করোনাভাইরাসের উপসর্গ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও পরামর্শ

ইউনিক ডেস্ক : বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। এরইমধ্যে তিন হাজার ছাড়িয়েছে মৃতের সংখ্যা। আর, সারা বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৯০ হাজার।

এই সংক্রমণটি শুরু হয়েছিলো এ বছরের শুরুর দিকে চীনের উহান শহরে। যা নতুন করোনাভাইরাস হিসেবে পরিচিত। এখন পর্যন্ত ৬০টি দেশের লোকজনের মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এতে হয়তো আরো অনেকেই আক্রান্ত হতে পারেন। এত দ্রুত গতিতে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার কারণে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

এই প্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের উপর ভিত্তি করে পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড ও ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএস লোকজনকে কিছু পরামর্শ দিয়েছে যে কী হলে কী করতে হবে।

করোনাভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ঠিক কীভাবে ছড়ায় সেটি এখনও নিশ্চিত করে জানা যায়নি। তবে এই একই রকমের ভাইরাস সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি ও কাশির সময় তার নাক ও মুখ দিয়ে যা নির্গত হয় (জলীয় পদার্থের কণা বা ড্রপলেট) তার মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। তাই হাঁচি ও কাশির সময় এমন কিছু করতে হবে, যার ফলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।

এনএইচএসের পরামর্শগুলো হলো:

  • নিয়মিত ও বারবার হাত ধুতে হবে। হাঁচি ও কাশি দিলে টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে। একই সঙ্গে হাত পরিষ্কার না হলে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করা যাবে না।
  • যদি ডাক্তাররা প্রচুর লোক সমাগম হয় এরকম জায়গা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন, তাহলে সেটা অনুসরণ করতে হবে।
  • পার্সেল, প্যাকেট, চিঠি অথবা খাদ্যের মাধ্যমে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে এখনও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাসের মতো ভাইরাস শরীরের বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারে না।

যুক্তরাজ্যে মেডিকেল কর্মকর্তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মাত্রা বৃদ্ধি করেছেন। তবে এনএইচএস বলছে, এই ঝুঁকি এখনও কম। তবে কিছু কিছু দেশ আছে যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। এ কারণে সেসব দেশে ভ্রমণ করার বিষয়ে একদিকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে সেসব দেশ থেকে যারা এসেছেন তাদের ওপরেও সতর্ক নজর রাখতে বলা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে চীন, ইতালি ও ইরান।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনাভাইরাসে মৃত্যুর হার খুব কম। আক্রান্তদের এক থেকে দুই শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়াও যারা মারা গেছে তাদের বেশিরভাগই বয়স্ক অথবা তারা আগে থেকেই অন্য কোনো অসুখে ভুগছিলো। তবে ভাইরাসটি যেহেতু এখনও তার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে তাই নিশ্চিত করে এর পরিণতি সম্পর্কে বলা যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো সংক্রমণ ধরাই পড়ে না। সে কারণে এসব পরিসংখ্যান এখনও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।

নতুন এই করোনাভাইরাসে, যার নামকরণ করা হয়েছে কোভিড-১৯, আক্রান্ত হলে প্রথমে জ্বর আসে, তার পর দেখা দেয় শুষ্ক কাশি এবং সপ্তাহখানেক পর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তবে এসব উপসর্গ দেখা দিলেই নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে আপনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। কারণ এসব উপসর্গের সঙ্গে অন্যান্য ভাইরাসের উপসর্গেরও মিল রয়েছে। যেমন: ঠাণ্ডা ও সর্দি-কাশির মতো ফ্লু। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ তীব্র হলে নিউমোনিয়া হতে পারে, দেখা দিতে পারে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা, কিডনি অচল হয়ে যেতে পারে, এমনকি হতে পারে মৃত্যুও। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত বয়স্ক লোকজন এবং আগে থেকেই যাদের বিশেষ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে (যেমন অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ) তারা গুরুতর অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।

ব্রিটেনে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, যদি মনে হয় যে আপনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বা এতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি বলে মনে হচ্ছে, তাহলে কিন্তু আপনি সঙ্গে সঙ্গে ক্লিনিক বা হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে চলে যাবেন না। বরং আপনি টেলিফোনে একটি বিশেষ নম্বরে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আপনার কথা শুনে তারা আপনাকে বলে দিতে পারবেন যে এরপর আপনাকে কী করতে হবে।

আপনাকে ঠিক তখনই যোগাযোগ করতে বলা হবে যখন আপনার মনে হবে যে আপনি হয়তো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

  • যদি গত ১৪ দিনে আপনি যদি কম্বোডিয়া, চীন, হংকং, ইটালির উত্তরাঞ্চল, ইরান, জাপান, লাওস, ম্যাকাও, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড অথবা ভিয়েতনাম সফর করে থাকেন।
  • যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসে থাকেন। এর ফলে আপনাকে হয়তো নিজের উদ্যোগেই অন্যদের থেকে আলাদা থাকতে বলা হতে পারে।

যদি কোন নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে কেউ গিয়ে থাকেন অথবা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলেই স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। তবে চিকিৎসকরা যদি মনে করেন যে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন, তখন তারা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। তখন কিছু নমুনা সংগ্রহ করা হতে পারে। যেমন: নাক, গলা ও ফুসফুস থেকে নির্গত শ্লেষ্মা, রক্ত ও মল বা বিষ্ঠা। তারপর এসব নমুনা পাঠানো হবে পরীক্ষাগারে। কতোদিনে এর ফল পাওয়া যাবে সেটা একেক দেশে একেক রকমের হতে পারে। তবে ব্রিটেনে সেটা একদিনেই পাওয়া যাবে। পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত বাড়িতে নিজেকে একটু বিচ্ছিন্ন করে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হয়তো বাড়িতে অবস্থান করতে বলা হতে পারে। বলা হতে পারে অন্যদের সংস্পর্শে না যেতে।

তখন যা যা করতে হবে তা হলো:

  • বাড়িতে অবস্থান করা
  • অফিসে, কাজে, স্কুলে এবং যেসব জায়গায় জনসমাগম ঘটে সেখানে যাওয়া যাবে না
  • বাস, ট্রেন, ট্যাক্সির মতো গণপরিবহন ব্যবহার করা যাবে না
  • বাড়িতে লোকজনের আসা এড়িয়ে চলা
  • বাজার-সদাই করতে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনকে অনুরোধ করা যেতে পারে

বাড়িতে আরও যারা বসবাস করেন, তারা যাতে আক্রান্ত না হন সেজন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে অতিরিক্ত কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। যেমন, থাকতে হবে আলাদা একটি ঘরে। বাথরুমে ও রান্না ঘরে যেতে হবে সবার পরে এবং সঙ্গে সঙ্গে ওই ঘরগুলো পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। আর এটা করতে হবে ১৪ দিন ধরে।

এখনও করোনাভাইরাসের কোন চিকিৎসা বের হয়নি। তবে পরীক্ষায় যদি দেখা যায় কেউ আক্রান্ত তখন যেসব উপসর্গ দেখা যাবে সেগুলো কমিয়ে আনতে চিকিৎসা নেয়া যেতে পারে। তখন অন্যদের থেকে আপনাকে আলাদা থাকতে হবে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে নিজেকে।

এই ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরিতে গবেষণা চলছে। আশা করা হচ্ছে এবছরের শেষ নাগাদ মানব দেহে এর পরীক্ষামূলক ব্যবহার হতে পারে। কোথাও কোথাও এন্টি-ভাইরাল ওষুধ দিয়েও দেখা হচ্ছে সেটি করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারে কিনা।

সৌজন্যে: বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত জানানঃ