খুলনা জেনারেল হাসপাতালে টেস্টের নামে বাণিজ্যের ফাঁদ!

(গাইনী ও অবস ) ডা: ফারহানা হকের কাছে শুধু সন্ধানী টেস্টের রিপোর্ট এলাও

কামরুল হোসেন মনি : খুলনা জেনারেল হাসপাতালে টেস্টের নামে বাণিজ্যের ফাঁদে নেমেছেন কতিপয় চিকিৎসক। তাদের মনোনীত নির্দিষ্ট ডায়াগণস্টিক সেন্টারে রোগীরা টেস্ট করিয়ে না আনলে পুনরায় তাদের মনোনীত ডায়াগণস্টিক সেন্টারের প্রেরণ করছেন। এমন ঘটনা ঘটছে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জেনারেল হাসপাতালে (গাইনী ও অবস) মেডিকেল অফিসার ডা: ফারহানা হকের বিরুদ্ধে নগরীর সন্ধানী ডায়াগণস্টিক সেন্টারের টেস্টের রিপোর্ট ছাড়া অন্য কোন মানসম্মত ডায়াগণস্টিক সেন্টারের টেস্ট তার কাছে গ্রহণযোগ্য না। এমনি অভিযোগ করেন গাইনী চিকিৎসা নিতে আসা হোসনেয়ারা। তার এসব বক্তব্য এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
হোসনেয়ারা জানান, তিনি গত কয়েকদিন আগে এই হাসপাতালে বহি: বিভাগের ডা: ফারহানা হকের চিকিৎসা সেবা নিতে আসি। তিনি আমাকে একটা টেস্টে করতে দেন। সেই সাথে আমাকে নগরীর সন্ধানী ডায়াগণস্টিক সেন্টার থেকে করিয়ে আনার জন্য আমাকে নির্দেশনা প্রদান করেন। কিন্তু আমি তার কথা মতো সন্ধানী ডায়াগণস্টিক সেন্টারে না গিয়ে আমার পরিচিত আত্মীয়র ডায়াগণস্টিক সেন্টার থেকে টেস্ট করিয়ে নেই। গতকাল হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে ওই গাইনী ডাক্তারের কাছে আমার রিপোর্টগুলো নিয়ে হাজির হই। তিনি আমার টেস্টের রিপোর্টগুলো দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। আমার দেয়া ডায়াগণস্টিক সেন্টার থেকে কেন করেনি তার জবাব চাইলে আমি বলি অন্যা জায়গায় করালে ২০০ টাকায় কমে পাবো। আমি গরীব মানুষ তাই যেখানে একটু কম টাকায় করাতে পারবো সেখান থেকেই তো করাবো। তিনি আবার পুনরায় আরেকটি টেস্টে দিয়ে বলেন, এই টেস্ট অবশ্যই সন্ধানী থেকে করিয়ে আনবেন, তা না হলে আমি দেখবো না। টেস্টের স্লিপে ডাক্তারের দেওয়া একটি নম্বর লিখে দিয়ে বলেন, এই নম্বরের ফোন করবেন। যদি সন্ধানী ডায়াগণস্টিক সেন্টারটা খুঁজে না পান। দরকার হয় আমার কথা বলবেন।
একই অভিযোগ রয়েছে ওই হাসপাতালের সহকারি রেজিস্টার (সার্জারী) ডা: গাজী শরিফুর রহমান এর বিরুদ্ধে। গতকাল সোমবার নগরীর ফেরিঘাট এলাকার বাসিন্দা মো: নাসিম এ প্রতিবেদককে জানান, তার পিতা মোসলেম উদ্দিনকে হার্ণিয়া অপারেশনের জন্য গতকালই সার্জারী ওয়ার্ডে চিকিৎসকের পরামর্শে ভর্তি করানো হয়। ওয়ার্ডে রাউন্ডে আসলে তার বাবাকে দেখার পর ওই ডাক্তার দুইটি টেস্ট করাতে বলেন। ওই ডাক্তার টেস্টগুলো নগরী সন্ধানী ডায়াগণস্টিক সেন্টার থেকে করানোর জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। সেই সাথে ওই ডায়াগণস্টিক সেন্টারের নম্বরও টেস্টের প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কতিপয় চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা ফির নামে হাতিয়ে নিচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। কমিশন সুবিধার লোভে একশ্রেণির ডাক্তারও এখন ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেন্টারনির্ভর চিকিৎসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। চড়া মূল্যের প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অসংখ্য পরীক্ষার চাপে রোগীরা হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। চিকিৎসকরা যত বেশি টেস্ট লিখে দেন তাদের কমিশনও তত বাড়ে। এর ভিত্তিতেই খুলনায় নামে-বেনামে অননুমোদিত ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি সেন্টার গড়ে উঠছে। সাইনবোর্ডসর্বস্ব এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মনীতির বালাই নেই, হাতুড়ে টেকনিশিয়ান দিয়েই চালানো হয় রোগ নির্ণয়ের কাজ। একই সমস্যায় একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট পাওয়ার নজিরও রয়েছে অনেক। এসব রিপোর্ট নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে।
অভিযোগ উঠেছে, কমিশনের লোভে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালের প্যাথলজিক্যাল বিভাগটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে দেওয়া হয় না। এখানে সবচেয়ে দামি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও অজ্ঞাত কারণে দ্রুততম সময়েই সেগুলো অকেজো করে ফেলে রাখা হয়।
সার্বিক বিষয়ে খুলনা সিভিল সার্জন ডা: সুজাত আহমেদ বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য সেবাকে ডিজিটালাইজড করার জন্য ব্যপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। হাসপাতালে যদি কোন পরীক্ষ-নিরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকে তবে রোগী তার রোগের ওই পরীক্ষা-নিরীক্ষা তার পছন্দমত নির্ভরযোগ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে করিয়ে নিতে পারবেন। সরকারি হাসপাতালের কোন ডাক্তার তাদের ইচ্ছামত ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোন রোগীকে কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি করতে পারে না। বিষয়টি অনাকাঙ্খিত এবং খতিয়ে দেখা হবে।

আপনার মতামত জানানঃ