্রায় ৪০ হাজার মৎস্যজীবীকে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দুবলার চরে গিয়ে দেখা যায়, চরটিতে সচল রয়েছে একটি মাত্র মোবাইল ফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক। তবে যেদিন বেশি মাছ ধরা পড়ে, সেদিনই ডাঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ থাকে জেলেদের। এই সুযোগে পানির মাছ পানির দামে কিনে নেয় মহাজনদের লোকজন। জেলেরা বিশাল জেলে পল্লীতে একসময় ছিল দস্যুদের লক্ষ্য। তবে এবার আবার নতুন করে বনদস্যদের উৎপাত বেড়েছে দফায় দফায় অপহরণ করছে জেলেদের।
এদিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, বছরে সাত মাস দুবলার চর ফাঁকা থাকে। থাকে না মানুষের তেমন পদচারণা। বাকি পাঁচ মাস থাকে লোকে লোকারণ্য। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রান্তিক জেলেরা গড়ে তোলেন বসতি। সাগর ও নদী থেকে ধরে আনা মাছ এখানে শুকানো হয় রোদে। সরকার প্রতি বছর এই শঁটকি পল্লী থেকে ছয়-সাত কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে। একদিকে সিন্ডিকেট, অন্যদিকে মহাজনরা খায় লাভের অংশ। কিন্তু জেলেদের নিয়ে ভাবে না কেউ।
এ বিষয়ে দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা জেলে নজরুল ফকির বলেন, ‘ক্ষমতা সব সাহেবদের। কামাল সাহেব, টোকেন সাহেব, কামরুল সাহেবসহ অনেক সাহেব আছে এখানে। এই সাহেবদের কাছ থেকে দাদন (অগ্রিম টাকা নেওয়া) নিতে হবে। এক লাখ টাকা নিলে পাঁচ লাখ টাকার মাছ বুঝে নেবেন তারা। মহাজন বা সাহেবদের কারবার হওয়ায় কোনো মাছ বাইরে বিক্রি করা যায় না। জলদস্যু না থাকলেও এই সাহেবদের অত্যাচারে জেলেরা বন্দি। এখান থেকে আমরা মুক্তি চাই।
আরেক জেলে সেলিম মাঝি বলেন, ‘এই চরের রাঘববোয়ালদের হাত থেকে সরকার আমাদের উদ্ধার করুক। যাদের লাইসেন্সে এখানে মাছ ধরা হয়, সেই সাহেবদের অর্ধেকের বেশি মাছ বুঝিয়ে দিতে হবে। কথা বলার কোনো অধিকার নেই। এভাবে দিতে দিতে জেলেদের ছেঁড়া জাল আর ভাঙা ট্রলার নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়।
৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দুবলার চরে মাছ ধরতে আসা নূর হোসেন ‌ নামে এক জেলে বলেন, ‘রাত জেগে রোদে পুড়ে সাগরে মাছ ধরতে হয়; অনেক কষ্ট। এরপর সাহেবদের কাছে সেই মাছ বিক্রি না করলে গালাগাল করে, নির্যাতন করে।’
এদিকে, শীত মৌসুমে দুবলার চরে জেলে ও অন্যান্য কর্মী মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার লোক বাস করেন। কিন্তু সেখানে নেই কোনো মেডিকেল ক্যাম্প, নেই সুপেয় পানির ব্যবস্থা।
শহিদুর ‌ইসলাম মৃধা নামে এক জেলে বলেন, এখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। চরের কুয়া থেকে পানি তুলে খেতে হয়। এতে পেটে অনেক সমস্যা হয়। এ ছাড়া এখানে হাসপাতালের কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে পর্যাপ্ত চিকিৎসারও কোনো ব্যবস্থা নেই।
ইয়াছিন শেখ নামে আরেক জেলে বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গেলে অনেক সময় পানি সাপ নামে একধরনের বিষাক্ত সাপের কামড় খেতে হয়। এ জন্য এখানে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা রাখা হলে তাদের জীবনের ঝুঁকি কমে যেত। এ ছাড়া অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে দুবলার চর থেকে তাদের নদীপথে বাগেরহাট বা খুলনায় হাসপাতালে নিতে ১০-১২ ঘণ্টা সময় লাগে। এ জন্য জরুরিভাবে একটি সরকারি হাসপাতালের দাবি করেন তারা।
এ ব্যাপারে দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘জেলেদের এই অভিযোগ কতটুকু সত্য তা আমার জানা নেই। এখানে দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের একটি সমিতি আছে। জেলেরা চাইলে সমিতিতে অভিযোগ দিতে পারেন। এরপর এর সুষ্ঠু সমাধান করা যেতে পারে।
কিন্তু দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপ সমিতির খোদ কামাল উদ্দিন আহম্মেদই কয়েক যুগ ধরে সাধারণ সম্পাদকের পদ আঁকড়ে রাখায় সেখানে কোনো জেলে অভিযোগ দিতে সাহস পান না বলে জানা গেছে।
মাছ শিকার আর শুঁটকির মৌসুমে কথিত সাহেবদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়ে জেলেরা লিখিত অভিযোগ দিলে দুবলার চরকে সাহেবমুক্ত করা হবে বলে জানিয়ে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষণ ক ইমরান আহমেদ। তিনি এই প্রতিবেদককে আরো বলেন মহাজন কামাল সাহেবের নামে ছেলেদের শ্বসনের অভিযোগ বারবার আসছে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।দাদনের ভয়াবহ চাপে পিষ্ট দুবলার চরের জেলেরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম দারিদ্র্যের শিকলে বাঁধা তাঁরা। তাঁদের এই দারিদ্র্যেরের সুযোগ নিচ্ছেন দাদন ব্যবসায়ীরা। দাদন ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন দরিদ্র এই জেলেরা। এ অবস্থায় দাদন ব্যবসায়ীদের জিম্মি দশা এবং দাদনের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে সরকারিভাবে সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
একটা সময় জলদস্যু-বনদস্যু আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে সুন্দরবনের দুবলার চরের জেলে সম্প্রদায়। সময়ের বিবর্তনে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত মুক্ত হলেও সাহেবদের সুদের ফাঁদ কেঁটে বের হতে পারেননি জেলেরা। এখনও জিম্মি দশায় থেকেই চলছে জেলে জীবন। তবুও মনে স্বপ্নের প্রদীপ জ্বালিয়ে ফিরে ফিরে দুবলার চরে আসছেন তারা। তারা বলছেন, মহাজনদের কাছে তাদের জিম্মি দশা কাটছে না। তাই দাদন প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে চান তারা। তারা বলছেন, সুদমুক্ত ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা হলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতো।
সরেজমিনে জানা গেছে, সুন্দরবনের কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে বিচ্ছিন্ন শুটকি পল্লী দুবলার চর। আলোরকোল, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া এবং মেহেরআলির চর জুড়ে এই জেলেপল্লি। বছরে মাত্র পাঁচ মাসের জন্য কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠে এই পল্লী। মনের ভেতরে স্বপ্ন বুনে জেলেরা দুবলার চরে আসেন। জীবনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরেন। সেই সঙ্গে শুঁটকি শোকানোর কাজও চলে। রাত-দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যেই কেটে যায় দুবলার মৌসুমী এই পাঁচ মাস। চওড়া সুদে ঋণ ও দাদন নিয়ে জেলারা দুবলায় মাছ-শুটকি কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। মৌসুম শেষে কেউ কেউ লাভের মুখ দেখলেও অধিকাংশই লোকসান বোঝা নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলেরা জানান, সুদের টাকা পরিশোধ করলেও ঋণের আসলটুকু বছরে পর বছর জেলেদের ঘাড়ে চেপে থাকে। মনে চাপা কষ্ট থাকলেও হাসি মুখে আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন দুবলার জেলেরা। কাঁচা মাছ, শুটকি ও রাবিশসহ ঋণ-লগ্নি ও দাদনের ফাঁদে ফেলে জেলেদের জিম্মি করে আখের গুছিয়ে নেয় বনবাসীর মত রক্তচোষা সাহেবরা। ভয়ে প্রভাবশালীদের কারও নাম প্রকাশ করেননি জেলেরা।
জেলারা আরও জানান, সমুদ্রে গিয়ে দুরে‌্যাগের আতঙ্ক কাটিয়ে কিনারে ফিরতে না ফিরতেই পড়তে হয় দাদনদারদের রোষানলে। হিসাব বুঝিয়ে দিতে হয় কড়ায়-গন্ডায়। অনেককেই ঘরে ফিরতে হয় শূন্য হাতে। এর সাথে রয়েছে জীবনের ঝুঁকি। গভীর সাগরে থাকলে পুরোপুরি প্রকৃতি দেখে গতিপথ চিহ্নিত করতে হয় জেলেদেরকে।
বিভিন্ন সময় জেলেদের ঠকিয়ে মধ্যস্থতাকারী ভোগীদের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। তবে লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যাবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়াছে র‌্যাব- ৬ এর পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ ফিরোজ কবির। তিনি বলেন, মৎজীবী যারা তাদের কাছ থেকে মৎস্য আহরণের সময় কম মূল্যে মাছ কিনে সেটি হয়তো বেশি মূল্যে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে। এ রকম অভিযোগ আমরা মৌখিক ভাবে অনেক সময় পেয়েছি। আমরা সব সময় কাজ করে যাচ্ছি যদি আমরা লিখতে ভাবে অথবা সুনির্দিষ্ট ভাবে অভিযোগ পাই সে ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।খুলনার সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের তীরে জেগে ওঠা দুবলারচরে এখন চলছে শুঁটকির ভরা মৌসুম। টানা ৬ মাসের জন্য কয়েক হাজার মৎস্যজীবীর পচারণায় মুখর দুলারচরের বিস্তীর্ণ জনপদ। পুরোদমে শুরু হয়েছে সাগর থেকে মাছ ধরে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ৪০ হাজার জেলে মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে নেমে পড়েছে।
টানা ৫ মাস এই চরে কাজ করেন তারা। প্রতি মৌসুমে এই পল্লীতে শত কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও শুঁটকি শিল্পে নেই সরকারি কোনো বড় উদ্যোগ। অস্থায়ী ঘর ও মাচা করতে হয় মহাজন ও জেলেরে উদ্যোগে।
ছয় মাসের বাণিজ্যে মহাজনদের কেউ হচ্ছেন কোটিপতি, আবার কেউ টানাপড়েনে নিঃস্ব হচ্ছেন। বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মহাজনরা দুবলারচরে ব্যবসা করলেও ‘সাহেবরে’ তারা আশীর্বাদ মনে করেন। সাহেবরা বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে মাথাবিহীন কাঁচা চিংড়িমাছ সংগ্রহ করেন। তারাই মূলত বন বিভাগ থেকে সাগরে জেলেদের মাছ ধরার অনুমতির ব্যবস্থা করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। এবারও এই চরে শুটকি প্রক্রিয়াজাতকরনে ১৫ জনের নামে লাইসেন্সের অনুমতি দিয়েছে বন বিভাগ। সেই ঘুরে ফিরে এখনও ফ্যাসিবাদের খলেই রয়ে গেছে দেশের অন্যতম শুটকিপল্লী হিসেবে খ্যাত ‘দুবলার চর’।
এখানে নেই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, কেউ অসুস্থ হলে ঝড়-জলোচ্ছাস উপেক্ষা করেই মংলা বন্দরে যেতে পাড়ি দিতে হয় ১২০ কিলোমিটার পথ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় এই পল্লীতে স্যুতা কমে গেলেও যুগ যুগ ধরে বড় সাহেব হিসেবে পরিচিত কামাল উদ্দিনের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। তার নিয়ন্ত্রণে অন্তত ১৫ জন সেকেন্ড ইন কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে দুবলারচরের জীবন-জীবিকা। এজন্য মহাজন ও জেলেরা তাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অনেকেই তাদের জুলুম-নীপিড়ন সহ্য করলেও নানা শঙ্কায় মুখ খুলতেও সাহস পান না।
জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ অংশের মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের ক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি দ্বীপ। এই দ্বীপটির আয়তন ৬৬.৫ কিমি ২। এটি খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত। দুবলার চর সুন্দরবনের ৪৫ এবং ৮ নম্বর কম্পার্টমেন্টে অবস্থিত। খুলনা শহর বা বাগেরহাট জেলার মোংলা বন্দর থেকে ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে যেতে হয় দুবলার চরে। এটি সুন্দরবনের মধ্যে একটি পর্যটন কেন্দ্রও বটে। তবে মাছ ধরার মৌসুমে এখানে পাঁচ থেকে ছয় মাস বসবাস করেন জেলেরা। আলোরকোল, কোকিলমনি, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া, মেহেরআলির চর এবং শ্যালারচর নিয়ে গঠিত দুবলার চর। কুঙ্গা ও মরা পশুর নরে মাঝে এটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। দুবলার চর মূলত জেলে গ্রাম হিসেবেই পরিচিত। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে জেগে ওঠে আবার সাগরের লোনা জলে তলিয়ে যায় দুবলার চর। মাছ ধরার সঙ্গে চলে শুঁটকি শুকানোর কাজ।
বর্ষা মৌসুমের পর বহু জেলে পাঁচ মাসের জন্য সুদূর কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে ডেরা বেঁধে সাময়িক বসতি গড়েন এখানে। এই দ্বীপটিতে প্রতি বছরের কার্ত্তিক মাসে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের রাসমেলা এবং পুণ্যস্নানের আয়োজন হয়। ধুঁ ধুঁ বালু চরে টেলিটক ছাড়া আর কোনো মোবাইল অপারেটর কোম্পানির নেটওয়ার্কের সংযোগ নেই এখানে। এখান থেকে আহরিত শুঁটকি চট্টগ্রামসহ দেশের পাইকারী বাজারে মজুত ও বিক্রয় করা হয়। সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের সদর প্তর বাগেরহাট থেকে মাছ সংগ্রহের পূর্বানুমতিসাপেক্ষে বহরার ও জেলেরা দুবলার চরে প্রবেশ করেন।
আরও জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে জেলেরা বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের সংলগ্ন নদী থেকে ধরে এনে এই চরে প্রচুর পরিমাণে মাছ শুটকি বানায়। রূপচাঁদা, লইট্যা, ছুরিসহ প্রায় ৮৫ প্রজাতির মাছ এবং বিভিন্ন ধরনের চিংড়ি সুন্দরবনে শুকিয়ে শুটকি প্রক্রিয়াজাত করা হয়। চরে জেলেদের থাকার জন্য বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে আলোরকোলে ৮২৫টি, মাঝেরকেল্লায় ৪০টি, নারিকেলবাড়ীয়ায় ৯৫টি এবং শ্যালারচরে ৭৫টি অস্থায়ী জেলেঘর নির্মাণ করেছে। ছন দিয়ে এসব ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া আলোরকোলে ৯০টি দোকান, ৫১টি মাছের ডিপো, মাঝেরকেল্লায় সুইটি দোকান, পাঁচটি মাছের ডিপো, নারিকেলবাড়ীয়ায় সুইটি দোকান, চারটি ডিপো এবং শ্যালারচরে সুইটি দোকান ও চারটি মাছের ডিপো বসানো হয়েছে। সাগরতীরে জেলেদের অস্থায়ী থাকার ঘর, মাছ শুকানোর চাতাল এবং মাচা বানাতে সুন্দরবনের কোনো গাছপালা ব্যবহার না করার জন্য বনবিভাগের নির্দেশনা আছে।
এসব বানাতে জেলেরা গ্রামের গাছপালা সঙ্গে নিয়ে যান সেখানে। সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোরসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ সেখানে বছরে টানা পাঁচমাস কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই পাঁচমাসের আয়-রোজগারের টাকায় চলে তাদের সারা বছরের হিসেব। নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে মার্চ মাস পর্যন্ত এই পাঁচ মাসের সময়কালে তারা এই-একমাস পর ৪-৭ দিনের জন্য ছুটিতে বাড়িতে পরিবারের কাছে যাওয়ার সুযোগ পান। প্রায় ২ হাজার ট্রলার ও নৌকা নিয়ে এখানে আগত জেলেরা নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এই পাঁচমাস সাগরে মাছ ধরেন। ধরে আনা মাছ জেলেরা মাচায় শুকিয়ে শুঁটকি করেন। এর ১০-১২ জনের একটি গ্রপ ১০ দিন পর্যন্ত নদীতে থেকে জাল ফেলে কেবল মাছ ধরেন।
অপর একটি গ্রপ ট্রলারযোগে বিভিন্ন জেলের জাল থেকে ধরা মাছ সংগ্রহ করে দুবলার চরে পৌঁছে দেনে। আরেকটি গ্রুপ সেই মাছ ট্রলার থেকে বিভিন্ন ড্রামে তুলে চাতালে আনেন। এরপর চাতালে থাকা আরেকটি গ্রুপ শুটকির জন্য প্রক্রিয়াজাত শুরু করেন। পরে অন্য একটি দল তা শুকানোর জন্য মাটিতে বেছানো নেট বা বাঁশের মাচায় ঝুলিয়ে রাখেন।
বাগেরহাট রামপালের শুঁটকি ব্যবসায়ী ইমরান ফরাজী জানান, তার বাবা কুদ্দুস ফরাজী ৫০ বছর আগে এই চরে শুঁটকি ব্যবসা করেছেন। তার অপর ভাই মুতাচ্ছিন ফরাজীও এই ব্যবসায় জড়িত।
তিনি জানান, এই খাত থেকে সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব পেলেও নেই সরকারি কোনো উদ্যোগ বা পৃষ্ঠপোষকতা। তারা এনজিওর থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা করে আসছেন। মূলত সাহেবরা বনবিভাগ থেকে তাদের মাছ ধরার অনুমতির ব্যবস্থা করে থাকেন। তারা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন জেলে-মহাজনদের কাছে। সাহেবরা-কোনো সুদ না নিলেও বিনিয়োগের বিপরীতে কাঁচা চিংড়ি মাছ নিয়ে থাকেন। চিংড়ি মাছ ধরার পর মাথা কেটে রাখা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুবলার চরের একাধিক জেলে ও মহাজনরা জানান, কামাল উদ্দিন, খুলনার পিন্টু কমিশনার, খোকন, হক, হাকিম বিশ্বাস, জাহিুল সাহেব তাদের এখানে বিনিয়োগ করেন। সাহেবরা বিনিয়োগ করলেও সেই টাকা পর্যাপ্ত না হওয়ায় মহাজনেরা এনজিও থেকে প্রতি লাখে শতকরা ১৪ টাকা হারে সুদের মাশুল গুনতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে কথা হয় প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরীর সাথে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান গত কয়েক বছর দুবলকচরে জেলেরা বনদস্যমুক্ত থাকলেও এবার কয়েক দফায় মুক্তিপণ অপহরণের খবর পাওয়া গেছে।