সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : এক সময় সুন্দরবনের নদী-খাল আর গভীর বনভূমিই ছিল উপকূলীয় মানুষের জীবনের প্রধান অবলম্বন। মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে হাজারো বনজীবী জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বর্তমানে দস্যু আতঙ্ক, অপহরণ, মুক্তিপণ ও নির্যাতনের ভয় সুন্দরবনের সেই চিরচেনা জীবনের ছন্দ ভেঙে দিয়েছে। জীবন বাঁচাতে এখন পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন বননির্ভর মানুষজন।
গত এক বছরের বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলে বনদস্যুদের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। দস্যুদের ভয়ে অনেক বনজীবী বনে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়ছেন, আবার কেউ দিনমজুরি, ইটভাটা কিংবা সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরে সুন্দরবনের গা ঘেঁষা অবস্থিত একটি দ্বীপ ইউনিয়ন, যার নাম গাবুরা। ইউনিয়নটির চার পাশ নদীবেষ্টিত। এখানের অধিবাসী অধিকাংশই অসহায় ও হতদরিদ্র। জীবন-জীবিকার তাগিতে সকালবেলায় ডিঙ্গি নিয়ে ছুটতে হয় সুন্দরবনের দিকে। ইউনিয়নের ৭০ শতাংশ নর-নারী সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বন্যপ্রাণীর হামলার শিকার হয়ে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়ালির মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য ইউনিয়ন থেকে অনেক গুণ বেশি।
এদিকে বাঘের আক্রমণে স্বামী মারা যাওয়ার পর অনেক নারীর ঠাঁই হয়নি শ্বশুরবাড়িতে। সন্তান প্রতিপালন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সমস্যা নিয়ে দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে এসব ভাগ্যহত নারী। তাদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শিখানোর কোনো সুযোগ নেই। তাদের সন্তানরা মায়ের সঙ্গে নদনদীতে যায় মাছ ধরতে।
ডুমুরিয়া গ্রামের আবু কাওছার ও রফিকুল ইসলাম জানান, গাবুরার উপকূলীয় হতদরিদ্র জেলে বাওয়ালি ও মৌয়ালরা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বাপ, দাদা ও পূর্বপূরুষদের একমাত্র পেশা ছিল সুন্দরবন। তবে এখন সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল যেন এক ধরনের বিপদ। বনে বাঘ, জলে কুমির আর ডাঙ্গায় বনদস্যুদের নির্যাতনের শিকার হয়ে আর কেউ বনে যেতে চায় না।
এছাড়া মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুমের কারণে দীর্ঘ পাঁচ মাস সুন্দরবনে প্রবেশে পাশ পারমিট বন্ধ থাকায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হয় জেলে বাওয়ালিদের। কাজের সন্ধানে অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ইটভাটাসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থানের খোঁজে চলে যাচ্ছেন। জেলে বাওয়ালিরা সরকারের কাছে বিকল্প কর্মসংস্থান চান।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক বলেন, সুন্দরবনের ওপর চাপ কমাতে এতদাঞ্চলের বন নির্ভরশীল ব্যক্তিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এনজিও সংস্থাগুলো। আর বিধবা নারীদের ভাতা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান, এনজিও সংস্থা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সমন্বয়ে কাজ চলছে।
তিনি জানান, সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহতদের তালিকা পেলে সরকারিভাবে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। সচেতন মহলের অভিমত, বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে এলাকার মানুষ উপকৃত হবে। একই সঙ্গে নদনদী ও সুন্দরবনের ওপর বনজীবীদের চাপ কমলে সুন্দরবনও রক্ষা পাবে।
কয়রার জেলে রায়হান শেখ ছোটবেলা থেকেই সুন্দরবনে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন তিনি ঢাকার একটি কারখানায় শ্রমিক। মুঠোফোনে কথা হলে রায়হান বলেন,
জীবনের অর্ধেক সময় বনে কাটিয়েছি। কিন্তু এখন বনে গেলে জীবিত ফিরব কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। দস্যুদের হাতে পড়লে টাকা দিতে হয়, না দিলে মারধর। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হয়ে ঢাকা চলে এসেছি।
একই বাস্তবতার মুখোমুখি বনজীবী সাফিদুল ইসলাম। সম্প্রতি কয়রা বাসস্ট্যান্ডে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় তাকে। তিনি বলেন,
বনদস্যুদের মুক্তিপণ দিয়ে যা আয় হয়, তাতে সংসার চলে না। তাই নড়াইলে ধান কাটার দিনমজুরি কাজে যাচ্ছি।
আরেক বনজীবী আব্দুল জলিল (ছদ্মনাম) বলেন,বনে গেলে দস্যুরা বন্দুক ঠেকিয়ে টাকা চায়। না দিলে বেধড়ক মারধর করে, অপহরণ করে। একবার মুক্তিপণ দিতে হয়েছে। এরপর আর বনে যাই না। এখন ইটভাটায় কাজ করি।
বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দস্যুদের হাতে পড়লে শুধু টাকা হারানোর ঝুঁকিই নয়, জীবন নিয়ে ফেরার নিশ্চয়তাও থাকে না।সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়ে বনদস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে আটক হন বনজীবী আ. সালাম ও আকবর আলী। তারা দুজনই ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর, কয়রা ,দাকপ, রামপাল ,মংলা এই সমস্ত এলাকার অধিকাংশ মানুষ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল কিন্তু বর্তমান বনদস্যুদের দাপট এত পরিমান বেড়ে গেছে? বনজীবীরা সুন্দরবনে যেতে অপারগতা প্রকাশ করছে। অন্ততপক্ষে ২০টি বনদস্যুবাহিনী সুন্দরবন পূর্ব পশ্চিমে সক্রিয়ভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। একজন বনজীবীকে অপহরণ করতে পারলে তাদের মুক্তিপণ ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। তাহলে ২০টি বনদস্যবাহিনীর মন জোগানোর মত সক্ষম বনোজিবিদের নেই ।সে কারণে তারা সুন্দরবনের পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যেতে চাই এবং অন্য পেশার জন্য সরকারের কাছেও সহতা প্রার্থনা করছে।
বনজীবীদের অভিযোগ, আত্মসমর্পণকারী একাধিক দস্যু বাহিনী আবারও দস্যুতায় ফিরে এসেছে। বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবনে মজনু বাহিনী, শরীফ বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবিউল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মঞ্জু বাহিনী ও মাসুম বিল্লাহ ভাগনে বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় সেই ঘোষণা আজ প্রশ্নের মুখে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন,
“সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখা শুধু বন বিভাগের একার পক্ষে সম্ভব নয়। র্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান জোরদার করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দস্যু আতঙ্ক দীর্ঘস্থায়ী হলে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন ও জীবিকা আরও সংকটে পড়বে। বন ছাড়ার ফলে বাড়বে বেকারত্ব, সামাজিক ঝুঁকি ও শহরমুখী জনস্রোত।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু বনজীবী নয়, পুরো উপকূলীয় অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে—এমনটাই আশঙ্কা স্থানীয়দের।