চিংড়ি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে উপকূলের ভেনামি চিংড়ি

প্রকাশঃ ২০২৬-০৮-৩১ - ১০:৫৭

সিরাজুল ইসলাম, শ্যামনগর : বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন সাফল্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছেন চিংড়ি সংশ্লিষ্টরা। উৎপাদন খরচ কম, উচ্চ ফলনশীল, সস্তা ও সহজলভ্য, খেতে ও বেশ সুস্বাদ হওয়ায় উপকূলে এই চিংড়ি চাষ বেড়েছে। বিশ্বের পুরো চিংড়ির বাজারও এখন ভেনামির দখলে। চিংড়ি চাষি ও রপ্তানিকারকরা বলছেন, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম খাত চিংড়ি শিল্পকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ‘ভেনামি’ চিংড়ি চাষের কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র ভেনামিই পারে বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্পের সম্প্রসারণ করে বিশ্ব বাজার ধরে রাখতে। অন্যথায় ধারাবাহিক অবনতিতে ‘খাদের কিনারায়’ এসে দাঁড়ানো চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ চিংড়িশিল্পে নিয়ে এসেছে নতুন বিপ্লব। ভেনামি প্রজাতির চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ করার ফলে বৈশ্বিক চিংড়ি উৎপাদনের পরিমাণ ২০০৩ সালের ২ মিলিয়ন টন থেকে ২০২২ সালে ৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু অবাক করার বিষয়, প্রধান চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে বাণিজ্যিক ভেনামি চিংড়ির চাষের অনুমতি মিলল ২০২৩ সালের মার্চ মাসে। এরই মধ্যে পুরা বাজার হারালো বাংলাদেশ। ২০০০ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের চিংড়িশিল্প কাছাকাছি ছিল। ২০১৯ সালে ভারত চিংড়ি রপ্তানি করে আয় করে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা কিনা মোট বৈশ্বিক আয়ের ২৪ শতাংশ। ভারত এই বিপ্লব করেছে মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর চিংড়ির খামার থেকে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর চিংড়ির খামার থেকে আয় করেছে শূন্য দশমিক ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই খাতে আয় ছিল শূন্য দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার।
সাম্প্রতিক কালে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের আকাশচুম্বী উত্থানের পেছনে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ যুগান্তকরী অবদান রেখেছে। কয়েক বছর ট্রায়াল ও ঝুঁকি বিশ্লেষণের পর ভারত ২০০৯ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। এশিয়ার ১৫টি চিংড়ি উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে ১৪টি দেশে ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। ২০২১ সালে ১৩টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষামূলক ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে মৎস্য বিভাগ।
এদিকে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশে বাগদা চিংড়ির গড় উৎপাদন হেক্টর প্রতি ৩৪১ কেজি। সেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ‘ভেনামি’ চিংড়ির হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন ৭ হাজার ১০২ কেজি। অর্থাৎ বাগদার তুলনায় ‘ভেনামি’র উৎপাদন হেক্টর প্রতি ৬ হাজার ৭৬১ কেজি বেশি। যার প্রমাণ মিলেছে সাতক্ষীরা ও খুলনায় প্রথম বারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে চাষকৃত ‘ভেনামি’র উৎপাদনে।
সাতক্ষীরার ভেনামি চিংড়ি চাষের উদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ৩৩ বিলিয়ন ডলারের চিংড়ির বিশ্ববাজার। যার ৮০ ভাগই দখল করে নিয়েছে ভেনামি চিংড়ি। আমাদের লড়তে হয় মাত্র ২০ শতাংশ বাজারের জন্য। সেখানেও নানা প্রতিকূলতায় বাজারের দরপতনের কারণে চিংড়ির উৎপাদন ও রপ্তানিতে পিছিয়ে যাচ্ছি আমরা। বিশ্ববাজারের চাহিদা বিবেচনায় দেশে এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে ভেনামি চিংড়ি চাষের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, পাঁচ বছরে জেলায় রপ্তানিজাত চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ১৪৬ টন। এর মধ্যে বাগদা চিংড়ি এক লাখ ১৮ হাজার ৩০৮ টন। গলদা চিংড়ির পরিমাণ ৩৩ হাজার ৮৩৭ টনের মতো। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উৎপাদন হয় ২৫ হাজার ৩৫৪ টন বাগদা ও ৬ হাজার ৩৪ টন গলদা চিংড়ি। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২৬ হাজার ৪৮৫ টন বাগদা ও ৬ হাজার ১০৬ টন গলদা, ২০১৭-১৮ বাগদা ২০ হাজার ৯৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫২৫ টন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাগদা ২১ হাজার ৪৪১ টন ও গলদা ৬ হাজার ৫৪২ টন এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ হাজার ৮৭ টন বাগদা ও ৮ হাজার ৬৩০ টনের মতো চিংড়ি উৎপাদন হয়। উৎপাদিত এসব চিংড়ির রপ্তানিমূল্য ৭ হাজার ৬০৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জেলায় বছরে প্রায় ৬০ হাজার নিবন্ধিত ঘেরে চিংড়ি চাষ করা হয়।
চিংড়ি ব্যবসায়িরা জানান, গলদা ও বাগদা চিংড়ির চাষ বছরে একবারের (চাষের সময় মারা গেলে দুবার) বেশি করা যায় না। আর ভেনামি চাষ করা যায় বছরে তিনবার। সাধারণ পুকুরে প্রতি হেক্টরে ৩০০-৪০০ কেজি বাগদা চিংড়ি উৎপাদন করা যায়। অন্যদিকে একই পরিমাণ জমিতে সাত-আট হাজার কেজি ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব। ভারতে ভেনামি চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষ থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পাঁচ বছর সময় লেগেছিল। বাংলাদেশে তিন বছরের মধ্যে সম্ভব।
সূত্রমতে, ফসলি জমিতে লবণাক্ততা, ক্ষয়িষ্ণু জীববৈচিত্র্য, সুন্দরবন ধ্বংস, প্রান্তিক কৃষকের বাস্তুচ্যুত হওয়া, হ্রাসকৃত ফসল উৎপাদনের মতো বড় মূল্যের বিনিময়ে লোনাপানির চিংড়ির দ্রুত সম্প্রসারণ হয়েছিল উপকূলে। ডলারের গন্ধে উপকূলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুনাফালোভী প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। সাদা সোনার হাতছানিতে গরিব ধানচাষির সাধের জমিটা রাতারাতি চলে গিয়েছিল লোনাপানির বাগদা চিংড়ি চাষের আওতায়। লবণে বিষাক্ত ধানি জমি চিংড়ি দস্যুকে দিয়ে দেশান্তরিত হয়েছিলেন অসংখ্য ভূমিহীন।
অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণের অশুভ পরিণাম নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, গণমাধ্যম প্রচার করেছে নানা রঙের দুঃখ-সুখের খবর। দরিদ্র কৃষকের কলিজার টুকরা তিন ফসলি জমিতে লোনাপানির আগ্রাসন নিয়ে পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদ কোনোভাবেই কোনোভাবেই যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ডলার উপার্জন করা সাদা সোনাশিল্প প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় বিপন্ন কৃষি ও বিপর্যস্ত জীবিকায়নের মূল্যের বিনিময়ে। গড়ে ওঠে হ্যাচারি, প্রসেসিং প্ল্যান্ট, রপ্তানি কেন্দ্র। অগত্যা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় বিশাল জনগোষ্ঠীর। নীতিকৌশলে পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ নানা কথা লেখা থাকলেও, বাস্তবে দ্রুত মুনাফা অর্জন আর কাঁচা ডলারই প্রাধান্য পায়। কিন্তু হঠাৎ ভাবিয়ে তুলেছে চিংড়িশিল্পের ক্রমহ্রাসমান উৎপাদনশীলতা আর অনিশ্চিত গন্তব্য।
দ্রুত নীতিমালা বাস্তবায়নে বাণিজ্যিকভাবে ‘ভেনামি’ চিংড়ি চাষকে উন্মুক্ত করে রপ্তানির পদক্ষেপ নিতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপি চিংড়ি মাছের কদর বেশি। সাদা সোনা হিসেবে খ্যাত আমাদের চিংড়ি শিল্প এখন মৃতপ্রায়। দামে কম এবং উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণে মৎস্য খাতে এখন আলোচিত নাম ‘ভেনামি চিংড়ি’। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে ভেনামির হাত ধরে আসবে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। হিমায়িত মৎস্য রপ্তানিতে গলদা ও বাগদা আধিপত্য থাকলেও বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখন ‘ভেনামি’ চাষ সময়ের দাবি। সরকারিভাবে পরীক্ষামূলক চাষে অভাবনীয় সাফল্য আসায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৎস্য চাষিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চাষাবাদ সম্প্রসারণ থেকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা এবং খুলনায় সীমিত সংখ্যক খামারি অতি নিবিড় পরিচর্যার মধ্য দিয়ে সিমীত আকারে ভেনামি চাষ করছে। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, পোনার স্বল্পতা, খাবার আমদানি এবং নিবিড় পরিচর্যা বিষয়ে সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় খামারি পর্যায়ে ব্যাপক আকারে শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের মাহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভেনামি চিংড়ির বেশ কদর থাকলেও চাষের বিষয়ে কিছু প্রতিবন্ধকতা ও বিধিনিষেধ থাকার কারণে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত দেশে ৩৬ টি প্রতিষ্ঠানকে চিংড়ি চাষের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ৭ টি প্রতিষ্ঠানকে হ্যাচারি স্থাপনের অনুমোদন পেলেও এই মুহুর্তে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। বিমেষ করে যারা ব্রুড চিংড়ি ও খাদ্য আমাদানির করতে চাচ্ছেন তাদের আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে।
চাষের পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ভেনামি চাষে কোনো ধরনের সমস্যা বা ক্ষতিকর কোনো বিষয় পাওয়া যায়নি। বেশ সাফল্য দেখা দেছে। তবে আমাদের পরিবেশের জন্য কতোটা স্মঞ্জস্য বা প্রতিবন্ধক সেটা নির্ধারণে গবেষণা করছে মৎস্য গবেষণা ইনন্টিটিউট। তিবে তিনি আশা করেন দ্রুত সময়ের মধ্যে গবেষণা প্রতিবেদন হাতে পেলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেয়া হবে।
ভেনামি চাষ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, সরকারি অনুমোদন বা নিয়স্ত্রন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই ভেনামি পোনা উৎপাদন এবং চাষাবাদ করার সুযোগ নাই। কক্সবাজার তথ্য দেশে প্রথম ভেনামি চিংিড়ির চাষ শুরু করে সীমার্ক (বিডি) লিমিটেড । তারা অতিনিবিড় চাষে দেখেছে প্রতি শতাংশে ১০০০ কেজি উৎপাদন করা সম্ভব। সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে যেখানে গলদা ও বাগদা মাত্র ৩০০-৫০০ কেজি বাগদা চিংড়ি পাওয়া যায়, সেখানে ভেনামি চিংড়ি চাষে প্রতি হেক্টরে ৭,০০০-৮,০০০ কেজি (এবং অতি-নিবিড় পদ্ধতিতে ৮০ টনের বেশি) উৎপাদন সম্ভব। বাংলাদেশে এর বাণিজ্যিক অনুমোদনের পর বিপুল চাহিদা তৈরি হলেও বর্তমানে পোনা ও খাবার আমদানিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যপকভাবো উৎপাদন করা যাচেআছ না। কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভের পাশে সীমার্ক (বিডি) লিমিটেড ১২ একরের খামারে ৩২টি নার্সারি এবং ১৬টি কোয়ারেন্টিন পুকুর তৈরি করেছে।
দেশে ভেনামি পোনা উৎপাদন প্রসঙ্গে এই জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, সরকারি কিছিু বিধি নিষেধ থাকায় সারা দেশে ব্যাপকভাবে চাষ ও পোনা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে এই চিংড়ি চাষ করতে হলে সরকারি অনুমোদন নিতে হয়। সম্পূর্ণ বায়োসিকিউরিটি মেনি এই চাষ করতে হয়। তা না হলে কাঙ্খিত উৎপাদন না পাওয়্রা পাশাপাশি অন্যকিছিু সমস্যও হতে পারে। তবে এই মুহুর্তে কক্সবাজারের কলাতলিতে নিরিবিলি হ্যাচারি থাইল্যান্ড থেকে আনা ব্রুড চিংড়ির মাধ্যমে ভেনামির পোনা উৎপাদন করছে।
নিরিবিলি হ্যাচারির ম্যানেজার সুজন বড়ুয়া বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষনিক মনিটরিংয়ের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালে থাইল্যান্ড থেকে ৩০০ ভেনামি ব্রুডমাছ সংগ্রহ করে পোনা উৎপাদনের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রতিমাসে ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি পর্যন্ত পোনা সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে চাহিদা বেশি থাকলে সে অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তবে সিমিীত চাহিদার কারণে অনেকে এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেনা। পাশাপাশি সরকারি বিধিনিষেধ থাকায়ও অনেকে চাইলেও চাষ করতে পারছেন না।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তার সহায়তায় সরেজমিন নিরিবিলি হ্যাচারি ঘুরে দেখা গেছে, ইচ্ছে করলেই কেউ যেতে পারে না হ্যাচারিতে। গাড়ি প্রবেশেও রয়েছে বিধিনিষেধ। গাড়িকে সম্পূর্ণ জীবানুমুক্ত করার পর ভিতরে প্রবেশে করলাম আমরা। হাতের ডান পাশে দেখা গেলো থরে থরে সাজানো ককশিটের বক্স, ভিতরে প্রবেশ করতেই নিজেকে জীবানু মুক্ত করেতে হলো। চারটি ভাগে ভাগ করে চলছে কর্মযজ্ঞ। একপাশে ব্যবহার উপযোগী করে পানি তৈরি করা হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে ডিম থেকে রেনু উৎপাদন, আর একপাশে তৈরি হচ্ছে চিংড়ির খাবার, এক বারে সাগর পাড়েরর অংশে পালন হচ্ছে ব্রুড মাছ।
উৎপাদন প্রসঙ্গে কক্সবাজারের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা আরো বলেন, গলদা ও বাগদার চেয়েও বহুগুণ বেশি উৎপাদনশীল এই ভেনামি চিংড়ি। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাগদা চিংড়ির উৎপাদন ক্ষমতা তুলনামূলক কম। যেখানে সাধারণ পদ্ধতিতে এক হেক্টর জমিতে বাগদা উৎপাদন হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি, সেখানে ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে প্রতি হেক্টরে ১০ থেকে ৩০ টন পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব। সহজ কথায়, ভেনামি চিংড়ি বাগদার তুলনায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। এছাড়া গলদা বা বাগদা বড় হতে যেখানে ৫-৬ মাস সময় নেয়, সেখানে ভেনামি মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে যায়। অর্থাৎ, একই সময়ে একজন চাষি বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল ঘরে তুলতে পারেন। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। বর্তমানে এই খাতের রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চিংড়ি প্রতিযোগিতামূলক দামে বিক্রি করা সম্ভব হবে। খুলনার পাইকগাছায় মৎস্য অধিদপ্তরের একটি পাইলট প্রকল্পে দেখা গেছে, মাত্র ১০০ দিনের ব্যবধানে এক হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৯ টন ভেনামি আহরণ করা সম্ভব হয়েছে।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বিষয়ে মৎস্য মহাপরিচালক জানান, বর্তমানে বিশ্ববাজারে চিংড়ি বাণিজ্যের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই দখল করে আছে ভেনামি। ভারত, ভিয়েতনাম ও ইকুয়েডর, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো এই চিংড়ি চাষ করে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ শুধু বাগদার ওপর নির্ভর করায় বিশ্ববাজারের বড় একটি অংশ হারিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের আড়াই লাখ হেক্টর চিংড়ি ঘেরের মাত্র ৩০ শতাংশেও যদি ভেনামি চাষ শুরু করা যায়, তবে বছরে মৎস্য খাত থেকে রপ্তানি আয় ২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এটি বর্তমান রপ্তানি আয়ের চেয়ে অন্তত চার গুণ বেশি। বিশ্ববাজারে ভেনামির চাহিদা প্রতি বছর গড়ে ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পরিবেশের প্রশ্নে ভেনামি চিংড়ি অনেক বেশি টেকসই। এই চিংড়ি চাষের জন্য আধুনিক ‘বায়োসিকিউরড’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে পুকুরের চারপাশ এবং তলদেশ পলিথিন বা কংক্রিট দিয়ে আবৃত থাকে, ফলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয় না এবং বাইরের কোনো রোগজীবাণু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। এছাড়া ভেনামি চিংড়ি পানির উপরের স্তরে নয়, বরং মধ্যস্তরে বিচরণ করে এবং খাবার নষ্ট কম করে, যা পানির দূষণ কমাতে সাহায্য করে। সবচেয়ে বড় দিক হলো, ভেনামি চাষে পানির অপচয় কম হয় এবং একই পানি বারবার শোধন করে ব্যবহার করা সম্ভব।
মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক খন্দকার মাহবুবুল হক বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ ভেনামি চাষে অগ্রসর হলেও আমাদেও দেশে নানা প্রতিবন্ধতরার কারণে অগ্রসর হতে পারেনি। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। তা না হলে সম্ভাবনাময় এই ফসলের সুবিধা পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, এই ভেনামির জন্য সরকারিভাবে একটি দ্বীপ বা এলাকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেখানে হ্যাচারি থেকে শুরু করে সকল সুযোগ সুবিধা থাকবে। প্রয়োজনে একই জায়গা থেকে রফতানির ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন হলে বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে জানা গেছে, গলদা ও বাগদা হেক্টর প্রতি উৎপাদন ৪০০-৫০০ কেজির বিপরীতে ১০-২০ হাজার কেজি, বিক্রির উপযোগী গলদা-বাগদায় ১৫০-১৮০ দিন, সেক্ষেত্রে ভেনামি ৯০ – ১০০ দিন, বেঁচে থাকার হার গলদা-বাগদা ৬০-৬৫শতাংশ, অপরদিকে ৯০- ৯৫শতাংশ, বিশ্ববাজারে চাহিদার ক্ষেত্রে গলদা-বাগদা ১০-১২শতাংশ, ভেনামি ৮০-৮৫ শতাংশ। প্রতি বর্গমিটারে পোনা ছাড়া যায় ৫-১০টি সেক্ষেত্রে ভেনামি ৮০-১৫০টি পর্যন্ত।চিংড়ির কদর দুনিয়াজুড়ে। সেরা প্রজাতির চিংড়ি গলদা-বাগদার কদর ছিল একসময়। কিন্তু ভেনামি চিংড়ি রপ্তানি করেই বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থানে এখন ভারত। এরপরে আছে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম। বাংলাদেশ চিংড়ি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ভেনামির পরীক্ষামূলক চাষে সীমাবদ্ধ রয়েছে এখানে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও রপ্তানিকারকদের মতে, ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন করলে বাংলাদেশ অনায়াসে চিংড়ি চাষে এক থেকে তিন নম্বর স্থানে চলে আসবে। কারণ এদেশের পানি, মাটি ভেনামি চিংড়ি চাষে দারুণ উপযোগী।
এখন, অনেকের প্রশ্ন হতে পারে ভেনামি চিংড়ি আবার কোন জাতের? চলুন জেনে নেয়া যাক এর পরিচিতি: ভেনামি চিংড়িকে প্যাসিফিক হোয়াইট শ্রিম্প বা টাইগার শ্রিম্প বলা হয়। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল থেকে দক্ষিণে পেরু ও উত্তরে মেক্সিকো সাগর উপকূল পর্যন্ত এই চিংড়ি আদি আবাসস্থল। ২০০০ সালে থেকে চীন, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, ভারত, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামে ভেনামি বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করে। কম সময়ে দ্রুত বর্ধনশীল এই চিংড়ির উৎপাদন এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে থাকে সেসময় থেকে। ভারতে ২০২০-২০২১ সালে ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন ছিল প্রায় ৮ দশমিক ১৬ লাখ মেট্রিক টন।
বিশ্ব বাজারে ভেনামি চিংড়ির চাহিদা: বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বে চিংড়ির বাজার ছিল ১৮ দশিমক ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালে এই বাজার দাঁড়াবে সাড়ে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই আয়ের বড় যোগান আসবে ভেনামি চিংড়ি বিক্রি করে।
বিশ্ববাজারের ভেনামির দাপট : বিগত দুই দশক ধরে ৬২টি দেশ ভেনামি চিংড়ি উৎপাদন করছে। ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশ থেকে বিশ্বে সর্বমোট চিংড়ি উৎপাদনের ৭৭ শতাংশের যোগান দেয় ভেনামি চিংড়ি। এশিয়ার ১৫টি দেশ চিংড়ি উৎপাদন করছে। একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া বাকি ১৪টি দেশই বাণিজ্যিকভাবে ভেনামি চিংড়ি চাষ করছে।
ভেনামির চাষে খরচ কম, উৎপাদন বেশি : উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করা হয়। হ্যাচারি মালিক ও বিশেষজ্ঞরা জানান, এককেজি বাগদা চিংড়ির উৎপাদন খরচ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সেখানে ভেনামি চিংড়ি খরচ ৪০০টাকা। এর বাজার মূল্য ৫৫০টাকা। ৯০ দিনে চাষ করে প্রতি কেজিতে হবে ৩৫টি ভেনামি চিংড়ি। তবে পোনা উৎপাদনসহ অবকাঠামোর উন্নতি প্রয়োজন।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্টের হ্যাচারি বিশেষজ্ঞ অমিতোষ সেন ইনডিপেনডেন্ট টিভিকে বলেন, কক্সবাজার ও খুলনার পাইকগাছায় পাইলট প্রকল্পে ভেনামি চিংড়ি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ করে সাফল্য এসেছে। প্রতি হেক্টরে ১০ মেট্রিক টনেরও বেশি ভেনামি চিংড়ি পাওয়া যায়। তার মতে, ভেনামি চিংড়ি বাণিজ্যিক চাষের জন্য পোনার সহজলভ্য উৎপাদন, খাবার ও যন্ত্রাংশের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
দেড় দশকেও মেলেনি বাণিজ্যিক চাষের অনুমতি: ২০২১ সালে ভেনামির চাষের জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকার ফিড (খাবার) বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি করা হয়। কিন্তু বিমানবন্দরে কাস্টমস ছাড়পত্র না মেলায় সেই ফিড নষ্ট হয়ে যায়। এসব কথা জানিয়ে হ্যাচারি বিশেষজ্ঞ অমিতোষ সেন ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ‘ভেনামি চিংড়ি নিয়ে সরকারী কার্যক্রমকে ধীরগতির। সরকারকে উৎসাহ নিয়ে ভেনামি চাষের চাষীদের মাঠে নামাতে হবে’।
‘১৫ বছর আগে ভেনামি চিংড়ির বাণ্যিজিক উৎপাদনের অনুমতি চেয়েছিল বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএফইএ)। কিন্তু দীর্ঘদিনে এটি পাওয়া যায়নি বলে জানান বিএফএফইএ’র সভাপতি মো. আমিনউল্লাহ।
তিনি ইনডিপেনডেন্টকে আরো বলেন, ভারত, থাইল্যান্ডের সাফল্যের পর আমরা মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে ভেনামির বাণিজ্যিক চাষের অনুমোদনের আবেদন করি। ২০১৮ সালে আমাদের পাইলট প্রকল্পের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটরে তত্ত্বাবধানে পাইকগাছা ও কক্সবাজারে পাইলট প্রকল্পে চাষ করে এমইউ সি ফুড নামে একটি প্রতিষ্ঠান।
২০২১ সালে পাইকগাছায় এক হেক্টরের জলাশয়ে সাড়ে ৯ মেট্রিক টন ভেনামি চিংড়ি পাওয়া যায়। চলতি বছর দ্বিতীয় দফা পরীক্ষামূলক চাষে সাড়ে ১০ মেট্রিক টন ভেনামি চিংড়ি মেলে। বাগদা চাষে যেখানে প্রতি হেক্টরে পাওয়া যায় ৫ মেট্রিক টন।
বিএফএফইএ’র সভাপতি আমিনউল্লাহ বলেন, বিশ্ব বাজারে ভেনামি চিংড়ি ক্রেতাদের বেশি পছন্দ। এর সঙ্গে বাগদা-গলদার এখন কম নিচ্ছেন ক্রেতারা। তাই আমাদের চিংড়ি রপ্তানি গত ৮ বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি রপ্তানি করে ৫৫০০ কোটি টাকা আয় করে।
সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩০ হাজার মেট্রিক টন রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪০০০ কোটি টাকা। মৎস্য অধিদপ্তরে মহাপরিচালক খন্দকার মাহবুবুল হক ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, খুলনার পাইকগাছায় দুটি পাইলট প্রকল্পে ভেনামি চিংড়ি চাষের সাফল্য এসেছে। আশা করছি চলতি বছরই ভেনামি চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমতি দেয়া ।বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ির পরীক্ষামূলক চাষ সফল হওয়ার পর সরকার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উচ্চ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় এ চিংড়ি চাষের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে ভেনামি চিংড়ি চাষে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে এ চিংড়ি চাষের অনুমতির জন্য আবেদন করতে পারবে।
দেশে ভেনামির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয় ২০১৯ সালে। চার বছর ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এ চিংড়ির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিল সরকার। এখন আগ্রহী খামারিদের অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা যাচাই-বাছাই করে ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতি দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে মিলবে এ সুযোগ।
ভেনামি চিংড়ি চাষের বিধিনিষেধ-সংবলিত একটি নির্দেশিকাও অনুমোদন করেছে সরকার।
ভেনামি চিংড়ি আসলে কী
ভেনামি চিংড়ি একটি উচ্চফলনশীল চিংড়ি। এটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি চিংড়ি প্রজাতি। উচ্চ ফলনের পাশাপাশি এর রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্যও এটি এখন সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০ শতাংশই ভেনামি জাতের।
ভেনামি চিংড়ির ইংরেজি নাম ‘হোয়াইটলেগ শ্রিম্প’ বা সাদা পায়ের চিংড়ি। এ চিংড়ির শুধু পা দেখতে সাদা এমন নয়, পুরো চিংড়িই দেখতে কিছুটা সাদাটে। অনেকটা স্থানীয় জাতের হরিণা চিংড়ির মতো। ফলে প্রথম দেখায় এ চিংড়িকে হরিণা ভেবে ভুল করেন অনেকে। বর্তমানে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, একুয়েডর, মেক্সিকো ইত্যাদি দেশে ভেনামি চিংড়ির চাষ হচ্ছে।
ভেনামি চিংড়িকে অন্যান্য চিংড়ির সঙ্গে তুলনা করা হলে এটাকে ফার্মের মুরগির মতো ফার্মের চিংড়ি হিসেবে অভিহিত করা যায়। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভালো থাকলেও খাদ্যাভ্যাস ও আবহাওয়া বিবেচনায় এ চিংড়ি চাষের ঝুঁকি একটু বেশি। ফলে ভেনামি চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনায় জৈব নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হয়।
এ চিংড়ি চাষের ক্ষেত্রে পানি ও বর্জ্য শোধন, ভৌত অবকাঠামোর বিচ্ছিন্নতা, বায়ু সঞ্চালন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, রোগের তথ্য সংরক্ষণ, খাদ্য প্রয়োগ—এসব বিষয়ে নজরদারি রাখতে হয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের উপকূলবর্তী এলাকায় ২ লাখ ৬ হাজার ৭৬৩ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। এ জমিতে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল মাত্র ৭২ হাজার ৮০৯ টন। বর্তমান বিশ্বে উৎপাদিত চিংড়ির ৮০ শতাংশ ভেনামি প্রজাতির হলেও বাংলাদেশে এর উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে এখন দেশে চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি দুটিই বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
দেশের চিংড়িচাষিরা বলছেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ব্ল্যাক টাইগার চিংড়ি, যেটি বাগদা চিংড়ি নামে পরিচিত। সনাতন উপায়ে খামারে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ কেজির মতো বাগদা চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব। তবে এ চিংড়ি যদি নিবিড় পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়, তাহলে হেক্টরপ্রতি দেড় টন থেকে দুই টন মাছ পাওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে, নিবিড় পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষ করা হলে হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন পর্যন্ত চিংড়ি পাওয়া সম্ভব। তাতে খরচ বাদে বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ করা সম্ভব বলে জানাচ্ছেন খামারিরা। তবে উৎপাদন পদ্ধতির ওপর চিংড়ি চাষের লাভ-লোকসান ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিকভাবে ভেনামি চাষ করা গেলে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সরকারি নীতিসহায়তা বাড়লে চিংড়ির উৎপাদন ও রপ্তানিতে তার প্রভাব পড়বে।
তবে খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক করছেন যে এখনো যেহেতু ভেনামির বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়নি, তাই শুরুর সময়টাতে সাবধানতার সঙ্গে এগোতে হবে। কারণ, দেশের চিংড়ি খামারে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বা মড়ক লাগার ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে চলেছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটের মতে, ২০২৮ সাল নাগাদ বৈশ্বিক চিংড়ির বাজার দাঁড়াবে ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের। এ ক্ষেত্রে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি ডলার। তবে অর্থবছরের প্রথম নয় মাস, অর্থাৎ জুলাই-মার্চ সময়ে চিংড়ি রপ্তানিতে আয় কমেছে ২০ শতাংশ।
রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান ক্রিমসন রোজেলা সি ফুডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চফলনশীল হওয়ায় ভেনামি চিংড়ির চাষ দেশে স্থানীয় সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধি করে বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করবে।
ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমতিকে এ শিল্পের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী বেলায়েত হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রচলিত যেসব চিংড়ি আমাদের এখানে চাষ করা হচ্ছে, এসব জাত অনেক পুরোনো। চাইলেও উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব নয়। সেই বিবেচনায় ভেনামি চিংড়ি চাষের অনুমোদন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এতে উৎপাদন সক্ষমতা বেশ বেড়ে যাবে।’
তবে তিনি মনে করেন, এটা মাথায় রাখতে হবে, সঠিক পদ্ধতি মেনে ভেনামি চিংড়ির উৎপাদনে না করা গেলে, তাতে নানা উত্থান-পতন হতে পারে।