নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সুন্দরবনে হরিণ শিকারে বেপরোয়া চোরা শিকারীরা

প্রকাশঃ ২০২৬-০৮-২৯ - ১৭:২০

দাকোপ (খুলনা) প্রতিনিধি : ফাঁদসহ নানা কৌশলে সুন্দরবনে প্রতিনিয়ত হরিণ শিকার করে আসছে বেপরোয়া চোরা শিকারীরা। এমনকি বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও থেমে নেই হরিণ শিকার। গরু ও খাসির মাংসের তুলনায় হরিণের মাংসের দাম অনেক কম। ফলে এই বন্যপ্রাণীর মাংস বন সংলগ্ন খুলনার দাকোপেসহ বিভিন্ন এলাকায় হরহামেশা বিক্রি হচ্ছে। হরিণের পাশাপাশি ওই সব শিকারীর কাছ থেকে বেহাই পাচ্ছে না অন্যান্য বণ্য প্রাণীও। মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযানে এসব শিকারী চক্রের সদস্যরা আটক হলেও থেমে নেই এই অবৈধ কর্মকান্ড।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব ও পশ্চিম সুন্দরবনের কোল ঘেষা এ উপজেলার সুতারখালী, কালাবগী, নলিয়ান, কালিনগর, কৈলাশগঞ্জ, রামনগর, বানিশান্তা, ঢাংমারী, খেজুরিয়া ও লাউডোব এলাকা রয়েছে। এছাড়া মোংলার চিলা, জয়মনি, বৈদ্যমারী, বাঁশতলা, কাটাখালী, মোরেলগঞ্জের জিউধরা, গুলিশাখালী, সন্ন্যাসী, শরণখোলার ধানসাগর, তাফালবাড়ী, সোনাতলা, পানিরঘাট, রাজাপুর, রসুলপুর, চালিতা বুনিয়া, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বেশ কিছু এলাকাও রয়েছে। এসব এলাকার চিহ্নিত বেশ কয়েকটি হরিণ শিকারী চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন যাবৎ সুন্দরবনে অবাধে ফাঁদসহ নানা কৌশলে হরিণ শিকার করে আসছে। বনবিভাগের প্রহরিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুরি করে সুন্দরবনে প্রবেশ করে তারা। পরবর্তীতে অনেক লম্বা ফাঁদসহ নানা কৌশলে হরিণ শিকার করে থাকে। তারপর খুব সহজেই লোকালয়ে নিয়ে আসে ওই চক্রের সদস্যরা। পরে বিভিন্ন এলাকা থেকে অগ্রিম অর্ডার নেয়া লোকজনের নিকট নগদ ও বাকিতে বিক্রি করছে। আবার অনেক সময় ক্রেতারা প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে মাংস কিনতে চান না। তখন শিকারীরা জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করে থাকেন। বন সংলগ্ন এলাকায় যে দামে হরিণের মাংস বিক্রি হয় তার থেকে ডাবলেরও অনেক বেশি দামে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংস বিক্রি হয়ে থাকে। আর অবৈধ জেনেও হরিণের মাংস কেনেন মানুষ। এমনকি ধনার্ঢ্য ব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। কেউ কেউ স্বজনদের হরিণের মাংস আবার উপহার দেন। আবার বড় ধরনের স্বার্থসিদ্ধির জন্যও কর্তা ব্যক্তিদের খুশি করতে গোপনে হরিণের মাংস দেন। তবে দূর্নীতিবাজ দুই একজন কর্মকর্তা এসব কাজে সহযোগিতা করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝে মধ্যে বনবিভাগ ও কোস্টগার্ডের কাছে হরিনের মাংস ও চামড়াসহ এসব শিকারী চক্রের দুই একজন সদস্য ধরা পড়ে। কোন কোন সদস্য আবার পালিয়েও যায়। এতে কয়েকটি মামলা খেলেও কখনও থেমে নেই হরিণ শিকার। এমনকি জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও থেমে নেই হরিণ শিকার। এছাড়া স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও জন প্রতিনিধিরা এসকল শিকারী চক্রের সদস্যদের কাছ থেকে ইচ্ছামত হরিণের মাংসসহ নানা সুযোগ সুবিধা নিয়ে থাকে। ফলে হরিণ শিকার কিছুতেই বন্দো হচ্ছে না বলে এলাকার সচেত মহলের অভিযোগ। এমনিভাবে চোরা শিকারীদের সুন্দরবনে হরিণ নিধন চলতে থাকলে আগামীতে এ চিত্রল মায়াবী হরিণ বিলুপ্ত হতে পারে বলে ওই মহল মনে করেন।
কালাবগি এলাকার জামাল শেখ জানান, চিহ্নিত হরিণ শিকারী চক্রের সদস্যরা প্রতি অমাবশ্যা ও পূর্নিমার গোনে বনে ঢুকে ফাঁদসহ নানা কৌশলে হরিণ শিকার করে থাকে। পরে এলাকায় এনে প্রতি কেজি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বিক্রি করে। এবিষয়ে এলাকার কোন লোক মুখ খুললে অনেক সময়ে এলাকার কথিত প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের রোষানলে বিভিন্ন রকমের হয়রানির স্বীকার হতে হয়। শুধু হরিণ নয় এসব শিকারীর হাত থেকে সজারুসহ বনের অন্যান্য বণ্যপ্রাণীও বেহাই পায় না। ওই চোরা চক্রের সদস্যদের নামে হরিণ শিকারের একাধিক মামলা থাকলেও তারা বহালতবিয়তে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছেন বলে তিনি জানান।
এবিষয়ে ফিশ ফার্ম অনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফোয়াব) ও জাতীয় মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মোল্লা সামছুর রহমান শাহিন বলেন, প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ধরা কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় প্রাকৃতিক এই সম্পদ অচিরেই বিলুপ্ত হতে পারে। সুন্দরবন এবং বনের জীব বৈচিত্র রক্ষা করতে হলে বনবিভাগকে আরো অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রথমে বনের বিভিন্ন নদী, খাল এবং নিষিদ্ধ এলাকায় বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার বন্দো করতে হবে। এছাড়াও বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন বণ্যপ্রাণী শিকারও। অপরাধ মূলক কর্মকান্ডে যে সব জেলে জড়িত তাদের কঠোর ভাবে বনে নিষিদ্ধ করতে হবে। তবে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান অথবা ভাতার আওতায় আনতে হবে। আর ওই অবৈধ শিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া এ কাজে আর্থিক চুক্তিতে বনবিভাগের দূর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী সহযোগীতা করছেন তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে সুন্দরবনের পরিবেশ ফিরে আসবে এবং বনের জীববৈচিত্র রক্ষা পাবে।
এব্যাপারে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা বিভাগিয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, মাছের প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনে প্রবেশে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু চোরা শিকারীরা মাঝে মধ্যে বনে ঢুকে হরিণ শিকার করছে আবার ধরাও পড়ছে। তবে আগের চেয়ে তুলনা মূলক অনেক কম। এ পর্যন্ত হরিণ শিকারের ঘটনায় মোট ৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে পি ও আর মামলা ৪টি ও ইউ ডি ও আর মামলা ৩টি। এসব মামলায় আসামী রয়েছে ৭জন। যার মধ্যে আটক হয়েছে ৩জন আর পলাতক রয়েছে ৪জন। এছাড়া ১৪৫.২৫ কেজি হরিণের মাংস ও ৯০ মিটার হরিণ ধরা ফাঁদ এবং ১৫০ মিটার হরিণ ধরা মালা ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। যার মধ্যে ৫২৮টি মালাফাঁদ রয়েছে। তাছাড়া অল্প জনবল দিয়ে এত বড় বনে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয় বনবিভাগের। চোরা শিকারীদের দমনে আমাদের অভিযান ও টহল অব্যহত রয়েছে।