দাকোপে অবিক্রিত তরমুজ এখন গো খাদ্য চাষিদের বোবা কান্না

আজগর হোসেন ছাব্বির, দাকোপঃ চৈত্রের তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে ঘাম ঝরানো শ্রম আর সমিতি ও মহাজন থেকে সুদে নেওয়া লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগে উৎপাদিত তরমুজ এখন গো খাদ্য। পাইকারী বাজারে চাহিদা না থাকায় খুলনার দাকোপের অধিকাংশ মাঠেই পড়ে আছে লক্ষ টাকার তরমুজ। ফলে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা চাষিদের চোখে মুখে বোবা কান্নার ছাপ।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, শষ্য ভান্ডারখ্যাত দাকোপে এবার ৭ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগন। কিন্তু অধিক শ্রম আর বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদিত তরমুজ এখন চাষিদের গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। খুচরা বাজারে ভোক্তারা ৪০/৫০ টাকা কেজি দরে যখন মৌসুমী এই ফল কিনতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ পাইকারী আড়ৎ গুলোতে এর যেন কোন মূল্যই নেই। গত বছর ১ বিঘা জমির ফলন বিক্রি হয়েছিল লক্ষাধীক টাকায়। অথচ এ বছর মাঠ পর্যায়ে কোন বেপারীর দেখাই মিলছেনা। ফলে মাঠের পর মাঠ অবিক্রিত তরমুজ এখন গো খাদ্যে পরিনত হয়েছে। পুঁজি বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসাবে অনেক চাষি তরমুজ নিয়ে ছুটছেন রাজধানী ঢাকা চট্রগ্রাম রাজশাহী বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারী বাজারে। উপজেলার লক্ষিখোলা গ্রামের চাষি বায়েজিদ শেখ দাবী করেছেন, সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা খরচে ১০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। ক্রেতা না পাওয়ায় পুঁজি বাঁচাতে নিজেই মাল নিয়ে যান গাজীপুর পাইকারী আড়তে। সেখানে টানা ৪ দিনের প্রচেষ্টায় যে টাকায় মাল বিক্রি করেছেন সেটা দিয়ে পুঁজি ফিরে পাওয়া দূরে থাক। ফের বাড়ী থেকে টাকা নিয়ে গাড়ী ভাড়া পরিশোধ করতে হয়েছে। যে কারনে ক্ষেতে থাকা অবশিষ্ট মাল নিয়ে আড়তে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেননা তিনি। চালনার বাসুদেব মন্ডল জানায়, তারা দু’জনে মিলে ১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা খরচে ৬ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলেন। মাঠে ফড়িযা না পেয়ে বিক্রির জন্য মাদারীপুরের ভোরঘাটা মোকামে নিয়ে যায়। ৫ হাজার পিচ তরমুজ পরিবহনে দুই ট্রাকের ভাড়া সাড়ে ৩৮ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়। মাল বিক্রি করেছেন ৪২ হাজার ৪৩০ টাকায়। আড়তদারী খাজনা, ট্রাক ভাড়া ও কমিশন মিলে ৪২ হাজার ৪৩০ টাকার বিপরীতে তার নিকট পাওনা হয় ৪৬ হাজার ২৯৩ টাকা। নিরুপায় চাষি আড়তদারের হাতে পায়ে ধরে ১ হাজার টাকা দিয়ে বাড়ী ফিরে আসে।
দরপতনের কারন অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবার দেরীতে উৎপাদিত ফলন রমজান মাসে বিক্রি উপযোগী না হওয়ায় মৌসুমী এই ফলের চাহিদা অনেকটাই কমে যায়। সংকটের বড় কারন অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। পাইকারী বাজারে নেওয়ার উপযোগী ভারী ট্রাক বা লরি সরাসরি দাকোপে প্রবেশে আরোপিত বিধি নিষেধের কারনে মাঠ থেকে ছোট ট্রাক বা পিকাপ যোগে বটিয়াঘাটাতে এনে ভারী ট্রাকে লোড দিতে হয়েছে। ফলে গাড়ী প্রতি অতিরিক্ত ২৫/৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অপরদিকে স্থানীয় এক শ্রেনীর দালালচক্র সিন্ডিকেট গড়ে তুলে পরিবহন ট্রাক লরি ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করে। যে কারনে ১০ হাজার টাকার গাড়ী চাষিরা তাদের মাধ্যমে দ্বিগুন ভাড়ায় নিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ১ গাড়ী মাল ক্ষেত থেকে পাইকারী আড়ত পর্যন্ত পৌছাতে সব মিলে ৪০/৫০ হাজার টাকা খরচ পড়ে যায়। যার প্রভাবে শ্রম ও বিনিয়োগের নায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত চাষিরা।
উপজেলা কৃষি অফিসার মেহেদী হাসান খান বলেন, নানা কারনে এবার সারা দেশে তরমুজ উৎপাদন অনেক বেশী হয়েছে। অর্থাৎ চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ বেশী থাকায় ক্রেতা সংকট দেখা দেয়। তাছাড়া দাকোপের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় পরিবহন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। অপরদিকে আম, লিচু বাজারে আসলে তরমুজের চাহিদা কমে যায়। সব কিছু মিলেই এবার তরমুজের দর পতন হয়েছে।
সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ী চাষ বন্দ হওয়ার পর কৃষিকে ঘিরে উপকুলিয় উপজেলা দাকোপের অর্থনীতি আবার ঘুরে দাড়াতে শুরু করে। সম্ভবনাময় তরমুজ চাষের সাথে যুক্ত হয় দাকোপের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ। কিন্তু চলতি বছরের লোকসান অধিকাংশ চাষিদের নিঃস্ব করেছে। এনজিও সমিতি অথবা মহাজনি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা চাষিরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন। যে কোন মূল্যে প্রনোদনার আওতায় এনে দাকোপের চাষিদের বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছেন তারা।