চিংড়ির রেণুর তীব্র সংকট, বিপাকে হাজারো ঘের মালিক

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৩ - ১৩:৪৮

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা খুলনা ও বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলা, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিংড়ি উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে চলতি মৌসুমে চিংড়ির রেণু (পোনা) তীব্র সংকটে পড়েছে। ঘেরে রেণু ছাড়ার নির্ধারিত সময় প্রায় শেষ হলেও অধিকাংশ চাষি প্রয়োজনীয় পোনার খুব সামান্য অংশ সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ফলে প্রস্তুত ঘেরগুলোতে চাষ শুরু নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
একসময় রেণুর বেচাকেনায় সরগরম থাকা ফলতিতা বটতলা ও আশপাশের বাজারগুলো এখন অনেকটাই নির্জীব। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজারে রেণুর সরবরাহ অত্যন্ত কম, আর যে পরিমাণ পাওয়া যাচ্ছে তার দামও গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে রেণু সংগ্রহে সরকারি বিধিনিষেধ, পরিবহন ও বিপণনে কড়াকড়ি এবং হ্যাচারির সংখ্যা কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। এর প্রভাব শুধু চিংড়ি উৎপাদনেই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত মানুষের জীবন-জীবিকাতেও পড়তে শুরু করেছে।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে বর্তমানে ৮ হাজার ৪টি বাণিজ্যিক ঘের এবং ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। এসব জলাশয়ের জন্য বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদা রেণুর প্রয়োজন হয়। তবে চাষি ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, প্রকৃত চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি; চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি রেণুর প্রয়োজন।
নলধা, ঠিকরিপাড়া ও মূলঘর এলাকার বিভিন্ন ঘের ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগে ঘের প্রস্তুত করা হলেও রেণুর অভাবে অনেক চাষি এখনো মাছ ছাড়তে পারেননি। এতে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ঠিকরিপাড়ার চাষি দাউদ হায়দার বাবু জানান, এক একর ঘের প্রস্তুত করতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রতিবছর তিনি প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পোনা ছাড়লেও এবার এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করলেও পর্যাপ্ত রেণু না পাওয়ায় তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
রেণু ব্যবসায়ী শেখ মনি বলেন, গত বছর প্রতি হাজার রেণু ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার দাম বেড়ে ৩ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। তিনি আরও জানান, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সরবরাহকারীদের কাছে অগ্রিম দেওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকার বিপরীতে এখনো কাঙ্ক্ষিত রেণু পাননি।
ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা আড়তমালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকনের ভাষ্য, স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাষিরা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ উপকূলীয় বিভিন্ন জেলা থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক রেণুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
উপজেলা মৎস্য চাষি সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ফলতিতা বাজারে প্রায় ৫০০ মাছের আড়ত রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছের বেচাকেনা হয় এবং ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক ও পরিবহনকর্মী এই ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়া উপজেলার প্রায় ২০ হাজার ঘের ও পুকুরকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল।
মৎস্য বিভাগের হিসাবে, গত অর্থবছরে ফকিরহাটে ২ হাজার ৩১৫ টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৩০ টন। তবে বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচ এম রাকিবুল ইসলাম জানান, ২০১১-১২ সালে দক্ষিণাঞ্চলে ৭৮টি হ্যাচারি থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩৭টিতে নেমে এসেছে। এর ফলে রেণু উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু সংগ্রহ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণুর ব্যবহার বাড়াতে চাষিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মাত্র ৮ শতাংশ হওয়ায় সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম।
চাষিদের আশঙ্কা, দ্রুত রেণুর সরবরাহ বৃদ্ধি না পেলে শুধু উৎপাদনই নয়, দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্পও বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় সাতক্ষীরায় চিংড়ি রেণুর ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। মৌসুমের শুরুতে চাহিদা মত রেণু না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে চাষিরা। ফলে চিংড়িতে উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে সংশয় দেখা দিয়েছে। প্রতি দিন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চাষিরা চিংড়ি রেণু কিনতে ভীড় করছে সাতক্ষীরা শহরের রেণু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গুলোতে। ফলে জমজমাট হয়ে উঠেছে জেলার চিংড়ি রেণুর কেনা বেচা।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে জেলাতে ৩৪৪ কোটি ৫৫ লক্ষ চিংড়ি রেণুর চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বাগদা ৩৩৪ কোটি এবং গলদা ১০ কোটি ৫৫ লক্ষ। এসব চাহিদার বিপরীতে সাতক্ষীরায় ১০টি হ্যাচারিতে ৮০ কোটি ৬ লক্ষ চিংড়ির রেণু উৎপাদানের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে। ফলে ২৬৪ কোটি ৪৯ লক্ষ রেণুর ঘাটতি মেটাতে হিমশীম খেতে হয় চিংড়ি চাষিদের।
চিংড়ি চাষি ও পোণা সরবরাহকারীরা জানান,এবর জেলাতে ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার ৫৫০টি চিংড়ি রেণুর বক্স দরকার। চাষিদের মতে একটি বক্সে ২টি পলিতে ১০ থেকে ১২ হাজার চিংড়ি রেণু থাকে। বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরা শহরের চিংড়ি রেণু বক্সপ্রতি বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার টাকা দরে। সেই হিসাবে চলতি মৌসুমে জেলাতে চিংড়ি রেণু বেচা কেনা হবে ১৩৭ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা। যার মধ্যে জেলা থেকে সরবরাহ করা হবে ৮০ হাজার ৬০টি বক্স। যার বাজার মূল্য দাড়ায় ৩২ কোটি ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১০৫ কোটি ৭৯ লক্ষ ২০ হাজার টাকা মূল্যে চিংড়ি রণেু জেলার বাইরে থেকে সরবরাহ করতে হবে।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলাতে ৬৬ হাজার ৭৬০টি চিংড়ি ঘের রয়েছে । এর মধ্যে বাগদা চিংড়ি ঘেরের সংখ্যা ৫৫ হাজার ১২২টি ও গলদা চিংড়ি ঘের রয়েছে ১১ হাজার ৬৩৮টি।
চলতি মৌসুমে জেলাতে ৭৬ হাজার ৩০৮ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষের লক্ষ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাগদা ৬৬ হাজার ৯১০ হেক্টর এবং গলদা ৯ হাজার ৩৯৮ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধরণ করা হয়েছে।
জেলাতে বাগদা চিংড়ি পোনার চাহিদা রয়েছে ৩৩৪ কোটি । যার হেক্টর প্রতি ৫০ হাজার পিএল মজুদের কথা বলা হয়েছে। যে খানে ৯টি হ্যাচারিতে উৎপাদিত নপ্লি নার্সিং করে ৮০ কোটি পিএল উৎপাদেেনর লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি ভাবে জেলাতে মাত্র একটি গলদা চিংড়ির হ্যাচারি গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে মাত্র ৬ লক্ষ ৭ হাজার পিএল উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে।
ফলে মানসম্মত রেণু পোনার অভাবে সাতক্ষীরা অঞ্চলের মৎস্য চাষিরা কাক্সিক্ষত চিংড়ি উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক উৎস থেকে রেণু পোনা আহরণ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকার কারণে দূর থেকে আনা হ্যাচারির অপুষ্ট রেণু পোনা চাষ করে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন চাষিরা।
মৎস্য বিভাগ বলছে, সরকারিভাবে স্বাদু পানির রেণু উৎপাদনে জেলায় প্রকল্প রয়েছে। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে উৎপাদিত মানসম্মত পোনা সরবরাহ করতে পারলে চিংড়ি চাষিদের সমস্যা সমাধান হবে।
মানা হচ্ছে না হোয়াইট গোল্ড হিসেবে পরিচিত চিংড়ি মাছের রেনু সরবরাহে নীতিমালা। বেশীর ভাগ রেনু ঘেরে ছাড়ার আগেই মারা যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে অনেকের। হ্যাচারি গুলোর প্রতারণার শিকার চিংড়ি চাষিদের বিঘা প্রতি চাহিদার কয়েকগুণ বেশী চিংড়ি রেনু ছাড়তে হচ্ছে ঘেরে। এরফলে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তেমনি উৎপাদনও কম হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঘের মালিকরা।
জেলায় আধা নিবিড়, নিবিড় সহ বিভিন্ন ধরনের চিংড়ি ঘের রয়েছে। এসব ঘেরে চিংড়ির রেণু আসে মুলত কক্সবাজারের বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে।
এসব রেণু পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে পোনার গুণগত মান কমে যায়। তাছাড়াও ঘেরে ছাড়ার আগেই বেশীর ভাগ রেণু অক্সিজেন ফেল করায় ও গরমে মারা যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
কক্সবাজারের রেণু মারা যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে কক্সবাজারের হ্যাচারি প্রতিনিধিরা বলছেন, ভারতীয় রেণু ফেলায় ঘেরে মাছ টিকছে না। তবে কক্সবাজার থেকে নোফলি এনে সাতক্ষীরার হ্যাচারিতে যদি প্রডাকশান দেয়া যায়, তাহলে চিংড়ির উৎপাদন বেড়ে যাবে।
চাষিদের দাবী তারা স্থানয়ি চিংড়ি পোনা হ্যাচারি গুলোর পোনা ছেড়ে অনেক লাভবান হচ্ছে । তাই এ অঞ্চলে হ্যাচারি শিল্প ধরে রাখতে ও একই সাথে বৈদেশিক মৃদ্রা অর্জনে সহায়তার লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে মা মাছ সংরক্ষণের দাবী সাতক্ষীরার হ্যাচারি মালিকদের।
ঘের মালিক আব্দুল মাজিদ বলেন সাতক্ষীরা হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেনু মাটি ও পানির সঙ্গে সহনশীল বলেই ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে ।
সাতক্ষীরা নিউমার্কেট সংলগ্ন হ্যাচারি প্রতিনিধি আখি ফিসের মালিক বিশ্বজিত জানান,বর্তমানে জেলাতে চিংড়ির রেণুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরবরাহ কম থাকা এবছর দাম একটু বেশি।
চিংড়ি রেণু কিনতে আসা আশাশুনির পূর্ব কাঁদাকাটি এলাকার দিপঙ্কার জানান, রেণু সংকটের কারণে সে যথা সময়ে ঘেরে পোনা ছাড়তে পারছে না। ৫ বিঘা জমিতে সে ঘের করে। তার চহিদা স্থানীয় হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেণু সংগ্রহ করতে । কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় স্থানীয় পোনা না পেয়ে বাইরে থেকে আসা রেণু কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এমন অবস্থা প্রায় সব চাষিদের।
সাতক্ষীরা চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলছেন, রেণুর গুণগত মান ভালো, তবে তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে কিছুটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কক্সবাজার থেকে নিয়ে আসা রেণু তাপমাত্রার ব্যবধানের কারণে চাষিরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর পরামর্শ স্থানীয় হ্যাচারি থেকে উৎপাদিত রেণুর গুণগত মান অনেক ভাল। সরকারি ভাবে জেলাতে আরো বেশি হ্যাচারি গড়ে তুলতে পারলে চিংড়ি খাত ব্যাপক সফালতার মুখ দেখবে। সরকার এ খাত থেকে কয়েক গুণ বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারবে।
সরকারি নীতিমালা মেনে রেণু পোনা সরবরাহ ও বিপণনের কথা জানালেন সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম। তিনি সময়ের কারণে কক্সবাজার থেকে আনা রেনুর গুণগত মান নষ্ট হওয়ার সত্যতা স্বীকার করে জানান, সাতক্ষীরায় মা মাছ সংরক্ষণে সরকারি ভাবে উদ্যোগ নিলে চাষিরা ভাল মানের রেনু পাবে। আর ২/৩ বার রেনু ঘেরে ছাড়ার প্রয়োজন হবে না। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলাতে নতুন নতুন হ্যাচারি গড়ে তোলা হবে।