উপকূলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা: বটিয়াঘাটার এলএসটিডি প্রযুক্তি গ্রামে অর্ধ-শতাধিক কৃষক পেলেন আধুনিক কৃষি উপকরণ

প্রকাশঃ ২০২৬-০৯-০১ - ১৪:২৮

 

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করে উপকূলীয় এলাকায় ধানের উৎপাদন বাড়ানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মাঠপর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি জনপ্রিয়করণের কাজ করছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এর ‘স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ প্রকল্প। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনার বটিয়াঘাটার প্রযুক্তি গ্রামে অর্ধশতাধিক কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে আধুনিক কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনার আওতায় বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারভাঙ্গা প্রযুক্তি গ্রামে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে কৃষকদের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম, জিংক সার ও বালাইনাশকসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ এবং সাইনবোর্ড বিতরণ করা হয়। স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি) প্রকল্পের আওতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। উপকূলীয় খুলনার কৃষি লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, জোয়ার-ভাটা ও ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় এলাকার পরিবেশ ও কৃষকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধানের জাত নির্বাচন এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্রির বিজ্ঞানীরা।

এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষি-প্রতিবেশ এক নয়। তাই অঞ্চলভেদে কৃষকের সমস্যা চিহ্নিত করে উপযোগী ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং তা মাঠে সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণ করাই এলএসটিডি প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি বলেন, “প্রযুক্তি গ্রাম হচ্ছে গবেষণার ফলাফল কৃষকের মাঠে নিয়ে যাওয়ার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। এখানে নতুন জাত ও প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখানোর পাশাপাশি কৃষকের অভিজ্ঞতাও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোন প্রযুক্তি স্থানীয় পরিবেশে কতটা কার্যকর, তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।”তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার পাশাপাশি কৃষকের ঝুঁকি ও ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রযুক্তি গ্রামগুলোর কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে কার্যকর প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করা হবে।

ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনার মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কার্যালয় প্রধান ড. মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে উন্নত জাতের পাশাপাশি সুষম সার প্রয়োগ, সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কৃষকদের এসব বিষয়ে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও মাঠসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি ফলন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়বে।

ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিল্লাল হোসাইন বলেন, গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি কৃষকের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাজ করা হচ্ছে। প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে উন্নত জাতের চাষ, পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদের হাতে-কলমে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকের মাঠের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হলে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।

কর্মসূচিতে কৃষকরা জানান, সময়মতো কৃষি উপকরণ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পেয়ে তারা উপকৃত হয়েছেন। বিশেষ করে চলতি রোপা আমন মওসুমে ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ধানের জাত ব্রি ধান১১২, ব্রি ধান১১০ ও ব্রি ধান১০৩-এর চাষ, সুষম সার প্রয়োগ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে সরাসরি পরামর্শ পাওয়ায় ধান চাষে তাদের আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকলে চলতি মওসুমে ভালো ফলন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রযুক্তি গ্রামের কার্যক্রমের মাধ্যমে খুলনা অঞ্চলে স্থানীয় কৃষি-প্রতিবেশের উপযোগী উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু-সহনশীল ধানের জাত এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয় করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কৃষিকে আরও লাভজনক ও স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে কারিগরি সহায়তা অব্যাহত থাকবে।