উপকূলীয় এলাকায় আড়াই লাখ হেক্টরের বনভূমি রক্ষাসহ নতুন বনায়নে নেই উদ্যোগ

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-২৬ - ১০:৫৭

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপন কর্মসূচী গ্রহনকারী বিশে^র সর্বপ্রথম ‘উপকূলীয় চরাঞ্চলে সফল বনায়নকারী দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের উপকূলভাগে বনায়নের এখন কোন প্রকল্প বা কর্মসূচী নেই। গত এক দশকেরও বেশী সময় ধরে দেশের উপকূলভাগে বনায়নে নতুন প্রকল্পসহ বিদ্যমান বনভূমি সংরক্ষণেও কোন সমন্বিত উদ্যোগ নেই।
অথচ বন বিভাগের মতে, উপকূলীয় বনায়ন কার্যক্রম ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছাসের ক্ষতি হ্রাসসহ সামাজিক নিরাপত্তায়ও এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৬৪ সাল থেকে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনায়ন সম্প্রসারনের ফলে প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় একটি শক্তিশালী সবুজ বেষ্টনী গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি এ বনায়নের ফলে উপকূলীয় এলাকায় মৎস্য সম্পদেরও এক বিশাল মজুত গড়ে উঠেছে।
সরকার বঙ্গোসাগরের কোল ঘেষে দেশের ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় তটরেখার ১৯টি জেলার ৪৮টি উপজেলার ৪৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে ‘উপকূলীয় এলাকা’ হিসেবে চিহিৃত করেছে। যা দেশের মোট আয়তনের ৩০%। মোট জনসংখ্যার ২৮% মানুষ এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাস করে।
দেশের সুনীল অর্থনীতি গড়ার ক্ষেত্রে উপকূলীয় বনায়নের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবীদসহ পরিবেশবীদগনও। পাশাপাশি উপকূলভাগের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র সংরক্ষণসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ এবং ঝড় জলোচ্ছাস ও প্রকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায়ও উপকূলভাগে সৃজিত ম্যানগ্রোভ বা লবনাম্বুজ বনভূমি ‘প্রাকৃতিক ঢাল’এর ভূমিকা পালন করছে।
দেশে বর্তমানে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমান ১৬ লাখ হেক্টর হলেও উপকূলীয় এলাকায় ইতোপূর্বে সৃজিত বনভূমির পরিমান ছিল প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর।
কিন্তু ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ^ব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা ও সাহায্য সংস্থার অর্থায়ন ছাড়াও দেশের নিজস্ব সম্পদে যে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর উপকূলীয় বনভূমি গড়ে উঠছে, তার অন্তত ৩০ভাগ ইতোমধ্যে বিনষ্ট হয়েছে। প্রতিটি ঝড়ঝঞ্ঝায় উপকূলীয় বনভূমি প্রাকৃতিক ঢালের মত সব দূর্যোগ মোকাবেলা করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যক গাছপালা বিনষ্ট হলেও সে ক্ষতি পুরনের উদ্যোগও যোড়াল নয়। সাম্প্রতিককালে উপকূলীয় এলাকায় নতুন বন সৃজনে কোন প্রকল্প না থাকায় বিদ্যমান ও ক্ষতিগ্রস্থ বনভূমির স্থায়িত্ব ও টেকসই ধারা অব্যাহত থাকছে না।
বছর তিনেক আগে ভারত, ব্রাজিল ও মালয়েশিয়ার কয়েকজন গবেষক সুন্দরবনসহ বরিশাল অঞ্চলের উপকূলীয় বন বাগান পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তাদের গবেষণা ফলাফল আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘এলসেভিয়ায়ের এস্টুয়ারিন, কোস্টল এন্ড সেলফ সায়েন্স জর্নাল’এ প্রকাশিত হয়েছিল। ঐ গবেষনাপত্রে আম্পানসহ সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোতে বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের বনের ক্ষতি ৫৬.১৯ শতাংশ এলাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি আম্পানের কারণে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বা লবনাম্বুজ বনের সব অংশেরই অবনতিসহ ভাঙন দেখা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের উত্তরাঞ্চল সহ পাশর্^বর্তি ভারতে বৃষ্টির অভাবে উজান থেকে নদ-নদীর প্রবাহ আশংকাজনক ভাবে হ্রাসের ফলে সাগরের লবনাক্ত পানি উপকূল থেকে বরিশাল অতিক্রম করে চাঁদপুরের ভাটিতে মেঘনায় হিজলা পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকা ও এর নদ-নদীগুলোতে লবনাক্ততার মাত্রা অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় বেড়ে যাবার কারণেও বনের ক্ষতি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। আবার অনেক চরাঞ্চলে ক্রমাগত পলি পড়ে ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলেও গাছ পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না। ফলে তার টেকসই স্থায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পলি জমে উপকূলের নদী ও খাল ভরাট হবার কারণেও বনের ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
আবার নদী ভাঙনেও উপকূলীয় এলাকায় প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর বনভূমি বিলীন হয়েছে। উপকূলীয় বনায়নে আর্থিক সহায়তাকারী বিশ^ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ১৯৭৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩৭ বছরে দেশের উপকূলীয় এলাকায় ১৪৪ বর্গ কিলোমিটার বনভূমি হ্রাস পাবার কথা বলা হয়েছে। এমনকি সিডর ইয়াশ, বুলবুল ও আম্পানের ছোবলে দক্ষিণ উপকূলীয় কুয়াকাটা সংলগ্ন উপকূলীয় বনভূমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গত দুই দশকে কুয়াকাটা সংলগ্ন উপক’লীয় বনাঞ্চলের প্রায় ৬৪ ভাগ বনভূমি সাগরের ঢেউ সহ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলেও জনাগেছে। কুয়াকাটা ইকোপার্ক, নারকেল বাগান ও ঝাউ বাগান সহ লবানাম্বুজ বনের বেশীরভাগ এলাকাই বিলীন হয়েছে।
দেশের উপকূলভাগে এ পর্যন্ত প্রায় ২লাখ হেক্টরে লবনাম্বুজ বন, সাড়ে ৮ হাজার হেক্টরে মূল ভূমির নন-ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বন, প্রায় ৩ হাজার হেক্টরে গোলপাতা, ২শ’ হেক্টরে বাঁশ ছাড়াও কয়েকশ হেক্টরে নারকেলসহ বিভিন্ন ধরনের বনায়ন করা হয়েছে। এছাড়াও প্রায় ১২ হাজার কিলোমিটার উপকুলীয় বাঁধসহ বিভিন্ন ধরনের রাস্তার ধারে ১ লাখ ২০ হাজার বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগান হয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব বনভ’মির কারণে দেশের বিশাল উপকুলীয় এলাকায় ইতোমধ্যে অনেক ভূমি উদ্ধারও সম্ভব হয়েছে। অনেক চরাঞ্চল মূল ভুখন্ডের সাথেও যুক্ত হয়েছে ইতোমধ্যে। তবে পরিবশেবিদদের মতে ভু-খন্ড উদ্ধারের চেয়েও এসব সৃজিত বনভুমি সবচেয়ে বেশী ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঝড়-জলোচ্ছাসের হাত থেকে উপকুলভাগকে রক্ষায়।
কিন্তু সারাদেশে বনায়ন নিয়ে ব্যপক কার্যক্রম শুরু হলেও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় সমন্বিত বনায়নের তেমন কোন উদ্যোগ বর্তমানে নেই। গত প্রায় এক দশক ধরে উপকূলীয় বনায়নে কোন প্রকল্প গ্রহন করা হয়নি। বর্তমান সরকার আগামী ৫ বছরে যে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপনের কর্মসূচী গ্রহন করেছে, সেখান থেকে ঠিক কত গাছ উপকূলীয় এলাকায় রোপন করা হবে, তাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না বন অধিদপ্তর। অথচ একটি শক্তিশালী ও টেকসই উপকূলীয় ব্যবস্থাপনার ওপরই দেশের বিশাল উপকূলভগে প্রায় কোটি মানুষের জানমালসহ সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত।
বিষয়টি নিয়ে বন অধিদপ্তরের কোস্টাল সার্কেলের বন সংরক্ষকের সাথে আলাপ করা হলে তিনি উপকূলভগে নতুন করে বনায়নের কোন কর্মসূচীর কথা বলতে পারেননি। তবে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপনের যে কর্মসূচী গ্রহন করা হয়েছে, তারমধ্যে বন অধিদপ্তর যে সাড়ে ৩ কোটি গাছ লাগাবে, সেখান থেকে একটি অংশ উপকূলীয় অঞ্চলেও রোপন করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তবে কত হেক্টরে কি পরিমান গাছ লাগান হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারেননি উপকূলীয় বন সংরক্ষক।আমরা প্রায়শই নদী কিংবা সমুদ্রের তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকাগুলোকে বছরের বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, টর্নেডোসহ নানারকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে দেখি। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার বাড়িঘর, আশেপাশের ফসল ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয় উপকূলীয় বনাঞ্চল।
আমরা সবাই জানি, একটি দেশের আয়তনের তুলনায় ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান বনভূমির পরিমাণ দেশের আয়তনের প্রায় ১৫.৫৮ শতাংশ। বন অধিদপ্তরের ২০১৮-২০১৯-এর হালনাগাদ তথ্যানুসারে সরকার নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ২৫,৭৫,১৯৬.০১ হেক্টর (গেজেট বিজ্ঞপ্তি অনুসারে) —যা দেশের মোট আয়তনের তুলনায় ১৭.৪৫ শতাংশ। তবে বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১৮,৮০,৪৯৩.৭৩ হেক্টর— যা দেশের মোট আয়তনের তুলনায় ১২.৭৪৩ শতাংশ। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু তারতম্যের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বনাঞ্চল রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম—পাহাড়ি বন, প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন, সৃজিত উপকূলীয় বন, শালবন, জলাভূমির বন ইত্যাদি। দেশের জলবায়ু, উপকূলীয় এলাকা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব বনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তন্মধ্যে সৃজিত উপকূলীয় বন ও প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকাগুলোর বেষ্টনি হিসেবে কাজ করে।
দেখা যায়, গভীর নদী বা সমুদ্র উপকূলের রয়েছে প্রবল ঢেউ। ঢেউগুলো এতই প্রবল হয় যে, চারপাশে এলাকায় গিয়ে আছড়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে জলোচ্ছ্বাসের আকার ধারণ করে। ফলে উপকূলের আশেপাশের বনে আঘাত হানে। বনের বৃক্ষগুলোর শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রেখে ভাঙন রোধ করে। ফলে ভাঙন বেশি বিস্তৃতি লাভ করে উপকূলের জনপদে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এসব বন না থাকলে উপকূলবর্তীয় জনপদে সময়ে-অসময়ে নেমে আসত চরম দুর্ভোগ।
উপকূলীয় এলাকায় নদীভাঙন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বছরের বিভিন্ন সময়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় লাখ লাখ হেক্টর জমি।
বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষাকালে উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাতের দরুণ নদীর পানি বেড়ে যায় এবং তা প্রচন্ড গতিতে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। এসময় উপকূলীয় অঞ্চলের নদীসংলগ্ন স্থলভাগে পানির তীব্র তোড়ে সৃষ্টি হয় নদীভাঙনের। বাংলাদেশে এটা স্বাভাবিক চিত্র হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় তা আর স্বাভাবিক বলে পরিগণিত হচ্ছে না।
প্রতিবছর প্রায় ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ হেক্টর জমি নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙনের ফলে প্রতি বছর প্রায় এক লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীভাঙনের ফলে এদেশে প্রতিবছর ২৫ কোটি ডলার ক্ষতি হয়। এক্ষেত্রে ভোলা জেলাকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক। বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (ঈঊ‌েওঝ) উপগ্রহের মাধ্যমে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে, ১৯৭৩-২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভোলার মূল ভূভাগ থেকে ২৪০ বর্গ কিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় ভোলার উত্তর-পূর্ব দিকে ভাঙনের প্রবণতা বেশি। তবে নদীভাঙনের সাথে সাথে চরও জেগে উঠে যা ভাঙনের তুলনায় যত্সামান্য।
তাই আমাদের বেশি করে উপকূলবর্তী এলাকায় বিশেষ করে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় সৃজিত উপকূলীয় বনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। জেগে উঠা চরে বেশি বেশি বন সৃজন করে চরভূমিকে স্থিতিশীল ও দৃঢ় করে কৃষি কাজসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। পশ্চিম উপকূলীয় ৩টি জেলা—খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় অবস্থিত পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। কারণ এই বন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা হতে উপকূলীয় এলাকা তথা সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলকে রক্ষা করে। বন অধিদপ্তরকেও এক্ষেত্রে উপকূলীয় এলাকার গতিশীলতা আনয়নে বন, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ও বন সম্পসারণে এগিয়ে আসতে হবে।আমরা প্রায়শই নদীর তীরবর্তী কিংবা সমুদ্রের তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকাগুলোকে বছরের বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন, টর্নেডোসহ নানারকম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে দেখি। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার বাড়িঘর, আশেপাশের ফসল ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয় উপকূলীয় বনগুলো।
আমরা সবাই জানি, একটি দেশের আয়তনের তুলনায় ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান বনভূমির পরিমাণ দেশের আয়তনের প্রায় ১৫.৫৮%। বন অধিদপ্তরে রক্ষিত ২০১৮-২০১৯ এর হালনাগাদ তথ্যানুসারে সরকার নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ২৫,৭৫,১৯৬.০১ হেক্টর(গেজেট বিজ্ঞপ্তি অনুসারে) যা দেশের মোট আয়তনের তুলনায় ১৭.৪৫%। তবে বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১৮,৮০,৪৯৩.৭৩ হেক্টর(গেজেট বিজ্ঞপ্তি অনুসারে) যা দেশের মোট আয়তনের তুলনায় ১২.৭৪৩%। ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ু তারতম্যের কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের বনাঞ্চল রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম-পাহাড়ি বন, প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন, সৃজিত উপকূলীয় বন, শালবন, জলাভূমির বন ইত্যাদি। দেশের জলবায়ু, উপকূলীয় এলাকা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এসব বনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তন্মধ্যে সৃজিত উপকূলীয় বন ও প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকাগুলোর বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে।
দেখা যায়, গভীর নদী বা সমুদ্র উপকূলের রয়েছে প্রবল ঢেউ। ঢেউগুলো এতই প্রবল হয় যে, চারপাশে এলাকায় গিয়ে আছড়ে পড়ে। অনেক সময় দেখা যায়, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে জলোচ্ছ্বাসের আকার ধারণ করে। ফলে উপকূলের আশেপাশের বনে আঘাত হানে। বনের বৃক্ষগুলোর শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রেখে ভাঙ্গন রোধ করে। ফলে ভাঙ্গন বেশি বিস্তৃতি লাভ করে উপকূলের জনপদে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এসব বন না থাকলে উপকূলবর্তী এলাকার জনপদে সময়ে-অসময়ে নেমে আসত চরম দুর্ভোগ।
উপকূলীয় এলাকায় নদীভাঙ্গন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বছরের বিভিন্ন সময়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় লাখ লাখ হেক্টর জমি। বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষাকালে উজানে প্রচুর বৃষ্টিপাতের দরুণ নদীর পানি বেড়ে যায় এবং তা প্রচন্ড গতিতে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়। এসময় উপকূলীয় অঞ্চলের নদীসংলগ্ন স্থলভাগে পানির তীব্র তোড়ে সৃষ্টি হয় নদীভাঙনের। বাংলাদেশে এটা স্বাভাবিক চিত্র হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় তা আর স্বাভাবিক বলে পরিগণিত হচ্ছে না।
প্রতিবছর প্রায় ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ হেক্টর জমি নদীভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে। এই ভাঙনের ফলে প্রতি বছর প্রায় এক লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীভাঙনের ফলে এদেশে প্রতিবছর ২৫ কোটি ডলার ক্ষতি হয়।
এক্ষেত্রে ভোলা জেলাকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক। বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (CEGIS) উপগ্রহের মাধ্যমে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে যে, ১৯৭৩-২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভোলার মূল ভূভাগ থেকে ২৪০ বর্গ কিলোমিটার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা যায় ভোলার উত্তর-পূর্ব দিকে ভাঙনের প্রবণতা বেশি। তবে নদীভাঙ্গনের সাথে সাথে চরও জেগে উঠে যা ভাঙ্গনের তুলনায় যৎসামান্য।
তাই আমাদের বেশি করে উপকূলবর্তী এলাকায় বিশেষ করে নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্রগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় সৃজিত উপকূলীয় বনের পরিমাণ বাড়াতে হবে। জেগে উঠা চরে বেশি বেশি বন সৃজন করে চরভূমিকে স্থিতিশীল ও দৃঢ় করে কৃষি কাজসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। পশ্চিম উপকূলীয় ৩টি জেলা- খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় অবস্থিত পৃথিবীর একক বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। কারণ এই বন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা হতে উপকূলীয় এলাকা তথা সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলকে রক্ষা করে। বন অধিদপ্তরকেও এক্ষেত্রে উপকূলীয় এলাকার গতিশীলতা আনয়নে বন, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ও বন সম্পসারণে এগিয়ে আসতে পারে।পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় বনের গুরুত্ব অপরিসীম। বনভূমিতে গাছ থাকলেই নিরাপদ থাকবে পরিবেশ। অক্সিজেন বৃদ্ধির পাশাপাশি সবুজ বন পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। বন ও বনভূমির রক্ষার্থে ২১ মার্চ আন্তর্জাতিক বন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। দিবসটি উদযাপন করা হয় মূলত বন ও জঙ্গলযুক্ত এলাকা রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনগণকে বন, বনজ দ্রব্য ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য। তাই সব ধরনের বনের গুরুত্ব ও তা টিকিয়ে রাখতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দিবসটি পালনের মূল লক্ষ্য।
১৯৭১ সালে ইউরোপীয় কনফেডারেশন অব এগ্রিকালচারের ২৩তম সাধারণ পরিষদে বিশ্ব বনায়ন দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বন দিবস প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দুটি আন্তর্জাতিক স্মারক বিশ্ব বনায়ন দিবস এবং আন্তর্জাতিক বন দিবসকে একত্রিত করে প্রতি বছর ২১ মার্চ দিবসটিকে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।
মানুষের জন্য বৃক্ষ বিশুদ্ধ বাতাস নানা রকম ফল ও উপকরণ সরবরাহ করে। বন শুধু আমাদের অক্সিজেনই সরবরাহ করে না। মানুষ, প্রাণী, পোকামাকড়, বন্য প্রাণীকে আশ্রয় দেয় এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ও আর্দ্রতার ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে, অক্সিজেন সরবরাহ করতে, পর্যটনশিল্প বিকাশে ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বনভূমি। দারিদ্র্য বিমোচনে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের মতে, একটি বনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ গাছ থাকে। একজন মানুষের শ্বাস নিতে বছরে ৭৪০ কেজি অক্সিজেন প্রয়োজন। গড়ে একটি গাছ বছরে একশ কেজি পর্যন্ত অক্সিজেন দেয়। ফলে মানুষের বেঁচে থাকা আর পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার কাজ করছে বনাঞ্চল।
পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ গাছের প্রজাতি পাওয়া যায় বনে। এ ছাড়া প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মানুষ বনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জীবিকা, বস্ত্র এবং ওষুধসহ মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিস গাছের থেকেই পাওয়া যায়। আমাদের দেশজ উৎপাদনে বনজ সম্পদের অবদান ১.৬৬ শতাংশ এবং কৃষিখাতে এর অবদান ১৩.২৪ শতাংশ। এ ছাড়াও সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো ঘন গাছে ঘেরা বন অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। ঘন বনের
গাছগুলো জলকে বিশুদ্ধ রাখে, বায়ুদূষণ মুক্ত করে, জলবায়ু অপরিবর্তিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড সঞ্চয় করে এবং খাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহ করে। পাশাপাশি বন মানুষকে প্রচুর পরিমাণে কর্মসংস্থান এবং ব্যবসার জোগান দেয়।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যেখানে কোনো দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন সেখানে বেশিরভাগ দেশই তা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের বন বিভাগের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বন আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির পরিমাণ ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এর আগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী যা ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। এই হিসাবে বনের বাইরের গাছ আমলে নেওয়া হয়নি। কিন্তু বন বিভাগের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বনের বাইরে গাছের পরিমাণ মোট ভূমির ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। সেই হিসাবে বনের ভেতর ও বাইরে বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকার পরিমাণ মোট ভূমির সাড়ে ২২ শতাংশ। এসব গাছের বেশিরভাগই বেড়ে উঠেছে মূলত সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে।
উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে তিন ধরনের বনভূমি আছে। ক্রান্তীয় চিরহরিৎ ও পত্রপতনশীল বনভূমি, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে রয়েছে এই বনভূমি। চাপালিস, গর্জন, গামারি, জারুল, কড়ই প্রভৃতি হলো এ বনভূমির প্রধান বৃক্ষ। শালবন, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইলের মধুপুরে এ বনভূমি অবস্থিত। এ ছাড়া রংপুর ও দিনাজপুরেও সামান্য পরিমাণে বনভূমি রয়েছে। এ বনাঞ্চলের প্রধান বৃক্ষ শাল, এ ছাড়া ছাতিম, কড়ই ও হিজলও আছে। ম্যানগ্রোভ বনভূমি, বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলায় এই বনভূমি অবস্থিত। সুন্দরবন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। এই বনের প্রধান বৃক্ষ হলো সুন্দরী।
আমাদের জীবন ও জীবিকার জন্য বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বৃক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অস্তিত্বের সম্পর্ক। বৃক্ষ সমস্ত প্রাণীর খাদ্য জোগান দেয়। বিশাল এ প্রাণিজগৎকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অক্সিজেন দেয় এবং প্রাণিজগৎকে বিপন্নকারী কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। বৃক্ষ তার সুবিশাল শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে তপ্ত পৃথিবীকে শীতল করে। বন্যা, খরা, ঝড় নিয়ন্ত্রণ করে বৃক্ষ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। আবহাওয়া ও জলবায়ূকে নাতিশীতোষ্ণ রাখে। মাটিকে উর্বর করে তোলে। গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া রোধ করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে বৃক্ষ। আমাদের জীবনযাপনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আসবাবপত্র, জ্বালানি কাঠ, গৃহনির্মাণে যে বিপুল পরিমাণ কাঠ প্রয়োজন হয় তা আসে এই বৃক্ষ থেকে। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ও জীবন রক্ষাকারী ভেষজ বিভিন্ন ওষুধের মূল্যবান উপাদান আমরা বৃক্ষ থেকে পাই।
মানুষের কুঠারের আঘাতে বন দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বৃক্ষ মানুষের এত উপকারে আসে তারপরও নিধন চলছে। দ্রুত শহরায়ন, শিল্পায়ন, আসবাবপত্র তৈরি, শিল্পের কাঁচা মাল তৈরি, জ্বালানী কাঁঠের সরবরাহ ইত্যাদি অজুহাতে বনাভূমি উজাড় হচ্ছে। এটি মানুষের আত্মঘাতী কর্ম। গাছ কমে যাওয়ায় প্রকৃতির ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে। কার্বন-ডাই-অক্সসাইড, কার্বন-মনো-অক্সসাইড, লিথেন সহ প্রভৃতি ক্ষতিকর গ্যাসের প্রভাবে বায়ুমন্ডল দূষিত হচ্ছে।
দেশের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্য বনভূমি ও বনজ সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বনভূমির পরিমাণ অত্যন্ত কম। অবাধে বৃক্ষ নিধনের ফলে আমাদের বনভূমি সংকুচিত হয়ে এসেছে। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক ও অন্যান্য প্রয়োজনে এই বনভূমি ও বনজসম্পদের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন রোধ করতে হবে। মূল্যবান বৃক্ষসমূহ সরকারি অনুমতি ছাড়া নিধন করা নিষিদ্ধ করতে হবে। আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বৃক্ষরোপণের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপন করে বনাঞ্চল তৈরি করা এবং জীবন ও জীবিকার তাগিদে আমাদেরকে বনভূমির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করতে হবে। শুধুমাত্র সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়েই নয় বরং ব্যক্তিগতভাবেও উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।সামাজিক বনায়ন মূলত জনসাধারণ, বিশেষ করে পল্লীর জনগণ এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক, বাস্তুসংস্থানিক ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত বনায়ন। সামাজিক বনায়নের লক্ষ্য কেবল গাছ নয়, গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীও। এ ধরনের সহায়তার লক্ষ্য শুধু গাছ লাগানো ও সেসব গাছের যত্ন নেওয়ার জন্য নয়, বরং গাছ রোপণকারীরা যাতে লাগানো গাছের সুফল পাওয়ার আগ পর্যন্ত সসম্মানে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে তারও নিশ্চয়তা বিধান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রদত্ত সামাজিক বনায়নের সংজ্ঞা হচ্ছে, বনায়ন কার্যক্রমে জনগণকে সরাসরি সম্পৃক্তকরণের যেকোনো পরিস্থিতি।
শিল্পভিত্তিক বৃহদায়তন বনায়ন এবং কেবল কর্মসংস্থান ও মজুরিভিত্তিক উন্নয়ন সহায়ক অন্যান্য ধরনের বনায়ন সামাজিক বনায়ন নয়, বরং গোষ্ঠীভিত্তিক বনায়নে উৎসাহ ও সহায়তা প্রদানকল্পে বনশিল্প ও সরকারি প্রচেষ্টায় পরিচালিত কর্মকাণ্ড সামাজিক বনায়নের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়নের ইতিহাস প্রাতিষ্ঠানিক বন সম্প্রসারণ কার্যক্রম প্রবর্তনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬২-৬৩ সালে রাজশাহী ও ঢাকায় বন সম্প্রসারণ বিভাগ গঠন এবং ১ জুনকে বৃক্ষরোপণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চারাগাছ উৎপাদন ও বিতরণের জন্য বন সম্প্রসারণ বিভাগ সৃষ্টির পর থেকেই বনায়ন কার্যক্রমের প্রসার ঘটতে থাকে। এই বনায়ন কর্মকাণ্ড অবশ্য জেলা সদর ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নার্সারি স্থাপন ও আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
বৃক্ষরোপণ অভিযান প্রথমদিকে একদিনের জন্য শুরু হলেও পরে তা এক সপ্তাহ, এক মাস এবং সর্বশেষ তিন মাসে বৃদ্ধি পায়। কর্মসূচি শুরুতে খুবই সীমিত ছিল এবং তা জনগণের ওপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। এটি সম্প্রসারণ কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গির বা জনগণের মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। ফলে ভূমিহীন জনগণকে বনায়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করেন কয়েকজন উদ্যোক্তা। তারা চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত বেতাগী ও পামোরা নামের দুটি বিরান পাহাড়ে এ প্রকল্প গ্রহণ করেন। এজন্য ১০১টি পরিবার বাছাই করে তাদের সেখানে জমি দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি ছিল স্বনির্ভর ধরনের। এসব কৃষক বাইরের কোনো অনুদান পেতেন না।
কৃষি ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীদের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ ও ঋণ আদায়ের শর্তে ঋণ বিতরণ করত। এ কার্যক্রম দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে মূল্যায়ন করা হয় এবং সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া যায়। তবে নির্বাচিত ১০১টি পরিবারের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে ৮৩টিতে দাঁড়ায়। এই প্রকল্পলব্ধ অভিজ্ঞতা আরো কর্মসূচি প্রণয়নে যথেষ্ট সহায়তা করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থসাহায্যে গৃহীত গোষ্ঠী বনায়ন প্রকল্প থেকেই মূলত সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির শুরু। এজন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এক কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ মঞ্জুর করে। এ ছাড়া জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মাধ্যমে কারিগরি সাহায্য হিসেবে ২০ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়।
উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের সাতটি বৃহত্তর জেলা দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও যশোরে এই প্রকল্প কার্যক্রম ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত চলে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি কাঠ, গবাদি পশুর খাদ্য, ছোটখাটো কাঠ, ফল ও অন্যান্য উৎপন্ন দ্রব্যের সরবরাহ বৃদ্ধি। গোষ্ঠীভিত্তিক বনায়ন প্রকল্পের সফলতার পরিপ্রেক্ষিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থানা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন ।