মোজাফ্ফর রহমান, সাতক্ষীরা : আজ প্রস্তুুত হচ্ছে ঢালাই সিসি ব্লক, অথচ গায়ে নীল কালির সিল মারা হচ্ছে গতঅর্থবছরের ব্যাক-ডেটে। আন্তর্জাতিক সংস্থা জাইকার অর্থায়নে সাতক্ষীরার আশাশুনিতে খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৪০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে চলছে এমনই নজিরবিহীন জালিয়াতি। সিডিউল লঙ্ঘন, নিন্মমানের কাজ এবং ভূয়া অগ্রগতি দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানাযায়, উপকূলীয় আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ও খাজরা ইউনিয়ন প্রাকৃতিক দূর্যোগের দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অতীতে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান ও ইয়াসের তান্ডবে খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ধসে পুরো এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ভিটেমাটি হারিয়ে নি:স্ব^ হতে হয়েছিল হাজার হাজার পরিবারকে। উপকূলের লাখো মানুষকে সেই চিরস্থায়ী দূর্ভোগ থেকে বাঁচাতে টেকসই বাঁধের এই মেগা প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। তবে মানহীন কাজের কারণে সেই সুরক্ষার বাঁধই এখন নতুন আতঙ্কের কারণ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ব্লক তৈরীতে নানা অনিয়সম চলছে। কারিগরি নিয়ম অনুযায়ী সিসি ব্লক ঢালাইয়ের পর অন্তত ২৮ দিন পানিতে ভিজিয়ে (কিউরিং) নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে আশাশুনির কাস্টিং মাঠে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ঢালাইয়ের মাত্র ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টার মাথায় ফর্মা খুলে অপক্ক ব্লক রোদে ফেলে রাখা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি ধরা পড়েছে ব্লকের তারিখে। আজ প্রস্তুুত করা ব্লকে কৌশলে জুন ২০২৬ বা পূর্ববর্তী অর্থবছরের ব্যাক-ডেট বসানো হচ্ছে। মূলত কাজ না করেই বিগত অর্থবছরের ভূয়া অগ্রগতি দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ হাতিয়ে নিতেই এ চক্রান্ত।
তৎকালিন সরকার পানিউন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২-এর অধীন ২০২৩ সালে ৪০ কোটি টাকা ব্যায়ে নদী ভাঙ্গন রোধে ওই প্রকল্পটি গ্রহন করে। বিধিমোতাবেক মের্সাস খোকন কনোস্টাশন প্রায় ৪০ কোটি ২ নম্বর প্যাকেজের (হাজরাখালি) কাজটি করার অনুমতি পান। ২৪ সালে কাজের আংশিক করার সময় সরকার পতনের পর কাজটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অদ্যবদি টিকাদারী প্রতিষ্টানের কাজ বন্ধ থাকলেও পানিউন্নয়ন বোর্ড কোনো অফিশিয়াল বাতিলপত্র ছাড়াই ৩ ও ৪ নম্বর প্যাকেজে (কোলা এলাকা) অন্য মের্সাস এমএম বিল্লডার্স নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দিয়ে করানো হচ্ছে। ওই প্রকল্পে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যায়ে প্রায় ২৮‘শ মিটার বেড়ীবাঁধের ব্লক নির্মান কাজ চলছে। অভিযোগ উঠেছে ২ নং প্যাকেজের কাজ বন্ধ থাকার পর নতুন করে সেখানে ব্লক নির্মানের কাজ শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় ওই প্যাকেজের প্রায় ৪০ কোটি টাকার সরকারী অর্থ তুলতে ৩ ও ৪ নং প্যাকেজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ব্লক তৈরী করে ব্যাক ডেটে তারিখ লিখছে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।
প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আবু দাউদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতাপনগরবাসী একের পর এক প্রকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতবিক্ষত। সরকার আমাদের সুরক্ষায় জাইকার কোটি কোটি টাকার টেকসই প্রকল্প দিল, কিন্তু পাউবোর অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি চক্রের দুর্নীতিতে সেই স্বপ্ন মাটি হতে চলেছে। কিউরিং ছাড়া অপক্ক ব্লক আর ব্যাক-ডেট মেরে বিল তুলে নেওয়ার এই পাঁয়তারা বরদাশত করা হবে না। বাঁধ টেকসই না হলে নদীভাঙনে পুরো ইউনিয়ন আবার মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। আমরা অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
প্রতাপনগরের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, আইলা-আম্পানে সব হারিয়ে আমরা এক কাপড়ে দিন কাটিয়েছি। চোখের সামনে নানা অনিয়মে আজ ব্লক ঢালাই হচ্ছে, ন্মিমানের পাথর,সিমেন্ট, দিয়ে নাম মাত্র ব্লক তৈরী করে তা একদিন পরে খুলে ফেলা হচ্ছে। তাতে ঠিকমত পানিও দেয়া হচ্ছে না। ফলে এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এছাড়া তারিখ বসানো হচ্ছে গত বছরের। কিউরিং ছাড়া এই দূর্বল ব্লক নদীর তীব্র ¯্রােত সামলাতে পারবে না।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে জানতে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। ব্যাক-ডেটিংয়ের বিষয়টি ভূল তথ্য। সরকারি বিধি অনুসরণ করেই কাজ তদারকি করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর ২ নং প্যাকেজের কাজ মাঝপথে বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। সেটার দরপত্র বাতিল করে নতুন টেন্ডার আহবান করা হবে। তবে ৩ ও ৪ নং প্যাকেজে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যায়ে আরেকটি প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন।
তবে কর্মকর্তারা স্বচ্ছতার কথা বললেও সরেজমিনে পাউবো কিংবা জাইকার কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। প্রমাণ লোপাটের আগেই দুর্নীতি দমন কমিশন ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী।