খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানাধীন সাজিয়ারা গ্রামের শামীম ফকির নামে একজন যুবক তার মাতা সালেহা বেগমের সন্ধান না পেয়ে খুলনার আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। আসামী করা হয় মোঃ লালন গাজী নামে একজন ব্যক্তিকে। আদালতের নির্দেশে পিবিআই এর তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ভিকটিম সালেহা বেগম দীর্ঘদিন যাবত পিরোজপুর জেলার ইন্দুকানী থানা এলাকায় অবস্থান করতেন। গত ১৯শে আগষ্ট সন্ধ্যা থেকে সালেহা বেগমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তার ছেলে শামীম ফকির বাদী হয়ে মোঃ লালন গাজী নামে একজন ব্যক্তিকে আসামী করে খুলনার আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, মামলার সূত্র ধরে পিবিআই পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী থানা এলাকায় খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারেন ভিকটিম সালেহা বেগম ও আসামি মোঃ লালন গাজী একত্রে ওই থানার চাড়াখালী গ্রামের মোছাঃ জেসমিন বেগমের বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত বসবাস করছিলেন। গত ১৯শে আগষ্ট সন্ধ্যায় ভিকটিম এবং আসামি মোঃ লালন গাজী তার মামা বাড়ি খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা থানাধীন গজালিয়া গ্রামে যাওয়ার কথা বলে একত্রে বাসা থেকে বের হন। কিন্তু তাদের কোন সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিলো না। এরপর থেকে আসামী লালন গাজীকে খুজতে থাকে খুলনা পিবিআই।
অন্যদিকে ঘটনাসূত্রে জানা যায়, গত ২০শে আগষ্ট আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিটে বটিয়াঘাটা থানা পুলিশ বটিয়াঘাটা থানাধীন ৪নং সুরখালী ইউনিয়নের সুখদাড়া গ্রামের শহীদ শেখ এর বাড়ির পশ্চিম দিকে ঝপঝপিয়া নদী হতে মাথাবিহীন অজ্ঞাতনামা একজন মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করে। তাৎক্ষনিকভাবে উক্ত মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় থানা পুলিশ উক্ত মৃতদেহের সুরতহাল প্রস্তুত করে ময়না তদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করে। এ ঘটনায় বটিয়াঘাটা থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু হয় (যার মামলা নং-০৯, তাং ২০/০৮/২০২৫)। উদ্ধারকৃত অজ্ঞাতনামা মহিলার মৃতদেহটি বটিয়াঘাটা থানা পুলিশ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন পূর্বক বেওয়ারিশ মৃতদেহ হিসেবে দাফন করে। এরই ধারাবাহিকতায় পিবিআই খুলনার ক্রাইমসিন টিম দায়েরকৃত হত্যা মামলার অজ্ঞাতনামা মাথাবিহীন মহিলার মৃতদেহের পরিচয় সনাক্তে কাজ শুরু করে। এক পর্যায়ে অপহরন মামলার বাদী শামীম ফকির ও তার পরিবার মস্তকবিহীন মহিলার উদ্ধারকৃত লাশের ছবি দেখে মৃতদেহের পরিধেয় বস্ত্র এবং শারীরিক অবয়ব দেখে মৃতদেহটি বাদীর মা সালেহা বেগমের বলে প্রাথমিকভাবে দাবী করেন। এ অবস্থায় বটিয়াঘাটা থানায় রুজুকৃত উপরোক্ত হত্যা মামলাটি পিবিআই এর সিডিউল ভুক্ত হওয়ায় পিবিআই মামলাটি গ্রহন করে তদন্ত শুরু করে।

খুলনা পিবিআইয়ের এসআই (নিঃ) রেজোয়ান বলেন, সালেহা বেগমকে হত্যার ঘটনায় আসামি মোঃ লালন গাজীকে গত ১৮ই ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন হালুয়ারঘাট বাজার সংলগ্ন খেয়াঘাট হতে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে আসামি মোঃ লালন গাজীকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আসামির এবং সালেহা বেগমের বাড়ি একই গ্রামে। সালেহা বেগম প্রবাসি শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২৩ সালে সালেহা বেগম সৌদি আরব হতে বাংলাদেশে ফেরত চলে আসেন। দেশে আসার পর আসামি মোঃ লালন গাজীর সাথে প্রেমের সম্পর্কে সালেহা বেগম জড়িয়ে পড়েন। এরপর আসামি সালেহা বেগমকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিয়ে একত্রে পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী থানাধীন চাড়াখালী একটি বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। সেখানে অবস্থানকালীন আসামি ভিকটিমের ব্যাংক একাউন্ট থেকে চৗদ্দ লক্ষ টাকা উত্তোলন করে নিয়ে নেয়। এই নিয়ে ভিকটিম আসামিকে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য এবং ভিকটিমকে বিবাহ করার জন্য চাপ দিলে আসামি ভিকটিমকে হত্যা করার পরিকল্পনা করতে থাকে। এ অবস্থায় গত ১৯শে আগষ্ট সাড়ে পাঁচটায় সালেহা বেগমকে নিয়ে আসামি খুলনা যাওয়ার কথা বলে বের হয় এবং অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহায়তায় খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা থানাধীন পার বটিয়াঘাটা নামক খেয়াঘাট এলাকায় নিয়ে ভিকটিমকে হত্যা করে শরীর হতে মাথা বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ গোপন করার জন্য বটিয়াঘাটা থানধীন ঝপঝপিয়া নদীতে ফেলে দেয়। পরদিন ২০শে আগষ্ট বটিয়াঘাটা থানা পুলিশ সালেহা বেগমের মাথা বিহীন মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
খুলনা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামি মোঃ লালন গাজীকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পরবর্তীতে আসামিকে বিজ্ঞ আদালতের আদেশে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালে আসামি মোঃ লালন গাজীর দেয়া তথ্যমতে তার মামাতো ভাইয়ের বাড়ির বসতঘর, রান্নাঘর ও রান্নাঘর সংলগ্ন উঠানের মাটির নিচ হতে ভিকটিম সালেহা বেগমের ব্যবহৃত বিভিন্ন মালামাল সহ পরিধেয় বস্ত্র জব্দ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামীদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে বলে তিনি জানান।