সাতক্ষীরা থেকে বছরে ৪০০ কোটি টাকার পাবদা মাছ ভারতের রপ্তানি হচ্ছে

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০৮ - ০১:২২

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা থেকে বছরে ৪০০ কোটি টাকার পাবদা মাছ ভারতের রপ্তানি হচ্ছে।।।সিরাজুল ইসলাম সাতক্ষীরা।বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরা। সাদা সোনাখ্যাত চিংড়ি খাত থেকে এ জেলার রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে। সত্তরের দশক থেকে সাতক্ষীরাবাসীর আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে চিংড়ি সম্পদ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে। তবে চিংড়ির পর এবার রফতানি আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে পাবদা মাছ।
জেলায় উৎপাদিত পাবদা মাছ সাদ-আট বছর ধরে ভারতে রফতানি হচ্ছে, যা এ জেলার অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকায় সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া ও দেবহাটা উপজেলার কিছু জায়গায় পাবদা চাষ হয়। রফতানিজাত এ পাবদা মাছ উৎপাদন করে জেলার অনেক মৎস্যচাষী লাভবান হচ্ছেন। মিঠাপানির মাছ হিসেবে অনেক সম্ভাবনাময় বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।মৎস্যচাষী ও রফতানিকারকরা জানান, সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে পাবদার পোনা খামারে ছাড়া হয়। ছয় মাসের মধ্যে বিক্রির উপযোগী হয়। নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাবদা মাছ ভারতে রফতানি হয়।
সাতক্ষীরার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান আল আমিন ফিশের স্বত্বাধিকারী আবুল বাশার জানান, তিনিসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ভারতে পাবদা মাছ রফতানি করে। প্রতি মাসে ৮০০-৯০০ টন মাছ ভারতে যাচ্ছে। সে হিসাবে বছরে গড়ে ১৫০০-২০০০ টন মাছ রফতানি হচ্ছে। মণপ্রতি গড় মূল্য ১১ হাজার টাকা হিসেবে বছরে ৪১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা রফতানি আয় হচ্ছে।
সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা সদরের ঝিকরা গ্রামের রফতানিজাত পাবদা মাছ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাকি ফিশের মালিক মো. ইশারাত আলী জানান, পাঁচ-ছয় বছর ধরে রফতানিজাত পাবদা মাছ উৎপাদন করেন। ১২০ বিঘা জমির ঘেরে পাবদা চাষ করেন। এ ঘেরে বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকার পাবদা মাছ উৎপাদন করেন। এর অধিকাংশ মাছই তিনি রফতানি করে থাকেন।
তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে পাবদা মাছ ময়মনসিংহ জেলার ব্যবসায়ীরা তার কাছ থেকে কিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন রফতানিকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতেন। এরপর তিন বছর ধরে তিনি ভারতে রফতানি করছেন বলে জানান।
পাবদা চাষী ইশারাত আলী আরো জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ কোটি টাকার পাবদা মাছ রফতানি করেছেন ভারতে। যার প্রতি মণ ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্য পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ উঠিয়েও বছরে ৪০-৫০ লাখ টাকা লাভ হয় পাবদা চাষে।সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চুপড়িয়া গ্রামের পাবদা মাছচাষী তানজির হোসেন বলেন, ৪৫ বিঘা জমির ঘেরে পাবদা মাছ করেন। তিনি জানান, তুলনামূলকভাবে খাদ্যও সাশ্রয় হয় পাবদা চাষে। তাছাড়া অন্যসব মাছের তুলনায় পাবদা মাছের দাম ও চাহিদা বেশি বলে জানান তিনি। স্থানীয় বাজার ছাড়াও সাতক্ষীরার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান সাব্বির এন্টারপ্রাইজের মধ্যে বেনাপোল বন্দর দিয়ে উৎপাদিত পাবদা মাছ ভারতে রফতানি করেন। তবে চলতি মৌসুমে করোনা সংকটের কারণে পাবদা মাছের দাম কিছুটা কম পাওয়া গেছে। তার পরও ৪৫ বিঘার ঘেরে পাবদা মাছ উৎপাদনে বছরে ১০-১২ লাখ টাকা তার লাভ হয়।
সাতক্ষীরার মৎস্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাব্বির এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. শফি জানান, তিনি সাতক্ষীরা থেকে বিভিন্ন প্রকার মাছ ভারতে রফতানি করেন। এর মধ্যে পাবদা, পারশে, ভেটকি, ট্যাংড়া ও রুই উল্লেখযোগ্য। তবে এসব মাছের মধ্যে ভারতের বাজারে পাবদা মাছের চাহিদা রয়েছে প্রচুর। বর্তমান তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাসে ২০০-৩০০ টন পাবদা মাছ রফতানি করছেন ভারতে।
মো. শফি আরো বলেন, ভারতের বাজারে বর্তমান ২০টি কেজি গ্রেডের পাবদা মাছের দর যাচ্ছে ১১ হাজার টাকা মণ এবং ৩০ গ্রেডের মাছ বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা প্রতি মণ। তিনি বলেন, পাবদা মাছ উৎপাদনে সাতক্ষীরা জেলা খুবই সম্ভাবনাময়। সাতক্ষীরা জেলাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাবদা মাছ সংগ্রহ করে তা ভারতে রফতানি করেন। কিন্তু গ্রেডের দিক দিয়ে ভালো হওয়ায় সাতক্ষীরার উৎপাদিত মাছই বেশি যাচ্ছে ভারতে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জানান, সাতক্ষীরার উৎপাদিত পাবদা মাছের অধিকাংশই যাচ্ছে ভারতে। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার অন্যান্য রফতানিজাত মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে পাবদা মাছ।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জিএম সেলিম এই প্রতিবেদককে জানান, মিঠাপানির মাছের মধ্যে সাতক্ষীরার একটি সম্ভাবনাময় পাবদা মাছ। এটি ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি ভারতেও রফতানি হচ্ছে। তবে পাবদা লবণাক্ত পানিতে ভালো হয় না। এটি মূলত সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলায় সবচেয়ে ভালো উৎপাদন হচ্ছে বলে জানান তিনি। অন্যান্য উপজেলায়ও কম-বেশি পাবদা চাষ হচ্ছে বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তিনি আরো জানান, জেলায় ৮০০-৮৫০ বিঘা পরিমাণ জমির ঘেরে পাবদা চাষ হচ্ছে। আগামীতে চাষের জমির পরিমাণ আরো বাড়বে।এশিয়ার সর্ববৃহৎ মৎস্য খামার শাওন ফিস সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার হরিনগরে অবস্থিত প্রকল্পটির স্বত্ব অধিকারী বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্দুস সাত্তার মোড়ল জানান আমার এই প্রকল্পটি ২৭০০ একর আয়তনের ১৪০ টি পুকুর আছে এর নির্মাণ কাল ২০১৫ সাল আমি এটিকে আধানীবির পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি চাষের জন্য তৈরি করে ছিলাম কয়েক বছর বাগদা চিংড়ি চাষের লাভবান না হতে পেরে বর্তমান পাবদা মাছ সহ দেশিয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করেছি তার মধ্যে পাবদা মাছ উল্লেখ যোগ্য ১৪০ টি পুকুরের মধ্যে ৭৫ টি পুকুরে পাবদা মাছ চাষ করেছে বর্তমান পাবদা মাছে আমার খামারের উল্লেখযোগ্য মাছ এবং ৭৫টি খামারে পাবদা চাষে আমি সাবলম্বী শ্যামনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তুষার মজুমদার বলেন এশিয়ার সর্ববৃহৎ মৎস খামার শাওন ফিস এখন পাবদা চাষ সহ নানা প্রজাতির মাছ চাষে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।সাতক্ষীরার মৎস্য চাষীরা পাবদা মাছ চাষে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করেছে। এই মাছ মাত্র ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই বিক্রির উপযোগী হয়, ফলে বছরে দুই বার চাষ করা সম্ভব। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও, বিশেষত ভারতের, পাবদার চাহিদা থাকায় এটি অন্য মাছের তুলনায় অধিক লাভজনক।
মৎস্য চাষীরা জানান, অল্প সময়ে বেশি উৎপাদন এবং ভালো বাজারমূল্য পাওয়ায় তারা পাবদা মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। একই জমিতে সাদা মাছ চাষের তুলনায় পাবদা মাছের তিনগুণ উৎপাদন হয়। তবে, সাদা মাছের তুলনায় পাবদা মাছের জন্য একটু বেশি যত্নের প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাদা মাছের সাথে পাবদার মিশ্র চাষ করে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চাষীরা। এছাড়া, বিদেশে পাবদার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এটি।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খানপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা নাজমুল হুদা ২০১৮ সালে লেখাপড়া ছেড়ে মৎস্য ব্যবসা শুরু করেন। ৬ বিঘা জমিতে পাবদা মাছ চাষ শুরু করে বর্তমানে তিনি ৪টি খামারের মালিক। তার সফলতা দেখে অনেকে মৎস্য উদ্যোক্তা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার খামারের মাছ ভারতের বাজারেও সরবরাহ হচ্ছে। তিনি জানান, আকার অনুযায়ী পাবদা মাছ ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে, যা তার উদ্যোগকে আরও লাভজনক করে তুলেছে।পাবদা মাছ চাষ করে সাতক্ষীরার মৎস্য চাষীরা চমৎকার সাফল্য অর্জন করেছেন। মাত্র ৫-৬ মাসের মধ্যে এই মাছ বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে, ফলে বছরে দুইবার চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। দেশের বাজার ছাড়াও বিদেশে এর চাহিদা বেড়েছে, যা চাষীদের জন্য লাভের নতুন দ্বার উন্মোচন করছে।
মৎস্য চাষীদের মতে, পাবদা মাছ অল্প সময়ে উচ্চ উৎপাদন দেয়, যা তাদের আগ্রহের মূল কারণ। সাদা মাছের তুলনায় পাবদা মাছ চাষে তিনগুণ বেশি ফলন পাওয়া যায় একই জমিতে, তবে সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন। মিশ্র চাষের মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়ছে, এবং একই জমিতে বছরে দুইবার পাবদা চাষ করা সম্ভব হওয়ায় কৃষকরা আরও লাভবান হচ্ছেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার খানপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা নাজমুল হুদা ২০১৮ সালে লেখাপড়া ছেড়ে ৬ বিঘা জমিতে পাবদা মাছ চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ৪টি খামারের মালিক এবং তার উৎপাদিত পাবদা মাছ দেশের পাশাপাশি ভারতের বাজারেও সুনাম অর্জন করেছে। প্রতি মণ মাছের দাম ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকায় পৌঁছেছে, যা তাকে উদ্যোক্তা হিসেবে সফল করে তুলেছে।
মাও. রেজাউল ইসলাম নামের আরেক সফল চাষী ১০ বিঘা জমিতে পাবদা চাষে ২০-২২ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন, এবং ৪-৫ মাস পর তার প্রত্যাশিত বিক্রয় মূল্য ৩৫-৪০ লক্ষ টাকা। এ ধরনের লাভজনক চাষের ফলে সাতক্ষীরার আরও চাষীরা পাবদা চাষে ঝুঁকছেন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য জিএম সেলিম এই প্রতিবেদককে জানান, সাতক্ষীরা উপকূলীয় জেলা হিসেবে মৎস্য সম্পদে একটি উদ্বৃত্ত জেলা। এ জেলায় ১ লক্ষ ৪৯ হাজার মেট্রিকটন চিংড়ি ও সাদা মাছ উৎপাদন হয়। এখানে চিংড়ি মাছের পাশাপাশি সাদা মাছের উৎপাদনও লক্ষনীয়। প্রায় ৬৫ হাজার মেট্রিকটন কার্প জাতীয় মাছ সাতক্ষীরা জেলায় উৎপাদন হচ্ছে। এখানে পাবদা ও তেলাপিয়া মাছের উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, ইদানিং সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলায় পাবদা মাছ বেশী উৎপাদন হচ্ছে কারণ এটা বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে এটি বেশী যাচ্ছে। রপ্তানী হওয়ার কারনে চাষীরা ও ভালো দাম পাচ্ছেন। প্রতি কেজি ৩’শ থেকে সাড়ে ৩ ’শ টাকা বিক্রি হচ্ছে। চাষীরা খুব স্বল্প সময়ে ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে লাভ তারা তাদের ঘরে তুলতে পারছেন। আর তাই লাভজনক হওয়ায় পাবদা মাছের চাষ সাতক্ষীরায় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশে রপ্তানী যোগ্য হওয়ায় মৎস্য অফিস থেকে চাষীদের পাবদা চাষে উদ্বুদ্ধসহ তাদের নানা পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে আরো জানান এ মৎস্য কর্মকর্তা।