সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলে সুন্দরবনের জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলে-বাওয়ালিদের জীবন-জীবিকা। মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহ করতে বনে গিয়ে অপহরণ, জিম্মি ও মুক্তিপণের শিকার হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটছে তাঁদের। বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করেও মিলছে না নিরাপত্তা। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জীবিকার তাগিদেও অনেক বনজীবী এখন সুন্দরবনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
এ অবস্থায় সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করা এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন উপকূলের হাজারো মানুষ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১০টায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা এলাকার বেড়িবাঁধে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়নের বিপুল সংখ্যক নারী পুরুষ এতে অংশ নেয়।
স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সুন্দরবনে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। বনে প্রবেশের পর বনজীবীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বনজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। জলদস্যুদের একাধিক দল সক্রিয় থাকায় এক দলের সঙ্গে সমঝোতা করেও অন্য দলের হাতে জিম্মি হয়ে হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর, মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন জেলার বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার পরিবার যুগের পর যুগ ধরে সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ তাঁদের আয়ের প্রধান উৎস।
স্থানীয় বনজীবীরা জানান, একসময় বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে তাঁরা নির্ভয়ে সুন্দরবনে যাতায়াত করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এখন বনে যাওয়ার আগে মাছ-কাঁকড়া পাওয়ার হিসাবের পাশাপাশি অপহরণ ও মুক্তিপণের আতঙ্কও তাঁদের ভাবতে হচ্ছে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, জলদস্যুদের চাঁদা না দিলে অপহরণ কিংবা নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার একাধিক দল সক্রিয় থাকায় একটি দলকে টাকা দেওয়ার পরও অন্য দলের কবলে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে একদিকে বনজীবীদের আয় কমছে, অন্যদিকে তাঁদের পরিবারের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে ছয়টি জলদস্য গ্রুপ পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা হলো, জলদস্যু দাদা ভাই বাহিনী, ভাই ভাই বাহিনী, আলিম বাহিনী, আমীর আলী বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, ঘুটঘুটি বাবু বাহিনী।
এসব দলের সদস্যরা সশস্ত্র অবস্থায় সুন্দরবনের নদী-খালে বিচরণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত সপ্তাহেও কোস্টগার্ডের সহায়তায় জিম্মি থাকা পাঁচ জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
কয়েক মাস আগে শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জে
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এক সমাবেশে জলদস্যু দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে এরপরও দস্যুদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ মানববন্ধনে বক্তাদের।
সুন্দরবনে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন উপকূলের মানুষ।
বনদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবিতে মানববন্ধন
মানববন্ধনে আয়োজক কমিটির পক্ষে সভাপতিত্ব করেন কামরুল ইসলাম বাবলু।
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সালাউদ্দিন লিটন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন মাস্টার আব্দুর রহিম, মাওলানা এছাহাক আলী, ইউপি সদস্য আবিয়ার রহমান, ইয়াসিন আরাফাত, নারী ইউপি সদস্য ফরিদা পারভীন ও আশিকুর রহমান।
সালাউদ্দিন লিটন বলেন, সুন্দরবন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের আধার নয়; এটি উপকূলের হাজারো পরিবারের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। জলদস্যুদের ভয়ে জেলে-বাওয়ালিরা বনে যেতে না পারলে তাঁদের পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়বে। তাই সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে কার্যকর ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করার দাবি জানান।
ইউপি সদস্য আবিয়ার রহমান বলেন, বর্তমানে ১০ জন বনজীবী জলদস্যুদের হাতে জিম্মি রয়েছেন।
অপহৃত এসব জেলেদের দ্রুত উদ্ধার, মুক্তিপণ আদায় বন্ধ, জলদস্যুদের অস্ত্র উদ্ধার এবং তাদের অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে হবে।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের নদী-খালে নিয়মিত টহল জোরদার করার পাশাপাশি বনজীবীদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে অংশ নেয়া বনজীবী গাবুরা ইউনিয়নের আব্দুল হালিম, আব্দুল মাজেদ, হযরত আলী, আলামিন বলেন, বন বিভাগের বৈধ অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশের পরও যদি জলদস্যুদের ভয়ে থাকতে হয়, তবে সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবিকা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁরা নির্বিঘ্নে মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
উপকূলের মানুষের প্রত্যাশা, সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান বনজীবীরা।
মাষ্টার আব্দূর রহিম বলেন,দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার ও স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার সংকট আরও গভীর হবে।
পশ্চিম সুন্দরবনের জলদস্যু নিয়ন্ত্রণে কোস্টারের ভূমিকা বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার বিএম সামির আলম সুজন বলেন, সুন্দরবনের দস্যু নির্মূল ও উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। কয়দিন আগে সুন্দরবনের ‘দাদা ভাই বাহিনী’ ৫ জন জেলেকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করেছিল তাদের কে উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া জেলেরা হলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রবিউল ইসলাম (৩৫) ও বিল্লাল হোসেন (২৬) এবং খুলনার কয়রা উপজেলার আলাউল ইসলাম (৩২), নওশের মোড়ল (৪১) ও শাহিনুর রহমান (২৮)। এসময় একটি একনলা বন্দুক, ছয় রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ এবং তিনটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র জব্দ করা হয়। এর আগে জলদস্যুদের সাথে কোস্টগার্ডের গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে।