সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের তিন জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের অন্তত ১৪ উপজেলায় বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এসব উপজেলায় জলাশয় কিংবা গভীর নলকূপের মতো উৎস থাকলেও মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক, লবণাক্ততা ও আয়রনের কারণে তা পানের উপযোগী নয়। এসব এলাকার বাসিন্দাদের, বিশেষ করে নারীদের বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে প্রতিদিন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এক কলস পানি আনতে কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে তাদের।
এ পরিস্থিতির জন্য কেউ দুষছেন চিংড়ি চাষকে; কেউ দুষছেন সরকারের অপরিকল্পিত ও দায়সারা প্রকল্পকে। এর সঙ্গে মিঠাপানির জলাশয় কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেও যুক্ত করেছেন কেউ কেউ।
খুলনায় খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে তিন উপজেলা কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপে। বাগেরহাটের রামপাল, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও মোংলার পরিস্থিতিও একই। অন্যদিকে সাতক্ষীরার সব উপজেলায়ই কম-বেশি খাওয়ার পানির সংকট রয়েছে। এপ্রিলের শুরু থেকে টানা তাপপ্রবাহে এ সংকট আরো তীব্র হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দাকোপ উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন সুতারখালী এলাকার বাসিন্দা মকবুল গাজী বলেন, ‘আমাদের খাওয়ার পানির কষ্টটা আর গেল না। কালাবগী, সুতারখালী, কামারখোলা ও গুনারী এলাকায় খাওয়ার পানির সংকট সবচেয়ে তীব্র। টিউবওয়েল ও জলাশয়ের পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা।’
দাকোপ উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি পানের প্রায় অযোগ্য। সুপেয় পানি সরবরাহে টিউবওয়েল, প্লান্ট, পুকুর খনন ও সংস্কার করা হলেও জনসংখ্যার তুলনায় তা অপ্রতুল।’
উপকূলবর্তী কয়রা উপজেলার স্থানীয় সংবাদকর্মী শেখ সিরাজউদ্দৌলা লিংকন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শীতকাল থেকে বর্ষার আগ পর্যন্ত লম্বা সময় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এখানকার বাসিন্দাদের। বর্ষা থেকে আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত বৃষ্টির পানি জমিয়ে কিছুদিন চলেন তারা। তবে বেশির ভাগ পরিবারে পানি জমিয়ে রাখার বড় পাত্র নেই। অনেকে টাকা দিয়ে পানি সংগ্রহে বাধ্য হন। রাজধানীর তুলনায় উপকূলে সুপেয় পানি সংগ্রহের খরচও বেশি।’
খুলনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেকনির্বাহী প্রকৌশলী আকমল হোসেন বলেন, ‘উপকূলের লবণাক্ত এলাকায় পানির সংকট মোকাবেলা আমাদের জন্য সবসময়ই চ্যালেঞ্জ। এ সংকট কাটাতে একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্প সম্পন্ন হলে এ অঞ্চলের মানুষের পানির কষ্ট কমে আসবে।’
সরজমিনে কয়রা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, এসব জনপদের চারদিকে পানি থাকলেও তা লবণাক্ত। বেশির ভাগ নারী নদীর পানিতে গোসল ও গৃহস্থালির কাজ সারছেন।
২০২১ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক জরিপে দেশের উপকূলীয় মানুষের নিরাপদ খাওয়ার পানির দুর্দশার কথা তুলে ধরা হয়। জরিপে দেখা যায়, উপকূলীয় এলাকার ৭৩ শতাংশ মানুষকে অনিরাপদ লবণাক্ত পানি পান করতে হয়।
কয়রা উপজেলার বাগালী ইউনিয়নের কলাপাতা গ্রামের সবিতা রানী বলেন, ‘রাত পোহালেই কলসি নিয়ে বের হতে হয়। দুটো বিল পাড়ি দিয়ে সরকারি পুকুর থেকে মিঠাপানি নিয়ে বাড়ি আসতে দেড়-দুই ঘণ্টা সময় লাগে। গরমের মধ্যে তিন-চার মাইল পথ হাঁটতে হয়। পাশের আমতলা, কেয়াবুনিয়া, সিন্দুরতলা ও কলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দাদেরও একই অবস্থা।’
কয়রা জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘উপজেলার অধিকাংশ মানুষ বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে। চলতি মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে পুকুর ও জলাধার শুকিয়ে গেছে। এতে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ নলকূপে পানি কম উঠছে। ফলে সংকট বেড়েছে।’
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘বাধ্য হয়ে উপকূলের মানুষ পুকুরের পানি পান করে। এ কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, পেটের পীড়া ও চর্মরোগ নিয়ে অনেকে হাসপাতালে আসে।’
রেজাউল করিম আরো বলেন, ‘লবণাক্ত পানি পানের মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড গ্রহণ করছে উপকূলের মানুষ, যা তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে। লবণাক্ত পানি পানের কারণে গর্ভবতী নারীদের কিডনি ও যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বছরের পর বছর লোনাপানি আটকে চিংড়ি চাষের কারণে মিঠাপানির পুকুরগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল, ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ মোতাসিম বিল্লাহ মনে করেন, উপকূলের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও অপরিকল্পিত আর দায়সারা কাজে দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলছে না।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমারি ইউনিয়নের খুটিকাটা গ্রামের নীলিমা সরকার, সাবিত্রি সরকার ও অনিমা মণ্ডল জানান, প্রতিদিন সকালে পার্শ্ববর্তী গ্রাম বড়দল ও কাঠাবাড়ি থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয় তাদের। পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে সংসারের কাজে যেমন ব্যাঘাত ঘটে, তেমনি শারীরিক কষ্ট ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
আইলাদুর্গত গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের গৃহবধূ আজমুন নাহার, চাঁদনিমুখা গ্রামের রেখা খাতুন ও ৯ নং সোরা গ্রামের পারুল খাতুন জানান, গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা থেকে পানি আনতে গেলে তাদের এক বেলা সময় নষ্ট হয়।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম মাকসুদুল আলম জানান, তার ইউনিয়নে ১৫টি গ্রামের মধ্যে ১১টি গ্রামে খাওয়ার পানির তীব্র সংকট। বিশেষ করে চাঁদনিমুখা, ডুমুরিয়া, খলশিবুনিয়া, হেতালবুনিয়া, চকবারা, সোরা ও পার্শ্বেমারী গ্রামের নারীরা অনেক দূর থেকে হেঁটে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করেন। তার ইউনিয়নের ৪২ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত ৩৬ হাজার সুপেয় পানি সংকটে রয়েছে।
শ্যামনগরের মতো অবস্থা জেলার আশাশুনি, দেবহাটা, কালিগঞ্জ, তালা, কলারোয়া ও সাতক্ষীরা সদর উপজেলায়।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের আঘাতের পর থেকে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে খাওয়ার পানি বা সুপেয় পানির সংকট আরো তীব্র হয়েছে। লবণাক্ত পানি ঢুকে সে সময় উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ মিঠাপানির আধার ও জলাশয়গুলোর মারাত্মক ক্ষতি হয়, যা আজও স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে শ্যামনগর, আশাশুনি ও দেবহাটা উপজেলার মানুষজন খাওয়ার পানির তীব্র সংকটে রয়েছে।’
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডা. মানস কুমার জানান, দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ত পানি পান করলে কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের চর্মরোগ হতে পারে।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুল ইসলাম জানান, জেলার ২৫-৩০ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির কষ্টে আছে। তিনি বলেন, ‘সুপেয় পানি সংকট নিরসনে ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ চলছে। ২০২৬ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা। এ প্রকল্পের ফলে জেলার অন্তত দুই লাখ মানুষ সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে পারবে।’উপকূলে পানির অভাব নেই, তবুও চারদিকে পানির জন্য হাহাকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর ও আশাশুনি এলাকার পানি ও জমিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। গ্রীষ্মে ওই সব এলাকায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। খাবার পানি সংগ্রহের জন্য নারী ও শিশুদের ছুটতে হচ্ছে গ্রাম থেকে গ্রাম, মাইলের পর মাইল। সরকারি প্রকল্পে সীমিত কিছু পরিবারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুকুরের পানি শোধন করে সরবরাহ করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এদিকে সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। গরম শুরু হওয়ার আগেই এ স্তর নেমেছে ৩২ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত। কমে গেছে টিউবওয়েলে পানি ওঠা।
বৃষ্টির অভাব ও অপরিকল্পিতভাবে গভীর-অগভীর নলকূপ স্থাপনের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ফসল উৎপাদনে প্রভাব, পানিতে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ পরিবেশ বির্পযয়ের আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খাবার পানি সংগ্রহে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে হয় মানুষকে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অপরিকল্পিতভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং লবণাক্ততার সমস্যা দূর করতে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে গৃহীত উদ্যোগ তদারকির অভাবে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় পরিবেশ কর্মীদের। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর শ্যামনগর উপজেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় এ এলাকার ৪০ শতাংশ মানুষ খাবার পানির সংকটে রয়েছে। সরকারিভাবে এ তথ্য দেওয়া হলেও বাস্তবের চিত্র আরও ভয়াবহ বলে দাবি স্থানীয়দের। শ্যামনগর উপকূলের মানুষ খাওয়ার পানি ও দৈনন্দিন কাজের জন্য মূলত পুকুর ও বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। তবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ, চিংড়ি ঘেরের আউটড্রেন না থাকা, নদীর প্রবাহ আটকে দেওয়া, পুকুর ভরাট ও খাল বেদখলের কারণে প্রান্তিক মানুষ নিরাপদ পানির তীব্র সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন। সাধারণত শীত মৌসুম থেকে বর্ষা আসার আগ পর্যন্ত একটা লম্বা সময় এ দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয় উপকূলবাসীকে। শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপেজেলায় এক হাজার ৯৪৯টি গভীর, ৪৯১টি অগভীর, ৫০০টি এসএসটি ও ৪৪১টি ভিএসএসটি নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে আটটি গভীর, ১২৯টি অগভীর, ১৬টি এসএসটি ও ৪৪টি ভিএসএসটি নলকূপ কয়েক বছর ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী এলাকার আব্দুল আলিম, গাজী মোশারফ হোসেন বলেন, এক কলস পানির জন্য দুই-তিন ঘণ্টা প্রচণ্ড রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা ফাতেমা পান করার পানি সংগ্রহ করেন পুকুর থেকে। পুকুরের পানি কতটা নিরাপদ তার জানা নেই, তবে চাহিদা মেটাতে আর বিকল্প নেই। ভোরে অনেকেই কলসি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পানির খোঁজে। কারণ সেটাই পান করবে সবাই, সেটাই ব্যবহার হবে রান্নায়। দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলের মানুষ এ পানি ব্যবহার করে আসছেন।
সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দীর্ঘদিনের। ভৌগোলিক কারণে বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছে থাকায় জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় পানির সংকট অন্য উপজেলার চেয়ে বেশি। এসব এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বড় এসব এলাকার জনগোষ্ঠীকে খাবার পানির জোগানে একেক ঋতুতে একেক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বৃষ্টির সময় রিজার্ভ ট্যাংকে পানি ধরে রাখা যায়। যা দিয়ে তিন-চার মাসও চলে যায়। বাকি সময় কখনও পুকুর ফিল্টার (পিএসএফ) বা সরাসরি পুকুরের পানি অথবা ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপিত লবণ বিমুক্তকরণ প্ল্যান্ট থেকে এখানকার মানুষের খাবার পানি পায়।
গরমের সময় প্রাকৃতিক উৎস বেশিরভাগই অচল থাকে। ফলে মানুষকে এই সময় পানি কিনে খেতে হয়। এই পানির দাম প্রতি লিটার এক টাকা।
২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে প্রচুর ক্ষতি হয় এই জেলার মানুষের। তারপর থেকেই পানির ভয়াবহ সংকট শুরু। এসময় সাতক্ষীরা পৌরসভা, শ্যামনগর ও আশাশুনিতে কয়েকটি এনজিও এগিয়ে আসে নিরাপদ পানি সরবরাহে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, নদীর নাব্যতা হ্রাস ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া প্রভাব পড়ছে টিউবওয়েলের ওপরও। টিউবওয়েল থেকেও মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পাচ্ছে। আর লবণাক্ততার কারণে এ সব উৎসের পানি ব্যবহারও দুরূহ হয়ে উঠেছে।
সংকট দূর করতে ২০১৫ সাল থেকে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে চাহিদা মেটানোর কাজ করছে ওয়াটারএইড। তাদের সহযোগিতায় সেটা বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় এনজিও রূপান্তর। এখন পর্যন্ত এসব এলাকার ৪১টি স্কুলে এবং ১৭টি কমিউনিটি ক্লিনিকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি ফিল্টার হয়ে চেম্বারে যাচ্ছে আর সেটি পান করছে স্কুলের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ।
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের ত্রিপানি বিদ্যাপিঠের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন পানি খাচ্ছিল স্কুলের পেছনের দিঘি থেকে। তাতে নানারকম শারীরিক সমস্যার পাশপাশি স্কুলে আসার প্রবণতাও কমে যেত। ২০১৮ সালে এই স্কুলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষার্থীরা জানালো, তারা দিঘি থেকে সরাসরি পানি খেতো। পরে পানির স্থাপনা হওয়ার পর তারা এখান থেকেই পানি খায়।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো আবুল কালাম মল্লিক জানান, আগে অধিকাংশ শিশুই পানি নিয়ে আসতো বাড়ি থেকে। অনেক সময় দেখা গেছে পানির অভাবে হয়তো তারা ছুটি চাইতো। দুই-একদিন স্কুলেও আসতো না। এলাকায় এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করায় কিছুটা সুবিধা হয়েছে। পানির কারণে আর শিক্ষার্থী ঝরছে না।
এই স্কুলে যে পানির চেম্বার করা করা হয়েছে সেটার ধারণক্ষমতা ২০ হাজার লিটার। রূপান্তরের কর্মকর্তারা জানান, এই সিস্টেমে একটি ডিসপেনসার পয়েন্ট আছে। এখান থেকে শিশুরা পানি নেয়। বৃষ্টি যখন হয় তখন পানিটা প্রথমে একটি লাইনে এসে পড়বে। পাইপের একটি পয়েন্টে ফিল্টার স্থাপন করা হয়েছে। এই ফিল্টার হওয়ার পর পানিটা ট্যাংকে চলে যাবে। তাছাড়া পাইপের সঙ্গে যুক্ত আছে ফাস্ট ফ্লাশিং সিস্টেম। বৃষ্টি যখন হয় তখন প্রথম বৃষ্টির পানিতে ময়লা থাকে। প্রথম ২৫-৩০ মিনিট এই ফাস্ট ফ্ল্যাশের মাধ্যমে ফেলে দিতে হয়। এই সময় পর সেটি বন্ধ করে দিলে পানি সরাসরি চেম্বারে চলে যাবে।
তিনি আরও জানান, আমরা হিসাব করি যে স্কুলে শিশুর সংখ্যা কত এবং তাদের জন্য ৯ মাসে কী পরিমাণ পানির প্রয়োজন। তার ওপর নির্ভর করে আমরা ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করি।
খাবার পানির মান সম্পর্কে ওয়াটার এইডের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার রিভেন চাকমা জানান, আমরা একটা মেকানিজমের মাধ্যমে পানিকে ফিল্টার করছি। ফিল্টার হওয়ার পর সেটি কতটুকু নিরাপদ সেটা নিশ্চিত করতে আমরা কয়েকটি প্যারামিটার পরীক্ষা করি। এগুলো হচ্ছে—ফিকাল কলিফরম, পিএইচ মাত্রা। ল্যাবরেটরি টেস্টের পর শতভাগ নিরাপদ হলে আমরা ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেই। ৯ মাস এই পানি যেহেতু থাকে আমরা ছয় মাস পর পর একটা মনিটরিং টেস্ট করি। আমাদের এক একটি প্রকল্পের মেয়াদ ১০ বছর।
ওয়াটারএইডের অ্যাডভোকেসি এবং কমিউনিকেশন ম্যানেজার ফয়সাল আব্বাস জানান, সাতক্ষীরার এসব অঞ্চলের মানুষ অনেক কষ্ট করে পানি সংগ্রহ করে। আমাদের যেসব প্রকল্প এখানে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কাজ করছে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা। আমরা জানি যে এসব এলাকার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানাকারনে যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করে। আমাদের প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে নিরাপদে কীভাবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা যায় তার একটি উদাহরণ। এখানে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ফিল্টারিং সিস্টেম এবং লবণাক্ততার কারণে অবকাঠামোগুলো টেকসই না হওয়া। আমরা যদি কমিউনিটিকে নিয়ে অবকাঠামোগত জায়গায় কাজ করতে পারি তাহলে সেটি আরও দীর্ঘমেয়াদি হবে। পানি এবং স্বাস্থ্যগত বিষয়ে যদি মানুষ জানতে পারে তাহলে জীবনযাপন আরও সুন্দর করে করতে পারবে।
সাতক্ষীরা জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আ. বাছেদ জানান, সাতক্ষীরা জেলায় পানির লবণাক্ততা অনেক বড় একটা সমস্যা। এই জেলায় অনেক মূল্যবান রিসোর্স আছে। প্রতিবছর ঝড় সাইক্লোনের সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ শ্যামনগর, আশাশুনি উপজেলা। দুর্যোগের প্রভাব সরাসরি এসব এলাকার মানুষের ওপর পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক বড় প্রভাব পড়েছে এই জেলায়। সরকার দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে কাজ করছে। আমি মনে করি সাতক্ষীরা জেলায় একটি মাস্টার প্ল্যান দরকার। এখানে লবণাক্ততা দূর করার জন্য বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে ব্যবস্থাপনায় আমাদের সব দফতর সংস্থা মিলে একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান করার প্রয়োজন আছে।
একপাশে খেয়াঘাট, অন্যপাশে সুবিস্তৃত নদী। সঙ্গে আছে কপোতাক্ষ নদও। তবুও নেই তৃষ্ণা মেটাতে পানের যোগ্য এক ফোটা পানি! সুপেয় পানির জন্য এলাকাভেদে যেতে হয় অন্তত তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে!
দক্ষিণাঞ্চলের ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দৃশ্য ঠিক এমনটাই। এই এলাকায় পানযোগ্য পানি সন্ধান করা যেন খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো।
শ্যামনগর উপজেলার একপাশে রয়েছে নীলডুমুর খেয়াঘাট। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে খোলপেটুয়া নদী। আর তার উত্তর-দক্ষিণে কপোতাক্ষ নদের অবস্থান। বিশাল উপজেলার একদিকে আছে বুড়িগোয়ালিনী আর অন্যদিকে ছোট্ট দ্বীপ গাবুরা ইউনিয়ন।
সুন্দরবন ঘেরা এই উপজেলার এসব ইউনিয়নে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও নেই বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি। ফলে সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরেও সুপেয় পানির জন্য এলাকাভেদে তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। নয়তো বর্ষাকালে জমানো পানি খেতে হয় সারা বছরজুড়ে। কেউ কেউ প্রতিনিয়ত কিনেও পানি পান করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার জীবন্ত সমস্যা বিশুদ্ধ সুপেয় পানি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরকূলে বসবাসরত এই জনপদের মানুষকে প্রতিনিয়ত লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়। উপর্যুপরি বেড়িবাঁধ ভাঙনের কারণে একসময়ের সবুজ শ্যামল জনপদ বর্তমানে প্রায় গাছগাছালি শূন্যও হয়ে পড়েছে। কৃষি উৎপাদন নেমে এসেছে শূন্যের কোটায়। ফলে এলাকায় কর্মসংস্থানের সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আর সুপেয় পানির সংকটে জনজীবনও বিপর্যস্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা অনিতা মন্ডল জানান, পাঁচ সদস্যের হতদরিদ্র পরিবার নিয়ে নিত্যদিনের সুপেয় পানি জোগানের দায়িত্ব তার। প্রতিদিন খুব সকালে বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরের বুড়িগোয়ালিনী থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করেন তিনি। রান্না ও খাওয়ার পানির জন্য প্রতিদিনই মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে হয় তাকে। অনিতা মন্ডলের মতো এভাবেই প্রত্যেককে পানির জন্য জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় সাতক্ষীরার উপকূলীয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নে।
কাঁধে পানযোগ্য পানি নিয়ে ফিরছে শ্যামনগর উপজেলার এক শিশু |
সুপেয় পানির সংকট এত প্রবল যে নিত্যদিন যদি বিশাল এই পথ পাড়ি না দেন তাহলে শেষ ভরসা হবে ঘরের পাশের নদীর লবণাক্ত পানি। তাইতো চারিদিকে পানি থাকতেও পানের উপযোগী এক ফোঁটা পানির জন্য বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে ছুটতে হয় স্থানীয়দের। এত কষ্ট করে পানি আনার পর তৃষ্ণা মেটাতে গিয়েও ভাবতে হয় শতবার। কারণ, পানি শেষ হলে আবারও ছুটতে হবে! তাই পানি পানেও মিতব্যয়ী এসব অঞ্চলের মানুষ।
চন্দনা রাণী নামে আরেকজন বাসিন্দা জানান, আমাদের এলাকায় পানির সংকট খুবই। আমরা লবণ-পানি খেয়ে বেঁচে আছি। আগে সরাসরি পুকুরের পানি খেতাম। এখান ফিল্টার হওয়ার কারণে কিছুটা হলেও নিরাপদ পানি পান করছি। তারপরও আমাদের পানিতো লবণাক্ত। আমরা আর লবণ-পানি খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারছি না। আমাদের গ্রামে যারাই আসে, তাদের কাছেই আমরা মিষ্টি পানির দাবি জানাই।
আমরা অনেক দূর থেকে এসে পানি নিয়ে যাই। আমাদের এই খাওয়ার পানিটা চৈত্র-বৈশাখ মাসে বেশি লবণাক্ত হয়ে যায়, যে কয় মাস বৃষ্টি হয় সে কয় মাস একটু পানি খাওয়া যায়।চন্দনা রাণী
একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আমাদের গ্রামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল জানিয়ে চন্দনা রাণী বলেন, ওই কমিটির মাধ্যমে জেলা পরিষদে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে এখানে পুকুর খনন করে দেওয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়-আইলার সময় আমাদের এই পুকুরটি লবণ-পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে পানিতেও লবণাক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবারও জেলা পরিষদ খনন করে দেয়। কিন্তু আগের মতো আর ভালো পানি পাওয়া যায় না।
চন্দনা রাণী আরও জানান, পানখালী, তালবারিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ফিল্টার করা পানি আগে প্রায় তিন থেকে চারশো পরিবার নিত। তবে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে এখন দুই থেকে আড়াইশ পরিবার পানি নেয়। আমাদের ফিল্টারের আনুষঙ্গিক খরচ আছে। যে কারণে সবাইকে মাসে ২০ টাকা করে দিতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৭ সালে ১১ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবের পর থেকে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির এই সংকট কাটছে না। আইলার আঘাতে সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রায় সব বিশুদ্ধ পানির উৎস ধ্বংস হয়ে যায়। লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় দেখা দেয় সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট। উপকূলের মানুষ সেই সংকট এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যদিও গত একযুগে সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। তবুও এই সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না এই জনপদের।
সুপেয় পানির জন্য স্থাপিত একটি নলকূপ | ছবি: ঢাকা মেইল
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরার পানি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় খাবার পানির মারাত্মক সংকট। খাওয়ার সঙ্গে ব্যবহারের পানিরও তীব্রতা রয়েছে। যার কারণ, লবণাক্ত পানির মাত্রটা অনেক বেড়েছে। আশির দশক থেকে এই এলাকায় পানির এই তীব্র সংকট মারাত্মকভাবে বাড়ে। যদিও এর আগে উপকূলের মানুষ পুকুরের বা বিভিন্ন পানি ব্যবহার করতেন।
অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী বলেন, ২০০৯ সালে আইলা আঘাত আনলে শ্যামনগর উপকূলের কৈখালী, মুন্সিগঞ্জ, পদ্মপুকুর, গাবুরা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী কয়রার বেতকাশী, উত্তর বেতকাশী- এই পুরো অঞ্চলটা প্লাবিত হয়ে যায়। এতে পানির যত আধার ছিল, মানুষগুলো যে পানি ব্যবহার করত, সেই পানিগুলো সব লবণাক্ত পানিতে ডুবে যায়। পাশাপাশি এই এলাকায় মারাত্মকভাবে আশির দশকের পর থেকে বাণিজ্যিক চিংড়ি মাছ চাষ শুরু হয়ে যায়। ফলে পুরোপুরিভাবে এই এলাকার পানি চিংড়ি চাষের কারণে আশপাশের কৃষি জমিগুলো লবণাক্ত পানিতে ভরে যায়।
দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের ৬০ ভাগ মানুষ সুপেয় খাবার পানি থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীদের দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এই এলাকায় নারীর প্রতি সহিংসতার যে ঘটনাগুলো হয়, তার অন্যতম কারণ হচ্ছে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করার কারণে দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বাইরে থাকার কারণে।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক বলেন, দেশের সর্ব দক্ষিণের সর্ববৃহৎ উপজেলা শ্যামনগর। এই অঞ্চল সিডর, আইলা, ফণি, বুলবুল, আম্পান, ইয়াসে বারবার লণ্ডভণ্ড হয়েছে। এই উপজেলার সাধারণ মানুষের সবথেকে প্রবল সমস্যা হচ্ছে বেড়িবাঁধ ও খাওয়ার পানি।
বর্তমানে যে মৌসুম চলছে এতে এখানে পানির সংকট দেখা দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মধ্য দিয়ে মানুষের কল্যাণে আমরা প্লাস্টিকের বড় পানির ট্যাংকি প্রদান করে থাকি। এর বাইরেও যে বরাদ্দ আমাদের প্রদান করেন সেই বরাদ্দ থেকেও আমরা স্বল্প পরিসরে পানির ট্যাংকি দিয়ে সাধারণ মানুষের পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকি। তবে যে পরিমাণে পানির চাহিদা সেই পরিমাণে এই সহায়তা খুবই অপ্রতুল। সুপেয় পানির জন্য আমাদের বেশি করে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্ল্যান যদি দেওয়া হয় এবং যে এলাকাগুলো নলকূপ সাকসেসফুল, সেই এলাকাগুলোয় যদি আরও বেশি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয় তাহলে এলাকার মানুষের পানির চাহিদা মিটবে।
সার্বিক বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা এবং পদ্মপুকুর ইউনিয়নে সুপয়ে পানির বেশি সমস্যা। ভুরুলিয়া, শ্যামনগর সদর, নুরনগর, ঈশ্বরীপুর ও বুড়িগোলনি- এই পাঁচটি ইউনিয়নে কোনো মিষ্টি পানির আধার নেই। বাকি ইউনিয়নগুলোয় কিছু কিছু অংশে নলকূপ বাসানো সম্ভব। যেখানে বাসানো সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিংয়ের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। আর যেখানে মিষ্টি পানির পুকুর আছে, সেখানে ফিল্টারে মাধ্যমে পানি দিয়ে থাকি। বর্তমানে পুরো উপজেলায় ছয় হাজারের বেশি পানির স্থাপনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের এই বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে প্রান্তিক নারীদের।
দাকোপ উপজেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের তথ্যমতে, উপজেলায় এক হাজার ৮১৩টি টিউবওয়েল আছে, যার মধ্যে চালু আছে মাত্র ২৪৭টি। কিন্তু এর অধিকাংশের পানি পানের অনুপযোগী। পানি বিশুদ্ধ করার পিএসএফ আছে ৫৩২টি, কিন্তু এর মধ্যে চালু মাত্র ৫৬টি।
বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা শতাধিক রিভার্স অসমোসিস ‘আরও’ প্ল্যান্ট নষ্ট। শুধু এসডিএফেরই ৭২টা অকার্যকর। তাদের তৈরি মাত্র ৫-৬টি প্ল্যান্ট ভালো আছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘দাকোপ উপজেলায় কোনো টিউবওয়েল ফাংশন করে না। যেকোনো একুয়িফায়ার গেলেও এটি কার্যকরী হয় না। তাই সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প নেওয়ার সময় এই উপজেলাকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে তা কার্যকরী করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি ভালো পুকুরগুলো সংরক্ষণ করে “আরও” এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পানির সমস্যা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’