সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর: বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটে বৈশ্বিক নেতাদের কাছে সবচেয়ে ক্ষতিকর দেশগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা। বিশ্বনেতারা এ ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কথা শুনবেন বলেও দাবি তাদের।
(২৩ সেপ্টেম্বর) ‘বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘট ২০২২’ উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেইভ ফিউচার বাংলাদেশ’ আয়োজিত ধর্মঘটে তারা এ দাবি জানান। অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশেও বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট হয়।
এসময় বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশেরও কম অবদান রাখা সত্ত্বেও ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
তারা বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে প্রাণঘাতী দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, খরা, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। এর ফলে দেশের দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়বে। এছাড়া বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ২৭ শতাংশ মানুষ বর্তমানে বন্যার ঝুঁকিতে আছে। চলতি শতাব্দীতে উপকূলীয় বন্যার এ ঝুঁকি বেড়ে ৩৫ শতাংশ হতে পারে। বর্তমানে বন্যায় উপকূলীয় এলাকায় বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতি হয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ।’
পরিবেশ ও জলবায়ুকর্মী এবং সেইভ ফিউচার বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক নয়ন সরকার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান। বর্তমানে আমরা মহাসংকটের মধ্যে রয়েছি, যেটা জলবায়ু সংকট। বিশ্বনেতারা জরুরিভাবে জলবায়ু পদক্ষেপ না নিয়ে সময় অপচয় করে জলবায়ু সংকট দীর্ঘ করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে গত ২০ বছরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি পরিবারের গড়ে চার লাখ ৬২ হাজার ৪৯১ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির অর্থ চাই এখনই। আমরা জলবায়ু পদক্ষেপ ও জলবায়ু সুবিচার চাই।
তিনি বলেন, আজ দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ ভালো নেই। অথচ পরিবেশ-প্রকৃতি সবচেয়ে বেশি ভালো থাকার কথা ছিল যাতে করে আমরা ভালো থাকতে পারি। কিন্তু আমরা কি গাছ, বন, পাহাড়, বন্যপ্রাণী, নদী, জলাশয়কে ভালো থাকতে দিয়েছি? না, দেইনি। দূষিত ও ধ্বংস করে চলছি। আজ দেশে পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব চলছে। পরিবেশ-জীববৈচিত্র ধ্বংস করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়- এটা জানার পরেও কেন এত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে? জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা বন্ধ করুন। সময় এসেছে বন্ধ করার। এখনই সময় পরিবর্তনের।
ধর্মঘটে সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি জানিয়ে বলা হয়, প্রথমত বিশ্ব নেতাদের কাছে দাবি, আমরা জলবায়ু পদক্ষেপ ও জলবায়ু সুবিচার চাই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতির অর্থ আমাদের দিতে হবে। প্যারিস এগ্রিমেন্ট বাস্তবায়ন করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনতে হবে। কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে।
সরকারের কাছে তাদের দাবি- জলবায়ু শরণার্থীদের টেকসই পুর্নবাসন করতে হবে। সুপেয় পানির স্থায়ী সমাধান করতে হবে। অভিযোজন প্রক্রিয়া বাড়াতে হবে। উপকূলজুড়ে টেকসই ব্লক বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। কয়লা না, নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রসর হতে হবে। পাঠ্যবইয়ে জলবায়ু-পরিবেশ শিক্ষা যুক্ত করতে হবে।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে। শব্দ ও বায়ুদূষণ রোধ করতে হবে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে সেসব প্রকল্প এবং পরিবেশ দূষণকারী কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। এছাড়া দেশের পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল, গাছ-পালা, বন্যপ্রাণী এবং নদী, জলাশয় রক্ষা করতে হবে। সর্বোপরি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে ও পুনরুদ্ধারে পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরিবেশ ও জলবায়ুকর্মী নয়ন সরকার বলেন, বিশ্বনেতারা প্রতিশ্রুত তহবিল সংগ্রহ ও দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু আমরা আজকের বৈশ্বিক জলবায়ু ধর্মঘট থেকে ক্রাউড ফান্ডিং রেইজ করা শুরু করেছি। তারা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ক্ষয়ক্ষতির অর্থ দিচ্ছে না। আমরা চাই, আমাদের এ দৃশ্য দেখে বিশ্বনেতারা লজ্জা পাক। এটাও আমাদের একটা প্রতিবাদ। যেটা তারা পারেনি, সেটা আমরা শুরু করেছি। তহবিল সংগ্রহ করা ছোট পরিসরে শুরু করা হলেও বড় পরিসরে শুরু করার দায়িত্ব বিশ্বনেঅনুপযোগী হচ্ছে উপকূলে বসবাস। বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিস্তার লাভ করছে লবণাক্ততা। লবণাক্ত পানিতে বসবাস করার ফলে চর্মরোগ, কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত রোগ লেগেই আছে। লবণাক্ত পানির জন্য নারীদের অকাল গর্ভপাত ঘটছে। ফলে বাড়ছে না জনসংখ্যা। কৃষিজমি নেই বললেই চলে। যা আছে তাতে ফসল হয় না। গোখাদ্যের চরম সংকট। চিংড়ি চাষে দেখা দিয়েছে মন্দা। এখানে মানুষের বসবাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে থাকা মুশকিল হচ্ছে উপকূলের কয়েক লাখ মানুষের। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে তেমন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে না পারায় সব কিছু হারিয়ে অনত্র পাড়ি জমাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তরা।
সূত্রমতে ২১০০ সাল নাগাদ সমদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ দশমিক ১ মিটার বাড়তে পারে। আগের ধারণার চেয়ে যা ১০ সেন্টিমিটার বেশি। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সালে মধ্যেই বিশ্বের কিছু এলাকা তলিয়ে যাবে। প্রতি বছর নিয়মিত আঘাত হানবে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমপক্ষে ৪৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। নয়তো তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। এটি হলে বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব হবে ভয়াবহ। মহাসাগর ও পর্বতগুলোতে জমা থাকা বরফের স্তূপ ইতোমধ্যে গলা শুরু করেছে। সেগুলো আরও দ্রুত গলে পানির উচ্চতা ধারণার চেয়ে বেশি বেড়ে যাবে। ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় অনেক অঞ্চল ডুবে যাবে। এতে উপকূলীয় ১৮ জেলা চরম আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দিনদিন পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ছে। সে কারণে দুর্যোগও বাড়ছে। এসব দুর্যোগ বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় সাতক্ষীরা উপকূলে আঘাত হানে। বহু মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়ছে। এখানকার পুরুষরা তাদের সন্তান-স্ত্রীদের রেখে অন্য এলাকায় কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন। অনেকে এলাকায় ফিরছেন না। অনেক পুরুষ অন্য এলাকায় গিয়ে বিয়ে করে স্থায়ী হচ্ছেন। ফলে বোঝা টানতে হচ্ছে নারীদের। অনেক ক্ষেত্রে ওই পরিবারের নারীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। এখানে বসবাসের জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করলে কয়েক বছর পর এসব এলাকায় মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ উপকূলীয় এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা এখন সারা বছরব্যাপী চলমান। বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিত এবং টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকার ফলে উপকূলবর্তী এলাকাসমূহ ক্রমান্বয়ে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় জনমনের প্রশ্ন, বাঁচানো যাবে কী উপকূলের লোকালয়কে?
বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনিস্টিটিউটের প্রকাশিত জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ৩৬ বছরে দেশে লবণাক্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ২ হাজার দশমিক ৮১ হেক্টরে। বৃদ্ধির হার শতকরা ২৬.৭ ভাগ। ১৯৭৩ সালে দেশে লবণাক্ত জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ৮ লাখ ৩৩ হাজার দশমিক ৪৫ হেক্টর। ২০০০ সালে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ লাখ ২০ হাজার দশমিক ৭৫ হেক্টর। মাত্র এক যুগেরও কম সময়ের ব্যবধানে ২০০৯ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার দশমিক ২৬ হেক্টর, অর্থাৎ ৯ বছরে বাড়ে ৩৫ হাজার দশমিক ৫১ হেক্টর ( বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ)। ২০২২সালে এসে তা দাঁড়ায় ১২ লাখ হেক্টরের কাছা কাছি।
আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আবু দাউদ ঢালী বলেন, আমার ইউনিয়নের একপাশে কপোতাক্ষ নদ আরেক পাশে খোলপেটুয়া নদী। দুই নদীর ২৫-৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অধিকাংশ এলাকা জরাজীর্ণ। প্রতিবছর নদীগুলোর পানি বাড়লেই লোকালয়ে ঢুকে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। বাঁঁধগুলো ষাটের দশকে তৈরি। এরপর নামমাত্র সংস্কার হয়েছে। দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও মাছের ঘের ভেসে নিঃস্ব হয়ে যায় মানুষ। দুর্যোগের পর তারা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে, পরিবার-পরিজন নিয়ে কোথায় বসবাস করবে, কোথায় যাবে এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে। ফলে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এখানে আশ্রয়কেন্দ্র্র নেই। স্থায়ী বাঁধ না হওয়ায় প্রতিবছর ক্ষতিগস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় এলাকায়। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও মাটির লবণাক্ততা উপকূলের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতের সময় অধিক শীত, গরমে প্রচন্ড গরম এবং বর্ষায় অতিবৃষ্টির ফলে বন্যা বাড়ছে। এছাড়া জলোচ্ছ্বাসে নদীভাঙন বাড়ছে। ফলে এসব এলাকার মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা অঞ্চলে বসবাস রত অনিচুর রহমান বলেন, ”আমাদের এখানে প্রতি বছর গরমের সময় দিন দিন গরম যেন বাড়ছেই। আবার ভারী বৃষ্টিপাত হলে আমাদের বাসার নিচে পানি জমে যায় আমাদের দোকান তলিয়ে যায় যা আগে কখনই দেখিনি। “সরকারের কাছে সংকট থেকে উত্তরণের প্রত্যাশা জানিয়ে আনিচুর বলেন, “নিরাপদ খাদ্য এবং পানির সুব্যবস্থা করা খুব জরুরি। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঝঞ্ঝায় গর্ভবতী মা এবং বৃদ্ধ লোকেরা, প্রতিবন্ধীরা নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাদের সেই সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সাহায্য দরকার আমাদের।”প্রবল তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ছয়টি দেশ, যার একটি বাংলাদেশ। অন্য দেশগুলো হলো– ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য। গবেষণাটি গতকাল সোমবার নেচার সাসটেইনেবিলিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ সংকট দ্রুত গভীর হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। জীবাশ্ম জ্বালানির বর্তমান ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে প্রবল তাপে আক্রান্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
গবেষকদের হিসাবে, শিল্প-পূর্ব সময়ের চেয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ প্রচণ্ড তাপের মধ্যে বাস করবে। ২০১০ সালে এই হার ছিল ২৩ শতাংশ বা প্রায় ১৫৪ কোটি।
উচ্চ ক্ষমতার জলবায়ু ও জনসংখ্যাভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে গবেষণায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ বা সিডিডি সূচকের মাধ্যমে। এই সূচক দিয়ে বোঝা হয়, ঘরের নিরাপদ তাপমাত্রা বজায় রাখতে বছরে কতটা শীতলীকরণ প্রয়োজন। বছরে তিন হাজারের বেশি সিডিডি থাকা অঞ্চলগুলোকে গবেষণায় ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেসুস লিজানা বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ের গড় তাপমাত্রা প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করে দিতে পারে। তাঁর মতে, দেশের অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বাস করে, যেখানে শীতলীকরণের চাহিদা বছরে ৩ হাজার সিডিডির বেশি। এর অর্থ হলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক তাপের মধ্যে জীবনযাপন, যার প্রভাব পড়ে মানুষের বেঁচে থাকা, উৎপাদনশীলতা ও স্বাস্থ্যের ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের একটি। এতদিন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা।
নতুন এই গবেষণা বলছে, এসব ঝুঁকির পাশাপাশি এখন নীরবে সমান প্রাণঘাতী হুমকি হয়ে উঠছে প্রবল তাপমাত্রা। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগজনিত চাপ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি, যাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, উষ্ণ ও উপউষ্ণ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। বিপরীতে, বৈশ্বিক উত্তরের ধনী দেশগুলোতে শীত নরম হওয়ায় ঘর গরম রাখার প্রয়োজন কমে আসবে। ব্যক্তিপ্রতি কুলিং ডিগ্রি ডেজ সবচেয়ে বেশি বাড়বে বলে যেসব দেশের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস ও ব্রাজিল। অন্যদিকে কানাডা, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ের মতো দেশে শীতের তীব্রতা কমায় গরমের চাহিদা কমবে।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, চরম তাপপ্রবণ দেশগুলোতে এয়ার কন্ডিশনের চাহিদা দ্রুত বাড়লে একটি ‘কুলিং ট্র্যাপ’ তৈরি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে এবং সেই জ্বালানি যদি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে, তবে কার্বন নিঃসরণ আরও বাড়বে, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে চরম তাপের সংকট আরও গভীর হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
গবেষণা স্পষ্ট করে বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি রাখতে পারলে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিজ্ঞানীদের মতে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখনই কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং শহর ও আবাসন নকশায় তাপ সহনশীল ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে প্রচণ্ড তাপ একটি বড় মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, ভবিষ্যতে দেশের তাপপ্রবাহ আরও বেড়ে যাবে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় সারা বছরই তীব্র গরম থাকতে পারে। যদি গ্রিনহাউস গ্যাস কমানো না যায়, তাহলে ২০৪১ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে যা বেড়ে ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত হতে পারে। বর্ষার আগের (মার্চ-মে) সময়টাতে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে। ২০৭০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষার আগে ২০ দিন পর্যন্ত তাপপ্রবাহ থাকার আশঙ্কা রয়েছে, যা বর্তমান সময়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্য বেশি। বর্ষা মৌসুমেও তাপপ্রবাহ বাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ২১০০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগের ৯০ দিনের মধ্যে ৭০ দিনই তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। বছরে অন্তত দুটি প্রবল তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারেন নগরবাসী। একটি বর্ষার আগে, আরেকটি বর্ষার পর।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি দ্রুততর হচ্ছে এবং আমাদের গ্রহের উষ্ণায়ন এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল সর্বোচ্চ উষ্ণ বছরগুলোর একটি। এছাড়া ২০২৫ সালের অক্টোবর ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ইতিহাসের উষ্ণ অক্টোবরের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উষ্ণতা বাড়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উপকূলীয় মানুষকে হুমকিতে ফেলবে, আর তীব্র হিটওয়েভ স্বাস্থ্য, কৃষি ও নিরাপদ পানির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। খুব বেশি সময় নেই হাতে। বরং সমুদ্রের পানির স্তর যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি-ই তলিয়ে যেতে পারে গোটা বিশ্বের উপকূলবর্তী একাধিক শহর, যার মধ্যে রয়েছে কলকাতা, মুম্বাইয়ের মতো একাধিক শহর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিজ্ঞান সংস্থা ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর একটি গবেষণায় এবার এমনই তথ্য উঠে এল। তাতে বলা হয়েছে, পানির স্তর বৃদ্ধির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন ৩০ লক্ষ মানুষ। বাসভূমি হারাতে পারেন ১৫ কোটি মানুষ। এশিয়াতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে।
‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর গবেষণাপত্র ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ বলা হয়েছে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমুদ্রে পানির স্তরের ওঠানামা এবং স্থলভূমির উপর তার প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে ওই সংস্থা। তাতেই এমন বিপদ সঙ্কেত মিলেছে। দেখা গিয়েছে, ২০৫০-এর মধ্যেই সমুদ্রের পানির স্তর উপকূল ছাপিয়ে পাকাপাকি ভাবে উপরে উঠে আসতে পারে।
অত্যধিক পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর আগেও এমন আশঙ্কা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু তাতে বলা হয়েছিল, বিংশ শতকে গোটা বিশ্বে সমুদ্রের পানির স্তর ১১-১৬ সেন্টিমিটার বেড়েছিল। বর্তমান শতাব্দীতে তা ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর বিজ্ঞানীদের দাবি, গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে যে হারে বিশ্ব উষ্ণায়ন বেড়ে চলেছে, তাতে আন্টার্কটিকার বরফের চাদর নির্ধারিত সময়ের আগেই গলতে শুরু করলে, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সমুদ্রের পানির স্তর ২ মিটারেরও বেশি বেড়ে যেতে পারে।
এর ফলে, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এবং চিনই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে ন’কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ সমুদ্র উপকূল অঞ্চলে বাস করেন। চিনে এই সংখ্যাটা চার কোটি ২০ লক্ষ। অবিলম্বে তাঁদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত বলে মত ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের আধিকারিক ডিনা লোনেস্কো। তাঁর কথায়, ‘‘বহু দিন ধরেই সতর্ক করে আসছি আমরা। আমরা জানি কী হতে চলেছে। নাগরিকদের স্থানান্তরিত করতে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সব দেশের সরকারের।’’জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে—বিষয়টি এখন সর্বজন স্বীকৃত। আর এই প্রভাবের একটি বড় ধাক্কা যাবে এরই মধ্যে অতিরিক্ত জনসংখ্যার রাজধানী শহর ঢাকার ওপর দিয়ে। এক গবেষণার বরাত দিয়ে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম ব্লুমবার্গ এ তথ্য জানিয়েছে।
ব্লুমবার্গ সিটি ল্যাবের গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোর জনমিতি ব্যাপক পরিবর্তন হবে। কারণ পরিবেশ ও আবহাওয়াসংক্রান্ত চরম ঘটনাগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে নিজ এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে জনাকীর্ণ শহরগুলোতে চলে যেতে বাধ্য করবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সি-৪০ সিটিজ কোয়ালিশন এবং মেয়র মাইগ্রেশন কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে চরম বন্যার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী ঢাকায় আরও ৩১ লাখ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখের বেশি।
এ ছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় প্রায় ৬ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হবে এবং তারা সবাই দেশটির রাজধানী বোগোটায় বসতি স্থাপন করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ, শহরটির বর্তমান ৮০ লাখ বাসিন্দার সবাই ব্যাপক পানীয় জলের ঘাটতিতে আছে।
প্রতিবেদনটিতে বিশ্বের একাধিক অঞ্চলে জলবায়ু অভিবাসনের ওপর ফোকাস করেছে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের ওপর ফোকাস করা হয়েছিল এই গবেষণা। যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বলে অনুমান করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসারণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস না করলে আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দ্রুততম বর্ধনশীল ১০টি মেগাসিটি চলতি শতকের মাঝামাঝি নাগাদ মোট ৮০ লাখ অভ্যন্তরীণ অভিবাসী দেখতে পারে।
সি-৪০ সিটিজের অভিবাসন ক্যাম্পেইনের সিনিয়র ম্যানেজার ক্লডিয়া হুয়ের্তা বলেন, ‘লোকজন এমন শহরগুলোতে যেতে চাইছে, যেখানে তারা সুযোগ, আবাসন ও সামাজিক সংযোগ খুঁজে পেতে পারে এবং এটি খুঁজে পেতে তাদের বিদেশে যাওয়ার জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরগুলোতে জনসংখ্যার অতিরিক্ত প্রবাহ স্থানীয় পরিষেবাগুলোতে আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করবে এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ ত্বরান্বিত করবে। এর ফলে উল্লিখিত শহরগুলোও নিজস্ব জলবায়ু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, যার অর্থ আগত অভিবাসীদের, যাদের বেশির ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন করবে। এ কারণে সম্ভবত শহরগুলো আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি যদি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তবে শহরগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনে আসা অভিবাসীদের কারণে যেসব নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। তবে কার্বন নিঃসারণ হার যদি প্যারিস চুক্তি অনুসারে না হয়, তাহলে বোগোটা, রিও ডি জেনিরো ও করাচিতে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে তিন গুণ বাড়তে পারে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, কার্বন নির্গমন হ্রাসে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অনুপস্থিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেশ কিছু শহর এরই মধ্যেই জনসংখ্যার ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে সিয়েরা লিওন, ঘানা ও জর্ডান উল্লেখযোগ্য। এমন একটি শহর, যা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে লাখ লাখ শরণার্থীদের আতিথেয়তা করার জন্য অপরিচিত নয়—তরুণ নতুনদের জন্য সবুজ স্থান এবং শিক্ষা কার্যক্রম তৈরি করছে।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা আশা করছেন, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের সবাইকে ঢাকা শহরে না নিয়ে তাদের আশপাশের অভিবাসীবান্ধব শহরে সরিয়ে নিয়ে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব হবে। গবেষকেরা বলছেন, এই বোঝা কেবল শহরগুলোর ওপর চাপানো উচিত নয়। জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাসে জাতীয় সরকার ও বেসরকারি খাতকে তাদের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।চরম তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হবে ছয়টি দেশ, যার একটি বাংলাদেশ বলে নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণাটি পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে- যার মারাত্মক প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। জীবাশ্ম জ্বালানির বর্তমান ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে চরম তাপে আক্রান্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি বিশ্বের ৪১ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ চরম তাপের মধ্যে বসবাস করবে। ২০১০ সালে এই হার ছিল ২৩ শতাংশ বা প্রায় ১৫৪ কোটি।
গবেষণায় উচ্চ রেজুলেশনের জলবায়ু ও জনসংখ্যাভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেইজ’ (সিডিডি) সূচকের মাধ্যমে। বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকা অঞ্চলগুলোকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঘরের নিরাপদ তাপমাত্রার জন্য কতটা ঠাণ্ডা প্রয়োজন, এই সূচকে সেটি মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, চরম তাপে বসবাসকারী সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন।
গবেষণার প্রধান লেখক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেসুস লিজানা বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশে জাতীয় পর্যায়ের গড় তাপমাত্রা প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করে দিতে পারে। বাস্তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বাস করে, যেখানে শীতলীকরণের চাহিদা বছরে ৩ হাজার সিডিডির বেশি। এর অর্থ হলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক তাপের মধ্যে জীবনযাপন- যার প্রভাব পড়ে মানুষের বেঁচে থাকা, উৎপাদনশীলতা ও স্বাস্থ্যের ওপর।’
তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু সংকটে বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। এই গবেষণা সেই ঝুঁকির ওপর নতুন করে তাপসংকটের মাত্রা যোগ করেছে। এতদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার দিকে নজর বেশি থাকলেও এখন নীরবে কিন্তু সমান প্রাণঘাতী হুমকি হয়ে উঠছে চরম তাপমাত্রা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক, হৃদ্রোগজনিত চাপ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়- বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু এবং স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে, যাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত।
অক্সফোর্ডের এই গবেষণায় বলা হয়েছে, গরম বৃদ্ধির কারণে বিশ্বের উষ্ণ ও উপউষ্ণ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। বিপরীতে, বৈশ্বিক উত্তরের ধনী দেশগুলোতে ঘর গরম রাখার প্রয়োজন কমে আসবে।
সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস ও ব্রাজিল- এই দেশগুলোতে ব্যক্তি প্রতি কুলিং ডিগ্রি ডেজ সবচেয়ে বেশি বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কানাডা, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়ের মতো দেশে শীত নরম হওয়ায়।