পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন রক্ষায় করণীয়

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৫ - ০৭:৫৪

সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: সুন্দরবন বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম । পদ্মা, মেঘনা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকায় বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট, পটুয়াখালি এবং বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত । সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি । ১০০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে । সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায় । বাংলাদেশ এবং ভারতীয় অংশ বন্তুত একই নিরবচ্ছিন্ন ভূমিখণ্ডের সন্নিহিত অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে সূচিবদ্ধ হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন এবং সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান নামেই । সুন্দরবনকে জালের মত জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা ও কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা । মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে আছে নদীনালা ও খাঁড়ি এবং বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল । বনভূমিটি স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও আছে নানান ধরণের পাখি ও চিত্রা হরিণ, কুমির এবং সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত । জরিপ হিসেবে ৫৫০ এর মত বাঘ এবং ৩০০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে এখন সুন্দরবন এলাকায় । ১৯৯২ সালের ২১শে মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ পায়।

মুঘল আমলে ১২০৩ সাল থেকে ১৫৩৮ সালের ভিতরে স্থানীয় এক রাজা পুরো সুন্দরবনের ইজারা নিয়েছিলেন । ঐতিহাসিক আইনী পরিবর্তনগুলোয় কাঙ্ক্ষিত যেসব মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যমেই রয়েছে বিশ্বের প্রথম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্বাবধানের অধীনে আসা । ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর এর কাছ থেকে স্বত্বাধিকার পাওয়ার পরপরই সুন্দরবন এলাকার মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে । বনাঞ্চলটি সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে ১৮৬০ সালের দিকে ভারতের তৎকালীন বাংলা প্রদেশে বন বিভাগ স্থাপনের পর থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিল । বনের উপর মানুষের অধিক চাপ ক্রমান্বয়ে এর আয়তন সংকুচিত করেছে। ১৮২৮ সালে বৃটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্ত্বাধীকার অর্জন করে। এল টি হজেয ১৮২৯ সালে সুন্দরবনের প্রথম জরীপ কার্য পরিচালনা করেন। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবন এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয় ও ১৮৭৯ সালে সমগ্র সুন্দরবনের দায় দায়িত্ব বন বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয় । সুন্দরবনের প্রথম বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নাম এম ইউ গ্রীন । তিনি ১৮৮৪ সালে সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন । ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ৬০১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে । যা বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ৪.২% এবং সমগ্র বনভূমির প্রায় ৪৪%। সুন্দরবনের উপর প্রথম বন ব্যবস্থাপনা বিভাগের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে । ১৯৬৫ সালের বন আইন ধারা ৮ মোতাবেক সুন্দরবনের একটি বড় অংশকে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় ১৮৭৫ সাল থেকে১৮৭৬ সাল এর ভিতর । পরবর্তী বছরের মধ্যেই বাকি অংশও সংরক্ষিত বনভূমির স্বীকৃতি পায় । এর ফলে দূরবর্তী বেসামরিক জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থেকে তা চলে যায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে । পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে বন ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক একক হিসেবে বন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সদর দপ্তর ছিল খুলনায়। সুন্দরবনের জন্য ১৮৯৩ সাল থেকে ১৮৯৮সালের ভিতর সময়কালে প্রথম বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণিত হয় ।

১৯১১ সালে সুন্দরবনকে ট্র্যাক্ট আফ ওয়াস্ট ল্যান্ড হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়, যা না তো কখনো জরিপ করা হয়েছে আর না তো কোনদিন শুমারীর আধীনে এসেছে। তখন হুগলী নদীর মোহনা থেকে মেঘনা নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১৬৫ মাইল ২৬৬ কি.মি. এলাকা জুড়ে এর সীমানা নির্ধারিত করা হয় । একই সাথে চব্বিশ পরগনা ও খুলনা এবং বাকেরগঞ্জ এই তিনটি জেলা অনুযায়ী এর আন্তঃসীমা নির্ধারণ করা হয় । জলাধারসহ পুরো এলাকার আয়তন হিসেব করা হয় ৬৫২৬ বর্গমাইল ১৬৯০২ কি.মি । জলবহুল সুন্দর বন ছিল বাঘ এবং অন্যান্য বন্য জন্তুতে পরিপূর্ণ। ফলে জরিপ করার প্রচেষ্টা খুব একটা সফল হতে পারেনি। সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে খুব সম্ভবত এর প্রধাণ বিশেষ গাছ সুন্দরীর Heritiera fomes নাম থেকেই। এ থেকে পাওয়া শক্ত কাঠ নৌকা ও আসবাবপত্র সহ বিভিন্ন জিনিস তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। সুন্দরবন সর্বত্রই নদী ও খাল এবং খাঁড়ি দ্বারা বিভক্ত যাদের মধ্যে কয়েকটি স্টিমার ও স্থানীয় নৌকা উভয়ের চলাচল উপযোগী নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হত কলকাতা এবং ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মধ্যে যোগাযোগের জন্য ।
পুরো পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের একটি হিসেবে গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান যথেস্ট জটিল। দুই প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশটি ৬২% বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত । দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পূর্বে বালেশ্বর নদী আর উত্তরে বেশি চাষ ঘনত্বের জমি বরাবর সীমানা । উঁচু এলাকায় নদীর প্রধান শাখাগুলো ছাড়া অন্যান্য জলধারাগুলো সর্বত্রই বেড়িবাঁধ এবং নিচু জমি দ্বারা বহুলাংশে বাঁধাপ্রাপ্ত । প্রকৃতপক্ষে সুন্দরবনের আয়তন হওয়ার কথা ছিলো প্রায় ১৬৭০০ বর্গ কি.মি. ২০০ বছর আগের হিসাবে । কমতে কমতে এর বর্তমান আয়তন হয়েছে পূর্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশের সমান । বর্তমানে মোট ভূমির আয়তন ৪১৪৩ বর্গ কি.মি. বালুতট ৪২ বর্গ কি.মি. এর আয়তনসহ এবং নদী, খাঁড়ি ও খালসহ বাকি জলধারার আয়তন ১৮৭৪ বর্গ কি.মি.। সুন্দরবনের নদীগুলো নোনা পানি এবৎ মিঠা পানি মিলন স্থান। সুতরাং গঙ্গা থেকে আসা নদীর মিঠা পানির বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি হয়ে ওঠার মধ্যবর্তী স্থান হলো এই এলাকাটি । এটি সাতক্ষীরা খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে । বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে সুন্দরবন অবস্থিত ।
হাজার বছর ধরে বঙ্গোপসাগর বরাবর আন্তঃস্রোতীয় প্রবাহের দরুন প্রাকৃতিকভাবে উপরিস্রোত থেকে পৃথক হওয়া পলি সঞ্চিত হয়ে গড়ে উঠেছে সুন্দরবন । এর ভৌগোলিক গঠন ব দ্বীপীয় যার উপরিতলে রয়েছে অসংখ্য জলধারা এবং জলতলে ছড়িয়ে আছে মাটির দেয়াল ও কাদা চর । তাতে আরো রয়েছে সমুদ্র সমতলের গড় উচ্চতার চেয়ে উঁচুতে থাকা প্রান্তীয় তৃণভূমি বালুতট এবং দ্বীপ, যেগুলো জুড়ে জালের মত জড়িয়ে আছে খাল, জলতলের মাটির দেয়াল, আদি বদ্বীপীয় কাদা এবং সঞ্চিত পলি । সমুদ্রসমতল থেকে সুন্দরবনের উচ্চতা স্থানভেদে ০.৯ মিটার থেকে ২.১১ মিটার । জৈবিক উপাদানগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সামুদ্রিক বিষয়ের গঠন প্রক্রিয়া এবং প্রাণী বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে । সৈকত, মোহনা, স্থায়ী এবং ক্ষণস্থায়ী জলাভূমি, কাদা চর, খাঁড়ি, বালিয়াড়ি, মাটির স্তূপের মত বৈচিত্র্যময় অংশ গঠিত হয়েছে এখানে । ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ জগৎ নিজেই নতুন ভূমি গঠনে ভূমিকা রাখে । আবার আন্ত:স্রোতীয় উদ্ভিদ জগৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জলে অঙ্গসংস্থান প্রক্রিয়ায় । ম্যানগ্রোভ প্রাণীজগৎ এর উপস্থিতি আন্তঃস্রোতীয় কাদা চরে ব্যষ্টিক অঙ্গসংস্থানিক পরিবেশ তৈরি করে । এটি পলিকে ধরে রাখে বীজের জন্য আনুভূমিক উপশিলাস্তর সৃষ্টির জন্য । অনন্ত বালিয়াড়ির সংগঠন ও বিবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয় প্রচুর পরিমাণে থাকা xerophytic এবং halophytic গাছ দ্বারা । লতা ও পাতা, ঘাস এবং হোগলা বালিয়াড়ি ও অসংগঠিত পলিস্তরের গঠনকে স্থিতিশীল করে ।

উপকূল বরাবর সুন্দরবনের গঠন প্রকৃতি বহুমাত্রিক উপাদানসমূহ দ্বারা প্রভাবিত, যাদের মধ্যে রয়েছে স্রোতের গতি, ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক স্রোত চক্র এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী দীর্ঘ সমুদ্রতটের স্রোত। বিভিন্ন মৌসুমে সমুদ্রতটের স্রোত যথেস্ট পরিবর্তনশীল। এরা ঘূর্ণীঝড়ের কারণেও পরিবর্তিত হয় । এসবের মধ্য দিয়ে যে ক্ষয় ক্ষতি এবং সঞ্চয় হয় যদিও এখনো সঠিকভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়নি তা ভূ প্রকৃতির পরিবর্তনে মাত্রাগত পার্থক্য তৈরি করে। অবশ্য ম্যানগ্রোভ বনটি নিজেই এর পুরো ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। প্রত্যেক মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ঋতুতে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের পুরোটিই পানিতে ডুবে যায় যার অধিকাংশই ডুবে থাকে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় জুড়ে । অববাহিকার নিম্নানঞ্চলের পলি প্রাথমিকভাবে আসে মৌসুমী বৃষ্টিপাতকালীন সময় সমুদ্রের চরিত্র এবং ঘূর্ণিঝড়ের মত ঘটনাগুলোর ফলে । অনাগত বছরগুলোতে গঙ্গা অববাহিকায় বসবাসকারীদের সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে তা হলো সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি । উঁচু অঞ্চলে স্বাদুপানির গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ভারতীয় ম্যানগ্রোভ আর্দ্রভূমিগুলোর অনেকগুলোতে স্বাদু পানির প্রাবাহ ১৯ শতকের শেষের দিক থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে । একই সাথে নিও টেকটনিক গতির কারণে বেঙ্গল বেসিনও পূর্বের দিকে সামান্য ঢালু হয়ে গিয়েছে, যার ফলে স্বাদু পানির বৃহত্তর অংশ চলে আসছে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে। ফলশ্রতিতে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে লবণাক্ততার পরিমাণ ভারতীয় অংশের তুলনায় অনেক কম। ১৯৯০ সালের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে হিমালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের অবনতি বা গ্রিন হাউস এর কারণে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতিকে আশঙ্কাজনক করে তুলেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের পাঠ শীর্ষক ইউনেস্কোর রিপোর্টে বলা হয়েছে যে মনুষ্যসৃষ্ট অন্যান্য কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের যে ৪৫ সে.মি. উচ্চতা বৃদ্ধি হয়েছে, তা সহ মনুষ্যসৃষ্ট আরও নানাবিধ কারণে সুন্দরবনের ৭৫ শতাংশ ধংস হয়ে যেতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর আলোচনায় প্রাকাশিত আন্তঃসরকার পরিষদের মত অনুযায়ী ২১ শতকের মধ্যেই । সামুদ্রিক ঝড়ঝঞ্ঝার বিরুদ্ধে ম্যানগ্রোভের যে অরণ্য সুন্দরবন সহ দক্ষিণবঙ্গের প্রাকৃতিক প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাকে বাঁচানোর যথেষ্ট উদ্যোগ না-থাকায় জাতীয় পরিবেশ আদালতও উদ্বিগ্ন ।
পৃথিবীর অন্যতম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন এবং দেশের অন্যতম আকর্ষণ পার্বত্য অঞ্চলের বনভূমির আয়তন ও পরিমাণ কমছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিবছর ৩৫০টি ফুটবল মাঠের সমান বনভূমি বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন থেকে কমে যাচ্ছে। আয়তন কমে আসায় সুন্দরবনের পরিবেশ ব্যবস্থা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কমে আসছে গাছ, লতাগুল্ম, মাছসহ নানা প্রজাতির প্রাণী। এসব বৈরি পরিস্থিতির মধ্যে সুন্দরবন দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রসঙ্গত বহু বছর ধরে সুন্দরবন দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকির কথা বলা হলেও কার্যত এর রক্ষায় নেওয়া হচ্ছে না কোনো ব্যবস্থা। স্বাদু ও লোনাপানি মিলিত হয়, এমন ভূমিতে সুন্দরবনের মতো বন গড়ে ওঠে। বনবিজ্ঞানীরা এ ধরনের বনের নাম দিয়েছেন ম্যানগ্রোভ। বিশ্বের আরো বেশ কিছু সমুদ্র উপকূলে ম্যানগ্রোভ আছে। কিন্তু সুন্দরবনের মতো এত বড় ম্যানগ্রোভ বন বিশ্বের আর কোথাও নেই। তথ্য অনুযায়ী বৃহত্তর খুলনা (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা) জেলার গেজেটিয়ার লেখার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। ১৯৭৮ সালে ছাপা ওই গেজেটিয়ারে বলা হয়েছিল, নির্বিচার বনসম্পদ লুট ও প্রাণী হত্যা বন্ধ না হলে সুন্দরবন বিবর্ণ, বৃক্ষলতাহীন, প্রাণহীন হয়ে পড়বে। পাঁচ দশক পর পরিস্থিতি ততটা মারাত্মক না হলেও সুন্দরবনের প্রাণপ্রাচুর্য কমছে। গবেষকরা বলছেন, সুন্দরবনের কিছু গাছ, প্রাণী ও পাখি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গোপসাগর উপকূলের বড় অংশজুড়ে সুন্দরবন। সরকারি দলিল অনুযায়ী, সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে, বাকি ৪০ শতাংশ পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনে গাছ, লতাগুল্ম, পাখি, প্রাণী, মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজাতির সংখ্যা বেশি।
২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক তাদের এক প্রতিবেদনে সুন্দরবনের আয়তন কমে আসার তথ্য প্রকাশ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুন্দরবন ও বনসংলগ্ন এলাকার মানুষের টিকে থাকার বিষয়ে প্রতিবেদন করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯০৪-১৯২৪ সালে দুই দেশের সুন্দরবনের আয়তন ছিল ১১ হাজার ৯০৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৭ সালে তা কমে হয় ১১ হাজার ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার। ২০০১ সালে আয়তন কমে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫০৬ বর্গকিলোমিটারে। ২০১৫-১৬ সালে আয়তন ছিল ১১ হাজার ৪৫৩ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ গত ১০০ বছরে সুন্দরবনের আয়তন ৪৫১ বর্গকিলোমিটার কমে গেছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সুন্দরবনের আয়তন কমে যাওয়ার পৃথক কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি। তবে ওই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯০৪-১৯২৪ সালে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন ছিল ৭ হাজার ১৪২ বর্গকিলোমিটার। ২০১৫-১৬ সালে আয়তন কমে ৬ হাজার ৮৭১ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ১০০ বছরে সুন্দরবনের ২৫২ বর্গকিলোমিটার হারিয়ে গেছে। এর হিসাবে প্রতিবছর আড়াই বর্গকিলোমিটারের মতো বন হারিয়ে যাচ্ছে। এ পরিমাণ জমির আয়তন আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফার ৩৫০টি ফুটবল মাঠের সমান। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা সংস্থা সিজিআইএসের গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের আয়তন কমছে, জলাভূমি বাড়ছে। বনাঞ্চলে ঘুরে এবং উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৭ বছরে ৭৬ বর্গকিলোমিটার জমি কমেছে সুন্দরবনের।
তবে বনের জমি কমে আসার বিষয়টি স্বীকার করতে চায় না বন বিভাগ। বনের আয়তন কমছে কি না, সে বিষয়ে সহমত বা দ্বিমত পোষণ করা যায় না। ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, দেশের কিছু এলাকাসহ সুন্দরবন হচ্ছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ‘অ্যাকটিভ ডেলটা’ অঞ্চলে। অর্থাৎ এই বদ্বীপ এলাকায় ভূগঠন প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এই অঞ্চলের ভূমি এখনো ভাঙা-গড়ার মধ্যে আছে। সুন্দরবনের মধ্যে ছোট-বড় অসংখ্য নদী ও খাল রয়েছে। জালের মতো বিছানো এসব খাল-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার। এসব নদী-খাল দিনে দুবার জোয়ারের পানিতে ভরে ওঠে, দুবার ভাটায় পানি নেমে যায়। জোয়ার ভাটার কারণে নদীর পাড় ভাঙে-গড়ে। তবে বিগত ১০০ বছরে ভাঙনই বেশি লক্ষ্য করা গেছে। নদীভাঙনের কারণে বনের জমি কমছে এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার।
শুধু আয়তনের কারণে নয়, জীববৈচিত্র্যের জন্যও সুন্দরবন অনন্য। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বনে ৫২৮ প্রজাতির বৃক্ষ ও লতাগুল্ম আছে, আছে ৩০০ প্রজাতির পাখি। ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণী সুন্দরবনে চরে বেড়ায়। সুন্দরবনের নদী-খালে ২৫০ প্রজাতির মাছ আছে। আছে বহু প্রজাতির কীটপতঙ্গ, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক। আছে নানা ধরনের ছত্রাক, শেওলা। কিন্তু চার দশক ধরে সুন্দরবনে উত্তর থেকে আসা স্বাদুপানির পরিমাণ কমেছে, লোনাপানির প্রবাহ বেড়েছে। এর ফলে লোনাপানি সহিষ্ণু গাছ ও লতাগুল্মের প্রজাতি টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়েছে। কমেছে বা ঝুঁকিতে পড়েছে স্বাদুপানি বা ব্রাকিস সহিষ্ণু প্রজাতিগুলো। সাম্প্রতিককালে বেশি আলোচনা হচ্ছে, রামপাল কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে। উৎপাদন শুরু হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পোড়া কয়লার ছাই সুন্দরবনের ক্ষতি করবে বলে পরিবেশবাদীরা কয়েক বছর ধরে অভিযোগ করে আসছেন। এ ছাড়া মোংলা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রায় ১০০ শিল্পকারখানা। এসব কারখানার বর্জ্য পশুর নদ হয়ে সুন্দরবনে পৌঁছায়। বড় বড় জাহাজ ছাড়াও অসংখ্য নৌযান নিয়মিত যাতায়াত করে পশুর নদ দিয়ে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজসহ সব নৌযান চলাচল করায় উচ্চ শব্দ বনের নিস্তব্ধতা ভাঙে। তদুপরি সুন্দরবনে আছে শিকারির উৎপাত। মাছ ধরার নামে জলজ প্রাণী নিধনও চলছে। জেলেরা ছোট ছোট খালে বিষ ঢেলে মাছ শিকারীদের উৎপাত। এতে মাছের সঙ্গে অন্যান্য জলজ প্রাণীও মরছে। মানুষের এসব কর্মকাণ্ড ছাড়াও সুন্দরবনে আঘাত হানে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে শুধু যে গাছের ক্ষতি হয় তা নয়, পশুপাখিরও প্রাণহানি ঘটে। পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, বছর বছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সংখ্যা বাড়ছে। প্রকৃতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশ্বব্যাংক বলছে, সুন্দরবন থেকে ১৯ প্রজাতির পাখি, ১১ ধরনের স্তন্যপায়ী ও এক প্রজাতির সরীসৃপ আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা মাছ ও গাছের প্রজাতির বর্ণনাও তাতে আছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮৯ সালে সুন্দরবনে ঘন বন ছিল ৬৩ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা কমে হয় ৩৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় যুক্ত পরিবেশ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, শত শত বছর ধরে সুন্দরবন ঝড়-ঝর্ঞ্ঝা থেকে মানুষকে রক্ষা করে চলেছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ও অর্থনীতিতে এর অবদান অপরিসীম। দেশে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট দেশের বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এর একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। দেশের ম্যানগ্রোভ বনগুলো অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল বিশেষ করে মানুষের কার্যকলাপ এবং প্রাকৃতিক কিছু কারণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছিল।
এর মধ্যে বন উজাড় ম্যানগ্রোভ বনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঠ, জ্বালানি কাঠ এবং কৃষি জমির চাহিদা ব্যাপকভাবে ম্যানগ্রোভ গাছ কাটার দিকে মানুষকে পরিচালিত করে। এ কারণে অসংখ্য প্রজাতি তাদের আবাসস্থল হারিয়েছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে। ম্যানগ্রোভ বনকে চিংড়ির খামারে রূপান্তরিত করার ফলে বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ ও খাল নির্মাণ প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের ধরনকেও ব্যাহত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ। ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় গাছ উপড়ে এবং লোনা জলের অনুপ্রবেশসহ ম্যানগ্রোভ বনের ব্যাপক ক্ষতি করে। ২০১৪ সালে তেলবাহী ট্যাংকার সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ডুবে গেলে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল, শ্যালা নদী দিয়ে সমগ্র সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেমে আসে এক গাঢ় অন্ধকার।
স্থানীয় সম্প্রদায়গুলো ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বনের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং তাদের টেকসই ব্যবহারকে উন্নীত করতে সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা অনুশীলন বিশেষ করে সহ-ব্যবস্থাপনা এবং জীবিকার বিকল্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকার ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বন উজাড়, অবৈধ গাছ কাটা এবং চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের বিধান বাস্তবায়ন জরুরি। ম্যানগ্রোভ সম্পদের টেকসই ব্যবহার সংরক্ষণ এবং জীবিকার চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ইকোট্যুরিজম, মৌমাছি পালন, কাঁকড়া চাষ এবং মধু উৎপাদনের মতো পরিবেশবান্ধব কাজে জড়িত হতে সম্প্রদায়গুলোকে উৎসাহিত করা দরকার। বাংলাদেশের ম্যানগ্রোভ বন জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, এর মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঘনত্ব ও তীব্রতা হ্রাস করে। এ ছাড়া কাঠ, জ্বালানি ও মণ্ডের মতো প্রথাগত বনজসম্পদের পাশাপাশি এখান থেকে নিয়মিত আহরণ করা হয়, বিপুল পরিমাণ গোলপাতা, মধু, মৌচাকের মোম, মাছ, কাঁকড়া এবং শামুক-ঝিনুক। বৃক্ষরাজি পূর্ণ সুন্দরবনের ভূমি একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় আবাসস্থল, পুষ্টি উৎপাদক, পানি বিশুদ্ধকারক, পলি মাটি সঞ্চয়কারী, ঝড় তুফান প্রতিরোধক, উপকূল স্থিতিকারী শক্তিসম্পদের বিপুল আঁধার এবং দারুণ সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র। দেশের কৃষিপ্রধান উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনায় করলে প্রতীয়মান, জাতীয় অর্থনীতির আন্তঃসলিলা শক্তির উদ্বোধন যার হাতে; সেই সুন্দরবন বেদনায় বিবর্ণ।
সমুদ্র, নদীমেখলা প্রকৃতি আর শ্যামল-সবুজ পরিবেশের সংমিশ্রণে উপকূল অঞ্চলসহ গোটা দেশের, সমাজের, অর্থনীতির জন্য অনিবার্য অবকাঠামো শুধু নয়, উন্নয়ন প্রচেষ্টায় ভারসাম্য রক্ষার জন্যও অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সুন্দরবন সুরক্ষায় সরকারের যথাযথ উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে উষ্ণায়নের প্রভাবে, তাপমাত্রার পবির্তনের তারতম্যে সমুদ্রের তলদেশ স্ফীত হয়ে ওঠার ফলে পরিবেশ ভারসাম্যহীনতার ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা বিশ্বের প্রায় সব সমুদ্র উপকূল বেষ্টনীতে বিরাজমান। এ অবস্থা বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত। এতে দেশের নিম্নাঞ্চল জলোচ্ছ্বাসের শুরুতেই তলিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের প্রাণিবৈচিত্র্যও বিপন্ন হতে চলেছে। আমাদের মনে রাখা উচিত মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বিভিন্ন জীবজন্তুর পদচারণায় সমৃদ্ধ সুন্দরবন পর্যটকদের জন্য আজো আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত। সুন্দরবনকে ঘিরে পরিবেশবান্ধব ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলা, আশপাশের জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকার উদ্যোগ নেওয়া, পর্যটনভিত্তিক গ্রাম গড়ে তোলা, বনের আকার বাড়ানো এবং বন রক্ষায় বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং এ সংক্রান্ত পরিকল্পনাকে বাস্তবেশ্যামনগর : সাতক্ষীরা ‌সুন্দরবনকে ম্যানগ্রোভ বন বলার কারণ; সুন্দরবন নামকরণ ও বিশ্বস্বীকৃতি; সুন্দরবন পরিচিতি; প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি; সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব; সুন্দরবন রক্ষা; উপসংহার।)
বাংলাদেশের জাতীয় বন হলো সুন্দরবন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও ঐশ্বর্যমন্ডিত বনগুলোর মধ্যে আমাদের সুন্দরবন অন্যতম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি এ বন। এর চার দিক নিবিড় ঘন, চিরসবুজ এবং নিস্তব্ধ। সর্বত্রই সবুজের রাজত্ব। গাছপালা অপরূপ সাজে সজ্জিত। ভারতীয় উপমহাদেশে সুন্দরবনের মতো এতো বড় অরণ্যসঙ্কুল বন আর নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের সৌন্দর্যের মধ্যমণি হয়ে সুন্দরবন শোভাবর্ধণ করে যাচ্ছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভয়াল গর্জন, হরিণের ছোটাছুটি, পাখিদের কিচিরমিচির, সুন্দরবনের চির পরিচিত দৃশ্য। বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ সুন্দরবনের আরেক নাম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট।
: পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এ ম্যানগ্রোভ বনের আয়তন ৫৭৪৭ বর্গ কি.মি বা ২৪০০ বর্গ মাইল। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে জেগে আছে সুন্দরবন। বাংলাদেশের পাঁচটি জেলা ঘিরে সুন্দর বনের অবস্থান। এগুলো হলো খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী। বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৬২ ভাগ অবস্থিত আর বাকি ৩৮ ভাগ ভারতে অবস্থিত। তবে বাংলাদেশে এর অবস্থান বেশি বলে একে এদেশের বন হিসাবেই গণ্য করা হয়।
: লোনা পানি বা কাদার মধ্যে জেগে থাকা খুঁটির মতো এক ধরণের শ্বাস গ্রহণকারী শিকড় বিশিষ্ট উদ্ভিদের অরণ্যকে বলে ম্যানগ্রোভ বন। যে বনে এ ধরণের উদ্ভিদ খুব বেশি পরিমাণে জন্মে সে বনকেই ম্যানগ্রোভ বন বলে। বিশ্বের গ্রীষ্মম-লীয় উপকূলে এ বনের অবস্থান বেশি। ম্যানগ্রোভ বনের সকল বৈশিষ্ট্যই সুন্দরবনের রয়েছে বলে সুন্দরবনকে ম্যানগ্রোভ বন বলা হয়। আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বা লোনা পানির বন হলো সুন্দরবন।
বিশ্বের প্রতিটি নিদর্শনের নামকরণে কোনো না কোনো কারণ থাকে। সুন্দরবনেরও তেমনই রয়েছে। এ বনের বৃক্ষকূলের মধ্যে অন্যতম হলো সুন্দরী বৃক্ষ। এ বনে প্রচুর পরিমাণে সুন্দরী বৃক্ষ জন্মে বলেই এ বনকে সুন্দরবন বলা হয়। সুন্দরী বৃক্ষের কাঠে মজবুত তক্তা হয় এবং তা নৌকা ও ঘরের দরজা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সুন্দর বন পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ বন। যার স্বীকৃতি স্বরূপ জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO) ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে ঘোষণা করে। বিশ্ব ঐতিহ্যের ক্রমানুসারে সুন্দরবনের অবস্থান ৫২২তম। এ বিরল সম্মাননা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা।
: বিশ্ব ঐতিহ্যের অপরূপ নিদর্শন হিসাবে সুন্দরবনের রয়েছে অনন্য পরিচিত। যা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্ব সভ্যতার জন্য ঈশ্বরের উপহার স্বরূপ। নিচে এ বনের নিদর্শনগুলো তুলে ধরা হলো-
: বৃক্ষ ছাড়া বন কল্পনা করা যায় না। এক্ষেত্রে সুন্দরবন অনন্য, অসাধারণ। কারণ সুন্দরবনে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন রকমের গাছপালা রয়েছে। বিশেষ করে সুন্দরী গাছের কথা বলতেই হয়। কেননা এ গাছের নাম অনুসারেই সুন্দরবনের নামকরণ করা হয়েছে। সুন্দরী গাছ ছাড়াও সুন্দরবনে যেসব গাছ রয়েছে সেগুলো হলো- গেওয়া, পশুর, ধুন্দুল, বাঁশ, বাইন, গরান, গর্জন, সেগুন, আমলকি, বৈলাম, কেওড়া, গোলপাতা প্রভৃতি ।
পশু-পাখি: পৃথিবীর বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস ভূমি হলো সুন্দরবন। পৃথিবীর একমাত্র সুন্দরবনেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাস করে। এছাড়াও সুন্দরবনে নানা ধরণের পশু বিচরন করে। এগুলো হলো- কুমির, হরিণ, সাপ, বানর, মৌমাছি, চিতাবাঘ, সজারু, শয়াল, বন মোরগ, বন বিড়াল প্রভৃতি। আর সুন্দরবনে প্রচুর পরিমাণে পাখ-পাখালির সমাগমও চোখে পড়ার মতো। সুন্দরবনের পাখ-পাখালির মধ্যে রয়েছে শালিক, টিয়া, ময়না, কোকিল, বক, হাঁস, টুনটুনি, ফিঙে, শকুন, মাছরাঙ্গা প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।