শান্ত সুন্দরবনে অশান্ত বানরদের সঙ্গে খেলায় মেতেছে পর্যটকরা

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২৯ - ০৭:৫০

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : শীতে সুন্দরবন থাকে শান্ত। যে কারণে লঞ্চ কিংবা ট্রলারে চেপে নদী ও ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করতে আসছেন দেশি-বিদেশি পর্যটক। আর সুন্দরবন গিয়ে দুষ্টু বানানদের সঙ্গে খেলায় মেতেছে পর্যটকরা।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বাঘ ও হরিণের পরই এ বনের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে বানর। সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্যকে আলিঙ্গন করে রেখেছে এই প্রাণী।
পর্যটকদের দেখলেই এখানে খাদ্য খেতে দল বেঁধে ছুটে আসে বানর। এ সময় পর্যটকরা বানরদের চিপস, সফট ড্রিংকসসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার খাইয়ে থাকেন।
শুক্রবার সকালে সাতক্ষীরার সুন্দরবন উপকূলে দেখা গেছে এমন চিত্র।
দেখা গেছে, হরিণ ও বানরের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আকর্ষণ করছে পর্যটকদের। সুন্দরবনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা বন্ধু-বান্ধব, পরিবার পরিজন নিয়ে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। পিছিয়ে নেই বিদেশি ভ্রমণপিপাসুরাও। তারাও এসেছেন সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখতে। ঘুরে বেড়াচ্ছেন সুন্দরবনের নদীতে।
সুন্দরবন সংলগ্ন আকাশ নীলা ইকো টুরিজম সেন্টারের ম্যানেজার সাইফুল ইসলাম বলেন, সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। ছুটির প্রথমদিনে শুক্রবার প্রায় দুই হাজার পর্যটক এসেছেন এখানে। এর সঙ্গে অনেক ভিআইপিও আসছেন।
তিনি বলেন, একারণে উল্লেখযোগ্য রাজস্বও আয় হবে। আকাশনীলা ছাড়াও সাতক্ষীরার সুন্দরবন বিভাগের কলাগাছিয়া পর্যটন স্পটেও পর্যটকদের ভিড় হচ্ছে।
কলাগাছিয়ায় ঘুরতে আসা সোহরাব হোসেন বলেন, অনেকবার সুন্দরবনের এসেছি। এই শীতের সময় এসে বেশি ভালো লাগছে। এখানে এসে হরিণ বানানদের সঙ্গে খেলা করে অনেক ভালো লাগল।
শরীয়তপুর থেকে আসা এক শিক্ষার্থী জানান, আমি প্রথমবার সুন্দরবনে এসেছি। সুন্দরবন এমন একটি জায়গা যেখেনে তাকালে শুধু সামনের দিকে যেতে চায় মন। কলাগাছিয়ায় এসে অনেক ভালো লাগছে। কারণ এখানে ছোট-বড় অনেক বানর আছে।
কলাগাছিয়া ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রর বন কর্মকর্তা আসাদুর রহমান বলেন, শীতের আগে প্রতি মাসেই আসত হাজার খানের পর্যটক। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার পর্যটক আসছে। সকাল থেকে কমপক্ষে ৫৯টি ট্রলার ও লঞ্চ সুন্দরবনের ভেতরে প্রবেশ করেছে। এসব নৌযানে প্রায় এক হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। মূলত সাপ্তাহিক ছুটি উপলক্ষে বেশি সংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছে বলে জানান তিনি।
ঢাকার ব্যবসায়ী আবীর আবদুল্লাহ সময় পেলেই দেশে-বিদেশে ঘোরেন। কিন্তু যাতায়াতের ঝক্কি-ঝামেলার কারণে সুন্দরবনে যাওয়ার সুযোগ হয়নি কখনো। পদ্মা সেতু সেই বাধা দূর করে দিয়েছে। আগামী সপ্তাহেই সপরিবার সুন্দরবন যাচ্ছেন তিনি। লক্ষ্য, রাস পূর্ণিমার মেলা দেখা।
আবীর আবদুল্লাহ বলেন, ‘আগে সড়কপথে খুলনা যেতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগত। এত সময় নষ্ট হবে ভেবে সুন্দরবন যাওয়া হয়নি। এখন রাতে বাসে উঠব, সকালে খুলনা নেমে সরাসরি জাহাজে গিয়ে উঠব। এরপর তিন দিন সুন্দরবন ঘুরব।’
শুধু আবীর আবদুল্লাহ নন, তার মতো হাজারো পর্যটকের কাছে সুন্দরবন এখন অন্যতম আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য। পদ্মা সেতুর কল্যাণে ঢাকা থেকে খুলনা, বাগেরহাট বা সাতক্ষীরার দূরত্ব কমেছে। অনেকে আবার সরাসরি জাহাজে করে বুড়িগঙ্গা থেকে সুন্দরবনে ভ্রমণে আসেন প্যাকেজের মাধ্যমে। উন্নত জলযান, নিরাপত্তা ও নতুন পর্যটন স্পট—সব মিলিয়ে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বাড়ছে পর্যটক, বাড়ছে রাজস্ব আয়। বনের পাশে গড়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব ইকো কটেজ, যা বদলে দিচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি।
একসময় সুন্দরবন ভ্রমণ ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর আধুনিক জাহাজের অভাবে অনেকেই সাগর বা পাহাড়কে বিকল্প হিসেবে বেছে নিতেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলেছে। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) তথ্যমতে, বর্তমানে তাদের ৬৫টির বেশি নিবন্ধিত জাহাজ পর্যটকদের নিয়ে সুন্দরবনে যায়। গত দুই বছরেই এ খাতে যুক্ত হয়েছে ১০-১৫টি বিলাসবহুল নৌযান।
তিন রাত দুই দিন অথবা দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজে সাধারণ মানের জাহাজে পর্যটকদের জনপ্রতি খরচ হয় ৭-৮ হাজার টাকা। বিলাসবহুল জাহাজে খরচ হয় ২২-২৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্যাকেজের আওতায় থাকার কেবিন, খাওয়া, বনে ভ্রমণ—সবই অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিজন দেশি পর্যটকের জন্য বন বিভাগকে রাজস্ব দিতে হয় ১ হাজার ৫০ টাকা এবং বিদেশি হলে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। সুন্দরবনের ভ্রমণের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের অনুমতি পাওয়া যায় বন বিভাগ থেকে। তবে একদিনের জন্য অনেকেই অর্থাৎ সকাল সন্ধ্যা এই প্যাকেজে বাগেরহাটের মোংলা থেকে ট্রলার ও ছোট জালিবোটে করে সুন্দরবনের করমজল ও হাড়বাড়িয়া এলাকায় ঘুরতে যান পর্যটকরা। সেখানে এই কাজে নিযুক্ত আছে অর্ধশতাধিক নৌযান। এ ছাড়া সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকেও একইভাবে পর্যটকরা সুন্দরবন ভ্রমণে যান।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে পর্যটক ও রাজস্ব আয় দুটোই সমানভাবে বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যেখানে রাজস্ব আয় ছিল ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। ওই অর্থবছরে সুন্দরবনে পর্যটক এসেছেন ২ লাখ ১৬ হাজার জনের বেশি।
২০২৪-২৫অর্থ বছরে সুন্দরবনে এসেছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২১১ জন পর্যটক। যারমধ্যে দেশি পর্যটক ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯১ জন এবং বিদেশি পর্যটক ৩২০ জন। এর পর প্রায় ধারাবাহিকভাবে সুন্দরবনে পর্যটক সংখ্যা বেড়েছে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্রমণ করেন ৩ লাখ ২৮ হাজার জন পর্যটক। এরমধ্যে বিদেশি পর্যটক ছিলেন ১ হাজার ৭৩৪ জন।
তবে ট্যুর অপারেটররা বলছেন, দেশি পর্যটকদের সংখ্যা বাড়লেও বিভিন্ন কারণে বিদেশি পর্যটকদের আসা কমে গেছে। এর জন্য তারা প্রধানত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করেছেন।
ছবি: স্টার
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জেড এম হাসানুর রহমান জানান, আগে বনের কটকা, কচিখালি, দুবলারচর, হিরণ পয়েন্ট, হাড়বাড়িয়া, কলাগাছিয়া ও করমজল এই সাতটি পর্যটন স্পট ছিল। নতুন করে শরণখোলার আলীবান্ধা, চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক, খুলনা রেঞ্জের শেখেরটেক ও কৈলাশগঞ্জে আরও চারটি পর্যটন স্পট হয়েছে।
সুন্দরবন ভ্রমণের প্রচলিত ধারণার বাইরে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইকো কটেজ ও রিসোর্ট। বনের পাশেই খুলনা ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ২০টির বেশি ইকো কটেজ। জঙ্গলবাড়ি, ইরাবতী, গোলকানন, বনবাসের মতো এসব কটেজে পর্যটকেরা বনের নিবিড় সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
তরুণ উদ্যোক্তারা পদ্মা সেতুকে ঘিরে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। এসব কটেজকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকশ পরিবারের কর্মসংস্থান হয়েছে। যারা একসময় ঝুঁকি নিয়ে বনে সম্পদ আহরণ করতেন, তারা এখন পর্যটন গাইড, নৌকার মাঝি বা অন্যান্য সেবা দিয়ে আয় করছেন।
রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া হোসাইন শাওন বলেন, ‘বনকে ভালো রাখাটাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পরিবেশবান্ধব পর্যটন আরও এগিয়ে যাবে।’
ট্রলারে করে করমজল, কালাবগী বা কলাগাছিয়া যেতে খরচ হবে ট্রলারপ্রতি ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা। সেখানে ২০ থেকে ৩০ জন একসঙ্গে ভ্রমণ করতে পারেন। হাড়বাড়িয়া, শেখেরটেক ও দোবেকীর মতো কিছু জায়গায় যেতে খরচ পড়ে ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।
তবে যারা গভীরভাবে সুন্দরবন উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য রয়েছে ট্যুর অপারেটরদের বিভিন্ন প্যাকেজ। তবে সবথেকে পছন্দনীয় প্যাকেজ নেন পর্যটকরা তিন দিন–দুই রাতের প্যাকেজ। এতে ভ্রমণের অনুমতি থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া, থাকা, নিরাপত্তা—সবকিছুর ব্যবস্থা থাকে। সাধারণত জনপ্রতি খরচ পড়ে ৭ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার টাকা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চে বা ক্রুজ শিপে গেলে খরচ ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ২২ হাজার টাকার মধ্যে।
খুলনা বা সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া এই ভ্রমণ আরও রোমাঞ্চকর। ১০–১৫ জনকে নিয়ে ছোট্ট ট্রলার যায় বনের গভীরে। নিরাপত্তার জন্য থাকে বনরক্ষী ও গাইড। দুই রাত তিন দিনের এই ভ্রমণে ভ্রমণকারীরা নিজের ইচ্ছামতো বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে পারেন। জনপ্রতি খরচ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা।
দর্শনার্থীদের মাত্রাতিরিক্ত ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণে অবশেষে ‘সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা’ চূড়ান্ত করেছে সরকার। সুন্দরবনের ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হবে গত কয়েক বছর ধরে আলোচিত এ নীতিমালার মাধ্যমে। নীতিমালায় সুন্দরবন ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটক, ট্যুর অপারেটর ও বন বিভাগের দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, সুন্দরবন ভ্রমণের কমপক্ষে তিনদিন আগে বনবিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হবে, সর্বোচ্চ ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে দোতলা লঞ্চ বা জলযান পর্যটকসহ সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারবে। দিনে একটি লঞ্চে সর্বোচ্চ ১৫০ ও রাতে ৭৫ জনের বেশি ভ্রমণ করতে পারবে না। কোনো ফিটনেসবিহীন লঞ্চ সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে নীতিমালায়।
যে কোনো শর্ত ভঙ্গের জন্য ভ্রমণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লঞ্চ বা জলযানের সুন্দরবনে ভ্রমণের রেজিস্ট্রেশন বাতিল বা জরিমানা আদায় করার কথাও নীতিমালায় বলা হয়েছে।
বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইউনুস আলী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত জানুয়ারি মাসে সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালার গেজেট জারি হয়েছে। পর্যটকদের কারণে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর বসবাসের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ যাতে দূষিত না হয় নীতিমালায় সে দিকে নজর দেয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নীতিমালার মাধ্যমে সুন্দরবনে ভ্রমণ সীমিত করে আনা হচ্ছে তা নয়। বরং সব কিছু একটা নিয়মের মধ্যে আনা হয়েছে। নিয়ম মেনে যে কেউ ভ্রমণ করতে পারবেন।’
নীতিমালায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে পর্যটক সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরিকল্পিত ও আকস্মিক ভ্রমণ দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা বিঘিœত করছে এবং সুন্দরবনের পরিবেশ বিনষ্ট করছে।
বন বিভাগের এক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৫৯ সালে এই বনে যেখানে প্রতি হেক্টরে গাছের গড় সংখ্যা ছিল ২৯৬টি, ১৯৯৬ সালে এই সংখ্যা নেমে এসে দাঁড়ায় ১৪৪টিতে। সুন্দরবনের ভেতর লঞ্চসহ নানা রকমের নৌযান চলাচলের শব্দ, রাতের বেলা সেগুলোর আলো এবং সার্চ লাইট বন্যপ্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশে বড় রকমের বিঘœ ঘটায়। দিনে দিনে কমছে বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী।
বন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৮ সালে এক আদেশের মাধ্যমে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা দেয় সরকার। সুন্দরবন বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখ- বনভূমি। ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে।
সমগ্র সুন্দরবনকে ১৯৯২ সালে ‘রামসার সাইট (ইরানের রমসা থেকে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাপী জৈবপরিবেশ রক্ষার একটি সম্মিলিত প্রয়াস)’ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের হালনাগাদ ফিটনেস সার্টিফিকেট ও বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ চলাচলের অনুমতি ছাড়া পর্যটকবাহী জলযানকে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না।
এতে বলা হয়েছে, সুন্দরবন ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য অক্ষুণœ রেখে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত আকারে সুন্দরবন ভ্রমণ অনুমোদন করা যাবে। সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য দর্শনার্থীদের সরকার নির্ধারিত হারে ফি দিতে হবে। সুন্দরবন ভ্রমণের ন্যূনতম তিনদিন আগে বন কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। তবে বিদেশী পর্যটকদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করতে হবে।
সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী এলাকার পর্যটন কেন্দ্র যেমন- করমজল, মুন্সীগঞ্জ বা এ ধরনের এলাকা ছাড়া সুন্দরবনের ভেতরে ভ্রমণ ও রাতযাপনের জন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পূর্ব অনুমতি নিতে হবে। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার পর্যটক ধারণ ক্ষমতার মধ্যে পর্যটক সংখ্যা সীমাবদ্ধ রাখা হবে বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সুন্দরবন ভ্রমণকালে প্রচলিত বন আইন, বন্যপ্রাণী আইনসহ সংশ্লিষ্ট বিধি এবং বনকর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে, যেখানে সেখানে অবতরণ, বিচরণ, অবস্থান করা যাবে না। বনের ভেতরে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো হাতিয়ার, ফাঁদ, বিষ ইত্যাদি ছাড়াও মাছ বা বন্যপ্রাণী শিকার বা ধরার সহায়ক কোনো সরঞ্জাম বহন করা যাবে না।
সুন্দরবন ভ্রমণকালে কোনো মাইক বা মাইক্রোফোন জাতীয় শব্দযন্ত্র বহন করা যাবে না। পর্যটকবাহী লঞ্চ চলাচলের জন্য নির্ধারিত রুট অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়।
সর্বোচ্চ ৫০ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত দোতলা লঞ্চ বা জলযান পর্যটকসহ সুন্দরবন ভ্রমণ করতে পারবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, লঞ্চ বা জলযানে দিনে সর্বোচ্চ ১৫০ জন পর্যটক ও রাত্রিকালীন অবস্থানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৫ জন পর্যটক বহন করা যাবে।
পর্যটকবাহী লঞ্চ বা জলযান সর্বোচ্চ চার রাত পাঁচ দিন পর্যন্ত সুন্দরবনে অবস্থান করতে পারবে। গবেষণার জন্য বন বিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে ন্যূনতম প্রয়োজন অনুযায়ী সুন্দরবনে অবস্থান করা যাবে।
ভ্রমণ নীতিমালায় বলা হয়েছে, অভয়ারণ্য এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত আলাদা এন্ট্রি ফি দিতে হবে। সুন্দরবনে নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত অবস্থানের প্রয়োজন হলে নিকটস্থ বন কর্মকর্তাকে যুক্তিসঙ্গত কারণ জানিয়ে নির্ধারিত ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। কোনোভাবেই তা সর্বোচ্চ নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত হবে না।
সুন্দরবনে প্রবেশ করার পর জলে ও স্থলে কোনোভাবেই কোনো আবর্জনা ফেলা যাবে না, জলযানের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।
হ্রাসকৃত ফির মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের ভ্রমণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের নিজস্ব প্যাডে ভ্রমণকারীদের তালিকাসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। প্রতি ৩০ জন ছাত্রছাত্রীর অভিভাবক হিসেবে ন্যূনতম একজন শিক্ষক নিযুক্ত রাখার কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়।
সুন্দরবন এলাকায় সাগর, নদী বা খালের পানিতে নামা, গোসল করা ও সাঁতার কাটা থেকে বিরত থাকার কথা উল্লেখ করে নীতিমালা বলা হয়েছে, সুন্দরবনের প্রাণীরা ভয় পেতে পারে, তাদের জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকির সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো কর্মকা- বা আচার-আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, স্বাভাবিক মাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী, কালো ধোঁয়া উদ্গীরণকারী বা ত্রুটিপূর্ণ কোনো জলযান পর্যটক পরিবহন করতে পারবে না। পর্যটকবাহী লঞ্চে সৌর শক্তি ব্যবহারে সচেষ্ট থাকা। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে শব্দ সৃষ্টিকারী জেনারেটর বহন থেকে বিরত ও রাত ১০টার পর জলযানে ব্যবহৃত জেনারেটর বন্ধ রাখতে হবে।
অনুমতি ছাড়া পর্যটকবাহী জলযানে জীবিত গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া জাতীয় প্রাণী বা এসব প্রাণীর মাংস বা রেড-মিট বহন করা যাবে না। প্রতিটি পর্যটকবাহী জলযানে কমপক্ষে একজন প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড এবং ৪০ জনের বেশি পর্যটকের জন্য দু’জন গাইড রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
সুন্দরবনে ভ্রমণের জন্য প্রাপ্ত আবেদনের বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য প্রবেশ ফি, জলযান রেজিস্ট্রেশন ফি ও অন্যান্য যে কোনো ধরনের আদায়যোগ্য ফি’র তালিকা বিভাগীয় দফতরে এবং পর্যটকদের প্রবেশ পথের স্টেশনে বন বিভাগকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে।
পর্যটকদের কাছ থেকে বনকর্মীর আচরণ নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।সুন্দরবন, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। যা দেশের দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত এক অনন্য প্রাকৃতিক রতœ। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল। বছরের নির্দিষ্ট সময়গুলোতে, বিশেষত শীত মৌসুমে, এটি ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে ওঠে। আর এখন মৃদু শীতল হাওয়া প্রকৃতিকে স্নিগ্ধ ও সুগন্ধিতে ভরিয়ে তুলেছে। ফলে সুন্দরবনের ইকো ট্যুরিজমের রিসোর্টগুলোতে জমে উঠছে ভ্রমণপ্রেমীদের ঢল।
প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। একদম দূরে, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। সেখানে গিয়ে প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগ করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তৈরি হয় ইকো ট্যুরিজমের ধারণা। বাংলাদেশে ইকো ট্যুরিজমের সম্ভাবনা অত্যন্ত বৈচিত্রময়। সুন্দরবন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অমূল্য রতœ। পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য।
সুন্দরবন কেন্দ্রিক বাড়ছে রাজস্ব : বন বিভাগ জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণে যান ১ লাখ ২৮ হাজার ১৭৫ জন পর্যটক। এর মধ্যে দেশি পর্যটক ছিলেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৪১২ জন এবং বিদেশি ৪ হাজার ৭৬৩ জন। বন বিভাগের রাজস্ব আসে ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুন্দরবন ভ্রমণ করেন ২ লাখ ১১ হাজার ৫৭ জন পর্যটক। এর মধ্যে দেশি ২ লাখ ৮ হাজার ৪৩৫ জন এবং বিদেশি ২ হাজার ৬২২ জন। এ থেকে রাজস্ব আসে হয় ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
সুন্দরবন : পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট : সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট হিসেবে পরিচিত। এটি টঘঊঝঈঙ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত এবং এখানকার জীববৈচিত্র, বিশেষ করে বাঘ, হরিণ, কুমির এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখি, পৃথিবীজুড়ে পরিচিত। সুন্দরবনের বিশালতা, জীববৈচিত্র এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য এক স্বর্গীয় স্থান।
সুন্দরবন ভ্রমণের উপযুক্ত সময় : সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হল শীতকাল। বিশেষত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত। এই সময়টিতে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আদর্শ। কারণ মৃদু শীতল আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৌন্দর্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে আরো চমৎকার করে তোলে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন এবং জলা অঞ্চলগুলো এই সময়ে আরো সুন্দর এবং উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এছাড়া, এই সময়ে বিভিন্ন ধরনের পক্ষী ও প্রাণীর বিচরণও বেড়ে যায়। যা ভ্রমণকারীদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়।
সুন্দরবনে ইকো ট্যুরিজমের সম্ভাবনা : সুন্দরবন ভ্রমণের মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, অন্যদিকে এখানকার পরিবেশ রক্ষার জন্য পর্যটকরা সচেতনভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন। সুন্দরবনের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ট্রেইল, পানিপথ, পাখির অভয়ারণ্য, বাঘ দেখতে পাওয়া এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ভ্রমণ পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। এসব স্থানে গিয়ে পর্যটকরা শুধু সৌন্দর্যই উপভোগ করেন না, বরং পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হন।
ইকো ট্যুরিজমের জনপ্রিয়তা : সুন্দরবন কেন্দ্রিক ইকো ট্যুরিজম এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। পরিবেশবান্ধব এই ট্যুরিজমের মাধ্যমে পর্যটকরা বনের প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ব হতে পারেন, যাতে তারা অল্প সময়েই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি এবং জীববৈচিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। সুন্দরবনের ইকো রিসোর্টগুলো সাধারণত পরিবেশের ওপর কম প্রভাব ফেলে। কারণ এসব রিসোর্টের নকশা এমনভাবে করা হয় যাতে প্রকৃতির সঙ্গতি বজায় থাকে।
দুর দূরান্তের ভ্রমণপিপাসুরা এখন সুন্দরবনে ছুটে আসছেন। বিশেষ করে বিদেশী পর্যটকরাও এখানে আসছেন, কারণ ইকো ট্যুরিজম এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে।
ইকো ট্যুরিজম বা পরিবেশবান্ধব পর্যটন এমন একটি ভ্রমণ প্রক্রিয়া যেখানে প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ভ্রমণ করা হয়। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে পরিবেশের ক্ষতি না করে পর্যটন বিকাশ করা। এখানে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন। তবে তারা প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাদের কাজের মাধ্যমে পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না।
এমনকি ইকো ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার উন্নয়নও সাধিত হচ্ছে। তারা তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত রেখে পর্যটনের সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এর মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করা সম্ভব।
রিসোর্ট এবং বিশেষ আকর্ষণ : এই সময়ে সুন্দরবনে বেশ কিছু এক্সক্লুসিভ রিসোর্ট রয়েছে। যেখানে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে ভ্রমণ করা যায়।
বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সুন্দরবন পৃৃথিবীর অনন্য সম্পদ। মাকড়সার জালের মতো ৪শ’ ৫০টি ছোট-বড় নদ-নদীতে বৈষ্টিত সুন্দরবন। দেশের নদ-নদীর পানি বঙ্গোপসাগরে পড়ার স্বাভাবিক ধারা হয়েছে অস্বাভাবিক। নেই প্রবল তোড়। স্রোতহীন নদীর পানি একরকম চুইয়ে পড়ার মতো অবস্থার কারণে লবণাক্ততা গ্রাস করছে। উপকূল বরাবর সুন্দরবনের গঠন প্রকৃতি বহুমাত্রিক উপাদানে প্রভাবিত। যাদের মধ্যে রয়েছে, স্রোতের গতি, ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক স্রোত চক্র এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী দীর্ঘ সমুদ্রতটের স্রোত। মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। বাড়ছে নদ-নদীতে পলি ও লবন পানির আধিক্য। জলবায়ু এবং ভূমি গঠনেরও পরিবর্তন ঘটছে। সুন্দরবনের বনভূমি ক্রমাগতভাবে বিপদের সন্মুখীন। ভারত অভিন্ন নদ-নদীর পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে পদ্মা ও তার শাখা নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের অপুরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। বনজ ও জলজ প্রাণী, উদ্ভিদ জীব বৈচিত্রের ক্ষতির সীমা-পরিসীমা নেই। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রতীক সুন্দরবন বুক পেতে দুর্যোগের পর দুর্যোগের ধাক্কা সামাল দিতে দিতে একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার ওপর মিঠা পানির বদলে লবণ পানির আধিক্যে নীরবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডক্টর মো. সাইবুর রহমান মোল্যা গতকাল ইনকিলাবকে জানান, নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়া বা নাব্য হারানোর কারণে সামগ্রিকভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সামাজিক পরিবেশের উপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে নদ-নদীর স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে পানি প্রবাহ কমে গেছে। এতে সমুদ্রের লবণ পানি উজানে ধাবিত হচ্ছে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে অধিকমাত্রায় স্যালাইন ওয়াটার ইনট্রুশন হওয়ায় গাছপালা, জলজ ও বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মক ব্যাহত হয়। তিনি জানান, বাঘ বা হরিণসহ পশু-পাখি অধিক পরিমাণে দীর্ঘমেয়াদী স্যালাইন ওয়াটার পান করলে তাদের জৈবিক গুণাবলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একইসাথে রি-প্রোডাকশন ক্যাপাসিটিও হারিয়ে ফেলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবন ১৯৭০ সালের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় হেরিকেন থেকে শুরু করে নিকট অতীতের সিডর, আইলা ও রোয়ানুর মতো ছোট বড় ঝড় ও জলোচ্ছাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেছে বিশাল এলাকার উপকুলীয় জনপদকে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় প্রতিবছর একাধিকবার সমুদ্র উত্তাল হয়ে বড় ধরণের ধাক্কা দিচ্ছে। অথচ মাস্টার প্লান করে সুন্দরবনকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বরাবরই অনুপস্থিত থাকছে। সুন্দরবন রক্ষা কমিটি ও তেল গ্যাস জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটি জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে সুন্দরবন রক্ষার জন্য। কিন্তু তাতেও ফলাফল বিগ জিরো। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, সাপ, শুকর, বানর, কাঠবিড়ালি, বাজপাখি ও শকুনসহ বিভিন্ন পশু-পাখির বিলুপ্তির পথে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা নদী ও খালগুলো ক্রমাগতভাবে মরে যাচ্ছে। সুন্দরবনে আগের মতো বাঘের হুঙ্কার ও দাপাদাপি নেই। কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে মায়াবী হরিণের ছুটোছুটি। নানা প্রজাতির পাখির কলতানও থেমে গেছে অনেকটা। সুন্দরী. গেওয়া, শাল, কেওড়া, বাইন, কাকড়া, পশুর, ধন্দুল ও গোলপাতাসহ উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী গ্রীন বেল্টও ক্ষতিগ্রস্ত। বিশেষ করে সিডর ও আইলার পরপর দু’টি ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে দেহ নিস্তেজ হয়ে গেছে সুন্দরবনের। নদ-নদীতে আগের চেয়ে কমে গেছে হরেকরকম মাছের সমাহার। মৎস্যসম্পদের অফুরন্ত ভান্ডার সুন্দরবনের এসব নদ-নদী। বন, পরিবেশ ও নদী সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবনের মূল ৬টি নদী শিবসা, পশুর, খোলপেটুয়া, কালিন্দি, বলেশ্বর, মালঞ্চ দিয়ে নদ-নদীর পানি বঙ্গোপসাগরে পড়ে। রায়মঙ্গল ও আড়পাঙ্গাসিয়া নদীসহ ছোট-বড় অসংখ্য খাল ও নালা রয়েছে সুন্দরবনে।
সূত্র জানায়, সমানতালে পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে বন ও লোকালয় সংলগ্ন শাখা-প্রশাখার অধিকাংশ নদ ও খাল। সুন্দরবনের নদী আড়পাঙ্গাসিয়া, মাদার, মালঞ্চ ও চূনার মধ্যখানেও জেগে উঠছে বড় বড় চর। কাকশিয়ালী নদীরও নাব্য হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। অন্যতম বেতনা নদীও তার নাব্য হারিয়ে পুরোপুরি একটি মৃত খালে রূপ নিয়েছে।