ঋণের জালে বন্দি উপকূলের জীবন: জলদস্যুর আতঙ্ক মাথায় নিয়েই সাগরে ছুটছেন জেলেরা

প্রকাশঃ ২০২৬-১০-২৯ - ১৭:৫৩
পাইকগাছা প্রতিনিধি : তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, দাদন ব্যবসায়ীদের চড়া সুদের ঋণের বোঝা এবং জীবনের চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলরাশি ও ঐতিহ্যবাহী দুবলার চরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। শীতকালীন শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের জেলেপল্লীগুলোতে এখন চরম ব্যস্ততা ও কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। দাদনের জালে বন্দি উপকূলের জীবন- উপজেলার বোয়ালীয়া, মাহমুদকাঠি, হিতামপুর, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, রামনাথপুর ও কাঠিপাড়া গ্রামের কয়েকশ পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের সঙ্গে জড়িত। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং জীবিকার অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় জেলেরা সুন্দরবন ও সমুদ্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিল শর্তের বেড়াজালে তা না পেয়ে জেলেরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজন ও দাদনদারদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন। নৌকা মেরামত, নতুন জাল কেনা এবং খাদ্য ও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এই দাদনের টাকা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। মৌসুম শেষে কাঙ্ক্ষিত মাছ বিক্রি করে এই ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাদের জীবন চরম বিপাকে পড়ে। বোয়ালিয়া গ্রামের জেলে অশোক বিশ্বাস, সীতেনাথ বিশ্বাস, মহাদেব বিশ্বাস (৫৬) রা জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি সাগরে মাছ শিকার করছেন। এবারও সাগরে নামার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, “দিন দিন সাগরে মাছ কমছে। আগে ছুরি, ভেটকি, লবঙ্গা, চিংড়ি, কাঁকড়া, রূপচান্দা, বাটা, বাচা, চন্দনা, খল্লা, চেলা, টুরাসসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ পেতাম; কিন্তু দিন দিন এসব মাছের সংখ্যা কমছে।” মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার জন্য পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন জেলেপল্লীর ১৯৫০ জন জেলে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন এবং তারা খাদ্য সহায়তা পান। শিবসা ও পশুর নদী হয়ে জেলেরা প্রথমে মোংলায় সমবেত হন। এরপর নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে পাস-পারমিট নিয়ে সুন্দরবনের দুবলার চর, আলোর কোলসহ বঙ্গোপসাগরের গভীর অংশে অস্থায়ী জেলেপল্লী তৈরি করে মাছ ও শুঁটকি আহরণে নিয়োজিত হন। জলদস্যু ও ভিনদেশি ট্রলারের আগ্রাসনে আতঙ্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলেদের জীবনে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত তাদের মুখোমুখি হতে হয় নানা হুমকির। বোয়ালিয়া গ্রামের জেলে শঙ্কর কুমার বিশ্বাস (৫৫) বলেন, “১৯৮৮ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিদুর্যোগে দুবলার চরে বাবা-দাদা-সহ পরিজন হারিয়েছি। সেই দুর্যোগের কথা মনে হলে আজও শিউরে উঠি, কিন্তু তার পরও সাগরে যাচ্ছি। এবার চারটি নৌকায় প্রায় পাঁচ ভাইসহ ২৯ জন সাগরে যাচ্ছেন। এতে প্রায় ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। ধারদেনা করে এটা তুলে আনা ঝুঁকির হলেও পেটের দায়ে যেতে হচ্ছে।” উপকূলের জেলেরা জানান, সাগরে আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকিং বা উন্নত রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব থাকায় হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা নিম্নচাপের সময় তারা সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে পারেন না। এর ওপর জলদস্যুদের আতঙ্ক, ভারতীয় বা বিদেশি বড় ট্রলারের আগ্রাসন এবং সাগরে মাছ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বহরের নৌকায় এক লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা চুক্তিতে পাঁচ মাসের জন্য সাগরে যেতে হয়, যেখানে জীবন সবসময়হাতের মুঠোয় থাকে। ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ও আকুতি‌ পরিবার ও পেটের টানে বুকভাঙ্গা কষ্ট আর অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে জেলেরা জাল, নৌকা ও ট্রলার প্রস্তুত করে সাগরে পাড়ি জমাচ্ছেন। মাহমুদকাঠি গ্রামের মঙ্গল বিশ্বাস, মোংলার মো. ইয়াসিন ও নৌকার মালিক প্রদীপ বিশ্বাস আক্ষেপ করে জানান, “সাগরে আয় দিন দিন অনেক কমেছে। জেলেদের বেঁচে থাকা খুব কঠিন।” ভবিষ্যতে উপকূলীয় এসব জেলের জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।