সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: প্রায় দিনই সকালে অফিসে যাওয়ার পথে বাচ্চাকে স্কুল কিংবা কোচিংয়ে দেওয়ার জন্য বের হতে হয়। বাসা থেকে বাচ্চার স্কুল কিংবা কোচিং একেবারে কাছেই অবস্থিত। তাই পায়ে হেঁটেই গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু অফিসের আবাসিক ক্যাম্পাসের বাইরে পা রাখতেই চারদিক থেকে পঙ্গপালের মতো ঝড়ের গতিতে ছুটে আসে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব রিকশার কোনটি যাত্রী নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলছে আবার কেউ কেউ যাত্রী নামিয়ে অন্য যাত্রী খুঁজছে। এসব ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের মূল লক্ষ্য থাকে, যত দ্রুত যাত্রীর গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারবে তত বেশি নতুন ভাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে চালক তার সর্বোচ্চ গতিতে ট্রিপ মারে। আর সকাল হলে তো কথাই নেই। কেননা, সকালে ট্রাফিক জ্যামের ততবেশি তীব্রতা থাকে না। আবার রাস্তাঘাটে পথচারীও তুলনামূলক কম থাকে। সেজন্য ঐ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সকালের দিকে ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। ফলে অহরহ দুর্ঘটনাও চোখে পড়ে। আমার মত অন্য যেকেউ সকালের ব্যস্ত সময়ে ঢাকার অলিগলি কিংবা মফস্বলের যেকোনো রাস্তায় দাঁড়ালেই চোখে পড়বে এই চিরচেনা দৃশ্য। কেউ কেউ এই ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ‘গরিবের বাহন’, আবার কেউবা রসিকতা করে নাম দিয়েছে ‘টেসলা’। দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থানে এই বাহনটি এখন এক অনস্বীকার্য বাস্তবতার নাম। কেননা, অফিসগামীদের জন্য কিংবা মহিলাদের জন্য এই বাহনটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য ঢাকা শহরের বিদ্যমান গণপরিবহন সুবিধা আদৌ পর্যাপ্ত কিংবা যাত্রীবান্ধব নয়। এজন্য তুলনামূলক কম খরচে অপেক্ষাকৃত দ্রুততার সাথে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কর্মজীবী মহিলা, স্কুলগামী শিক্ষার্থী বা তাদের অভিভাবকসহ অনেকের কাছে নির্ভরযোগ্য বাহন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
কিন্তু এই ব্যাটারিচালিত রিকশার বেশ খারাপ দিক আছে। এজন্য গত কয়েক বছর ধরে এটি উচ্ছেদ করা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলেছে, রাজপথ উত্তপ্ত হয়েছে, এমনকি পানি গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবতার কষাঘাতে একে পুরোপুরি উচ্ছেদ করা যায়নি। আর বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এটি হয়ত আর সম্ভব না-ও হতে পারে। কেননা, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে কর আরোপসহ একটি শৃঙ্খলতার ভিতর আনার জন্য বর্তমানে সরকার ভিন্ন এক পথে হাঁটছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে, ব্যাটারিচালিত রিকশা কি তাহলে স্থায়ীভাবে বৈধতা পাচ্ছে? সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপারটি স্পষ্ট না করা হলেও এমনটি অনুমান করা হচ্ছে যে, ব্যাটারিচালিত রিকশা স্থায়ী বা ঢালাওভাবে বৈধতা না পেলেও সম্পূর্ণ বন্ধে আপাতত তেমন কোন পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে না। তবে একথা বলা যায় যে, সরকার এই বিশাল খাতটিকে একটি আইনি ও কর কাঠামোর মধ্যে এনে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চিন্তা-ভাবনা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঢালাও বা চিরস্থায়ী ব্যাটারিচালিত রিকশার বৈধতা দেওয়া হচ্ছে না। বরং বিশৃঙ্খল এক বিশাল খাতকে আইনি কাঠামো, করের জাল এবং কড়া নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে নিয়ন্ত্রণের এক মহাপরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়মের মধ্যে আনতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ইতোমধ্যে ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী গতি ও গাড়ির ধরনভেদে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন নিতে হবে। এছাড়া কোনো একক ব্যক্তি নিজের নামে ৩টির বেশি এবং কোনো কোম্পানি ২৫টির বেশি রিকশা কিনতে বা নিবন্ধন করতে পারবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই বিশাল খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো একে করজালের আওতায় আনার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এলাকাভেদে প্রতি বছর রিকশাগুলোর ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানভেদে এই আয়করের পরিমানও নির্ধারণ করা হয়েছে। যেমন: সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫,০০০ টাকা, পৌরসভা এলাকায় বছরে ২,০০০ টাকা এবং ইউনিয়ন পরিষদ তথা গ্রামাঞ্চলে বছরে ১,০০০ টাকা। যানটির উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে আমদানি শুল্কও বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যেমন: সরকার এসব রিকশায় ব্যবহৃত ৭৫০ থেকে ১২০০ ওয়াটের মোটরের অবৈধ ব্যবহার কমাতে এর আমদানি শুল্ক শতকরা ১ ভাগ থেকে বাড়িয়ে ২০ ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে নতুন রিকশা তৈরির গতি ধীর করা। খসড়া নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, চালকদের ন্যূনতম পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে, বাংলা পড়তে ও লিখতে পারার যোগ্যতা এবং ন্যূনতম ১৮ বছর বয়স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চালকদের বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হবে এবং সড়কে এই বাহনগুলোর সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমিত রাখতে হবে। এই নীতিমালার আলোকে আরও কিছু বিষয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপের বিষয়ে বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে, মূল সড়ক ও মহাসড়কে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কোনো অবস্থাতেই জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে বা শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে চলতে পারবে না। এসব নীতিমালা পাশ হলেও এগুলো তদারকি করার মতো কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। যদি এগুলো যথোপযুক্ত তদারকি করা না হয় তাহলে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের পরিমান বহুগুণে বেড়ে যাবে বলে প্রতীয়মান হয়।
যদিও নীতিমালার আলোকে প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন সরকারের পক্ষে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, এই বিশাল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধন দেওয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এই নিবন্ধন দেওয়ার কাজটি বিআরটিএ-কে করতে হলে তাদের সেক্টরে নতুনভাবে জনবলের দরকার আছে। কেননা, বিআরটিএ থেকে বিভিন্ন মোটরযানের নিবন্ধন নেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট কালক্ষেপণ, দালালদের দৌরাত্ম্য, নির্ধারিত ফিসের পরিবর্তে বেশি পরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে আরও বিশাল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা বিআরটিএ সেক্টরের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ধারণা করা যায়, বর্তমানে দেশে ৫০ লাখেরও বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে কেবল রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ। তবে প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন না থাকায় সরকারের কাছে এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই এবং এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে ঢের বেশি হবে। এই বিশাল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধন দেওয়া বিআরটিএ-এর কাছে যথেষ্ট সহজতর বিষয় নয়।
তবে একথা বলতে হয় যে, ঢাকা শহরের সকল সড়ক ও অলিগলি এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে। ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন ঢাকাবাসীর দৈনন্দিন বাহনে পরিণত হয়েছে। এই ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্যে অন্যান্য বাহন যেমন, সিএনজিচালিত ট্যক্সি, গণপরিবাহন অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সড়কে ধারণ ক্ষমতার বাইরে ব্যাটারিচালিত রিকশার এতটাই আধিক্য যে, পথচারীরা এখন রাস্তা পার হতে ভয় পায়। এমনিতেই যানজটে নাকাল নগরবাসী তার উপর সর্বত্র ব্যাটারিচালিত রিকশার এই বেপরোয়া আধিপত্য দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঠামোগত ত্রুটিযুক্ত এই বাহন রাস্তায় নামার পূর্বে কোনরকম ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়নি। বৈদ্যুতিক ব্যাটারিচালিত এসব রিকশায় রয়েছে বড় শক্তির ৬০ ভোল্ট ১০০০ ওয়াট এর মোটর। এই ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়ই এসেমব্লিং হচ্ছে। সেইসাথে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও চলাচল করছে এই ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা ইজিবাইক। সাধারণ রিকশার সঙ্গে বাজার থেকে ক্রয়কৃত ইউপিএসের ব্যাটারি এবং ছোট মোটর সংযোজন করে সেটিকে ব্যাটারির রিকশায় পরিণত করা হচ্ছে। ময়লা টানার ভ্যান, বেকারি পণ্য সরবরাহ করার ভ্যান, সবজি টানার ভ্যান সবখানেই এখন মোটর লাগিয়ে সেটাকে চালনা করা হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পায়ে চালানো রিকশায় মোটর ও ব্যাটারির সংযোজন হচ্ছে। কোন অটোমেটিক বা ইঞ্জিনচালিত পরিবহন সড়কে নামার পূর্বে অনেকগুলো ধাপ আছে। সেসব ধাপ সফলতার সাথে অতিক্রম করার পরে উক্ত পরিবহন সড়কে চলার অনুমতি মেলে। অথচ শুধুমাত্র আন্দোলন করে রাস্তায় নামানোর অনুমতি মেলা এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা ইজিবাইক কতটা যৌক্তিক সেটা ভাববার বিষয় আছে। ব্যাটারিচালিত এসব রিকশার সঙ্গে ব্যবহৃত ব্যাটারিগুলো মূলত রিচার্জেবল লেড এসিড ব্যাটারি। অর্থাৎ এখানে ক্ষতিকারক সিসা এবং সালফিউরিক এসিড থাকে। অধিক ব্যবহারের ফলে এই ব্যাটারিগুলো খুব অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হওয়া ব্যাটারিগুলো পরিবেশে উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হচ্ছে কিংবা ভাঙ্গারির পণ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। এসব ব্যাটারি সাধারণত সাবধানের সঙ্গে ধ্বংস করার কথা থাকলেও যত্রতত্র এ ব্যাটারি ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ব্যাটারিতে ব্যবহৃত সিসা এবং সালফিউরিক এসিড দুটোই প্রাণীকূল ও উদ্ভিদকূল তথা পরিবেশের সকলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আবার উন্মুক্ত স্থানে ফেলার ফলে ব্যাটারির মধ্যে বিদ্যমান রাসায়নিক দ্রব্যগুলো সহসাই পুকুর, ডোবা অথবা অন্যকোনো মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরিবেশের মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করছে।
সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, যদিও এসব ব্যাটারি চালিত রিকশা কিংবা ইজিবাইক চলাচলে ঢাকাবাসী তথা দেশবাসীর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সময় ও অর্থের কিছুটা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু সড়ক কিংবা রাজপথে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে সেটা খুব বেশি অসহনীয়। একটি সভ্য নগরী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্য যেটা বড্ড বেশি বেমানান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি ঢাকার যানজট মহামারির রূপ নিয়েছে। দেখেও যেন কেউ দেখার নেই। অভিভাবকহীন একটি নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে মোটরচালিত যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে এমন অনিরাপদ বাহন চলতে দেওয়া হয় না। এছাড়া ছোট যানবাহনের আধিক্যে ঢাকার সড়কের ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীলতা কমছে, আর বিশৃঙ্খলা এত বেড়েছে যে, পুরো শহর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েক লাখ চালকের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে দখল হচ্ছে ফুটপাতও। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। নগরের পাড়া-মহল্লায় যেসব গলিপথ যানজটমুক্ত ছিল, সেগুলোও এখন প্রধান সড়কের মতোই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে স্থবির। উল্টোপথে চলা, প্রধান সড়কে বেপরোয়া গতিতে চলা, অন্য যান্ত্রিক বাহনকে তোয়াক্কা না করা, কখনো কখনো উড়াল সড়কেও উঠে যাচ্ছে এসব রিকশা। আর দুর্ঘটনা তো নিয়মিত ঘটনা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোভ্যান, লেগুনা, মিশুকসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৬ জন। নিহতের সংখ্যাটি সত্যিই উদ্বেগজনক। এটি বন্ধ করা না গেলে বা এর চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ না আনতে পারলে এই সংখ্যা দিনকে দিন আরও বাড়বে। সেইসাথে বাড়বে নিত্যদিনের যানজট। যানজটের ভোগান্তি কেবল মানুষের সময় নষ্ট করে না, বরং তাদের শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকার ফলে মানুষের মনে তীব্র হতাশা, ক্ষোভ এবং মানসিক অবসাদ তৈরি হয়। এর ফলে মানুষের ধৈর্য্যশক্তি কমে যায় এবং সামান্য কারণে মানুষ হিংস্র বা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এজন্য যানজট নিরসন অতীব জরুরি। সেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশার বৈধতা যানজটের মতো উপদ্রবকে বহুগুণে উস্কে দেবে বলে প্রতীয়মান হয়। শৃঙ্খল নগরী গড়ে তুলতে চাইলে এই ব্যাটারিচালিত রিকশার লাগাম এখনিই টানতে হবে। পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা না গেলেও ধাপে ধাপে কিছু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে একথা অনস্বীকার্য যে, এই ব্যাটারিচালিত রিকশা দেশের লাখ লাখ চালক ও গ্যারেজ শ্রমিকের উপার্জনের প্রধান উৎস। আবার মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত মানুষের জন্য অলিগলিতে যাতায়াতের সবচেয়ে সাশ্রয়ী বাহন এটি। লাখ লাখ রিকশা রাতারাতি তুলে দিলে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটবে। ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঢালাওভাবে বৈধতা না দিয়ে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর এনে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই নতুন নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে সুনজরে নিয়ে সুদূরপ্রসারী ও সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে তিলোত্তমা নগরী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে আইন করে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল সীমিত করা সমীচীন বলে প্রতীয়মান হয়।দুর্ঘটনারোধে চলতি বছরের ১৫ মে ঢাকায় বিআরটিএ ভবনে এক অনুষ্ঠানে সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন রাজধানীতে কোনো ধরনের ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে পারবে না। এই ঘোষণার পর তৎপর হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুরু হয় সড়কে অভিযান। নগরবাসী এমন ঘোষণায় খুশি হলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। চালকরা রিকশা বন্ধের প্রতিবাদে শুরু করেন আন্দোলন। ঢাকায় রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ, ভাঙচুর করায় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় হয় সংঘর্ষ। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকায় নিম্নআয়ের মানুষের দুঃখের কথা মাথায় রেখে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালু রাখার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশের সুযোগে ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। ফলে আগে পুলিশের ভয়ে অলিগলিতে চলাচল করা রিকশা এখন প্রকাশ্যে মহাসড়কে! আন্দোলনের পর রাস্তায় প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়ে গেছে বহুগুণ। ঘটছে নিয়মিত দুর্ঘটনা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর মূল সড়ক ব্যাটারিচালিত রিকশায় সয়লাব। রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, আরামবাগ, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, সদরঘাট, মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও, বাড্ডা, নয়াবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাংলামটর, কারওয়ানবাজার, ফার্মগেট, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, মুগদা, বাসাবো, নাজিরাবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ধনিয়া, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। প্যাডেল রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি লাগিয়ে তৈরি হয়েছে এসব রিকশা। এসব এলাকায় মোড় দখল করে রেখেছে রিকশা। বিশেষ করে রাতে অন্যান্য গাড়ির চাপ কমে গেলে ব্যাটারিচালিত রিকশা বেরিয়ে আসে রাস্তায়। দিনে অলিগলিতে চললেও রাতে চলতে থাকে সব রুটে। কোনো রুটেই বাধা নেই তাদের। ধরা পড়লে পুলিশের কাছে ঘুষ দিয়ে রক্ষা পান এমনও তথ্য দিয়েছেন একাধিক রিকশাচালক।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, সারা দেশে ৪০ হাজার ইজিবাইক ও ব্যাটারি চালিত রিকশা আছে। এর মধ্যে ঢাকা শহরে আছে সাত-আট লাখ। এসব যন্ত্রচালিত রিকশার কোনো নিবন্ধন দেয় না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ(বিআরটিএ)। ঢাকাসহ কোনো সিটি করপোরেশনও তাদের লাইসেন্স দেয় না। মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পরিবহন শ্রমিক নেতা ও সমিতিও পুলিশ মিলে অর্থের বিনিময়ে এই ধরনের যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা কত, এর সঠিক কোনো তথ্য কোনো সংস্থার কাছে নেই। ডিএসসিসি এলাকায় অবৈধ প্রায় ৪ লাখ রিকশা রয়েছে। ডিএনসিসি এলাকায়ও অবৈধ রিকশার সংখ্যা ৪ থেকে ৫ লাখ হবে বলে মনে করছেন ডিএনসিসি সংশ্লিষ্টরা। নতুন করে ঢাকায় যেসব রিকশা নামানো হচ্ছে, এর মধ্যে বড় একটি সংখ্যা ব্যাটারিচালিত। শারীরিক কষ্ট লাঘব করতে রিকশাচালকরা ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। এজন্য রিকশার মালিকরাও রিকশায় ব্যাটারি যুক্ত করছেন।
রিকশা মালিকদের অভিযোগ, প্রতি মাসে গড়ে ২০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি করা হচ্ছে। নিয়মিত চাঁদা দিতে হচ্ছে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের। পুলিশকেও দিতে হচ্ছে নিয়মিত। সবমিলিয়ে লোকজন জিম্মি হয়ে আছে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কাছে।
ব্যবসায়ীরাসহ যোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারা দেশে কমপক্ষে ২০ লাখ এমন পরিবহন চলছে। যা ২০১৬ সালে ছিল ১০ লাখ। ব্যাটারিচালিত যানবাহনে দিনে বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এসব বন্ধে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের যোগসাজশে চলছে এসব যান। বুয়েটের এক গবেষণা বলছে, সারা দেশে দিনে অন্তত এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার পেছনে।
২০১৬ সাল থেকে ব্যাটারিচালিত এসব যানবাহনের ওপর গবেষণা করেছেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান খান। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, দেশে প্রায় ২৯ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত যানবাহনে দিনে বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট। একটি ইজিবাইকে ৪-৫টি ব্যাটারি থাকে। ১২ ভোল্টের প্রতিটি ব্যাটারির জন্য ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজের কমতি নেই। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে মুগদাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, বাসাবোসহ খিলগাঁও এলাকায় রয়েছে বড় বড় গ্যারেজ। রিকশাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে ব্যবসা করছে। খোলা হয়েছে নামে-বেনামে রিকশা চালক সমিতি। সমিতির কাছে চাঁদা দিয়ে রাস্তায় নামার অনুমতি পায় রিকশা। মূলত লাভবান হচ্ছে যারা এ রিকশা গ্যারেজের ব্যবসা করছে। তারা দেড় থেকে ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাটারি চার্জের জন্য বিদ্যুতের বিশেষ লাইন নামিয়ে চার্জের ব্যবসা করছে।
তথ্য বলছে, সারা দেশে বিভিন্ন রুটে অটোরিকশা-ইজিবাইক চালাতে লাগে না কোনো ধরনের লাইসেন্স বা রুট পারমিট। অবৈধ অটোরিকশা-ইজিবাইকের মালিক বা গ্যারেজ মালিকরা অটোরিকশা চালাতে দেন অনেক ক্ষেত্রেই অযোগ্য, অদক্ষ কিংবা অপ্রাপ্ত বয়স্ক, উঠতি বয়সি ছেলেদের। অনেক ক্ষেত্রেই এরা কানে হেডফোন লাগিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে থাকে। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করাতে বিভিন্ন এলাকা বা মহল্লায় যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এমন ঘটনায় কেউ প্রতিবাদ করলেই অশ্লীল আচরণও করতে দেখা যায় প্রায়ই। কোনো ঝামেলা হলে গ্যারেজ মালিকরাই তা মিটমাট করে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা-ইজিবাইকচালক বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা কখনো পথচারী, কখনো প্রাইভেট কার, আবার কখনো মোটরসাইকেলের সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব অটোরিকশা-ইজিবাইককে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ গ্যারেজ ও অনুমোদনহীন ব্যাটারি চার্জার কেন্দ্র। এতে দেদারসে হচ্ছে বিদ্যুৎ চুরি। রাজস্ব আয় হারাচ্ছে সরকার।
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আইন-বিধিমালা করে অটোরিকশা চলাচলের ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনে অটোরিকশা চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করে দিতে হবে যে, এই এলাকার বাইরে তারা চালাতে পারবে না। কোনো অবস্থাতেই মহাসড়ক কিংবা বড় সড়কে তারা যেতে পারবে না।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার বেপরোয়া চলাচলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এতে জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। নগরীর সড়ক ও পরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সুফল মিলছে না।
জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পরপর ডিএসসিসি এলাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা তুলে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিছুদিন অভিযানও পরিচালনা করা হয়। নানামুখী সমালোচনার কারণে ডিএসসিসির এ উদ্যোগের গতি হ্রাস পায়। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর স্তিমিত হয়ে যায়। বর্তমানে কালেভদ্রে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ফলে দেদার মহানগরীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভেতরে মোটরচালিত, মেশিনচালিত, ইঞ্জিনচালিত কিংবা ব্যাটারিচালিত সব ধরনের অটোরিকশা জাতীয় যানবাহন আনুষ্ঠানিকভাবেও নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৭ সালেও একবার উচ্চ আদালত সড়কে অনুমোদনহীন বা তিন চাকার যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে। সর্বশেষ রুট নির্ধারণ করে চলাচল করতে নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
সূত্র বলছে, ব্যাটারিচালিক রিকশা ও ইজিবাইককে কেন্দ্র করে সারা দেশে একটি চাঁদাবাজ চক্র গড়ে উঠেছে। মিরপুর এলাকায়ই মাসে দেড় কোটি টাকা চাঁদা দিতে হয় বলে জানান ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা মালিক ও শ্রমিক সমিতির এক নেতা। তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় মাসে ১ হাজার ৮০০ টাকা করে চাঁদা দিই। মিরপুর বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় এটা স্থানীয় কয়েকজন যুবলীগ নেতা এটা নিয়ন্ত্রণ করেন। টাকার বিনিময়ে তারা থানা পুলিশ ও ট্রাফিকের ঝামেলা সামলানোর দায়িত্ব নেয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. হানিফ খোকন বলেন, এই ব্যাটারিচালিত রিকশার পেছনে আছে পুলিশ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং কিছু পরিবহন শ্রমিক নেতা। আমাদের হিসাবে প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে মাসে দুই হাজার টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। দেশে এই ধরনের যানবাহন আছে কমপক্ষে ৪০ লাখ। সেই হিসাবে মাসে ৮০০ কোটি টাকা চাঁদা ওঠে। যারা এটা পরিচালনা করে তারা সংঘবদ্ধ। আমরা বিভিন্নভাবে সরকারকে বলেছি এসব চাঁদাবাজি বন্ধ করা হোক।
জাতীয় রিকশা ভ্যান শ্রমিক লীগের (ব্যাটারি চালিত) সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আগে স্থানীয়ভাবে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রিকশাপ্রতি দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতেন। বর্তমানে কয়েকটি এলাকা ছাড়া চাঁদাবাজি বন্ধ হয়েছে। ঢাকা শহরে আমাদের জরিপ অনুযায়ী দক্ষিণ সিটিতে দেড় লাখ ও উত্তর সিটিতে এক লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। আর এসব রিকশা মহাসড়কে চলাচল যেন করতে না পারে সেজন্য আমরা হ্যন্ডবিল, পোস্টারিং করছি। চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছি।’
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি শাহাবুদ্দিন খান বলেন, মহাসড়কে থ্রিহুইলারসহ সব ধরনের অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশের কোনো সদস্য এসব যানবাহনের চালকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টাকা আদায় করার প্রমাণ মিললে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।সারা দেশে চলছে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার। অথচ এখনো প্রতিদিন ৫৫ কোটি টাকা মূল্যের বিদ্যুৎ গিলে খাচ্ছে অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত রিকশা। ইজিবাইকের পেছনে বিদ্যুতের বার্ষিক খরচ ছাড়িয়ে যাচ্ছে ২০ হাজার কোটি টাকা। দিন যত যাচ্ছে, ততই বেড়ে চলেছে এ ব্যয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবৈধভাবে ব্যাটারি চার্জ করায় এ খাতে বছরে অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, এসব রিকশায় সাধারণত ১২ ভোল্টের ৪-৬টি ব্যাটারি রয়েছে। দেশে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ। একেকটি ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতি ঘণ্টায় ৯০০-১১০০ ওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। দিনে গড়ে আট ঘণ্টা চার্জে রাখলে একেকটি রিকশায় বিদ্যুৎ খরচ হয় ৮-৯ ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা)। ফলে কেবল রিকশার ব্যাটারি চার্জের পেছনেই প্রতিদিন চলে যাচ্ছে জাতীয় গ্রিডের ৮০০-৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোই গ্রাস করছে বছরে প্রায় তিন লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যা দেশের মোট উৎপাদনের অন্তত পাঁচ শতাংশ।
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে। চাহিদা ১৮-১৯ হাজার মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপন্ন হচ্ছে ১৩-১৫ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে এ সংকট প্রকট হয়ে দেখা দেয়। ফলে লোডশেডিং করতে হচ্ছে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট। লোডশেডিংয়ের চাপ এতদিন প্রায় পুরোটাই সইতে হয়েছে গ্রামের মানুষদের। ক্ষেত্রবিশেষে ৭-১২ ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে তাদের।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যু ৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মতে, দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ লাখ। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই চলছে প্রায় ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব অটোরিকশার একেকটিতে থাকে ৪ থেকে ৬টি ১২-ভোল্টের ব্যাটারি, যেগুলো চার্জ দিতে ১ ঘণ্টায় প্রয়োজন হয় প্রায় ১ হাজার ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ। অর্থাৎ, ৮ ঘণ্টা চার্জে থাকলে একেকটি রিকশায় খরচ হয় প্রায় ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ।
সিপিডির গবেষণা অনুযানুয়ী, প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে শুধু এই রিকশা চার্জ করার পেছনে। কিন্তু বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে অনিয়ন্ত্রিত সংযোগ নেওয়ার কারণে এই বিপুল বিদ্যুতের কোনো অর্থ সরকারি কোষাগারে।