খুলনায় ১৪৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত : খুমেক হাসপাতালে ভর্তি ৯৮

ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে : দুটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু

সরকারি হাসপাতালে কেসিসি’র মশক নিধন কার্যক্রম নেই

কামরুল হোসেন মনি : খুলনা বিভাগের বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। শুধু পরিধি বাড়ছে তাই নয়, বাড়ছে প্রতিদিন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে শনিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা বিভাগের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা রয়েছে ৬৮ জন। শনিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী (১ জুলাই-৩ আগস্ট) খুলনা বিভাগের ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮০ জন। এর মধ্যে খুলনা জেলায় রয়েছে ১৪৫ জন। যার মধ্যে ২ জন শিশু রয়েছে। ডায়াবেটিস, গর্ভবতী, কিডনীজনিত রোগ, লিভারজনিত রোগ ও বয়স্ক ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকে।
এদিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ দুইটি ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ৪০ শয্যা বেড চালু করেছেন। রোগীর চাহিদার তুলনায় হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ সনাক্তকরণ কিটস অনেক কম। ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মনে আতঙ্কও বাড়ছে। হাসপাতালে মশক নিধন কার্যক্রমে খুলনা সিটি কর্পোরেশন পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেই বলে রোগীর স্বজনরা জানান।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সূত্র মতে, শুক্রবার সকাল ১১টা থেকে শনিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় নতুন করে আরও ৬৮ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে রয়েছে খুলনায় ৯ জন, বাগেরহাটে ৮ জন, যশোরে ১৪ জন, ঝিনাইদহে ৭ জন, মাগুরায় ৮ জন, নড়াইলে ১ জন, কুষ্টিয়ায় ১৫ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৪ জন ও মেহেরপুরে ২ জন রয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮০ জন।
খুলনা সিভিল সার্জন দপ্তরের সূত্র মতে, ১ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট সকাল ১১টা পর্যন্ত খুলনা জেলায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলে মোট ১৪৫ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে রয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯৮ জন, খুলনা জেনারেল হাসপাতালে ৬ জন, ফুলতলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন, পাইকগাছায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন, খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ জন, খুলনা ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ৪ জন ও গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন। শুক্রবার থেকে শনিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত খুলনায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে খুমেক হাসপাতালে ৪ জন, খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন ও গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ গতকাল শনিবার এ প্রতিবেদককে বলেন, শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত গত এক মাসে ৯৮ জনকে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬২ জন ভর্তি রয়েছেন। বাকীরা চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। রোগীর চাহিদা অনুযায়ী তার হাসপাতালে ডেঙ্গু সনাক্তকরনের কিটস খুবই কম। মাত্র ৩০টি কিটস শনিবার সকালে ম্যানেজ করা হয়েছে। আগামী ২-১ দিনের মধ্যে আরো কিটস চলে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জরুরি বিভাগে নিচ তলায় শনিবার থেকে আরও ২০টি বেড চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ৪০ শয্যা বেড চালু রয়েছে।
খুমেক হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডাঃ এস এম তুষার আলম বলেন, জ্বর, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা, মাংসপেশিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এ সমস্ত লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদেরকে এনএসওয়ান টেস্ট করে ডেঙ্গু জ্বর নিশ্চিত করে ৯৮ জনকে ডেঙ্গু জ্বরে সনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২ জন শিশু রয়েছে। যারা একাধারে ৫ দিনের বেশি জ্বরে ভুগছেন তাদেরকে এন্টিবডি টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত করা হচ্ছে ডেঙ্গুর লক্ষণের বিষয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এফসিপিএস (মেডিসিন) বিশেষজ্ঞ ডাঃ শৈলান্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, ডেঙ্গু জ্বরে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যাদের কয়েকদিন ধরে জ্বর, সর্দি, কাশি বেশি হচ্ছে তাদের চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
খুমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে চিকিৎসাধীন অখিল জানান, গত মঙ্গলবার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হন। এর আগে ঢাকায় থাকাকালীন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। ঢাকায় ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার দ্বীপবরন এলাকার বাসিন্দা কমলেসের পুত্র।
খুমেক হাসপাতালে একাধিক রোগী অভিযোগ করেন, হাসপাতালে খুলনা সিটি কর্পোরেশন থেকে মশক নিধনের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। বেড স্বল্পতার কারণে অনেক রোগী বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করছেন।
হাসপাতালের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, খুমেক হাসপাতালে প্রতি মাসে খুলনা সিটি কর্পোরেশনকে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা রাজস্ব প্রদান করা হয়। সেই হিসেবে মশক নিধন কার্যক্রম আজ পর্যন্ত চোখে পড়েনি। কেসিসি শুধু হাসপাতালের বর্জ্য নিয়ে যায়। মশক নিধনের স্প্রে কার্যক্রম কোনো দিনও চোখে পড়েনি।
উল্লেখ্য, খুলনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সূত্র মতে, ২ আগস্ট (গত ২৪ ঘন্টায়) খুলনা বিভাগে ৭৯ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে খুলনায় ১৫ জন, সাতক্ষীরায় ৫ জন, বাগেরহাটে ২ জন, যশোরে ১৯ জন, ঝিনাইদহে ৮ জন, মাগুরায় ৭ জন, নড়াইলে ৭ জন, কুষ্টিয়ায় ১১ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৪ জন ও মেহেরপুরে ১ জন রয়েছে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত খুলনা বিভাগের ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০৯ জন। এর মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়।

আপনার মতামত জানানঃ