জলবায়ু পরিবর্তনে হুমকির মুখে বাংলাদেশের কৃষি খাত, ২৪ শতাংশ আবাদি জমি কমার আশঙ্কা

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৪ - ২০:২৮

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।আর জলবায়ুর এই নেতিবাচক প্রভাবের কারনে হুমকির মুখে রয়েছে বাংলাদেশের কৃষি খাত। ফলে ২০৪৫ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় ফসলি জমির পরিমাণ ২৪ শতাংশ কমতে পারে বলে ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (সিএসএআইপি)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (সিএসএআইপি)’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা এবং কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা, স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজনে বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি বিশ্বে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে দেশের গ্রামীণ পরিবারগুলোর অবদান প্রায় ৮৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ২০৪৫ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় ২৪ শতাংশ এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ৯ শতাংশ ফসলি জমির কমতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় ৬ শতাংশ এবং অন্য অঞ্চলে ২ শতাংশ আবাদি জমি কমবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় ১২ শতাংশ এবং দেশের অন্য অঞ্চলে ৪ শতাংশ আবাদি জমি হ্রাস পাবে। ২০৪০ সালের মধ্যে উপকূলীয় এলাকায় ১৮ শতাংশ এবং অন্য অঞ্চলে ৭ শতাংশ আবাদি জমি কমবে। মাটির লবণাক্ততা উপকূলীয় জমিগুলোর ৬২ শতাংশকে প্রভাবিত করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ ৮ কিমি. উত্তরে অগ্রসর হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। কৃষিকাজের জন্য জমির সহজলভ্যতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে প্রধান দুটি ফসলের (আমন এবং বোরো ধান) ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ পানির চাপের ফলে ধানের ফলন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে কৃষি খাতের উৎপাদনের নিয়মিত চিত্র স্থবির হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের মূল জাতীয় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় ধান ও গমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলে প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৫ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২১০০ সাল নাগাদ সাগরপৃষ্ঠ সর্বোচ্চ ১ মিটার উঁচু হতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৮.৩ শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হতে পারে। এমন অবস্থা তৈরি হলে বাংলাদেশকে ওই এলাকার কৃষিসহ সবকিছুই হারাতে হবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।একসময়ের খাদ্যভাণ্ডারখ্যাত রংপুরে দিন দিন কমে আসছে কৃষিজমির পরিমাণ। প্রতিবছরই হাজার হাজার হেক্টর জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। আবাসন আর শিল্পায়নের জালে হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে কৃষিনির্ভর রংপুরের অর্থনীতি।
?রংপুর জেলায় আবাদি জমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জনসংখ্যা। বাড়ছে খাদ্যের চাহিদাও। গত পাঁচ বছরে এ জেলায় আবাদি জমি কমেছে ৩ হাজার ৪৮৪ হেক্টর। একই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে এক লাখ ৫৪ হাজার ১৮৩ জন। খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে ২৭ হাজার ৫৯৪ টন। ৫ বছরে খাদ্য উদ্বৃত্ত বেড়েছে মাত্র ২ হাজার ৭০৫ টন।
সূত্র বলছে, চাহিদা অনুযায়ী রংপুরে তেমন একটা উৎপাদন বাড়েনি। এ ছাড়া উদ্বৃত্ত ফসলও আনুপাতিক হারে তেমন একটা বাড়েনি। একসময় রংপুরের উদ্বৃত্ত ফসল দিয়ে দেশের অন্যান্য জেলার চাহিদা মেটানো হতো। বর্তমানে যে ফসল উৎপাদন হয় তা দিয়ে জেলার ৩২ লাখ মানুষের চাহিদা মিটলেও প্রতিবছরই আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। অকৃষি খাতে চলে যাওয়া জমিতে গড়ে উঠছে শিল্প কলকারখানা, বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠান। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে চাহিদানুযায়ী বসতভিটার সংখ্যাও।
আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় এ পরিস্থিতি দিন দিন হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে কৃষিনির্ভর রংপুরসহ উত্তর জনপদের সাধারণ মানুষকে। এতে করে উত্তরের কৃষি অর্থনীতির বিপর্যয়ের সঙ্গে দেখা দিতে পারে চরম খাদ্য সংকটও।
আগে মহাসড়কের দুই পাশজুড়ে শুধু কৃষিজমি দেখা যেত। এখন সেই জমিতে অনেক সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ছোট ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। দিন দিন রংপুর অঞ্চলে কৃষিজমি চলে যাচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর অকৃষি খাতে। এটা আমাদের আগামী প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তার দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।
একদিকে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাদ্যশস্য জোগান দেওয়া সম্ভব হলেও আগামীতে এই জেলায় খাদ্য উদ্বৃত্ত নাও থাকতে পারে এমন শঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষি আন্দোলনকারীরা বলছেন, জমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইনের প্রয়োগ না থাকায় হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি। এতে করে কৃষিভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চলে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, কৃষিজমি কমলেও উৎপাদনে ঘাটতি সৃষ্টি হয়নি। বরং মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদে উৎপাদন বাড়িয়ে আবাদি জমির ঘাটতি পূরণ করতে পারছে। এক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ উচ্চফলনশীল এবং স্বল্পকালীন ফসল আবাদে গুরুত্ব দেওয়ায় কৃষিজমি কমা সত্ত্বেও জেলায় উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত আছে।বছরে ১ শতাংশ হারে কৃষি জমির পরিমাণ কমছে- এই খবর আমাদের অনেকেরই জানা। আর কৃষিজমির সংকোচন মানে খাদ্য নিরাপত্তাকে সংকটে ফেলে দেয়া। আক্ষরিক অর্থেই তেমনটিই ঘটছে। কৃষিজমি কমার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিজমি সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বাস্তবে ইতিবাচক ফল তেমন মেলেনি। লক্ষণীয় ব্যাপার, কৃষিজমি কমার পেছনে শুধু ব্যক্তি পর্যায়ের যথেচ্ছাচার নয়, সরকারি-বেসরকারি উন্নয়নের কোপও কম দায়ী নয়। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। মোংলাবন্দর সচল রাখতে পশুর নদ খননে বন্দর কর্তৃপক্ষ খননের বালু ফেলে মোংলার চিলা এলাকার ৭০০ একর জমিতে। এরপর তিন ফসলি এসব জমির চাষাবাস শিকেয় ওঠে। পাশাপাশি পশুর নদ খননের বাকি বালু একইভাবে খুলনার দাকোপের বাণীশান্তা ইউনিয়নের ৩০০ একর তিন ফসলি জমিতে ফেলার তোড়জোড় চলে। তবে চাষিদের প্রতিরোধের মুখে আপাতত বন্ধ রয়েছে বালু ফেলার প্রক্রিয়া। এভাবে নানা পন্থায় কৃষিজমি সংকুচিত হচ্ছে। ইটভাটার জন্য মাটি লুট, সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, শিল্পায়ন, আবাসন প্রকল্প, নগরায়ণ, ব্যক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা কারণে দেশজুড়েই কৃষিজমি কমছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তো আছেই। এভাবে কৃষিজমির সংকোচন উদ্বেগজনক।
আবাদযোগ্য জমি দখল কিংবা সংকোচন একটি আত্মঘাতী ব্যাপার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষিজমির অপরিকল্পিত ব্যবহার বন্ধে বারবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন। পরিতাপের বিষয়, এরপরও বন্ধ হচ্ছে না আবাদি জমির অপরিকল্পিত ব্যবহার। খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে আবাদযোগ্য পতিত জমি। এ অবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকা আবাদযোগ্য অনাবাদি জমি উদ্ধারে অনুসন্ধানে নেমেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। একটি একটি ইতিবাচক তথ্য বৈকি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাতে প্রকাশ, পাটকল, বস্ত্রকল ও রেল বিভাগে চাষযোগ্য পতিত জমি রয়েছে অধিক পরিমাণে। তবে রেলের দখলে সাড়ে ৮০০ হেক্টর জমি ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কতটুকু আবাদযোগ্য জমি আছে, তা তারা জানেন না। জমির পরিমাণ বের করতে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। এই কাজটি দ্রুত সম্পাদন করা দরকার। এ দিকে পতিত জমি আবাদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকদের কঠোর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিভাগীয় কমিশনারদের নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তা দ্রুত প্রতিপালিত হোক- এটাই প্রত্যাশা। অপরদিকে ঢাকা মহানগরের চারপাশে গিয়ে দেখা যায়, আবাসন কোম্পানিগুলোর অগণিত সাইনবোর্ড। একেকটি কোম্পানি শত শত একর আবাদি জমি কিনেছে। তারা ওইসব জমি ভরাট করে বেশি দামে বিক্রি করবে। এর আগে এভাবেই শত শত একর ফসলি জমি কিনে নির্মাণ করা হয়েছে আবাসন। ঢাকার বাইরেও একই অবস্থা। এভাবে কৃষিজমি কমিয়ে নির্বিচারে আবাসন গড়ে তোলা কিছুতেই সমর্থন করা যায় না। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেও কৃষিজমি কমছে। এই সর্বনাশা প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আবাদি জমির অপরিকল্পিত ব্যবহার বন্ধে সরকারকে হতে হবে কঠোর। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে। প্রশাসনের উচ্চ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নিতে হবে সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি অপচয় হওয়া জমির বড় অংশে চাষাবাদ করা গেলে তা ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি ফসল বিন্যাস, পরিকল্পনা অর্থাৎ বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদকেই কৃষি উৎপাদনের গতি অব্যাহত রাখার একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। আর কৃষিজমি সুরক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন করতে হবে দ্রুত। আইনি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনাও গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রামে কৃষি জমি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। জমি, খাল-বিল, জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে বাড়িঘর, ইটভাটা, শিল্প-কারখানাসহ নানা স্থাপনা। এতে প্রতিবছর এক শতাংশ কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এতে বাড়ছে খাদ্য ঘাটতিও। প্রতি বছর চট্টগ্রামে প্রায় চার লাখ ২৪ মে. টন খাদ্য ঘাটতি রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চট্টগ্রামে খাদ্য চাহিদা রয়েছে ১১ লাখ ৬৯ হাজার ২৬১ মে. টন। খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২০৪ মে. টন। বীজ ও ফসল অপচয় ৯৭ হাজার ৫৫৮ মে. টন। প্রকৃত খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে ৭ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪৬ মে. টন। খাদ্য ঘাটতি রয়েছে প্রায় চার লাখ ২৩ হাজার ৬১৫ মে. টন।
কৃষি বিভাগ বলছে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও উন্নতজাতের বীজ ব্যবহার বাড়ছে। এতে আবাদযোগ্য জমি কমলেও ফসল উৎপাদন কমেনি। চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘চট্টগ্রামে ফসলি জমি কমলেও উচ্চফলনশীল, হাইব্রিড ও সর্বশেষ অবমুক্তকরণ জাতের বীজ ব্যবহারে ফসল উৎপাদন বেড়েছে। ফলে যেভাবে খাদ্য ঘাটতি থাকার কথা সেভাবে আর নেই। ক্রমান্বয়ে খাদ্য ঘাটতি পূরণের দিকে যাচ্ছি। ফলে জমি কমলেও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১০ দশকে প্রতিটি ফসলের উৎপাদন বেড়েছে।’
দেখা যায়, গত ১০ বছর ধরে চট্টগ্রামে ধানি জমি কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে নগর ও নগরীর আশপাশের উপজেলায় ব্যাপকভাবে আবাদযোগ্য জমি কমছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাসস্থল, শিল্প-কারখানাসহ নানা স্থাপনা নির্মাণের হার বেশি লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়াও অপরিকল্পিত নগরায়নে কৃৃষি জমি দ্রুত অকৃষি খাতে যাচ্ছে। বাদ পড়েনি সংরক্ষিত ভূমি, সরকারি খাস ভূমি, জলাধার। ১৯৯৭ সালে কৃষি জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ফসলি জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। এরমধ্যে চাষাবাদের আওতায় ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমি। ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী চট্টগ্রামের ফসলি জমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ২৩৫ হেক্টরে। ১৩ বছরে জমি কমেছে প্রায় ৬৮ হাজার ৭৬৫ হেক্টর।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) প্রতিবেদনে বলছে, দেশে বিভাগওয়ারি কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি। এ বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১২-১৩ সালে আমন মৌসুমে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৭৮ হাজার ৭৮৩ হেক্টর জমি। ফসল উৎপাদন হয়েছে চার লাখ ৭০ হাজার ১০২ মে. টন। কিন্তু পরবর্তীতে কয়েক মৌসুমে আবাদ কমে যায়। ২০১৮-১৯ সালে আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৯ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৫১ হাজার ১৬০ মে. টন। আবার গত কয়েক বছরে আবাদ বেড়েছে। চলতি মৌসুমে (২০২১-২০২২ সাল) এক লাখ ৮২ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর এক-চতুর্থাংশই এখন হুমকির মুখে। কৃষি জমি অকৃষি খাতে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতেও বাণিজ্যিক কারণে এক-চতুর্থাংশ জমি হুমকির মুখে রয়েছে। কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইটভাটা, কলকারখানা, ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে প্রতিবছর এক শতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। কৃষি প্রতিবেদন বলছে, বছরে প্রায় এক শতাংশ হারে ধানি জমি কমছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জেলায় খাদ্য উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে। সবজির উৎপাদন বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জমির তুলনায় ফসল উৎপাদন বেড়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ও উন্নতজাতের বীজের ব্যবহারে ভালো ফসল পাওয়া যাচ্ছে।জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বসবাস করছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার মানুষ। সেই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে তাদের জীবন ও জীবিকা। লবণাক্ততার কারণে কৃষক তার জমিতে ফসল ফলাতে পারছেন না, হালের পশু ও অন্যান্য গৃহপালিত পশুর খাদ্যের ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে উপকূলের চাষযোগ্য জমি হারাচ্ছে ঊর্বরতা। এছাড়া প্রতিনিয়ত এই অঞ্চলের মানুষকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে স্বাস্থ্যজনিত বিভিন্ন সমস্যা ।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাতক্ষীরার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬২৬ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ৮১ শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ ১লাখ ৫৩ হাজার ১১০ হেক্টর জমি লবণাক্ততায় রূপ নিয়েছে। আর পতিত জমি রয়েছে ৪০ হাজার ৯৮১ হেক্টর। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটায় সাতক্ষীরায় বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতার পাশাপাশি মাটি ও পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এতে ক্রমেই আমন ধানের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। গত চার বছরের ব্যবধানে আমন ধান উৎপাদন কমেছে ৩৩ হাজার টন।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ২০১৯-২০ মৌসুমে এ জেলায় রোপা আমন চাল উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬ টন, ২০২০-২১ মৌসুমে উৎপাদন হয় ২লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টন, ২০২১-২২ মৌসুমে উৎপাদন হয় ২লাখ ৪৬ হাজার ৭২৮ টন এবং ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় আমন চাল উৎপাদন হয় ২ লাখ ৪১ হাজার ৮৫৮ টন। সেই হিসাবে ২০১৯-২০ মৌসুমের তুলনায় ২০২২-২৩ মৌসুমে ৩৩ হাজার ২৩৮ টন উৎপাদন কমেছে। কৃষির মতো সাতক্ষীরার সড়কগুলোতেও ফুটে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টি কমে গেছে। কয়েক বছরে মাটিতে বেড়েছে লবণাক্ততা। এ কারণে সাতক্ষীরার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে হাজার হাজার রেইনট্রি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. নাসরিন আক্তার জানান, রেইনট্রি গাছ মরে যাওয়ার অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মাটির লবণাক্ততা ও ক্ষার বেড়ে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত কমে গেছে। সময়মত বৃষ্টি হচ্ছে না। মৌসুমি বৃষ্টি না হলে খাদ্যসংকটে পড়ে রেইনট্রি। তবে বিভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও গাছ মরে যেতে পারে বলে জানান তিনি।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে উপকূলে। এতে সহায়-সম্পদ হারানোর পাশাপাশি সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসার অভাব, নারী-শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা জীবনযাত্রা ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে। উপকূলের এমন অবস্থার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৯ সালের আইলার পর থেকে গত ১৫ বছরে এক ডজনের বেশি দুর্যোগের কবলে পড়েছে উপকূলের এ জেলা। এর মধ্যে উলে­খযোগ্য ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’, ২০১৩ সালের ‘মহাসেন’, ২০১৫ সালের ‘কোমেন’, ২০১৬ সালের ‘রোয়ানু’, ২০১৭ সালের ‘মোরা’, ২০১৯ সালের ‘ফণী’, ২০১৯ সালের ‘বুলবুল’, ২০২০ সালের ‘আম্পান’, ২০২১ সালের ‘ইয়াস’, ২০২২ সালের ‘অশনি’ ও ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল।
প্রতিবছরই ছোট-বড় মিলিয়ে তিন-চারটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয় সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায়। এতে জেলার উপকূলবর্তী তিন উপজেলা শ্যামনগর, কালীগঞ্জ ও আশাশুনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট নদীভাঙনে গত কয়েক বছরে সহস্রাধিক ঘরবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বহু কৃষিজমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে ওই তিন উপজেলার অধিকাংশ গ্রাম। এতে সহায়-সম্বল হারিয়ে বাসস্থান ছেড়েছেন অনেক মানুষ।
উপকূলের বাসিন্দারা বলছেন, উপকূলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের শিশুরা শৈশবের ডানা মেলে অপুষ্টি আর অশিক্ষায়। জলবায়ু পরিবর্তন এ জেলার পুষ্টিহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ বলে জানা যায়।
বিগত ২০১৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত বিষয়ে সাতক্ষীরার দু’টি উপকূলীয় উপজেলা নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষ বছরের প্রায় সাত মাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ইটভাটায় অবস্থান করেন। আর এ সময় ওই সব পরিবারের শিশু সন্তানরা শিক্ষা থেকে পিছিয়ে যায়। জড়িয়ে পড়ে শিশুশ্রমে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও পুষ্টির অভাব শিশুদের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে এ জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৩৩হাজার ৯৩৭ জন শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত ছিল। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০২২ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২৬ হাজার ৪৮৭জন। অর্থাৎ ওই ব্যাচের কমপক্ষে ৭ হাজার ৪৫০জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। আর এই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম একটি কারণ বলে জানান সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তারা।
সুন্দরবন ঘেষা শ্যামনগরের দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার বাসিন্দা হুদা মালী বলেন, খরা, ঝড়, বৃষ্টি ও নদীভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। আইলার পর থেকে গোাঁ এলাকা উদ্ভিদশূন্য। লবণাক্ততার কারণে সব গাছ মারা গেছে। এলাকায় বসবাস করা খুবই কষ্টের। সব সময় সুপেয় পানির অভাবে থাকতে হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তথ্যমতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাতক্ষীরার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সুপেয় পানির সংকটে। ঘূর্ণিঝড় আইলার তান্ডবের পর সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলাগুলোর বিভিন্ন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তীব্র হয়। নষ্ট হয়ে যায় সুপেয় পানির উৎস।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, প্রতি লিটার পানিতে শূন্য থেকে ১হাজার মিলিগ্রাম লবণ থাকলে সে পানি পানযোগ্য। কিন্তু উপকূলে প্রতি লিটার পানিতে ১হাজার থেকে ১০ হাজার মিলিগ্রাম লবণ রয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সাতক্ষীরার ১৩ শতাংশ মানুষ খাওয়ার পানির সংকটে রয়েছেন বলে জানানো হলেও বাস্তবে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লির্ডাস, ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ডসহ জলবায়ু অধিপরামর্শ ফোরামের তথ্যমতে, জেলার ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮১জন মানুষের মধ্যে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ সুপেয় পানির সংকটে রয়েছেন।
জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে ‌বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায়। ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ¡াস, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও মাটির লবণাক্ততা উপকূলের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতের সময় অধিক শীত, গ্রীষ্মে প্রচন্ড গরম এবং বর্ষায় অতিবৃষ্টির ফলে দুর্ভোগ বাড়ছে। এ ছাড়া জলোচ্ছ¡াসে নদীভাঙনে এসব এলাকার বহু মানুষ উদ্বাস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট প্রভাবের কারণে বর্তমান সময়ে সাতক্ষীরার মানুষ রেকর্ড পরিমাণ তাপমাত্রা অনুভব করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
.